জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৮১ নং কিস্তি
বাবা কারুর সঙ্গে কথা বলেছে শুনেছিস?
না।
রেগুলার চিকনাদার সঙ্গে বাবার কথা হয়। তুই চিকনাদাকে গুলি করে মেরে ফেললেও সেই নম্বর উদ্ধার করতে পারবি না।
কি করে জানলি? অনিসা বললো।
আমি নিজে কানে কথা বলতে শুনেছি তেঁতুল তলায়।
অনিসা দাদার দিকে তাকিয়ে!
আমার আর একটা সন্দেহ হয়।
কি।
অফিসের কয়েকজন বাবার স্পাই-এর কাজ করে চলেছে।
ট্রেস করতে পারবি।
তাহলে কাজ শেষ হয়ে যেতো।
কিরে কলেজ যেতে হবে না শুধু গল্প করলে হবে।
অনিসা দিদাই-এর দিকে তাকালো।
ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে দেখছিস কি। কটা বাজে খেয়াল আছে।
বোচন।
বলো।
ভাত খেয়ে যাবি না, টিফিন খেয়ে যাবি।
ভাত খেয়ে বেরোব।
বুঁচকি।
আমিও ভাত খাবো।
মা রেডি হচ্ছে তাড়াতাড়ি।
তুমি যাও, যাচ্ছি।
বেশি রাতের ফ্লাইটে কলকাতায় আসার মজাই আলাদা। কেউ কাউকে চেনে না। সবচেয়ে ভালো লাগে অতো বড়ো ফ্লাইটে সাকুল্যে দশ বারো জন লোক থাকে। এগুলো ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট মাঝরাতের একটু পরে কলকাতায় পৌঁছে আবার ভোরের দিকে রওনা হয়ে যায়। আগের ফ্লাইটটা চেষ্টা করলে হয়তো ধরতে পারতাম। তাহলে বাকি কাজটুকু শেষ হতো না।
তাই সব কাজ শেষ করে যখন ফিরেছিলাম অনুপ বার বার বলেছিল আজ রাত টুকু আমার বাড়িতে থেকে যা। কালকে সকালের ফ্লাইটে একসঙ্গে সকলে যাব।
আমি রাজি হইনি। অনুপ আর ভালো লাগছে না। হাত ধুলাম। জানিনা এরপর আমার কপালে কি লেখা আছে। কাল সকালে ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে হাজির হবো। তারপর যা থাকে কপালে।
রাতে ফিরবি কি করে?
ওই তো কয়েকঘণ্টা সময় তারপর ঠিক চলে যাব।
কলকাতায় কিন্তু এখন বেশ টেনশন।
থাকলে থাকবে তাতে আমার কি।
তোর পেছনে কিন্তু লোক লেগে রয়েছে।
তুই আছিস কি করতে।
আমাকে একটু সময় দিতে হবে তো?
আমার বাঁচা মরার ব্যাপারটা আমার হাতে। তোকে সব ডকুমেন্টস এখনও দিইনি।
পাসপোর্ট গুলো?
সব আছে।
সকাল বেলা রাঘবন কি বললো?
আমরা পলিটিক্যালি প্রেসারে যা পারলাম না তুই তা করে দেখালি। আমাদের একটা হেডেক চলে গেল।
তনু কোথায়?
সকালের ফ্লাইটে কলকাতায় ঢুকবে।
স্টার্ট করেছে?
হ্যাঁ।
তুই কিছু খোঁজ খবর নিয়েছিস?
হাসলাম।
মিষ্টি মহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো কলকাতার মাটি ছুঁচ্ছে আমাদের ফ্লাইট। বুকের ভেতরটা সমান্য কেঁপে উঠলো।
অনি এবার তুমি কি করবে? তোমার মকসদে তুমি পৌঁছে গেছ। এতদিন তুমি জীবন কাটিয়েছ একভাবে। এবার তোমাকে অনেকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কি উত্তর দেবে?
আমি ক্লান্ত এখন কোনও প্রশ্ন করো না।
প্রথমে কাকার কাছে যাব। তাকে আমার সব কথা জানাতে হবে। তারপর সব।
বসিরহাট?
যাব।
তোমার ছেলে মেয়ে?
অবশ্যই ওদের কাছে আমাকে কনফেস করতে হবে।
এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দেখলাম। শুনশান। কেউ নেই।
দু-একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে।
কাঁধের ঝোলাটা একবার ঠিক করে নিলাম।
সাধুবাবা কোথায় যাবেন? সামনে একটা বছর তিরিশের ছেলে।
গড়িয়া হাট।
তিনশো লাগবে?
অতো নেই ভাই।
কতো দিতে পারবেন?
একশো টাকা দিতে পারবো।
হবে না।
তাহলে একটু হেঁটে যাই যদি বাস পাই।
প্লেনে এলেন পকেটে টাকা নেই?
কে দেবে ভাই। যারা নিয়ে গেছিলো তারা প্লেনের টিকিট কেটে তুলে দিয়ে গেছে। বললো গাড়ি থাকবে আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য, দেখছি না তো।
তাহলে অপেক্ষা করুণ, চলে আসবে।
ছেলেটি চলে গেল।
দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। বরং পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই।
অনুপ বার বার বলেছিল পকেটে টাকা কড়ি কিছু আছে, না থাকলে নিয়ে যা।
আছে। যা আছে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যাব। তাছাড়া ঝোলায় কার্ড আছে। প্রয়োজনে তুলে নেব।
মচকাবি, তবু ভাঙবি না।
এইভাবে তো জীবনটা কাটিয়ে দিলাম।
মাথার জটাগুলো কবে পরিষ্কার করবি?
কাজলদীঘিতে গিয়ে।
শ্মশান, পীরবাবার থান এখনো অক্ষত আছে?
চিকনা তাই বললো।
একবার চিকনাকে ফোন করতে পারতিস।
শুধু শুধু টেনশন বারিয়ে লাভ আছে। ওরা তো জানে আজ না হয় কাল ফিরবো।
আমার কালকে যেতে একটু বেলা হবে। সকালে কোর্ট খুললে কাগজপত্র রেডি করে সঙ্গে নিয়ে যাব।
তাই আসিস।
এখন এই অঞ্চলটা অনেক বেশি ঝকঝকে। চারিদিকে ফ্লুরসেন্ট লাইটগুলোর জোড়াল আলো থিক থিক করছে। শুনশান রাস্তায় হাঁটতে বেশ লাগছে। পায়ে পায়ে ভিআইপি রোড-এর মুখে চলে এলাম।
দু-একটা গাড়ি যে যাচ্ছে না তা নয়। হাত দেখালে এই কানা রাতে কে থামে। তার ওপর এই জটাজুটধারী চেহারা। কে কি মনে করছে কে জানে।
আজ প্রথম ছেলেমেয়ের মুখো মুখি হবো। কি বলবে ওরা।
যে ভাবে শেষের কয়েকটা মাস আদাজল খেয়ে পরেছিল তাতে অনেক কিছুই ওরা জেনে ফেলেছে। মিত্রা ওদের কিছু কিছু জানাতে পারত। আমি যদি ওদের জায়গায় থাকতাম তাহলে আমিও এই বিহেভটাই করতাম।
যশোর রোড দিয়ে একটা প্রাইভেট বাস ঘুরলো। মুখটাতেই দাঁড়াল।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।
ভাই আপনারা কোথায় যাবেন?
এটা যাবে না। গ্যারেজ।
আপনাদের গ্যারেজ কোথায়?
গড়িয়া স্টেশন।
আমাকে একটু নামিয়ে দেবেন?
কোথায় যাবেন।
গড়িয়া হাট?
ছাড়তে দেরি হবে।
ঠিক আছে আমি না হয় একটু অপেক্ষা করি।
করুন।
বেশ কিছুক্ষণ পর বাস ছারলো। সাহেব সুবোরা একটু চা খেলেন। ফাঁকা রাস্তায় বাস ছুটল তার মর্জি মাফিক। সারাদিনে এই একবারই মনে হয় এরা জোড়ে গাড়ি চালায়।
সাধু বাবা পাঁচটা টাকা দেন। আপনার হাতেই বৌনি করি। দেখি আজ আপনার কৃপায় বাজারটা কেমন যায়।
পকেট থেকে পাঁচটা টাকা হাতে দিলাম। ছেলেটি একটা টিকিটও দিলো।
গড়িয়াহাটে যখন এসে নামলাম তখনও সকাল হয়নি। প্রাতঃভ্রমণ কারীরা সবাই যার যার নিজের মতো বেরিয়ে পরেছে।
একদিন এই সাত সকালেই জ্যেঠিমনিকে ফিরিয়ে আনার জন্য বেরিয়ে পরেছিলাম।
একবার ফ্ল্যাটে গেলে কেমন হয়।
না থাক।
এখন হয়তো ওই ছেলেটি নেই। কি যেন নাম? মনে পরছে না।
সঙ্গে যে চাবিটা আছে, সেটাও হয়তো বদলে ফেলেছে মিত্রা।
আজ নিজে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
সামনেই সুজিতদার বাড়ির গলি। এই একটা লোক যে তার ভাইকে ভোলেনি।
দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এখনও।
হ্যাটস অফ সুজিতদা, তোমার ঋণ আমি এই জীবনে শোধ করতে পারবো না।
জ্যেঠিমনি। সত্যি কি কপাল আমার সেদিনও আমার সঙ্গে কেউ ছিল না, আজও নেই।
পায়ে পায়ে চায়ার দোকানটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
কোনও বদল হয়নি।
মুখ বদলায় দোকানের রং বদলায় না।
রাস্তাঘাটের কিছু পরিবর্তন হয়েছে।
ভাই এক ভাঁড় চা দেবেন।
বসিয়েছি, দাঁড়ান।
দাঁড়ালাম।
থলথলে চেহারার কমতি নেই কলকাতা শহরের বুকে। সে তুলনায় বিদেশের লোকেরা অনেক বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। এরা ভাবে সকালে উঠে ঘাম ঝরালেই ওজন কমবে। ওতে পাঁচ–সাত কিলোর বেশি কমে না। তারপর যে খাওয়াটা খায় তাতে ডবল বেড়ে যায়।
নিজের মনে নিজে হেসে ফেললাম।
চারিদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। কলকাতা আছে সেই কলকাতাতেই।
এই নিন।
ছেলেটির হাত থেকে চায়ের ভাঁড়টা নিয়ে চুমুক দিলাম।
নাঃ চায়ের স্বাদও বদলায় নি।
সেই একই রকম। একটু আমলাটে আমলাটে গন্ধ ছাড়ছে।
আকাশটা একটু একটু পরিষ্কার হচ্ছে। কলকাতার ঘুম ভাঙছে।
এই কয় বছরে কতো দেশ ঘুরলাম। কতো রকমের চা খেলাম। কিন্তু কলকাতার এই ভাঁড়ের চা কোথাও খুঁজে পাইনি।
শেষ এসেছিলাম সুরোর ছেলেটা হবার সময়, তাও বছর চারেক হয়ে গেল।
তার মানে সুরোর ছেলের এখন চার বছর বয়স!
সাধুবাবা খুচরো দেবেন।
কত দেবো ভাই।
কলকাতায় নতুন?
নিজের মনে নিজে হাসলাম।
দেড়টাকা।
যাক এটার তাহলে পরিবর্তন হয়েছে।
এই দোকানে শেষ চা খেয়েছিলাম আটানা দিয়ে। আঠারো বছর দু-মাসে একটাকা বেরেছে।
হাঁটতে হাঁটতে ট্র্যাংগুলার পার্ক। সেই চিরপরিচিত রাস্তা। গতো আঠারো বছরে বার পাঁচেক এই রাস্তায় ঢুকেছি।
ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম।
আজ প্রথম যেন মনে হচ্ছে বুকটা একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে।
কেন?
কি অনিবাবু এতদিন কাউকে ভয় পাওনি। হঠাৎ তোমার আজ বুক কাঁপছে।
নিজের মনে নিজে হাসি।
পায়ে পায়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
কেউ ওঠে নি। দরজাটা একটু ফাঁক করা। তার মানে দাদা একা উঠেছে। এটা দাদার কাজ। প্রথমে ঘুম থেকে উঠে ছগনলালের ঘরের দেয়ালের গা থেকে চাবিটা নিয়ে গেটের তালা খোলা। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে এসে একবার ডানদিক একবর বাঁদিক ভালো করে দেখা। তারপর বাগানে পায়চারি।
সেই যে গেটটা একটু খুলে বাইরে বেরিয়ে আসবে আর লাগাবে না।
অনেক সময় কুকুর ঢুকে বাগান নোংরা করে দিয়েগেছে। বড়োমা বাগানে এসে দেখতে পেয়ে মুখে যা এসেছে তাই বলেছে। কে কার কথা শোনে। সেই এক স্বভাব। সেই ট্র্যাডিশন।
ভতরে এসে দাঁড়ালাম। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। চারিদিক নিস্তব্ধ। আমগাছটা ঠিক সেইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার ঝাঁকরা চুলগুলোয় আমার মতো জট ধরেছে। আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসলো।
এসেছিস। আয়, তোকে কতোদিন দেখিনি।
ঠিক পাশেই পেয়ারা গাছটা। যেন আমগাছটার একমাত্র সন্তান। অতোটা বড়ো নয়। এই সাত সকালে দুটো টিয়াপাখি পাকা পেয়ারা খেতে আসতো। তাদের সঙ্গে আমাগাছের কাকেদের ঝগড়া বেধে যেত। সে কি ঝগড়া, কা কা আর টেঁও টেঁও শব্দে চারদিক ম ম করে উঠতো। দেখতে ভারি ভালো লাগতো। সাকলটা বেশ ভালো কাটতো।
সারাটা বাড়ি ঘুমিয়ে আছে। কটা দিন এই বাড়ির ওপর দিয়ে বেশ ঝড় বয়ে গেছে।
অনেক কিছু ওলট পালট হয়েছে।
এবার আমার হিসাব নেওয়ার পালা। দাঁতের পাটি দুটো শক্ত হয়ে উঠলো।
পায়ে পায়ে বাড়ির পেছনের বাগানে এলাম। দাদা মাটিতে বসে গাছের পরিচর্যা করছে।
এটা দাদার একটা নেশা।
সেই চেহারা আগের থেকে একটু রোগা হয়েছে। বুকে যন্ত্র বসেছে। চুলগুলো আগে কাঁচাপাকা ছিলো এখন অনেক বেশি সাদা। কালোর চিহ্নমাত্র নেই।
একবারে কাছে গিয়ে আস্তে করে ডাকলাম।
দাদা।
কে!
চমকে পেছন ফিরে তাড়াতাড়ি উঠতে গেল, পারলো না। দাদা কেমন টাল খেলো।
সাইড ব্যাগটা কোনও প্রকারে মাটিতে রেখে দাদাকে জড়িয়ে ধরলাম।
কে, কে আপনি!
দাদা আমাকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। আমার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। আঠারো বছর আগের মুখটা দাড়ি গোঁফে ঢাকা পড়ে গেছে। দাদার চোখের মনিদুটো থিরি থিরি কাঁপছে। আপনা থেকেই চোখে জল টলটল করে উঠলো। পরিবর্তনের ছোঁয়া সারাটা চোখে মুখে। ঠোঁট দুটো ছোট্ট দুধের শিশুর মুতো ফুলে ফুলে উঠলো। মুখটা বেঁকে চুড়ে দুমড়ে গেলো। মিনু বলে তারস্বর চিৎকার করতে গিয়ে গলা বুঁজে গেল। শুধু একটা অস্ফুট শব্দ রিনিঝিনি সুরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
আমি দাদাকে আষ্টে পৃষ্ঠে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
আজ পর্যন্ত বাবার বুকের স্পর্শ অনুভব করতে পারিনি। দাদাই আমার বাবা, দাদাই আমার সব। এর আগে দাদার বুকে মুখ লুকইনি তা নয়। তবে সে অনুভূতির থেকে এই অনুভূতির স্পর্শ সুখ আরও বেশি মধুর। দাদার শরীরের ওমে আমি স্নাত। আমার সারাটা শরীরে মিহি কুয়াশার মতো তা ছড়িয়ে পরছে। আমি দাদাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। বুকের ভেতরটায় কিছু যেন একটা আটকে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
দু-জনে কতক্ষণ দু-জনকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। দাদার চোখের ফোঁটা ফোঁটা জলে আমার উদম পিঠ ভিঁজে যাচ্ছে। পিঠে নরম হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলাম।
এবার ছাড়।
দাদার বুকের অর্গল থেকে মুক্ত হলাম। আমার ঠিক পেছনে বড়োমা। একটু দূরে মিত্রা, ছোটোমা।
বড়োমাকে জড়িয়ে ধরলাম।
দাদা তখনও ফুঁপিয়ে চলেছে।
কাপর দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললো, যাই ডাক্তারকে খবর দিই।
কেউ কোনও কথা বললো না।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
চোখ ছল ছল করছে। কিন্তু কাঁদছে না।
আমি বড়োমার দুই কাঁধে হাত রাখলাম।
প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললাম, এটা অনির আসল চেহারা, নকল নয়।
এইবার বড়োমার ঠোঁট ফুলতে শুরু করলো।
না না কাঁদবে না। অনি কথা দিচ্ছে আর কোনওদিন কোথাও যাবে না।
কে কার কথা শোনে বড়োমা ডুকরে কেঁদে উঠলো।
বড়োমাকে জড়িয়ে ধরে ছোটোমা মিত্রার কাছে এলাম।
তাদেরও সেই একই অবস্থা।
মুখে কোনও কথা নেই। চোখের ভাষাই আজ মুখের ভাষা।
কাছে যেতে মুখ নীচু করলো।
কিগো অনিকে বকবে না।
দুজনে কেঁদে ফেললো।
কেঁদো না। অনি ফিরে এসেছে।
তিনজনের নিবিড় বন্ধনে বাঁধা পরলাম।
নিস্তব্ধ বাগান। মিহি কান্নার শব্দ। গাছের ডালে বসে থাকা পাখির কিচির মিচির, সব যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে চারিদিকে ঝড়ে পরছে।
বারান্দায় মল্লিকদার গলা পেলাম। ছোটোমার নাম ধরে ডাকছে।
ছোটোমা মুখ তুললো।
চলো মল্লিকদা উঠেছে ভেতরে যাই।
মিত্রা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
এরই মধ্যে চোখ ফুলিয়ে ফেললি।
তিনজনকে নিয়ে ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এলাম। মল্লিকদা আমকে দেখতে পেয়ে ছুটে এলো। কিছুক্ষণ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকলো। কথা বলতে চাইলেও যেন বলতে পারছে না।
এ কী চেহারা করেছিস তুই! গলাটা ভেঙ্গে গেল। শেষটুকু আর বলতে পারলো না।
আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
গেটদিয়ে দেখলাম ডাক্তারদাদা খালিগায়ে পাজামা পরে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছে।
চোখে মুখে খুশির ছোঁয়া। কাছে এসে ফিক করে হাঁসলো।
এই হাসির আড়ালে কান্না লুকিয়ে আছে। চোখ দুটো ছল ছল করছে না। তবে অসহ্য যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট।
বেশ বানিয়েছিস তো চেহারাটা।
ডাক্তারদাদা বড়োমার দিকে তাকাল।
কি বান্ধবী এ্যাম আই রাইট ওর রং। মল্লিক সর, আমি একটু বুকে নিই।
ডাক্তারদাদা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
তুই না থাকাতে বড়ো একা হয়ে পড়েছিলাম বুঝেছিস।
আমি ফিরে এসেছি। আর যাব না।
ডাক্তারদাদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
সত্যি বলছি। কথা দিচ্ছি।
ডাক্তার দেখো ওর দাড়িটা কিরকম সাদা সাদা লাগছে।
দাদার কথায় ডাক্তারদাদা হাসলো।
বয়স তো কম হলো না। তোমার চুল কি কালো আছে।
ডাক্তারদাদা আমার দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে।
অরিজিন্যাল। একবারে জল মেশানো নেই।
মামনি একবার বোচন আর বুঁচকিকে ডাক। ডাক্তারদাদা মিত্রার দিকে তাকাল।
আমরা ওপরের গ্যালারিতে শ্যুট করছি।
আমি ওপরের দিকে তাকালাম। ছেলেমেয়ে দু-জনে মোবাইল হাতে ছবি তুলে যাচ্ছে। হাসলাম।
হাত নারলাম।
দু-জনে ছুটতে ছুটতে হুড়মুড় করে নিচে নেমে এলো।
সামনে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল। এতদিন গল্প শুনেছে। মনে মনে বাবার একটা ছবি এঁকেছে। তার সঙ্গে ঠিক মিল খুঁজে পাচ্ছে না।
মেয়ে এগিয়ে এসে আমাকে প্রণাম করলো। ওকে বুকে টেনে নিলাম। গালে গাল ঘসে দিলাম।
উঁউউ।
মিত্রা হাত দিয়ে চোখের জল মুছে হাসলো।
দাদার কাছে তুই জিততে পারলি না।
বুক থেকে মাথা তুললো। মেয়েকে মুখোমুখি দাঁড় করালাম। সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখেছে।
কেন?
দাদাকে জিজ্ঞাসা কর।
ছেলে নীচু হয়ে পা ছুঁলো।
দাঁড় করিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলাম আমার সমান হাইট।
আমার চোখে চোখ রেখেছে।
কিছু খোঁজার চেষ্টা। ওর জায়গায় আমি থাকলে আমার চোখের ভাষাও এরকম হতো।
কাল তুই ঠিক জায়গায় গেছিলি।
ছেলে মাথা নীচু করলো।
কাজ সারতে দেরি হলো। তাই মাঝ রাতের ফ্লাইটে এলাম।
মেয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে।
আমার দেখা পেয়েগেলেই তুই বোনকে হারিয়ে জিতে যেতিস। মাউন্ট এভারেস্টে উঠে ফার্স্ট ফ্ল্যাগটা তুই-ই ওড়াতিস তাই না।
ছেলে মুখ নীচু করে হাসছে।
দাদা তুই কি বেইমান!
তুই ঠিক ডালটাতে বসেছিলি, তবে ঐ ডালটা আমি পনেরো দিন আগে কেটে ফেলেছি।
মেয়ের চোখ গোল্লা গোল্লা।
সেই জন্য সাতদিন খুব টেনসনে ভুগলি। তুই একা নোস, সবাই। এই সাত দিন আমি নিজেকে টোটাল ব্ল্যাক আউট করে দিয়েছিলাম। আঠারো বছর আগে যাদের নিয়ে কাজ করতাম, তাদের নিয়ে কাজটা সারলাম। মাত্র দুটো নতুন ছেলে। এই সাতটা দিন আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
একটু থামলাম।
একটু বেশি সাবধানী হয়ে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো খতোটায় প্রলেপ দিলাম।
অনিসা, অনন্য দুজনেই আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
বুঝলি বাবা, মানুষ বিস্মৃতির জাত। সবাই যদি সব কিছু মনে রাখতে পারতো, তাহলে পৃথিবীর রং-রূপ সব অন্যরকম হয়ে যেত। যাদের নিয়ে কাজ করলাম, তাদের নাম ধাম সকলে ভুলে গেছে। খাতা কলমে তাদের এখন কেউ চেনে না। তারাই আমার কাজটা করে দিল। বাবা চলে এসেছে। নো টেনশন, ডু ফুর্তি। এবার শুধু মন দিয়ে পড়াশুন। কি তাই তো?
ছেলের চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
মাথায় রাখবে, মা সব সময় মা। এর ঊর্ধে পৃথিবীতে আর কেউ নেই। বাবা চেষ্টা করলেও ওই আসনে কোনওদিন বসতে পারবে না। তোমাকে ন-মাস দশদিন গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে। তুমি চেষ্টা করলেও মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সেই ঋণ শোধ করতে পারবে না।
ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজলো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সবাই আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
অনন্য আমি কান্না পছন্দ করি না। এটা তুমি নিশ্চই এতদিনে তোমার মা, দিদানদের কাছে জানতে পেরেছ। তুমি পুরুষ মানুষ, কেঁদে বিশ্বজয় করতে পারবে না।
লিপিড ইট, বি স্টেডি।
ছেলে তবু বুকে মুখ গুঁজে রইলো।
দিদাই কাঁদতে পারে, দিদান কাঁদতে পারে, মা কাঁদতে পারে। তাদের জীবনটা সীমাবদ্ধ। চলার পথে তাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। তোমার নেই। আজ থেকে মেন্টাল প্রিপারেসন নাও। মনে করো, তোমার চোখটা পাথরের। তার থেকে জল পড়ে না।
ছেলে বুক থেকে মাথা তুললো।
আমি কথা দিলাম বাবা। আর কোনওদিন এই ভুল করবো না।
এবার একটু হাসো।
ছেলে কান্নাভেঁজা চোখে হেসে ফেললো।
মিত্রা আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে। বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা ওর চোখে মুখে। অনেক কথা ওর বলার আছে। ওর চোখ তাই বলছে।
ওরকম ভাবে ঢেপসির মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেন। একটু চা বানা।
মিত্রা মুখ নীচু করে নিল।
মেয়ে ফিক করে হেসে ফেললো।
হাসলি কেন? মেয়ের গালটা টিপে দিলাম।
তুমি মাকে তুই বললে।
ছোটোমা মুখ টিপে হাসছে।
চল ভেতরে চল। ডাক্তারদাদা বললো।
সবাই ভেতরে এলাম।
বসার ঘরটা যেমন ছিল ঠিক তেমনি আছে। কোনও পরিবর্তন হয়নি। সেই টেবিল চেয়ার।
বড়োমা।
বড়োমা রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়াল।
ভজু কোথায়?
অনেকদিন মার কাছে যায়নি, কাল একবারটি গেছে।
ছগনলাল।
বয়স হয়েছে, ঘর থেকে ঠিক মতো বেরতে পারে না।
তাহলে গেটে কে থাকে?
ওর ছেলেটা রয়েছে।
আমাকে একটু নুন-তেল দাও।
কি করবি?
দাঁতটা মাজি।
তুই কি সত্যি সন্ন্যাসি হয়েছিস!
কয়েক দিনের জন্য।
তোকে এই চুল দাড়িতে ভালো লাগছে না।
কেটে ফেলবো।
আজই কাট, এখুনি।
আমাকে আটচল্লিশ ঘণ্টা সময় দাও।
বড়োমা এগিয়ে এলো।
তুই কি এই সাজ-পোষাকে সারা বিশ্ব ঘুরতিস!
তোমার বিশ্বাস হয় না।
না হয় না। মিত্রা ওর পাজামা পাঞ্জাবী বার কর।
না বড়োমা তা হয় না।
কেন!
পনেরো বছর ধরে যে নিয়ম নিষ্ঠা পালন করে এসেছি তুমি আর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য তা ভেঙ্গে দিও না।
কেন বল।
কাকা যেদিন মারা গেল, আমি তখন লণ্ডনে। চিকনা ফোন করে সব জানাল। কাছা কাছি গঙ্গা কোথায় পাব। তাই টেমস নদীতে স্নান করে কাছা নিলাম। সেও কতো ঝক্কি পোহাতে হলো, সে তোমায় কি বলবো। সাদা থান হাতের কাছে পেলাম না। গেড়ুয়া ধারণ করলাম। চিকনাকে বললাম চিতার ছাই একটু খামে করে পাঠিয়ে দিস। চিকনা কথা রেখেছিল। সেই থেকে এই পোশাক শরীরে তুলে নিয়েছি। বলতে পার আমি বিগত পনেরো বছর ধরে অশৌজ পালন করছি।
বড়োমা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।
কেঁদো না। মনাকাকা, তোমরা না থাকলে অনি হয়তো স্রোতে ভেসে যেত। তোমরাই তো আমার বন্ধন। তিনি আমার জন্য সারা জীবন এতো কষ্ট করলেন, আর আমি তার জন্য এটুকু করতে পারবো না।
আমি তোকে আর কোনও দিন কিছু বলবো না।
কেন বলবে না। তাহলে বুঝবো তুমি আমার সেই বড়োমা আর নও।
ছোটো ওর জন্য রান্নাঘরে চা করিস না।
সেটা করো না। ওটুকু ধরে রাখতে পারিনি। যতটুকু মন থেকে চেয়েছে মানার চেষ্টা করেছি।
ছোটোমা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছেই চলেছে।
প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হয়েছে। তারপর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।
অনিদাআআ….অনিদাআআআআ…. কেউ যেন ত্রাহি ত্রাহি রব ছেড়ে ছুটে আসছে।
বড়োমা চমকে উঠলো।
কে?
নিমেষের মধ্যে গেটের কাছে একটা মুখ ভেসে উঠলো।
হাঁপাচ্ছে।
বুকটা হাপরের মতো ওঠা নামা করছে।
এক চিলতে হাসি প্রতিপদের চাঁদের মতো দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
ছুটে এসে আমাকে কোলে তুলে একপাক ঘুরে নিল, তারপর নামিয়ে রেখে জড়িয়ে ধরে ভজু ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললো।
কাঁদছিস কেন!
তুমি আমার সঙ্গে কথা বলোনি কেন?
আমি তো তোর সঙ্গে কথা বলেছি।
ওটা তো মিছি মিছি।
গেটের সামনে ইসলামভাই, দামিনীমাসি।
চোখদুটো ছল ছল করছে। কাছে এসে দুজনে জড়িয়ে ধরলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো।
এই দেখো কান্নাকাটি কিসের জন্য শুনি।
কতদিন পরে তোকে ছুঁলাম। দামিনীমাসি বললো।
একটু চেটে নাও।
দামিনীমাসি কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললো।
তুই বললে তাও করতে পারি।
গলাটা মিউ মিউ করছে কেন। মাসির থুতনিটা ধরে মুখটা তুলে ধরলাম।
মাসি হাসছে।
তোমার নাগর ফিরে এসেছে।
যাঃ ওরা আছে। মাসি বুঁচকিদের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল।
আমি হাসছি।
দেখলাম মেয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেসে ফেললো।
দেখো আমার কথা শুনে তোমার বুঁচকি হাসছে।
কাল সারারাত ঘুমোয়নি। ইসলামভাই ধরা গলায় বললো।
কেন!
তোর কথা শুনেছে।
শেষ হয়েছে, না আরও বাকি আছে?
এখনও বাকি আছে।
খবর কে দিল?
বুঁচকি ম্যাসেজ করেছিল।
দামিনীমাসি হাসছে।
আমার কচুরী জিলিপি।
এতক্ষণ পরে অনি ঠিক কথা বলেছে। ডাক্তারদাদা চেঁচিয়ে উঠলো।
সত্যি তো দামিনী।
রতন আনছে দাদা। ইসলামভাই-এর ধরা গলা।
সবাইকে খবর দেওয়া হয়ে গেছে? মাসির দিকে তাকালাম।
হ্যাঁ।
কিরে কবিতা ওখানে দাঁড়িয়ে রইলি কেন—ভেতরে আয়।
তুমি চিনতে পেরেছো!
কবিতা এগিয়ে এসে পায়ে হাত দিল।
ওকে তুলে ধরলাম।
একেবারে বুড়ী হয়েগেছিস।
তুমি বুঝি জোয়ান আছো।
আমার দাড়িতে হাত দিল।
তোমাকে বেশ লাগছে।
তোর ভালো লাগছে।
একবারে সাধুবাবা সাধুবাবা। আজ তোমাকে ওখানে একবারটি যেতে হবে।
যাব—
ইসলাম এই পোষাকে অনিকে বেশ মানিয়েছে বলো। ডাক্তারদাদা হাসছে।
দাদা আপনি খালি গায়ে?
আর বোলো না—
ইসলামভাই হাসছে।
কাল কার মুখ দেখে শুয়েছিলাম কে জানে। সকালটা খুব ভালো শুরু হলো।
কেন!
এডিটর গিয়ে ডেকে তুললো। শিগগির চলো—
কেন! আবার কার কি হলো?
কিছু হয় নি—
তাহলে!
অনি এসেছে—
ঘুম চোখে এডিটরের পেছন পেছন বেরিয়ে এলাম। যা পরে কাল শুয়েছি সেই পরে চলে এলাম।
ও বুঁচকি—
বলো—
তোর দুদুনের একটা পাঞ্জাবী আন, গলিয়ে নিই।
মেয়ে দাদার ঘরের দিকে গেল।
ছোটোমা চায়ের পট ট্রে নিয়ে এলো।
দামিনীমাসি রান্নাঘর থেকে কাপ নিয়ে এলো।
রতন একটা বড়ো ঝুড়ি কাঁধে করে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। আবিদের হাতে একটা নারকেল ঝাঁটা।
এ কি অলুক্ষণে, তুই সকাল বেলা ঝেঁটা নিয়ে এলি কোথা থেকে! দামিনীমাসি বললো।
তুমি বুঝবে না মাসি।
রতন হাসছে।
আবিদ সোজা বড়োমার পায়ের কাছে গিয়ে বসলো।
এই নাও তোমার মুড়োঝাঁটা, এখন যতো খুশি আমাকে ঝাঁটা পেটা করতে পার। আমার একটুও লাগবে না।
সবাই হেসে ফেললো।
বড়োমা আবিদের কান ধরলো।
তোকে আমি ঝাঁটা পেটা করবো বলেছি।
তুমি এই ক-বছরে, কমসেকম হাজার বার বলেছো, ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে।
সাবাই হাসছে।
যাই বলো বান্ধবী আবিদ কিন্তু অন্যায় কিছু বলে নি। ডাক্তারদাদা বললো।
সাউকিরি হচ্ছে। বড়োমা ধমকে উঠলো।
থামো ডাক্তার থামো। চা খাও। এখুনি তোমার এ্যান্টি হয়ে যাবে, ছেলে এসেগেছে। এবার দেখবে দু-জনের দেমাকে মাটিতে পা পরবে না। তারপর অন্যান্য সাগরেদরা তো আছেই। দাদা বললো।
মরণ, বুড়ো বয়সে রস কতো দেখ। বড়োমা চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে।
ছোটোমা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
ছেলে, মেয়ে দুজনে দিদানের কথা শুনে হেসেই চলেছে।
তোরা হাসছিস কেনরে—ও ছোটো দে তো কানটা মূলে—
দু-জনে মিলে দিদানকে জাপ্টে ধরেছে।
সবাই হাসছে।
মিত্রা আমার কাছে এসে দাঁড়াল।
তোর আর কাপর নেই।
রতন পাশে ছিল। শুনতে পেয়েছে।
দাঁড়ান দাঁড়ান ম্যাডাম।
তুই দাঁড়া রতনদা আমি যাচ্ছি।
আবিদ ছুটে বেরিয়ে গেল।
তুই কি খাবি?
ওই তো কচুরী খাব। স্নানটা সেরে কাপরটা ছেড়ে নিই।
আবিদ একটা প্যাকেট এনে আমার হাতে দিল।
ঠিক মতো নিয়ে এসেছিস।
মাসিকে সঙ্গে নিয়ে গেছিলাম।
মাসি হাসছে।
কথাবার্তা হই হুল্লোড় চলছে। আমি চা খেয়ে বেরিয়ে এলাম।
মিত্রা আমার পেছন পেছন এলো। শিঁড়িদিয়ে উঠতে যেতেই মিত্রা বলে উঠলো।
ওপরে কোথায় যাচ্ছিস?
ঘরে—
তোর ঘর মেয়ে দখল করেছে। ওটা আর তোর নেই।
তাহলে!
আমি এখন নীচে—
মেয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে।
যাও না মা, বাবা যখন যেতে চাইছে।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
চল—
নিচের ঘরে এসে ঢুকলাম।
আমার আলমাড়িটা মিত্রা নিচে নিয়ে এসেছে। আর একটা আলমাড়ি দেখলাম। টেবিলে আমার ফটোটা যেমন দেখে গেছিলাম ঠিক তেমনি আছে। টেবিলটা আমার মতোই অপরিষ্কার। মিত্রা দরজায় ছিটকিনি দিল।
করছিস কি?
ছাড়তো—
ছেলে মেয়ে রয়েছে—
তাতে কি হয়েছে—
ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বুকে মুখ ঘসছে।
কাঁদিস না। তুই কাঁদলে আমি ঠিক থাকতে পারি না।
আমি আর পারছি না বুবুন।
আমি সব জানি।
গত এক সপ্তাহ ধরে কথার জবাব দিতে দিতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি।
বুক থেকে ওর মুখটা তুলে ধরলাম। চোখের পাতা শিশির স্নাত।
আমি এসেগেছি।
ওরা তোকে এ্যারেস্ট করবে।
তোকে একটা কথা বলে দিলাম, আমার শরীরের একটা লোম স্পর্শ করার ক্ষমতা কারুর নেই।
অনিমেষদা কিছু করতে পারেনি।
ঠিক আছে, কাঁদিস না।
ইসলামভাই সরিয়ে দেবে বলেছে।
আমি সব জানি।
তোর ছেলে সব জানে, মেয়ে কিছু জানে না।
বোকা কোথাকার, আমি তোকে কথা দিচ্ছি।
মিত্রা কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
একটা চুমু দে।
তুই বুড়ী হয়ে গেছিস। দেখতে কেমন লাগছে। চোখের তলাটা কেমন ফুলে ফুলে গেছে।
তুই বুড়ো হোস নি—
হয়েছি। তবে তোর মতো নয়। শক্ত শক্ত লাগছে কেন বলতো।
তোর ছেলেমেয় চিবিয়ে সব খেয়ে নিয়েছে।
গালটা টিপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। মিত্রা চোখ বন্ধ করলো।
দরজায় টোকা পরলো। মিত্রা চোখ খুললো। হাসলো।
চোখে মুখে খুশির ছোঁওয়া।
যা তুই দরজা খোল, আমি বাথরুমে ঢুকি।
আমি আর দাঁড়ালাম না, তাড়াতাড়ি গিয়ে বাথরুমের দরজা বন্ধ করলাম।
মাস্তানটা কই রে—অনিমেষদার গলা।
বুঝলাম মিত্রা ঘরের দরজা খুলেছে।
মিত্রা চুপ করে রইলো।
নিশ্চই বাথরুমে, আর তুই বসে বসে চোখের জল মুছছিস।
তবু মিত্রা কোনও কথা বললো না।
আয় ওই ঘরে আয়।
যাচ্ছি, আপনি যান।
তুই বৃথা কষ্ট পাচ্ছিস। মেঘ কেটে গেছে। আমি সব খবর নিয়ে নিয়েছি। তোকে একবার বলেছি, ও নিজের ঘর নিজে সামলায়, আমাদের সাহায্য নেয় না।
কই, সাহেব কোথায়?
অনুপদার গলা পেলাম।
বাথরুমে ঢুকে বসে আছে। অনিমেষদা বললো।
চল চল। অনেক সুখবর আছে। অনুপদার গলা।
বাথরুম থেকেই বুঝলাম, ওরা মিত্রাকে নিয়ে ওই ঘরে চলে গেল।
ভালো করে স্নান করলাম। কোমরে চাবিটা বাঁধলাম। সাদা থানগুলো বেশ দামী বলে মনে হল।
মাসির চোখ আছে। কাপর পরে গায়ে আলোয়ানটা চাপিয়ে বেড়িয়ে এলাম।
শূন্য ঘরে পাখাটা বন বন করে ঘুরছে, কেউ নেই।
আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালাম। বেশ লাগছে। জটাগুলো সাপের মতো বেশ বড়ো হয়ে গেছে। জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে।
তোর কি এখনও….!
ঘরের সামনে ইসি দাঁড়িয়ে। আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। কাপরটা ছাড়ারও মনে হয় সময় পায়নি। খবরটা পেয়ে কোনও প্রকারে জড়িয়ে চলে এসেছে।
ইসি আমার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।
কি হলো। দাঁড়িয়ে রইলি কেন? আয়।
ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদে উঠলো। আমি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর মুখ তুললো।
একি শরীরের অবস্থা তোর!
আমি ঠিক আছি। তোরা বরং বুড়িয়েছিস—
ইসি বুকে মুখ ঘসছে।
কাঁদিস না। কাঁদলে ভালো লাগে, বল?
এই কটা বছর কি ভাবে কেটেছে জানিস?
জানি।
কেন তুই এরকম করলি?
আর যে উপায় ছিল না।
তুই একবার ছুটকির দিকটা ভাবলি না।
ভেবেছি বলেই তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম।
ইসি মুখ তুললো।
না হলে ফিরতিস না!
ফিরতাম, আর একটু দেরি হতো। পিকু কোথায়?
ওর বাবা অফিসে টেনে নিয়ে গেছে। যেতে চাইছিল না।
হাসলাম। অনেক বড়ো হয়ে গেছে।
ইসি হাসলো।
বরুণদা আসবে না?
বললো তোমরা যাও, আমি গেলে এখন চান্স পাব না, বরং একটু পরে যাচ্ছি।
সুরো ছুটে এসে ঘরে ঢুকলো।
তুমি সব আদর খেয়ে নিলে আমি কি খাবো।
জোড় করে ইসিকে সরিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরলো।
আমি কাঁদবো না অনিদা। সুরোর গলাটা ভাড়ি হয়ে এলো।
তাহলে গলাটা বুঁজে আসছে কেন?
সুরো বুকে মাথা রেখেছে। ওর বুকের লাবডুব শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।
দেখি সবাই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। অংশু আসেনি?
সুরো মাথা দোলাল—এসেছে।
বৌদি, জ্যেঠিমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। অংশু পেছনে এসে দাঁড়াল। সুরো আমাকে জড়িয়ে ধরেই হাঁটছে। ওদের কাছে এলাম।
বৌদির কাঁধে হাত রাখলাম।
কি দেখছো?
বৌদি মাথা নীচু করে নিলো। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে।
অনি ফিরে এসেছে।
সে তো দেখতে পাচ্ছি। গলাটা ভাড়ি ভাড়ি।
জ্যেঠিমনি চোখ মুছলো।
আংশু এগিয়ে এসে নীচু হলো।
আজ থাক অংশু। ওর হাতটা ধরে ফেললাম।
চলো খিদে পেয়েছে। খেতে হবে।
তোর খিদে পায়?
বৌদির কথায় হাসলাম। বৌদি, জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরলাম।
সুরো, তোর ছেলেটা কই?
দাদুর কাছে রেখে এসেছি। শ্বশুর মশাই বললেন, তুমি যাও বৌমা, আমি একটু পরে বুকুনকে নিয়ে যাচ্ছি।
ঝোলা থেকে মোবাইলটা বার করলাম।
মোবাইলটা অন করতে একটা মিউজিক বেজে উঠলো। মেয়ে আমার দিকে তাকাল।
বাবা এটা পাম টপ।
হাসলাম।
তুই নিবি?
চালাতে পারবো না।
শিখে নিবি।
বাইরের ঘরের দরজার সামনে এলাম।
ঘরে তিল ধারনের জায়গা নেই। গিজ গিজ করছে।
অনিমেষদা উঠে এলো। পেছন পেছন বিধনাদা, অনুপদা, রূপায়ণদা, প্রবীরদা।
বেশ জব্বর পোশাকটা লাগিয়েছিস। মাথার গালেরগুলো নকল না আসল।
হাসলাম।
দেখছো প্রবীর সেই অম্লান হাসি।
দাদা আজ কাউকে প্রণাম করতে পারলাম না। এই পোষাকে প্রণাম করা যাবে না। যার জন্য এই পোশাক ধারণ করেছি, তাহলে তাকে অসম্মান করা হবে।
জানি রে জানি। দিদির মুখ থেকে এখানে এসে সব শুনলাম।
অনিমেষদা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
তোর কলকাতায় আজকে ঢোকার কথা নয়।
বিধানদার মুখের দিকে তাকালাম।
কেন আগে থেকে দিনক্ষণ ঠিক করা ছিল নাকি?
সেরকমই তো শুনেছি।
এখনও এতো খবর রাখেন?
তোর জন্য রাখতে বাধ্য হচ্ছি।
জানেন বিধানবাবু আজও এয়ারপোর্ট থেকে বাসে করে এসে গড়িয়াহাটে নেমেছে।
এ্যাঁ, তাই নাকি!
জিজ্ঞাসা করুণ। আমি মিথ্যে বলছি কিনা।
হাসলাম।
কিরে তাহলে কথাটা সত্যি?
ট্যাক্সি ড্রাইভারের বুদ্ধি নিয়ে কি স্পাইগিরি করা চলে।
বাবাঃ জল এতদূর পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে! বিধানদা বললো।
ইসলামভাই জোরে হেসে উঠলো।
তাহলে এটাই অনি ব্যানার্জী, যাচাই করার আর দরকার নেই কি বলুন বিধানবাবু? অনিমেষদা বললো।
অনি ব্যানার্জী আজ থেকে আঠারো বছর আগে বসিরহাট থেকে ফেরার সময় একটা রোড এ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। আমার গলাটা সকলের কানে একটু অন্যরকম শোনাল।
হাসতে হাসতে সবাই কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অনিমেষদা আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে।
বডিটা পাওয়া যায় কল্যনী হাইওয়ের ধারে একটা ঝোপে। তার পোস্টমর্টেম হয়েছে ব্যারাকপুরে, তার বডিটা হ্যান্ড ওভার করা হয় সেই সময়কার পার্টির রাজ্য সম্পাদক অনিমেষ বিশ্বাসের হাতে, তারপর তাকে নিমতলা মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। সেই সার্টিফিকেটেও অনিমেষ বিশ্বাস সাইন করেন।
ঘর ভর্তি সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
নিস্তব্ধ ঘর। মেয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে। অবাক হয়ে তার বাবার কথা শুনছে।
আর কিছু জানতে চাও—
তাহলে আমার সামনে জলজ্যান্ত লোকটা যে দাঁড়িয়ে আছে, সে কে?
সেটা সময় বলবে।
তাহলে আমরা কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
সেটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আশা রাখি তুমি যতটা জানতে চেয়েছিলে, তার সঠিক উত্তর পেয়ে গেছ।
তাহলে বিধানবাবু লড়াইয়ের ময়দানটা বেশ ভালোই তৈরি আছে, কি বলুন?
হাসলাম।
বড়োমা খিদে পেয়েছে।
ফোনটা বেজে উঠলো। খুলে নম্বরটা দেখে মিত্রার দিকে তাকালাম। হাসলাম।
এখনও চেঞ্জ করিনি।
ইসি হাসছে।
মা তুমি ফোন করেছিলে? দাও দাও নম্বরটা দাও।
সেই আগের নম্বরটা? অনিমেষদা মিত্রার দিকে তাকাল।
মিত্রা মাথা দোলালো।
ঘরে এসে সোফায় বসলাম। সবাই আজ খুশি খুশি। ডাক্তারদাদা এরই মধ্যে ধোপ দুরস্ত হয়ে পরেছে। দামিনীমাসি, ছোটোমা রান্নাঘরে।
প্রবীরদা একটা ফাইল নিয়ে এসে আমার হাতে দিল।
ওটা কি প্রবীর? অনিমেষদার চোখেমুখে বিষ্ময়।
একটা ফাইল।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
পরে শুনবেন।
তারমানে!
বললাম তো পরে শুনবেন।
প্রবীরদা আমার দিকে তাকাল—
তুই আমাকে তিরিশ হাজার টাকা দিবি।
কেন!
ঘুষ না। ফাইলাটা ব্যাঙ্কের লকারে পনের বছর রেখেছিলাম। দু-হাজার টাকা করে প্রতি বছর। হিসাব করলে তিরিশ হাজার হয়।
হাসলাম।
অনিমেষদারা কিচ্ছু জানে না। শুধু আমি একবার কাগজগুলো ভালো করে পড়েছি।
অনিমেষদা, প্রবীরদার দিকে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে হেসে ফেললো।
বুঝলেন বিধানবাবু সরষের মধ্যে যদি ভূত থাকে আপনি ভূত তারাবেন কি করে?
মিত্রার মোবাইলে ঘন ঘন ফোন আসছে। বুঝতে পারছি কারা করছে। আমি মিত্রার হাতে ফাইলটা দিলাম।
আমাকে একবার দেখাবি না।
অনিমেষদা করুণ সুরে বললো।
ডাক্তারদাদা হাসছে। বাহাত্তর ঘণ্টা পর।
মিত্রা এগিয়ে এলো। কানে মোবাইলটা চেপে ধরে আছে। ফাইলটা আমার হাত থেকে নিল।
চলে আয়।….হ্যাঁ কচুরী খাওয়া চলছে….।
কে এতো ফোন করছে রে। অনিমেষদা বিরক্ত হয়ে বললো।
কে আবার, ওর সব বন্ধুরা।
দেখলাম ছেলে, মেয়ে দুজনেই বেশ পরিবেশটা এনজয় করছে।
ভজুরাম দৌড়তে দৌড়তে ঘরে ঢুকলো।
দিদিমনি—দিদিমনি, শুভদাদা এসেছে।
দেখলাম ছেলে, মেয়ে দুজনেই বেরিয়ে গেল।
দেয়াল ঘরিটার দিকে তাকালাম। সারে দশটা।
অনুপ এখনও ফোন করলো না কেন? সময় হয়ে গেছে।
মেয়ে গম্ভীর হয়ে ঘরে ঢুকলো। ছেলের মুখটাও শুকনো। পেছনে শুভ, শুভর দাদু।
সবাই বুঝতে পেরেছে, কিছু একটা ঘটেছে।
বাবা তোমাকে থানার ওসি একবার ডাকছেন।
আমি ক্যাজুয়েলি বললাম, যা ভেতরে ডেকে নিয়ে আয়।
উনি আসতে চাইলেন না।
এবার আমার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেল।
গিয়ে বলগে যাও, আপনি প্রয়োজন পরলে ভেতরে গিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলতে পারেন, না হলে ফিরে যেতে বলেছে আপনাকে।
গলাটা গম গম করে উঠলো।
মেয়ে আমার অস্বাভাবিক গলার স্বরে একটু চমকে উঠলো।
ও থাক আমি যাচ্ছি। ইসলামভাই এগিয়ে গেল।
না।
মেয়ে বেরিয়ে যেতে গেল।
শোনো।
ফিরে দাঁড়াল।
আমি কি বললাম বুঝতে পেরেছো।
মেয়ে মাথা দোলাল।
আমার গলার টিউনটা ধরতে পেরেছ।
পেরেছি।
ঠিক এইভাবে কথা বলবে।
মেয়ে মাথা দুলিয়ে বেরিয়ে গেল।
আমি শুভর দাদুকে জড়িয়ে ধরলাম।
আজ প্রণাম করতে পারলাম না।
এটা কি আর নতুন করে বলতে হয়।
শুভ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
হাসলাম।
শুভ মাথা নীচু করে নিল। ওর মাথায় হাত দিয়ে ওর চুলটা ঘেঁটে দিলাম।
কিরে প্রেমানন্দকে চিনতে পারছিস না?
হেসে ফেললো।
আমার ছবিট বানিয়েছিস।
কোনও উত্তর নেই।
তোমার আজ আসার কথা নয়—
শুভরদাদু আমার দিকে তাকাল।
কি করবো, শুনলাম এখানে খুব প্রেসার গেম খেলছে সবাই।
সে কাজ তো শেষ করে এসেছো।
এখনও কিছুটা বাকি আছে।
ভেতরে আসুন।
শুভরদাদু আমি ভেতরে এলাম।
সবার সঙ্গে আলাপ হয়েছে?
তোমার দৌলতে আলাপ না হয়ে থাকতে পারে।
তুই তো কচুরীগুলো এখনও খেলি না। বড়োমার কণ্ঠে অভিমান ঝড়ে পরলো।
কি আছে, আমি খেয়ে নেব। মিত্রা কথাটা বলেই জিভ বার করে ফেললো।
বৌদি আমি হাফ। সুরো হাসতে হাসতে বললো।
বড়োমা না হেসে থাকতে পারলো না।
ওসি ভদ্রলোক দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
আমি এগিয়ে গেলাম।
ঘরের সবাই কেমন চুপচাপ হয়ে গেল।
স্যার।
একটা সেলাম ঠুকলেন।
সবার চোখে মুখের চেহারাটা কেমন মুহূর্তে বদলে গেল।
স্যার এসপি সাহেব, সিপি সাহেব পাঠালেন যদি দয়া করে পাঁচ মিনিট সময় দেন। ওনারা আপনার কাছে আসবেন।
এসপি আবার সিপি!
হ্যাঁ স্যার।
এসপি কোথা থেকে এলো?
বলতে পারবো না স্যার।
আমার কাছে! কেন?
তা জানিনা স্যার।
আপনি ঠিক বলছেন!
হ্যাঁ স্যার।
আপনি কাকে চাইছেন ঠিক বলুন তো?
অনি ব্যানার্জী।
উনিতো আঠারো বছর আগে মারা গেছেন!
জানি স্যার।
তাহলে?
বলতে পারবো না স্যার।
হেসে ফেললাম।
ওনাদের গিয়ে বলুন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রসচিবকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাড়িতে আসতে। আমি আজ রাতটুকু এই বাড়িতে থাকবো। কাল সকালে আমার দেশের বাড়িতে যাব। যা বিরক্ত করার আজ করবেন, কাল থেকে যেন বিরক্ত না করেন।
আচ্ছা স্যার।
ভদ্রলোক গট গট করে চলেগেলেন।
ফিরে দাঁড়ালাম।
অনিমেষদা এগিয়ে এলো। চোখে মুখে অনুসন্ধিৎসা। আমার দুই কাঁধে হাত রাখলো। আমার সম্মানটা একটু রাখিস।
তোমার সম্মানহানিটা কে করলো বলো?
না, বলছি….।
কেন, এখন তোমাদের সরকার নয়।
আমি জানি, তুই সব খবর রাখিস।
তাহলে। চুপচাপ বসে থাকবে। তোমরা পার্টি করো, পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তোমরা চলো, আমি আমার ব্যক্তিগত গঠনতন্ত্রে চলি।
মিত্রার ফোনটা বেজে উঠলো।
একবার মোবাইলের স্ক্রিনটা দেখে নিয়ে ভয়েজ অন করে দিল।
তারপরেই চিকনার গলা ভেসে এলো।
গুরুমা।
বলো।
তাইরে নারে না….।
আবার কি হলো!
গুরু একহাত দিয়ে দিয়েছে। খালি বাছুর হয়েই চলেছে হয়েই চলেছে।
কেন!
সকাল থেকে এখানে ছোটাছুটি পরে গেছে।
হুঁ।
বাসু এসেছিল, বললো ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। আমি বলে দিয়েছি গুরু সিগন্যাল না দিলে একবারে যাবি না।
হুঁ।
তুমি শুধু হুঁ হুঁ করছো কেন বলো তো?
তোমার গুরু এসেছে, তোমার কথা শুনতে পাচ্ছে।
অনি এসেছে! শালা ছুঁচ্চা, আমাকে একটা ফোন করতে পারে নি।
তোমার কথা শুনে হাসছে।
ওকে হাসাচ্ছি। আমি এখুনি রওনা হচ্ছি।
কাল সকালে ওখানে যাবে।
ওকে আসাচ্ছি।
ফোনটা কেটে গেল।
(আবার আগামীকাল)
জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রোমাঞ্চকর গল্প কিন্তু সিরিয়ালে পুরোটা পাচ্ছি না একটু দিবেন pls.