| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাজলদীঘি

Reporter Default
রিপোর্টার / ৩২৬৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০

জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

৯১ নং কিস্তি

অনিমেষদারা সব বারান্দায় বসে। নিজেকে ধরে রাখা এই মুহূর্তে সত্যি খুব কঠিন। বেশ কিছুক্ষণ শক্ত কাঠের মতো দুজনকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমিই এখন এদের কাছে অন্ধের যষ্ঠি। বড়োমা বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।

এবার ছাড়ো, আর না। তোমরা ওর মা। এরকম করলে চলবে কি করে। ওর দিকটা তোমরা একটু ভাবো। একার মাথায় কতো বোঝা।

কে কার কথা শোনে।

বড়োমার সৌজন্যে কিছুক্ষণ পর মুক্ত হলাম।

তোমাদের আজ প্রণাম করতে পারলাম না। কাল করবো।

সুরোমাসি আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো।

আবার কাঁদে। আমি ফিরে এসেছি। আর যাব না। কথা দিচ্ছি।

এবার নীপার পালা। সে একটু জড়িয়ে ধরে কাঁদলো।

তুই কাঁদছিস কেন। তুই জানিস না তোর দাদার ব্যাপার। বড়োমার স্নেহের ধমক।

বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। যা দেখে গেছি সেরকমই আছে। সেই বেঞ্চি, কাকার সেই চেয়ার। এখন ওখানে অনিমেষদা বসে আছে।

বড়োমা এসে মুখে চোখে হাত বোলাল।

মুখটা একেবারে শুকিয়ে গেছে।

বারান্দার এক কোনে ডাবের কাঁদি, কলার কাঁদি।

হাসলাম।

চোখ পড়ে গেছে। অনিমেষদা বললো।

এসেই একেবারে প্রণামী নিয়ে ঢুকলি। একবার ভাবলাম আমি অনি হয়ে যাই। তারপর ভাবলাম এই বুড়ো বয়সে যদি মারধোর খাই। তার থেকে বরং এইই ঠিক আছে।

বিধানদা হেসে উঠলো।

প্রবীরদারা কোথায়?

সব এপাশে, ওপাশে আছে।

এখানে এসেও মিটিং করতে শুরু করে দিয়েছ?

তুই করলে দোষ নেই আমরা করলেই দোষ।

কিরে একটা ডাব কেটে দিক। বড়োমা মুখের দিকে তাকিয়ে।

না। একটু সাদা জল দাও।

দিচ্ছে। নীপা তোর জন্য সাবু, মুগডাল ভিঁজিয়ে রেখেছে।

আমি এখন স্নান করবো।

এই অবেলায়?

না হলে পারবো না।

কলের জলে কর।

না পুকুরে ডুব মারি।

ইসি পেটে গোঁতা মারলো, তোর সৌজন্যে ডাব খাওয়া যাবে।

এই কটাতে কি হবে।

আরও আসছে।

অর্ডার দিলি।

শুধু একবার বললাম।

খাতায় লিখে রাখিস।

দেবো না একটা গাঁট্টা।

তেড়ে এলো।

থাম না। সব সময় খালি ঘুঁসো ঘুঁসি।

বড়োমা আমার কাপর দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে।

মিত্রা ভেতর থেকে বেরলো।

দিদিভাই, আদোর দেখছিস।

থাম তুই।

বাবা চিংড়ি মাছের মোলা খেলাম। অনিসা, দিদানকে সরিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরলো।

কতোটা খেলি?

বেশি না। মা একটুখানি দিল।

বাকিটা সব একা খেয়ে নিল!

না সবাই খেয়েছি।

নীপা জল নিয়ে এলো।

জানো মৌসুমীদিদা মাছ ধরেছে। অনিসা বললো।

আবার টবায় নেমেছে!

তুমি বারন করো না। সকালে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে চলে এসেছে। গামছা পরে ছেনিজাল নিয়ে নেমে গেছে। চিকনাদা বারন করেছিল, দুমুড়ো গাল দিল। নাতি, নাতনী আসবে না। তারা কি শুকনো ভাত খাবে? নীপা বললো।

সাপেটাপে কামড়ালে কেলেঙ্কারি হবে।

অনিসার দিকে তাকালাম।

তুই দেখেছিস মৌসুমীদিদা কোথা থেকে মাছ ধরেছে।

তুয়া দেখিয়েছে।

সেটা আবার কে!

নীপা হেসে ফেললো।

কাছে টেনে নিলাম।

এতোবড়ো হয়ে গেছে!

তেরো পেরিয়ে চোদ্দয় পরলো।

ম্যাডাম কোথায়, কাছাকাছি আছেন নাকি।

সব তেঁতুল তলায় খেলছে।

নীপার হাতে গ্লাসটা ফেরৎ দিলাম।

মাথা নীচু করে ভেতর বারান্দা হয়ে রান্নাঘরে এলাম। দামিনীমাসি ঠ্যাং ছড়িয়ে বসেছিল। আমাকে দেখে পা গুটিয়ে নিল।

মিত্রা।

বল।

আমাকে একটা কিছু দে। স্নান করে পরতে হবে।

টাওয়েল পরে স্নান কর। গা মুছে এটাই পরে নিবি।

আমার কোনও অসুবিধে নেই, তোদের অসুবিধে হবে না তো?

থাকলে হতো, নেই তো হবে কোথা থেকে।

যাক একটা জিনিষ আদায় করা গেল।

না না আমি এখুনি বাসুর দোকান থেকে আনিয়ে দিচ্ছি।

কি হলো আবার! বড়োমা বললো।

শুনলে না কি বললো। ঠিক সময় মতো প্যাঁচ মেরে দেবে।

মিত্রা দৌড়লো।

ছোটোমা কোথায় বড়োমা?

ও বাড়িতে আছে। শরীরটা একটু গণ্ডগোল করেছে।

কি হয়েছে!

গ্যাস।

অবেলায় খেয়ে…।

না। ধাবাতে খেয়েছে।

কেন খেতে গেল।

খেয়ে এসেই বললো, দিদি অন্যায় হলো, লোভের মারে খেয়ে নিলাম।

ওষুধ খায়নি।

খেয়েছে।

ঠিক আছে যাও। কাপরটা নিয়ে এলে আমাকে পুকুর ঘাটে দিয়ে যেতে বলো।

বড়োমা চলে গেল।

আমি পুকুর পাড়ে এলাম। সেই বাঁশ ঝাড়, সেই আমগাছ, সেই আমড়াগাছ, এখনও অটুট। কোথাও একটুও টোল খায় নি। দো-পাখা উনুনটার দিকে চোখ চলেগেল। এখন মনে হয় আর ব্যবহার হয় না। আগে কাকী ধান সেদ্ধ করতে বসলেই, আমি বাঁশঝাড়ের তলা থেকে শুকনো পাতা ঝাঁট দিয়ে একটা বস্তায় ভরে টেনে টেনে নিয়ে আসতাম। মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। আমার কতো স্মৃতি এই ছোট্ট জায়গাটার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

কাকার হাতে প্রথম মার খেয়েছিলাম ঠিক এই জায়গায়, নিজের মনে নিজে হাসলাম।

আমড়া গাছের ডাল থেকে পুকুরে লাফিয়ে পরে স্নান করছিলাম বলে। তখন কেউ পুকুরঘাটে ছিল না। কাকা খেয়ে স্কুলে যাবে। আমি স্কুল থেকে সবে ফিরেছি। কাকীমার কাছে খেতে চেয়েছিলাম, বললো স্নান করে আয়, কাকার পাতে দুটো খেয়ে নিবি। কাকা খেয়ে পুকুরে মুখ ধুতে এসে দেখতে পেয়েগেছে। পুকুরের ধারে একটা মাছধরার ছিপ পোঁতা ছিলো সেইটা দিয়ে সপাং সপাং করে কয়েকটা বাড়ি মারলো। কাকীমা এসে জড়িয়ে ধরলো। সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। একটু কেঁদেছিলাম। কাকাকে মনে মনে ভীষণ গালাগাল দিয়েছিলাম।

সেই কাকা এখন আকাশের তারা। আমাকে আর কোনওদিন ছিপ দিয়ে মারবে না।

পায়ে পায়ে আমড়া গাছটার কাছে এলাম। একবার ছুঁয়ে দেখলাম। আমড়া গাছের গোড়ায় সেই খতকুঁড় এখনও আছে। প্রত্যেকদিন গোয়াল ঘড় পরিষ্কার করে যা গোবর জমা হয়, এখানে ফেলা হয়। কিছুটা ঘুঁটে করে শুকিয়ে উনুনের জালন হিসাবে ব্যবহার করা হয়। বাকিটা বছরের শেষে চাষের ক্ষেতে দেওয়া হয় সার হিসাবে।

এখন কতো কেমিক্যাল সার বেরিয়েছে। কাকা কোনওদিন ব্যবহার করতে দিত না। সেই পুরনো অনুশাসন, পুরনো প্রথা। খুব বেশি হলে ডিমেক্রন স্প্রে করে দিত, তাও যদি ধানে পোকা লাগতো।

আমি খতকুঁড় থেকে একটু ঘুঁটের ছাই তুলে নিলাম।

পুকুর ধার দিয়ে হেঁটে খালের ধারে এসে বসলাম।

খালের ওপারে গদাধর সামন্তর বাড়ি। কাকা বলতো গদাই সাঁতের বাড়ি। তার তিন ছেলে। ছোটোটার নাম বিমল। কাকা বিমলা বিমলা বলে ডাকতো। ভীষণ স্বার্থপর ছিল। কাকার সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া করতো। তখন খুব রাগ হতো। বৈষয়িক ব্যাপার। বুঝতাম না। এখন বুঝি। আমাদের বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে নিয়ে চলে যেত। কাকা কিছু বললেই ঝগড়া। তোমার ঘরের বাঁশ ঝাড়। বাবার নাম ধরে বলতো ওটা অধীপ কাকার, তুমি বলার কে।

সেই বিমল সামন্ত এখন নাকি কলকাতায় বাড়ি করেছে। কি সব ব্যবসা করে নাকি। এখন ন-মাসে ছ-মাসে একবার আসে ভায়েদের কাছ থেকে ধানের ভাগ নিতে।

ওই দিকের ঘরটা সিংয়ের ঘর। এই তল্লাটের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু চাষী পরিবার। সিংয়ের ঘরের বুড়ী আমাকে খুব ভালোবাসতো। আমি বলতাম ঠাকুমা। তোবড়াগাল একটাও দাঁত নেই। একটা মাত্র ছেলে হরি সিং। কালো কুচকুচে খুব খাটিয়ে মানুষ ছিল। কাকাকে দাদা বলতো তাই আমি বলতাম হরিকাকা। একা হাতে সংসার চালাত। হরিকাকার চোদ্দটা ছেলে মেয়ে। এই গ্রামের সবচেয়ে বেশি ছেলে মেয়ের বাবা।

আমার পৈতের সময় ঠাকুমা এসে কাকাকে বললো, ও মনা আমি অনিকে আবড়া ভাতা খাওয়াব।

সে কিগো! তুমি চাষী ঘরের মানুষ। ব্রাহ্মণের ছেলেকে ভাত খাওয়াবে, এটা হয় নাকি। তাও আবার তার আগামীকাল পৈতে।

ঠাকুমা ফোকলা হাসি হেসে বলেছিল খই-মুড়ি, চিঁড়ে-দই খাওয়াব।

চালের কোনও জিনিষ খাওয়াতে পারবে না।

ঠিক আছে সাবু ভিঁজানো আর মুগডাল খাওয়াব সঙ্গে ফল-মূল।

হ্যাঁ, কথাটা যেন মাথায় থাকে।

ঠাকুমা ফোকলা গালে হে হে করে হেসেছিল।

সেদিনটা আমার বেশ মনে পড়ে। এর বাড়ি তার বাড়ি করে সারাদিন খেয়েছিলাম। সবচেয়ে ভালো খাইয়েছিল গাঙ্গুলী বাড়ি, আর অধিকারী বাড়ি। রাতে গেছিলাম ঠাকুমার কাছে খেতে। আমাকে একটা নতুন পাটভাঙা ধুতি আর গেঞ্জি দিল পরতে। আমি কোনওপ্রকারে জড়িয়ে নিলাম। তখন কতো বয়স হবে। ফোরে পরি। মনে হয় নয়।

জেদ ধরলাম আমি কিছুতেই সাবু খাব না। শেষে পান্তা খয়েছিলাম, চিংড়ি মাছের টক দিয়ে। কেউ জানে না। আজও কেউ জানে কিনা তাও জানি না। সে কতোকাল আগের কথা।

আমি যখন গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় আসছি, সেই দিন ঠাকুমা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল। আজ ঠাকুমাও আকাশের তারা।

শুনলাম সেই সংসার আজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। অতো জমি-জমা সব ভাগ হয়ে গেছে। এখন সেই সোনার সংসার আর নেই।

আমি ভানু এই খালে কতো নৌকা চড়েছি। তখন আমি ভালো সাঁতার জানতাম না। খালের মাঝে নৌকো নিয়ে গিয়ে ভানু শুধু নৌকো দোলাত। নৌকয় জল উঠে যেত। আমি ভয়ে তারস্বরে চেঁচাতাম। কোনও প্রকারে ডাঙায় এসে বেধড়ক মার দিতাম।

একবার সত্যি সত্যি নৌকয় প্রচুর জল ঢুকে গেল। নৌকো ডোবার আগে ভানু লাফ দিয়ে জলে পরলো। আমি ভয়ের মারে নৌকো থেকে নামতে পারলাম না। নৌক সমেত জলে ডুবলাম। কোনওপ্রকারে হাবুডুবু খেতে খেতে একপেট জল খেয়ে ডাঙায় উঠলাম। ভাগ্য ভালো তখন খালে বেশি জল ছিল না। তারপর ভানুর সঙ্গে অনেকদিন আর কথা বলিনি।

কিরে এখানে বসে বসে কি করছিস?

মিত্রার গলা পেয়ে পেছন ফিরে তাকালাম।

চিকনা, বাসু, তনু, মিত্রা, ইসি এসে দাঁড়িয়েছে।

দেখ তনু দেখ। ওর কীর্তি দেখ। মিত্রা বললো।

তোমার মুখে ওগুলো কি। তনু বললো।

বুঝতে পারলে না। চিকনা বললো।

না।

ঘুঁটের ছাই।

তনু এবার হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পরলো।

হাসছো কেন! আমি বললাম।

হাসবে না। তোর কীর্তিগুলো তো সব খোদাই করে রাখার মতো। বাসু বললো।

কেন!

তুই যেমন চিকনাও তেমন।

কেন বলবি তো!

তুই চিকনাকে বললি তনুর হাত দিয়ে ঘুঁটের ছাই পাঠিয়ে দে। ও অমনি ঠোঙায় করে তনুর হাত দিয়ে তোকে পাঠিয়ে দিল।

তাতে হয়েছে কি। অসুবিধে কোথায়?

তার জন্য তনু ম্যাডামকে কতো কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জানিস।

ও এবার মনে পড়েছে।

যাক বাবু স্বপ্নের রাজ্য থেকে মর্তে ফিরলেন। মিত্রা বললো।

বুঝলি বাসু আমস্টার্ডামের কাস্টমসের লোকগুলো কোনওদিন তো ঘুঁটের ছাই দেখেনি। ভেবেছে হেরোইন। একচ্যুয়েলি তনুর বোঝানতে কোনও ফাঁক ছিল।

ইসি, চিকনা, তনু হেসে গড়িয়ে পরে।

তনু হাসতে হাসতেই বললো। আমার বোঝানতে ভুল ছিল না।

জানো মিত্রাদি আমি তো লাগেজ রিসিভ করারা জন্য দাঁড়িয়ে আছি। একজন এসে বললো। তনুশ্রী চকরবরতী। ওরা কিরকম ভাবে উচ্চারণ করে না।

বললাম আমি।

সে কি সন্দেহের চোখে আমাকে দেখা। প্রথমে বুঝতে পারিনি।

আপনি একটু আসবেন।

গেলাম। তখন দেখি আমার ব্যাগ খুলতে বলে।

আমি খুললাম। ওরা সেই ছাই-এর প্যাকেট বার করলো। কতো বোঝালাম। যে ওটা ঘুঁটের ছাই। কে বোঝে কার কথা। তারপর টেস্ট হলো। আমাকে দাঁত মেজে দেখাতে হলো। তারপর নিজেরা মাজলো। আবার কিছুটা রেখে দিল। নিজেরা দাঁত মাজবে বলে। সেই প্লেন মিস যেদিন যাবার কথা তারপর দিন গিয়ে পৌঁছলাম।

এয়ারপোর্টে নিতে এসে কি মেজাজ।

তখন তো বলিনি কি হয়েছে। রাতে খেতে বসে বলি। সুন্দর হেসে গড়িয়ে পরে।

উনি বিজ্ঞের মতো বললেন। দেখলে তো আমার গাঁয়ের গরুর পটির কি মাহাত্ম্য।

ইসিরা হেসে গড়িয়ে পরে।

আমি ওদের মতো হাসছি না তবে হাসছি।

আচ্ছা তোর ঘুঁটের ছাই এতো প্রিয় কেন। ইসি বললো।

তুই বুঝবিনা ইসি। গ্রামের ছেলে।

শুধু সেই জন্য!

ঠিক তা নয়। জন্মেছি এখানে। ছোটো থেকে বড়ো হয়েছি এই পরিবেশে। এখানে পা দিলেই কেমন যেন আমি বদলে যাই। হিংসা ভুলে যাই। মনের যতো আক্রোশ সব জলাঞ্জলি দিয়ে দিই এই খালের জলে। তখন আমি এক অন্য মানুষ। ঠিক তোকে বোঝাতে পারবো না। এককথায় বলতে পারিস আত্মার সঙ্গে আত্মার গভীর মিলন।

একটু থেমে।

এই আঠারো বছরে আমি অনেক কিছু হারিয়েছি। আবার আমার পাওয়ার ভাণ্ডারও নেহাত কম নয়। বড়োমাকে আমি এখনও সেই ভাবে পাই। ছোটোমা, জ্যেঠিমনির ভালোবাসা এখনও সেই ভাবে অটুট। চিকনা, বাসুর ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। তবু দেখ আমাদের মনটা কিন্তু এখনও সেই আঠারো বছর আগেই পরে আছে।

ভানুকে দেখলি না। সকাল থেকে চকে গিয়ে বসেছিল। চিকনা পইপই করে বারন করা সত্ত্বেও আমাকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট শিশুর মতো ভেউভেউ করে খানিকটা কাঁদলো। মনের যতো ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে। চিকনা মারবে বলেছে। সবার সামনে চেঁচিয়ে বলেছে মারনা, কতো মারবি।

বিশ্বাস। বুঝলি ইসি বিশ্বাস, বিশ্বাসের কোনওদিন বয়স হয় না। সে চির যৌবন। তোর শরীরের বয়স হবে, বার্ধক্য তোকে গ্রাস করবে। কিন্তু তোর মনটার কোনওদিন বয়স হবে না। সে ঠিক তার আঠারো বছরের মতো উচ্ছ্বল থাকবে। সময় সুযোগ পেলে তুই নিশ্চই তার দেখা পাবি।

ইসির মুখের দিকে তাকালাম। এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

তোকে কতো উদাহরণ দেব। অসংখ্য, অসংখ্য উদাহরণ তোকে দিতে পারি।

স্যারকে দেখলি তো।

প্রণাম করতে একটা কথাই প্রথমে বললো। মনাটা অভিমান করে চলে গেল। কোথায় গেল? মারা গেল? না বাড়িতে বসে দুই বন্ধু গল্প করছিল, কোনও একটা কথায় দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছে। তাই জন্য অভিমান করে চলে গেল।

ঠিক একই কথা মৌসুমীমাসির মুখে। আমার বাবার আমলের ওই সাঁওতাল মেয়েটা মাঠে কাজ করার জন্য ভালোপাহাড় থেকে এই গ্রামে এসেছিল। তারপর কালের গ্রাসে তার নিজের জন্মভূমি ভুলে এখানে রয়েগেল। আমি এসেছি শুনে, চিকনার সঙ্গে ঝগড়া করে একই গাড়িতে কলকাতা গেছে।

কিসের জন্য জানিস?

সবাই আমার মুখের দিকে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে।

কারুর মুখ থেকে একটি শব্দও বের হচ্ছে না। ঝিরঝিরে বাতাসে গাছের পাতা কাঁপছে। একটানা একটা সরসর শব্দ।

একটু খেয়াল কর। আমি যখন মৌসুমামাসির কাছে গিয়ে বসলাম। বুড়ী চোখে দেখতে পায় না। কিন্তু আঠারো বছরের উপলব্ধিটা ভোলেনি। আমার মুখে হাত দিয়ে এতো চুল দাড়ির মধ্যে স্পর্শ করে এক চান্সে বলেছে অনি। তারপর কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বলেছে। বড়কত্তা মরে গেছে।

এতো দূর থেকে, চিকনাকে এতো গালাগাল দিয়ে, এতো কষ্ট করে কলকাতা গেছে অনিকে শুধু এই খবরটুকু দিতে, বড়কত্তা মরে গেছে।

মৌসুমীমাসি বাবাকে ছোটোকত্তা বলতো। কাকাকে বড়োকত্তা। আমাকে ছুটে জানাতে গেছিল কাকা মারা গেছে। তার কাছে যে পৃথিবীটা ছোটো। সে মন থেকে বিশ্বাস করে অনি খবরটা জানে না। অনিকে ব্যাপারটা জানাতে হবে। এরা কেউ হয়তো আমাকে জানাবে না। বা জানাতে দ্বিধা বোধ করবে।

আমি এই বিশ্বাসটাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। দেখ আঠারো বছর হয়ে গেছে। কতো ঘটনা এর মধ্যে ঘটে গেছে। তোরা কিছু তার মনে রেখেছিস, কিছু ভুলে গেছিস। ওই বুড়ী কিন্তু কাকা মারা যাবার পরও পনেরো বছর ধরে মনে রেখেছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস অনি মরতে পারে না, অনি ফিরে আসবে। তাকে বড়োকত্তার মৃত্যু সংবাদটা দিতে হবে। এই জন্যই তাকে ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচে থাকতে হবে। তার কাছে যে ঘটনাটা পনেরো দিন আগেকার।

ইসি আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো।

তনুর চোখটা মনে হয় ছল ছল করছে।

হ্যাঁরে ইসি, আবেগের বশে কতো কথা তোকে বলে ফেললাম। এই আবেগ তোর আছে, আমার আছে, তনুর আছে, মিত্রার আছে সবার আছে। তফাতটা কোথায় জানিস, তুই এক্সপ্রেস করতে পারিস না, আমি এক্সপ্রেস করতে পারি।

তোর খুব সফ্ট কর্নারে আঘাত দিয়ে ফেলেছি।

আবার ভুল করলি। পৃথিবীতে কে না শান্তি চায় বল। একটা প্রাণ দেখাতে পারবি যে শান্তি চায় না। কিন্তু শান্তি তুই কোথায় পাবি?

রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এখানে সেরা উদাহরণ, মুক্তি ওরে মুক্তি কোথায় পাবি, মুক্তি কোথায় আছে, আপনি প্রভু সৃষ্টি বাঁধন পরে, বাঁধা সবার কাছে। ধুলামন্দির মনে পড়ে?

ইসি আমার বুক থেকে মুখ তুলে আমার চোখে চোখ রাখলো।

এই দেখ আমরা ছটা প্রাণ এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কথা বলছি। কিন্তু প্রকৃতিকে দেখ। সে কিন্তু আপন খেয়ালে চলছে। তার কোনও হেলদোল নেই। হাওয়া হলে গাছের পাতা কাঁপছে। হাওয়া না হলে গাছের পাতা নিথর।

তারজন্য গাছ কি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে, ওগো হাওয়া তুমি বওনা কেন, আমার যে ভীষণ গরম লাগছে। প্লীজ তুমি আমাকে গরমের হাত থেকে বাঁচাও। অন্ততঃপক্ষে একটা ইলেকট্রিক ফ্যান লাগিয়ে দিয়ে যাও। একটু হাওয়া খাই।

তনু-মিত্রা ছল ছল চোখ হেসে ফেললো।

ইসি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

দেখলি তুই কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসে আছাড়টা মারলি। মিত্রা বললো।

বড্ডবেশি ভাবগম্ভীর পরিবেশ হয়ে যাচ্ছিল।

এবার ছাড় মুখটা ধুয়ে স্নানটা করি। অনেকক্ষণ সুখভোগ করলি।

ইসি আমাকে ছেড়ে দিয়ে চোখ পাকাল।

বাসু, চিকনা তখনও গম্ভীর।

ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

চিকনা একটা বিড়ি দে। একটু বাথরুমে যাই।

চিকনার ঘোর ভাঙলো। গম্ভীর গলায় বললো, চল দিচ্ছি।

পুকুর ধার দিয়ে বাঁশ ঝাড়ের ভেতর দিয়ে সরু পথে পুকুর ঘাটে এলাম।

চিকনা একটা বিড়ি বার করে আমার হাতে দিল।

লাইটারটা দে।

সত্যি তুই বিড়ি খাবি! মিত্রা বললো।

একটু মুখ বদলাই।

তা বলে!

তোকে সব সময় পাই। মাঝে মাঝে যদি তনু আর ইসিকে পাই ক্ষতি কি।

তুমি আমাকে বিড়ির সঙ্গে তুলনা করছো। তনু চেঁচিয়ে উঠলো।

সিগারেটের থেকে কম ক্ষতি কর। বিড়ি খেলে শরীর খারাপ হয় না।

তনু আর কিছু বলবি। মিত্রা হাসি হাসি মুখ করে বললো।

তনু হাসছে।

দিদিভাই তুই কিছু বলবি।

আমার বলা সব শেষ।

আমার কাপর।

মিত্রার দিকে তাকালাম।

বাথরুমে রেখেছি।

ঠিক আছে।

ওরা চলে গেল।

আমি বাথরুমের কাজ সেরে পুকুরে এলাম। জলে নামলাম। মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠলো। টেমস নদীতে একবার নেমেছিলাম। আবার আমার পুকুরে। দূর শালা টেমস নদী। তার থেকে আমার এই গ্রামের বাঁশপাতা পরা পুকুর যথেষ্ট ভালো।

গা-টা কেমন সির সির করে উঠলো। জলে অবগাহন করলাম। মুখটা ধুয়ে গোটা পাঁচেক ডুব মরলাম। না মন ভরছে না। ওই পারটা কেমন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

জলে ভেসে উঠলাম। সাঁতরে চলে এলাম এপারে। ফেরার মুখে দেখলাম মিত্রারা সবাই পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। ছোটোমা, বড়োমা, অনিসা সবাই। ডুব দিলাম। কতটা এসেছি জানি না। তবে দমবন্ধ হয়ে যাবার মুহূর্তে যখন উঠলাম দেখলাম পার থেকে কিছুটা দূরে। সত্যি দম কমে এসেছে।

বড়োমা চেঁচিয়ে উঠলো এখনও সখ আছে।

লজ্জা পেয়ে গেলাম।

বাবা প্লিজ আর একবার।

মেয়ের কথা রাখতে পারলাম না। নিজের কাপরটা গুছিয়ে ওপরে উঠে এলাম।

সবাই হাসছে।

সারা গা বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে।

কাপর কোথায় ছাড়বি। বড়োমা বললো।

বাথরুমে গিয়ে ছেড়ে নিচ্ছি।

চিকনা হাসছে।

আর একবার হোক আমার সঙ্গে।

পারবো না। বুঝতে পারছি, বয়স হয়েছে।

আমি বাথরুমে গিয়ে ভালোকরে গা মুছে কাপর পড়লাম। চুল আঁচড়াবার কোনও ব্যাপার নেই। বেরিয়ে এলাম।

তোর জটা থেকে জল পরছে। ছোটোমা এগিয়ে এলো।

পরুক।

আয় মুছিয়ে দিই।

আমি ছোটোমার কাছে গেলাম। নিজের আঁচল দিয়ে চেপে চেপে জলটা নিংরে দিল। শরীরটা এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে। মনে হচ্ছে যেন প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গেছে।

নীপা পেটে রাহুর খিদে লেগেছে।

আমি জায়গা করে রেখেছি। তুমি বসে পরলেই দিয়ে দেব।

মিত্রা।

মিত্রা আমার দিকে তাকাল।

কনিষ্করা কোথায় বলতো?

তোর পাকা বাড়িতে।

ওখানে কি করছে?

দোতলায় বসে রুগী দেখছে।

আমি ওর দিকে হাঁ করে তাকালাম।

বিশ্বাস না হলে আর কাউকে জিজ্ঞাসা কর।

হ্যাঁগো বাবা, চিকনাদা কাকে কাকে বলেছে তারা এসেছে। মেয়ে বললো।

চিকনার দিকে তাকালাম।

আরে কানা সামন্ত মরে গেছে, এখানে ডাক্তারের বড়ো অভাব, দু-চারটে হাতুড়ে আছে। বললাম, যা অনির বন্ধুরা এসেছে। ওদের একবার দেখিয়ে নে।

আমি তাকিয়ে আছি।

চিকনা হাসছে।

ভিজিট দেবে। পার হেড দশটাকা।

সেটা বল।

চারিদিকে আলো জ্বলে উঠেছে। বেশ ঝকঝক করছে। কতো লোক যে পায়ের কাছে কোমড় ধাপিয়ে প্রণাম করে যাচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। না বললেও কেউ শুনছে না। কাউকে চিনি না।

খেতে বসলাম।

নীপা বেশ বাড়ির গিন্নীর মতো গুছিয়ে দিয়েছে। আম, কলা, ভেঁজানো সাবু, মুগডাল, দই, মিষ্টি।

নীপা।

বলো।

একটা বড়ো জাম দাও।

বুঝেছি একসঙ্গে ঘাঁটবে তো।

হাসলাম।

ওদের জন্য আছে তুমি একলা ওটা খাও।

আমি কি গরু নাকি। এক তাড় দিয়ে দিয়েছো।

আজকের দিনটা হও না, ক্ষতি কি।

নীপা একটা বড়ো জামবাটি এনে দিল।

আমি আস্তে আস্তে সব মাখলাম। মেয়ে সামনে বসে বসে এক দৃষ্টে দেখছে। মিত্রা একবার জোরে নিঃশ্বাস নিলো।

হাসলাম।

তুই যখন মাখিসনি তখন একরকম গন্ধ পাচ্ছিলাম, এখন আর একরকম গন্ধ পাচ্ছি।

মুখ দিয়ে জল পড়ে গেল।

মেয়ে জোড়ে হেসে উঠলো।

সত্যি মা, তুমি না….।

গন্ধটা কেমন বেরিয়েছে বল।

নীপা।

আবার কি হলো।

একটা চামচ নিয়ে এসো।

নীপা নিয়ে এলো।

সামনে যতগুলো বাটি ছিল। সব কটাতে ভাগ করে দিলাম।

এগুলো আমাদের? ইসি বললো।

জ্যেঠিমনি হাসতে হাসতে একবার ইসির দিকে তাকাল।

তুইও কি ছুটকি হয়ে গেছিস?

কোনওদিন খাইনি, টেস্টটা ভালো হলে মাঝে মাঝে খাওয়ার চেষ্টা করবো।

বড়োমা কোনও কথা বলতে পারলো না। শুধু ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।

এটা তোদের।

মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে যতটুকু সময় লাগলো।

নিমেষে বাটি উধাও হয়ে গেল। মিত্রা, নীপার কাছ থেকে চামচ জোগাড় করে প্রথমে বড়োমা তারপর ছোটোমা তারপর জ্যেঠিমনির মুখে ফেলে দিল।

এলাকা পুরো ফাঁকা।

আমি খাওয়া শুরু করলাম।

ভালো মেখেছিস। ছোটোমা বললো।

এগুলো খাওয়া অভ্যাস করো, দেখবে গ্যাস হবে না।

নিশ্চই তুমি বলেছো—ছোটোমা, বড়োমার দিকে কট কট করে তাকাল।

তখন জিজ্ঞাসা করলো, কি বলবো।

ওই জন্য জানলেও তোমায় কিছু বলি না।

বড়োমা হাসছে। তুই খামকা আমাকে ধমকাচ্ছিস।

তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, যতোটা পারলাম খেলাম।

বেশি খেতে পারলাম না গা গুলিয়ে উঠলো।

কি রে! ছোটোমা তাকাল।

আর পারছি না।

এদিকে দে।

বড়োমা, জ্যেঠিমনি দুজনেই হেসে উঠলো।

তুই যে এখুনি আমাকে ধমকালি।

ছোটোমা ততক্ষণে জামটা টেনে নিয়ে শুরু করে দিয়েছে।

বাড়িতে এই ভাবে কেটে কুটে সাজিয়ে দেব ভালো করে মাখিস।

ছোটো তুইও কি ছুটকি হয়ে গেলি। জ্যেঠিমনি বললো।

সত্যি দিদি জীবনে কোনওদিন মুগডাল, সাবু ভিঁজনো দিয়ে এরকম অমৃত খাওয়া যায় ভাবি নি।

বারান্দায় ধুপ ধাপ আওয়াজ। দেখলাম মেয়ে হাজির।

দিদাই!

চুপ চুপ কথা বলিসনি। এখানে চলে আয়।

মেয়ে নিস্তব্ধে ছোটোমার কাছে এসে বসে গেল।

নিমেষে শেষ।

যা মুখ ধুয়ে নে। আমি বাটিটা চাটি।

গেটের মুখে মিলির মুখ। ছোটোমা তখন আঙুল দিয়ে কাচিয়ে কাচিয়ে জামবাটি চাটছে।

হাসতে হাসতে মিলি চেঁচিয়ে উঠলো, মিত্রাদি একবার দেখবে এসো।

চোখর পলক পড়তে না পড়তেই সবাই হাজির, আবার একচোট হাসাহাসি। কে কাকে ছাড়ে।

গ্যাস হয়েছিল বুঝলি মিত্রা, তাই অনি বললো খাও, শরীর ঠিক হয়ে যাবে, তাই খেলাম।

তা বলে তুমি জাম শুদ্ধু….।

মাখাটা ভালো হয় নি? তুই বল।

অনিসা হেসে গড়িয়ে পরে বড়োমার কোলে মাথা রেখেছে।

নীপা।

ছোটোমা হাসতে হাসতে বললো।

আর একটু ভিঁজিয়ে দে তো মা। রাতে আর ভাত খাব না। এই খয়ে শুয়ে পরবো।

ছোটোমার কথায় কেউ আর গম্ভীর নেই।

যাই দাদাইকে গিয়ে খবরটা দিই। অনিসা বড়োমার কোল থেকে উঠে বসলো।

বুঁচকি, তোকে ভাগ দিয়েছি।

ঠিক আছে বলবো না।

আমি আসন থেকে উঠে বাইরের টিউবওয়েলে এসে মুখ ধুলাম।

তখনও ওখানে ক্যাঁচর ম্যাচর হয়েই চলেছে।

শরীরটা মনে হয় এবার ছেড়ে দিচ্ছে।

সন্ধ্যা হতে এখনও বেশ কিছুটা বাকি আছে। মাথার ওপরের গাছটায় পাখির কিচির মিচির। এখন গোধুলি বাইরের আলো কমে এসেছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মীরচাচা দলবল নিয়ে আসবে বলেছে। চিকনা বললো আরও কারা যেন আসবে।

কারুর সঙ্গে শুষ্ঠ ভাবে বসে যে দুদণ্ড কথা বলবো তার জো নেই। একটা না একটা লেগেই আছে। এখনও নিজের ঘরেই যেতে পারলাম না।

পায়ে পায়ে বাড়ির পেছন পাশ দিয়ে বারান্দায় এলাম। আসার পথে দেখলাম। বাঁশ ঝাড়ে সত্যি সত্যি রান্নাবান্না চলছে। দুটো বড়ো বড়ো উনুন বানান হয়েছে। কাউকেই চিনতে পারলাম না। এরা সব চিকনা বাসুর লোক জন। এই গ্রামেরই হবে। সঞ্জুকে দেখতে পাচ্ছি না।

মিনতি বললো, সঞ্জু দুই ছেলেকে নিয়ে এখানেই রয়েছে।

আগের থেকে ব্যবসা অনেক বারিয়েছে। ভালো, অন্ততঃ পক্ষে অনাদি হয়ে যায়নি।

কিরে ভালোই তো খেলি।

তাকালাম।

অনিমেষদা বেশ রাজকীয় চালে বশে। অনেকে সামনে বসে আছে। এরা নিশ্চই সব পার্টির নেতা।

তুমি খেয়েছো নাকি?

মিত্রা এক চামচ দিল। স্বাদটা খারাপ হয়নি।

ভাতটাত না খেয়ে অভ্যাস করে ফেলো।

খরচ অনেক বেশি।

সন্দীপ ফোন করেছিলো বুঝলি। দাদা বললো।

কেনো?

তোকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। কি কি ছবি যাবে জিজ্ঞাসা করলো। আমি কিছুক্ষণ বাদে ফোন করতে বলেছি।

লেখার কথা কিছু বললো।

চারটে ইনস্টলমেন্টে বার করবে।

যাক বাঁচালে।

কেন।

আমি তো ভাবছিলাম এখুনি লিখতে বসবো।

সময় করে লিখে দিস। এরকম টান টান যেন থাকে।

এই তোমার শুরু হয়েগেল। মল্লিকদা খ্যাঁক করে উঠলো।

ও হচ্ছে দুনিয়ার ফাঁকি বাজ। লেগে থাকতে হয় বুঝলি।

তুমি কি আজ থেকে কুড়ি বছর আগেকার অনি পেয়েছ।

অনিমেষদাকে ইশারায় একবার খামারে উঠে আসতে বললাম। বাচ্চাগুলো সব খামারে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কোনটা কার চেনা মুস্কিল।

আমি এগিয়ে এলাম। অনিমেষদা এলো। বিধানদা বসে বসে বারান্দা থেকে দেখছে।

কিছু খবর পেলে।

কিসের বলতো!

এলাকার।

স্থিতা বস্থায় আছে।

কালকে লেখাটা বেরলে ব্রাঞ্চে ব্রাঞ্চে ক্যাম্পেনিং-এর কথা বলেছো।

সে কি আর বলতে।

মীরচাচারা একটু পরে আসবে।

কে মীরচাচা।

যারা ওই ডাব কলা দিয়ে গেল। এখানকার বেশ বর্ধিষ্ণু মুসলিম পরিবার। সবাই মানে।

কেন?

মুসলমান বস্তিটা অনাদির দখলে ছিল। ইদানিং ওরা অনাদির কাজ কর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারছে না। চিকনা আমাকে বেশ কয়েকমাস আগে থেকেই বলছিল। ইকবালভাই-এর সঙ্গে মীরচাচার খুব ভালো রিলেশন। কাজে লাগিয়ে দাও।

তোদের এখানে শবর পাড়ার কে নেতা আছে, সেও এসেছিল।

তাই?

হ্যাঁ।

কথা বললো।

এলসিএসকে ডেকে পাঠিয়েছি।

ডেকে পাঠালে! তুমি আসবে জানতো না?

আমি আসার ঠিক ছিল নাকি, বেরোবার আগে তোর বৌদি জোড় করলো তাই এলাম। তাছাড়া সবাই জানবে তার কি কথা আছে। নিরঞ্জনবাবু যে দু-একজনকে ফোনে বলেছিল তারা এসেছে।

চুপ করে গেলাম।

নার্সিংহোমের ম্যানেজারটাকে কি করলি?

এখনও কিছু করিনি। একটু সময় নেবো। ইসলামভাইকে দেখছি না।

এখানে কোথায় মসজিদ আছে, নামাজ পড়তে গেছে।

ঠিক আছে তুমি যাও, আমি একটু গড়িয়ে নিই।

পারবি?

কেন পারবো না।

সব তোর ঘর দখল করে আছে।

বৌদি কোথায়?

আছে কোথাও এপাশে ওপাশে।

মীরচাচাকে তুমি সামলাবে। ওদিকটায় আমি একেবারে হাত দেব না।

ঠিক আছে।

আমি আমার বাড়ির বারান্দায় এলাম। একবার চারিদিকটা চোখ বুলিয়ে নিলাম। সত্যি চিকনা যেমন ছিল তেমনি রেখেছে। তবে যত্ন অনেকটা বারিয়ে দিয়েছে। চারদিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, বেশ ঝকঝকে। সেই রান্নাঘর, সেই ভেতর বাইরের দালান।

রান্নাঘরে মনে হয় কারা আছে। ঢুকেই ডানদিকে চিকনার খাট। বেশ টিপটপ। মাথার শিয়রে আমার একটা ফটো। বহুদিন আগে তোলা একটা পাসপোর্ট ফটো থেকে প্রিন্ট করিয়েছে। নিচের দুটো ঘর থেকে কলকল করে শব্দ আসছে।

আস্তে করে ঠক ঠক করতেই দরজা খুলে গেলো। বটা সামনে দাঁড়িয়ে।

কিরে, তুই এখানে?

টিনা তার পছন্দের ঘর বেছেছে। ওবাড়িতে যাবে না।

নিশ্চই অবেলায় লেগে পরেছিস।

শালা, পাশে কনিষ্ক আছে শুনতে পাবে।

সত্যি কথা বললেই দোষ।

টিনা উঁকি মারলো।

আমি জিভ বার করে ফেললাম। কাপরে কুঁচি দিচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।

মেয়ে কোথায়?

খামারে খেলছে। দেখো নি?

চেনা মুস্কিল, সবাইকে একরকম দেখতে।

টিনা হাসলো।

ভেতরে আয়। বটা বললো।

না। টিনা এই ড্রেসটা কতক্ষণের জন্য।

দেখি কতক্ষণ টেঁকে।

পুকুরে সাঁতার কেটেছো?

কালকে কাটবো।

আমি একটু কেটেছি।

শুনলাম।

ও ঘরটা কে দখল করেছে।

মিলি।

রেডি হও, আমি ওপরে আছি।

সিঁড়িদিয়ে ওপরে উঠে এলাম। চিকনা বারান্দাটা অনেকটা বারিয়েছে বলে মনে হলো। ঢালাও বিছানা করে দিলে, কুড়ি জন নিশ্চিন্তে শুয়ে পরতে পারবে।

ঘরের দরজাটা খোলা। ঢুকলাম। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। মায়ের একটা বিশাল ছবি বাঁধিয়ে ঘরে টাঙানো আছে। ফুলের মালা দেওয়া। কেউ নেই। সেই সোফা সেই মিটসেফ। মিট সেফের দিকে ঘুরে তাকাতে দেখলাম বাবারও একটা ছবি। মালা দেওয়া।

আলমাড়িটা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। একটা বড়ো ফ্যান রাখা আছে দেখলাম।

বিছানাটা পরিবর্তন হয়েছে। একটা নতুন তোষোক পাতা হয়েছে, গদি গদি।

মায়ের ফটোটার সামনে এসে দাঁড়ালাম।

মুখটা অনেক বেশি উজ্জ্বল লাগছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট থেকে কালার করা।

মাথা নীচু করে মনে মনে বললাম। মা তোমার ছেলে তার শেকড় খুঁজে পেয়েছে।

মুখ তুললাম। সরাসরি মায়ের চোখে চোখ রাখলাম।

না পেলেই ভালো ছিলো বুঝলে মা। যেমন ছিল তেমন থাকলে মনে হয় কোনও ক্ষতি হতো না। আমি একটুও কষ্ট পাইনি মা। আমি মেনে নিয়েছি। মানুষ যখন ভুল করে তখন একটা ভুলকে চাপা দিতে সে আরও দশটা ভুল করে বসে। মনাকাকার কাছে আমি সারাটা জীবন ঋণী থাকবো, তিনি তাঁর বন্ধু এবং বন্ধুপত্নীর স্ত্রীর যথার্থ সম্মান রক্ষা করেছেন। কাউকে জানায়নি। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার আমাকে তার ছেল মনে করে নিজে কখনও সন্তানের পিতা হতে চায়নি। তুমি আমায় ন-মাস দশ-দিন গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছ। তবে তোমার মৃত্যুটা আমি কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। বাবা তুমি কেন একসঙ্গে মরতে গেলে? একটু আগে পরে হলে, খুব একটা কি ক্ষতি হতো? অন্ততঃ তুমি একবার আমার কথাটা ভেবে দেখতে পারতে।

বাবার ফটোর সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ মুখের দিকে তাকালাম।

বুকের ভেতরটা ভীষণ ষন্ত্রণা করতে শুরু করলো। পায়ে পায়ে খাটে এসে টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম।

নিজেকে নিয়ে কিছু ভাববো না। যেমন চলছে চলতে দাও। যতো ভাববো ততো কষ্ট।

উঠে বসলাম, মিটসেফের কাছে গেলম। আমার ঝোলা ব্যগটা নিয়ে এলাম। অনেক কাগজপত্র আছে। একবার দেখে নিলাম। না সব ঠিক আছে।

মিত্রা ঠিক ধরতে পেরেছে। আমি ঝোলা ব্যাগটা কিছুতেই কাল থেকে কাছ ছাড়া করিনি। আগের থেকে অনেক বেশি ম্যাচুওর্ড। কথা বললে চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। চোখ থেকে কিছুতেই চোখ সরায় না।

সময়, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, মানুষকে তৈরি করে দেয়।

পামটপটা বার করে একবার অর্ককে ধরলাম।

বলো অনিদা।

খবর কি?

কুল। সব পেয়ে গেছি।

অফিসের হালচাল।

স্মুথ। লেখাটা জমপেশ নামিয়েছ।

তোর ভালো লেগেছে?

কি যে বলো।

আনোয়ারের লেটেস্ট নিউজ।

হেডকোয়ার্টারে আছে। অসুস্থ।

অনাদি।

সে তো তোমার ওখানে। সিপিকে খুব প্রেসার করেছে সাদিকের ব্যাপারে। সিপি কোনও রেসপন্স করছে না। মনে হয় সরিয়ে দেবে। আজ সেরকমই একটা ফাইল প্রসেস হয়েছে শুনেছি।

টাকা লাগলে নিয়ে নে। যে ভাবেই হোক কাজ চাই।

নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। দ্বীপায়নদা বলছিলো ছবিগুলো কি কি যাবে।

লেখা অনুযায়ী যে ছবিগুলো খাপ খাবে দিয়ে দিক।

আমি দ্বীপায়ণদাকে সেটাই বলছি। তবু দ্বীপায়নদা বললো অনিদার কোনও সাজেশন আছে কিনা।

তুই দ্বীপায়ণকে বলে দে।

আচ্ছা।

লাইনটা কেটে দিলাম।

নেটটা চালালাম। মেল বক্সটা দেখে নিলাম। কয়েকটা চিঠির উত্তর দিয়ে দিলাম। নেটব্যাঙ্কে ঢুকে নিজের এ্যামাউন্ট চেক করলাম। হ্যাঁ আফতাবভাই ট্রান্সফার করে দিয়েছে।

একটা ম্যাসেজ আফতাবভাইকে পাঠিয়ে দিলাম।

শিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলাম। পামটপটা অফ করে বিছানায় শুলাম।

কনিষ্ক, বটা গেটের মুখে।

তুই একা নাকি?

হ্যাঁ।

ভেতরে এলো। সোফায় বসলো।

একটা সিগারেট দে। মুখটা কেমন লাগছে।

কনিষ্ক একটা সিগারেট দিল। ধরালম।

নিচে বেশ হই চই চলছে।

পরিদাকে কেমন দেখলি?

বাঁচবে না। যতটুকু লড়ার জায়গা দিয়েছে লড়লাম। একটু ভালো থাকবে।

ওষুধ পেয়ছিস?

নীরুর কাছে অন্যগ্রুপের ছিল, দিলাম। বাকিটা কিনে নিতে বলেছি। অনিকেতকে একটা ফোন করে দিলাম। বললাম, কালকে হিমাংশুর হাত দিয়ে কিছু ওষুধ পাঠিয়ে দে। পাঠিয়ে দেবে বলেছে।

নার্সিংহোমের খবর কি?

দুটো বাদে সবকটা ঠিক আছে। বারাসাত আর তোদের এইটা গণ্ডগোল হয়ে আছে।

কেন বলতো!

স্যারের এই ছাত্র দুটো ঠিক নয়। একচ্যুয়েলি তোর যে মিশন এরা তার বিপরীত।

টাকা কামানোর ধান্দা।

এটা তুই আমার থেকে ভালো বুঝবি।

অনুপ চিঠি পাঠিয়েছে।

সেই জন্য মনে হয় ওরা নড়ে চড়ে বসেছে। স্ট্রাইক হওয়ার কথা ছিল উইথড্র করেছে।

চুপ করে থাকলাম।

সকালে আসার সময় যা ধাক্কা খেলাম, বেশ ভয় করছিল। বটা বললো।

কেন?

তুই তো উনা মাস্টারের ঘরে ঢুকলি।

হ্যাঁ।

আমরা বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় তিনবার গাড়ি দাঁড় করাতে হলো। অনি আছে কিনা। থরো চেক করে তবে ছাড়া পেলাম।

এখানে কিছু হবে না। অনাদির সেই দম নেই।

অনাদির বউ-ছেলে-মেয়ে রয়েছে দেখলাম। কনিষ্ক বললো।

আমি এখনও দেখিনি।

তোর কাছে আসতে লজ্জা পাচ্ছে।

কি করবে বল, কপাল। কিছুতেই বোধোগম্য হচ্ছে না।

অনাদি এরকম করলো কেন?

ধরাকে সড়াজ্ঞান করে ফেলেছে। বটা বললো।

তুই একটু বেশি বিশ্বাস করে ফেলেছিলি। কনিষ্ক বললো।

এটা একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু এটাই সব নয়। এর বাইরেও আরও কিছু আছে।

সেটা তুই জানতে পারিস। আমি সাদা চোখে যা বুঝেছি তাই বললাম। বটা বললো।

তুই অনাদিকে বললি দিবাকরকে তুলে এনেছিস। ব্যাপারটা কি? কনিষ্ক বললো।

তোরা জানলি কি করে!

ল্যাপটপে সব ভিডিও রেকর্ডিং করেছে।

সব্বনাশ।

চুপ করে গেলাম। কথাটা বারালাম না।

তোর কি কোনও নির্দিষ্ট প্ল্যান আছে? কনিষ্ক বললো।

আছে।

এখন জানাতে বলছি না। সময় মতো জানাস।

হাসলাম।

তুই এখনও সেরকমই রয়ে গেলি। বটা বললো।

তোরাও তো সেরকমই আছিস।

আমার চোখে কিছু ধরা পরছে না। কনিষ্ক বললো।

জীবনটাকে ভাসিয়ে দিতে পারতাম বুঝলি কনিষ্ক। কিন্তু যখন নিজেকে জানতে পারলাম। তখন মনের মধ্যে একটা জেদ চেপে বসলো। দখি না। তবে আমার এই জায়গায় পৌঁছনোর জন্য মিত্রার সাহায্য আমি কোনওদিন ভুলবো না।

ম্যাডাম উল্টো কথা বলে।

কি বলে।

তোকে যদি ম্যাডাম তার জীবনে টেনে না নিয়ে আসতো তাহলে তুই খুব সুখে থাকতিস। সে বরং অন্যায় করেছে।

তাহলে হয়তো একটা চরম মিথ্যে চিরটা কাল সত্য হয়েই থেকে যেত।

নিচে আমার নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গছে।

দেখ আবার কারা এসে পরেছে। বটা বললো।

মীরচাচার আসার কথা আছে। ওরা এসেছে হয়তো।

কনিষ্ক হাসলো।

তোর ক্লান্তি আসে না।

আসে। কি করবো বল। নিজের গর্ত নিজে খুঁড়েছি। লোকের ভালো করতে চেয়েছি। ফল ভোগ আমাকে করতে হবে। এর দায় সম্পূর্ণ আমার।

চিকনা ঘরে ঢুকলো।

নিচে চল, চাচারা এসেছে।

গ্রাম শুদ্ধু উজার করে চলে এসেছে।

গোটা পঞ্চাশজন এসেছে।

কি সমস্যা বল?

কো-অপারেটিভের লোন, তোর উইল করা জমি, অনাদির বে-আইনি ব্যবসা।

এগুলো সব গ্রামের ব্যাপার।

তাই জন্য অনাদি আজ গত একবছর গ্রামে ঢুকতে পারেনি। কিছু কিছু পকেট জায়গা আছে অনাদি সেখানে ছড়ি চালাচ্ছে।

তুই।

এদেরকেও অনাদি হাত করে নিয়েছিল। তারপর মীরচাচা যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলো, আমাকে ডাকলো। আমি সব বললাম, তারপরই এরা ঘুরে গেল। মীরচাচা ওই গ্রামের পঞ্চায়েত, এখন ওইই সব অপারেট করছে।

সঞ্জু কোথায় বল?

তোর কাছে আসতে চাইছে না।

কেন!

তোর এই চেহারা ও দেখতে পারছে না। বাঁশঝাড়ে বসে কাঁদছে।

পাগল একটা।

উঠে দাঁড়ালাম। নিচে নেমে এলাম।

বাইরের বারান্দায় পা রাখতেই ধাক্কা খেলাম।

একটা রোগা মতো মেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফললো। পাশে একটা বছর বাইশের ছেলে আর একটা বছর কুড়ির মেয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটার মুখটা বেশ মিষ্টি। ছেলেটা বেশ সন্ডা গন্ডা। পেটান চেহারা। আমি না বলার আগেই ওরা প্রণাম করলো।

আমি বললাম এই বেশে প্রণাম করতে নেই।

বেশ অস্বস্তিতে পরে গেলাম। চিকনা আমার মুখ দেখে বুঝতে পেরেছে। মীরচাচা নীচে মাদুরে বসে আমাকে লক্ষ্য করছে। কাঞ্চন এবার ছাড়ো। চিকনা বললো।

(আবার আগামীকাল)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev