জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
৯২ নং কিস্তি
চমকে উঠলাম।
এ কি চেহারা মেয়েটার। কঙ্কাল স্বার। সেই ফুট ফুটে প্রানোচ্ছল কাঞ্চন।
এই বার ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
কেঁদো না।
আমার কপাল পুড়েছে অনিদা।
কিচ্ছু হয়নি। সব ঠিক হয়ে যাবে।
আর হবে না অনিদা। আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।
ঠিক আছে ও আবার ফিরে আসবে। ওকে আসতেই হবে। একটা মোহের বসে ও ভুল করে ফেলেছে।
আসলেই বা আমরা মেনে নেবো কেন। মীরচাচা চেঁচিয়ে উঠলো।
সবাই মীরচাচার সঙ্গে তালে তাল মেলালো। একটা হই হই শব্দ।
চুপকরে গেলাম।
কাকা-কাকী কেমন আছে।
বিছানায় শয্যা শায়ী।
কি হয়েছে?
রোগে ধরেছে।
ডাক্তার দেখিয়েছ?
পয়সা কোথায় পাব।
চিকনাকে বলেছিলে?
চিকনাদা আর কতো করবে।
কেন। ওকে বলে রেখেছি। একবার কলকাতায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারতে।
কনিষ্কদা দেখে ওষুধ দিয়েছে। সেই খেয়ে এখন ভালো আছে।
তোমরা এতোগুলো মানুষ একটা ছেলেকে শায়েস্তা করতে পার না।
করব কি করে বল। পুলিশ লেলিয়ে দেয়। নিরীহ ছেলেগুলোকে হ্যারাস করে। তার ওপর এখন মন্ত্রী বলে কথা দু-হাতে টাকা লুটছে। চাচা চেঁচিয়ে উঠলো।
সবাই আবার গর্জন করে উঠলো।
তোমার ছেলে মেয়ে।
কাঞ্চন বুক থেকে মুখ তুললো। হাত দিয়ে দেখাল।
আরি ব্যাস এতো বড়ো হয়ে গেছে। তোরা তোদের বাবাকে কিছু করতে পারিস না।
দু-জনেই মাথা নীচু করে রইলো।
তোমার রাইস মিলে কাজ করে দু-জনে। তাই কোনওপ্রকারে চলে যায়। সব কিনে খেতে হয়।
তার মানে!
তাহলে বলছি কি। দুই ভাই বোন বলে উঠলো।
কাঞ্চনের মুখটা তুলে ধরলাম
রাইস মিল আমার নয়। তোমার মিত্রাদি, চিকনা আর নীপার। মিত্রাদির সঙ্গে দেখা হয়েছে।
কাঞ্চন মাথা দোলাল। হয়েছে।
যাও। আমি কাল সকালে তোমার কাছে চা খেতে যাব। এবার একটু হাসো।
কাঞ্চন চলে গেল।
মিত্রাদের ধারে কাছে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। চারিদিকে আলো জ্বলছে।
আমি এগিয়ে এসে মাদুরে বসতে গেলাম।
তুই বেঞ্চিতে বোস। মীরচাচা বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো।
কেন!
তোর মুখ দেখতে পাব না।
আমি কি মোড়ল যে বেঞ্চিতে বসে মোড়লি করবো।
চাচা হেসে ফেললো।
তোমরা কি সব লাঠি-সোঁটা নিয়ে এসেছো?
কেন বলতো!
আমাকে ঠ্যাঙাবে বলে।
তোকে তখন বলেছি। তোর গায়ে হাত উঠলে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেব।
কেনো খামকা মারপিট করতে যাবে। ওরাও তো এই গ্রামের ছেলে।
কিছু উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। মেয়েদের পর্যন্ত বেইজ্জত করে। আমাদের গ্রামের ঋীতি বিরুদ্ধ।
কেন বাধা দাও না।
দিই তো, তাই খারাপ হয়ে গেছি। হিন্দু-মুসলিম বিবাদ বাধাতে চায়।
এতদূর গড়িয়ে গেছে!
তাহলে তোর কাছে ছুটে এসেছি কেন।
আমি যদি না আসতাম।
তাহলে একটা হেস্ত নেস্ত হয়ে যেত। তুই চিকনাকে জিজ্ঞাসা কর। চিকনা আজ ছ-মাস থামিয়ে রেখেছে। বলেছে অনি চলে আসবে সময় হয়েছে, তোমরা অপেক্ষা করো।
বলো তোমাদের কথা শুনি।
মিন্তু চাচা তুমি বলো। মীরচাচা বললো।
তাকিয়ে দেখলাম দূরে একজন বৃদ্ধ মানুষ বসে আছে। চিনতে পারলাম না।
মীরচাচার দিকে তাকালাম।
চিনতে পারলি না?
মাথা দোলালাম।
আমার চাচা। তোরা ধান নিয়ে গেলে যে মাপা মাপি করতো।
আমি উঠে গিয়ে হাতদুটো ধরে ফেললাম।
আমার কাছে গিয়ে বসবে চলো।
বুড়ো আমার হাত ধরে উঠে এলো।
কাছে এসে বসলো।
তুই আমাদের সঙ্গে এক আসনে বসেছিস। কেউ এভাবে এখনও বসেনি।
ধ্যুস সব আজেবাজে কথা।
নারে আমি ঠিক বলছি। এখন সব শিক্ষিত হয়ে গেছে।
ওসব কথা থাক। তোমার কথা বলো।
মীর তুই বল। তুই গুছিয়ে বলতে পারবি।
তুই তোর সম্পত্তি অর্ধেক পীরসাহেবের নামে আর অর্ধেক বাসন্তী মায়ের নামে দান করে দিয়ে গেছিলি। একটা ট্রাস্টি পর্যন্ত বানিয়েছিলি।
হ্যাঁ।
তাতে কি লেখা ছিল জমি বিক্রী করা যাবে?
কখনই না।
পাট্টা দেওয়া যাবে?
না।
তাহলে জমি বিক্রী হয় কি করে? আমাকে বোঝা।
কি বলছো চাচা!
শুধু বিক্রী না। পাট্টা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।
কে করেছে!
ক্লাবের প্রেসিডেন্ট অনাদি এগুলো করেছে।
আমি পীরবাবার জমি আর বাসন্তীমার জমি আলাদা আলাদা ট্রাস্ট করেছিলাম।
তুই চলে গেছিলি। সেই দলিল কোথায়?
চিকনার হাতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।
সেটা অনাদির হেফাজতে ছিল। যেহেতু সে প্রেসিডেন্ট।
পীরবাবার জমি এরকম হওয়ার কথা নয়। আমি সেই জমির দায়িত্ব চিকনাকে দিয়েছিলাম। এও বলেছিলাম। প্রত্যেক শুক্রবার তুই গিয়ে পীরবাবার থানে ফুল দিয়ে আসবি। জমি থেকে যা আয় হবে তাই দিয়ে বছরে একবার তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করে উৎসব করবে।
চিকনা এখনও তাই করে আসছে। সব হিসাব দেয়। কিন্তু সে জমির কাগজ পত্র আমাদের কাছে নেই। সেই জমিতেও পাট্টা দেওয়া হয়েছে। আমরা লড়াই করে সে জমি দখলে রেখেছি।
বাসন্তীমার ব্যাপারটা যেহেতু অনাদি দেখেছে। তাই ঘর তোলার নাম করে জমি বিক্রী করেছে।
কে কিনেছে!
বীরকটার মণ্ডলদের জামাই।
রেস্ট্রি হলো কি করে?
টাকা খাইয়ে। ক্ষমতা দেখিয়ে।
আমি মীরচাচার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
সেই জমি ব্যাঙ্কে বন্ধক দিয়ে লোন বার হয় কি করে। কেন বাসন্তী মার জমি ব্যাঙ্কে বন্ধক থাকবে।
দাঁড়াও দাঁড়াও চাচা, কোথাও মনে হয় ভুল হচ্ছে।
কোনও ভুল নয়।
হতেই পারে না। ব্যাঙ্ক কখনও ট্রাস্টের জমি বন্ধক নেয় না। নিশ্চই সেখানে নাম চেঞ্জ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখান হয়েছে। কোন ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়েছে?
কো-আপারেটিভ থেকে।
চিকনা একবার সুবীরকে ডাক।
সুবীর মনে হয় কাছেই ছিল। আমার গলা শুনে এগিয়ে এলো।
ব্যাপারটা কিগো সুবীর?
তখন অনাদিদা সব দেখা শুনো করতো।
লোনের কাগজে সই কার আছে?
সেই কাগজ-পত্রই নেই। ওই প্রিয়েডের অনেক কাগজই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সেই জন্যই এরা সবাই এতদিন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেরিয়েছে?
সুবীর মাথা নীচু করে রইলো।
ঠিক আছে যাও।
হঠাৎ হই হই শব্দ। সামনের ক্ষেতে কাকে যেন বেধড়ক মারধর করছে। ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। মীরচাচা উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর একটা ছেলেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এলো। খামারে তখন ভিড় হয়ে গেছে।
ছেলেটা তখন আধমড়া হয়ে গেছে। ও বাড়ি থেকে সবাই এসে ভিড় করেছে।
আমি চুপচাপ বসে আছি।
এই দেখ অনাদির লোক। তোকে কি নালিস করতে এসেছি তাই শুনছিল ওই গাছে চড়ে। নামতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে।
আমি উঠে গেলাম। ছেড়েদাও চাচা। ও তো আমাদেরই গ্রামের ছেলে।
এরাই গ্রামটাকে সর্বনাশ করেছে।
ঠিক আছে। তুমি ছাড়।
আমি আর কোনওদিন করবো না। আমার পা জড়িয়ে ধরলো।
থাকো কোথায়?
ভাট পাড়ায়।
তুমি কার ছেলে?
আমি বেনীর ছেলে।
কে বেনী! অধর রায়ের ব্যাটা?
হ্যাঁ।
তুমি অধর জ্যেঠুর নাতি!
হ্যাঁ।
তোমার দাদু, বাবা এতো ভালো লোক ছিলেন। তুমি এরকম হলে কেন?
ছেলেটা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
চাচা ওকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করো।
আবার নিজের জায়গায় এসে বসলাম। ওদের সঙ্গে কথা বলছি। চা এলো। সব প্লাস্টিকের গ্লাস। চায়ে চুমুক দিচ্ছি আর কথা বলছি। কখনও মীরচাচা আমার কথা মনে নিচ্ছে। কখনও রেগে গিয়ে বলছে, তুই এরকম দয়া সবাইকে দেখাবি না। দয়া দেখাতে গিয়ে সকলে মাথায় চড়ে বসেছে।
কি বলবো কাকে, চাচার কথায় হাসছি। আলোচনা চলছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।
আবার হই হই।
দেখলাম খামারে গোটা দশেক বাইক এসে দাঁড়াল।
পুলিশ। কারা যেন চেঁচিয়ে উঠলো।
খামারে বাইক রেখে সব গট গট করে ওই বাড়ির দিকে গেল।
থানার বড়বাবু এখানে কেন শাজাহান—মীরচাচা চেঁচিয়ে উঠলো।
কি করে বলবো।
কাকে ধরতে এসেছে এ বাড়িতে?
জানিনা।
শালাকে পিটে ছাল খিঁচে দেব। সব রেডি থাক।
মীরচাচার কথায় আবার একটা হই চই শুরু হয়েগেল।
তারপরে দেখলাম সব বারান্দা দিয়ে এই বাড়ির উদ্দেশ্যে হেঁটে আসছে।
পেছনে চিকনা ছিল, কখন যে উঠে চলে গেছে খেয়াল করিনি।
ও বাড়ি থেকে সবাই ছুটো-ছুটি করে এ বাড়ির বারান্দায় ভিড় করেছে।
কি হলো বড়োবাবু আবার কাকে ধরতে এসেছেন? মীরচাচা বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো।
ভদ্রলোক কোনও কথার উত্তর দিল না।
হাসতে হাসতে বললেন, মুন্সীবাবু চিনে ফেলেছি।
তারপর দেখলাম, নীচু হয়ে বড়োবাবু জুতোর ফিতে খুলছেন। মাথার টুপিটা মুন্সীবাবু নামে ওই ভদ্রলোকের হাতে দিলেন। বারান্দায় উঠে এসে হাসি হাসি মুখে হাত জোড় করে বললেন, আনিদা একটু উঠে আসুন একটা প্রণাম করবো।
ব্যাপারটা বোধোগম্য হলো না। উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। হই হই শব্দটা একবারে থেমে গেছে। কেমন যেন সকলে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। এতগুলো লোক কারুর মুখে কোনও কথা নেই। আমি একদৃষ্টে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছি।
কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলাম। এটা কি এসপির নতুন চাল? সবাই ভিড় করে আছে। মিত্রার মুখটা এই আধো অন্ধকারেও শুকনো শুকনো দেখছি। পাশে ইসি, তনু।
আমি উঠে গেলাম।
আমি তো এই সময় কারুর প্রণাম নিতে পারবো না।
আমায় একটু করতে দিন।
এমনভাবে বললো, না বলতে পারলাম না।
ভদ্রলোক হাঁটু মুড়ে বসে, আমার পায়ে মাথা ঠেকিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো।
কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি কি ভুল দেখছি, না ঠিক দেখছি।
সকলে আমাকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। অবাক হওয়ার কথা।
আমি হাতদুটো ধরে তুলে ধরলাম।
চিনতে পারলাম না।
আমি সুকান্ত। সুমন্তদার গ্রামে থাকি।
হাসছে। সারাটা মুখে একটা প্রশান্তির ছাপ।
সুমন্ত বিষই? নবদ্বীপ, গ্রামের নাম টিয়ারং।
হ্যাঁ অনিদা।
একটা কলরোল। ব্যাপারটা এরকম তাহলে অনিকে এ্যারেস্ট করতে আসেনি।
তখনও আমার দু-হাত বড়োবাবুর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরা আছে। মুখের দিকে স্থির দৃষ্টি।
কনিষ্ক, নীরু, বটা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো।
আপনি সুমন্তর থেকে ছোটো তুমি করে বলি।
অবশ্যই।
আমাকে চিনলে কি করে?
সে অনেক কথা।
বলো একটু শুনি।
আপনি সুমন্তদাকে নিজের রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছেন। যেদিন সুমন্তদাকে আপনি গ্রামে নিয়ে গেলেন, সে বছর আমি ক্লাস নাইনে পরি। দূর থেকে আপনাকে দেখলাম। তার আগে গ্রামের লোকের মুখে আপনার গল্প একটু একটু শুনেছি। আমি সুমন্তদার কাছে পড়তে যেতাম। সুমন্তদার কাছ থেকে আপনার সব গল্প শুনলাম। আপনি সুমন্তদাকে মাসে মাসে টাকা পাঠান। সেই টাকায় সুমন্তদাদের সংসার চলে। সুমন্তদার সমস্ত পড়াশোনার খরচ দেন। সুমন্তদা বললো, দাদা সাংবাদিক। আপনার কাগজের নাম বললো। নাইন থেকে টেনে উঠলাম। সুমন্তদা একদিন বললো, জানিস সুকান্ত দাদা এখন কাগজের মালিক হয়েছে। আপনার গল্প শুনতে শুনতে কেন জানি না আপনাকে মনে মনে ভালোবেসে ফেললাম।
আমি একদৃষ্টে সুকান্তর দিকে তাকিয়ে আছি। চোখের পলক পড়ছে না।
সুকান্ত তার মতো হরবর করে বলে চলেছে।
আমার এখনও কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না ভদ্রলোক অভিনয় করছে কিনা। তবে কথা বলতে বলতে কখনও লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে, কখনও ইমোসন্যাল হয়ে পড়ছে। আমি দোলাচলের মধ্যে।
তারপর আপনার লেখার আমি ভক্ত হয়ে গেলাম। কাগজ গ্রামে পৌঁছলেই খুঁজে খুঁজে আপনার লেখা আগে পড়তাম। মনে মনে ঠিক করলাম আমি সাংবাদিক হবো।
হলেনা কেন?
কপালে নেই হবো কি করে।
কেন?
আমি যখন টুয়েলভে, সুমন্তদাকে আবার কলকাতায় নিয়ে আসা হলো। দ্বিতীয়বার অপারেশন হলো। তারপর সুমন্তদা আর গ্রামে ফিরলো না। কলকাতায় কাগজে চাকরি পেয়ে গেল। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে কলকাতায় পড়তে এলাম। সুমন্তদার সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রায়ই আপনার কাগজের অফিসে যেতাম। আপনাদের নিউজরুমে গেছি। আপনি যেখানে বসতেন সেই টেবিলটাও দেখে এসেছি। আপনার কথা জিজ্ঞাসা করতাম। সুমন্তাদ বলতো অনিদা হারিয়ে গেছে। অনিদার কথা জিজ্ঞাসা করিস না। মনটা খারাপ হয়ে যেত। সুমন্তদার সাহায্যে কয়েকবার কাগজে লেখার সুযোগ পেলাম। তারপর পেটের তাগিদে চাকরিটা নিয়ে নিলাম। সব জলাঞ্জলি।
আমি সুকান্তর দিকে তখনও তাকিয়ে আছি।
সেদিন থেকে আপনাকে স্পর্শ করার খুব ইচ্ছে ছিল। আপনি আমার আইডল। কেন যদি জিজ্ঞাসা করেন, বলতে পারবো না। আপনার সমস্ত কাজ আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে। এখনও আমি মাঝে মাঝে সময় পেলে সুমন্তদার সঙ্গে আপনার এনজিওতে গিয়ে ফ্রি সার্ভিস দিয়ে আসি।
আমি না উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে সুকান্তর গল্প শুনছে। চারদিক নিস্তব্ধ।
গত সপ্তাহে সুমন্তদা বললো। অনিদা ফিরে আসছে। তুই এখন যেখানে পোস্টিং আছিস সেখানে কাজলদীঘি বলে একটা গ্রাম আছে। অনিদার বাড়ি ওখানে।
আমি বললাম, তুমি এসেছো কখনও।
বললো, অনিদা নেই, গিয়ে কি করবো। অনিদা এলে যাব।
সুমন্তদার কাছ থেকে কথাটা শুনে প্রথম কাজ হল আপনার বাড়ি খুঁজে বার করা। খুঁজেও বার করলাম। তারপর সকলের কাছ থেকে খোঁজ খবর নিলাম। সুমন্তদা যা যা বলেছে সব মিলে গেছে।
আমি একা একা পীরসাহেবের থান, শ্মশানে ঘুরে এসেছি। মাঝে দুদিন এসে ওই খামার থেকে ঘুরে গেছি। আপনার এই খড়ের চালের বাড়ি দেখে আমি আরও আপনার প্রেমে পড়ে গেছি। আপনি এখান থেকে ওই রকম একটা জায়গায় পৌঁছেছেন। মুন্সীবাবুরা আমার পাগলামো দেখে জিজ্ঞাসা করলো ব্যাপারটা কি বলুন। ওনাদের আপনার উত্তরণের কাহিনী বললাম, ওনারাও আপনার প্রেমে পড়ে গেছে।
স্যার যদি একটু বারান্দা থেকে নিচে নেমে আসেন। মুন্সীবাবু হাতজোড় করে বললেন।
ভদ্রলোকের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। কাঁচাপাকা চুল। হয়তো আমারই বয়সী, নয়তো বছর দুয়েকের ছোটো হবে।
বাধ্য হয়ে নিচে নামলাম।
সবাই টুপি খুলে প্রণাম করলো।
মুন্সীবাবু ছাড়া বেশির ভাগেরই বয়স আমার থেকে কম।
সুকান্ত সবার নাম বলছে। আমি মাথা দুলিয়ে চলেছি।
অনিদা, সুমন্তদাকে একটা ফোন করি।
ওর মুখের দিকে তাকালাম। একেবারে ইনোসেন্ট চোখমুখ।
করো।
ভিড়ের মধ্যে কাউকে চিনতে পারছি না। আধো অন্ধকার। আমার ছেলে মেয়েদেরও দেখতে পাচ্ছি না। বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসিরা ওই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। চোখে মুখের উৎকন্ঠা এখন অনেকটা পরিষ্কার।
রিং বাজছে। বুঝতে পারলাম ভয়েজ অন করা আছে।
কিরে সুকান্ত গেছিস?
দাদার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
পেন্নাম করেছিস?
হ্যাঁ।
শখ মিটলো?
মিটেছে।
দে অনিদাকে দে।
আমার হাতে ফোনটা দিল।
দাদা।
বল।
কেমন দিলাম বলো। একবারে এক্সক্লুসিভ।
কলকাতায় গিয়ে তোর ঘার মটকাব। সকাল থেকে এলিনা কেন?
বৌদিকে জিজ্ঞাসা করো। কাল একবার গেছি, আজও একবার গেছি।
আমার সঙ্গে দেখা করলিনা কেন?
তোমাকে দূর থেকে দেখলাম। মনটা খারপ হয়ে গেল। তোমার সামনে যেতে ইচ্ছে করলো না। বৌদির হাতে একটা পাঞ্জাবী পাঠিয়েছি। মা রাত জেগে নিজে হাতে কাজ করে দিয়েছে।
মাসিমা, মেসোমশাই কেমন আছেন?
তুমি যেমন রেখেছো।
খুব কথা শিখেছিস মনে হচ্ছে।
কাল কিন্তু তোমার কাজ হয়ে গেলে পাঞ্জাবীটা পড়বে।
বিয়ে করেছিস?
বৌদি কিছু বলে নি—
কাল থেকে বৌদির সঙ্গে কথাই বলতে পারিনি।
জিজ্ঞাসা করো লেটেস্ট আপডেট পেয়ে যাবে। আমি আমার সবকিছু ওখানে জানিয়ে রাখি। তোমার লেখাটা পড়লাম। ফাটিয়ে দিয়েছো।
কাগজ ছাপা হয়ে গেছে?
বাইরের কাগজ ডেলিভারি হয়ে গেল।
দেখেছিস?
দেখবো না মানে। সব শোনাও হয়ে গেছে।
ঠিক আছে।
সুকান্ত।
বলো দাদা।
এখন কপি লিখছি। রাতে তোকে ফোন করবো।
আচ্ছা দাদা।
সুকান্ত ফোনটা রেখে আমার হাতটা চেপে ধরলো।
উচ্ছ্বলতা ওর চোখে মুখে।
দাদা আপনার সঙ্গে একটু ব্যক্তিগত কথা আছে।
ভেতরে চলো।
আবার সকলের মুখ কেমন যেন থম থমে হয়ে গেল।
মীরচাচার দিকে তাকালাম।
একটু বসো, আসছি।
ভেতরে এসে চিকনার খাটে বসলাম।
মুন্সীবাবু আর তিনজন সঙ্গে এলেন।
বাইরের কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিলো না।
সুকান্ত এবার সরাসরি আমার চোখে চোখ রাখল।
আমরা সব জানি দাদা, প্রশাসনের চাপে কিছু ভুল কাজ করে ফেলেছি। ক্ষমা করবেন। বিশ্বাস করুণ আমি জানতাম না। এসপি সাহেব দুপুরে আমাকে ডেকে পাঠালেন। আপনার কথা জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যা জানি সব বললাম ওনাকে। এসপি সাহেব আমাকে সব ডিটেলসে বললেন। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমাদের পাঁচজন আর্মাড ফোর্স এখানে থাকবে। ভিআইপিরা রয়েছে।
কেন! কিছু সমস্যা?
সেরকম একটা খবর আমাদের কাছে আছে।
চিন্তায় ফেললে।
কোনও চিন্তা নেই। আপনি নিশ্চিন্তে থাকবেন। মুন্সীবাবু।
স্যার।
ফাইলটা এনে দিন।
কিসের ফাইল?
তা জানি না স্যার। এসপি সাহেব পাঠিয়েছেন আপনাকে দিতে।
ইসলামভাই ঢুকলো।
থানার বড়োবাবু যে।
এখন বড়োবাবু না, সুকান্ত।
এতোবার গেলাম, কই আপনার সঙ্গে সুমন্তর পরিচয় আছে আগে বলেননি।
আপনি যে এতো বড়ো মাপের মানুষ তা আগে বলেছেন।
ইসলামভাই জোড়ে হেসে উঠলো।
সব অনির কাছ থেকে শেখা বুঝলেন।
বুঝলেন না বুঝলে।
এতদিনের অভ্যাস ছাড়তে সময় লাগবে।
অনিদা একটু বৌদিকে দেখবো। বড়োমা, ছোটোমাকে দেখবো।
আরি বাবা সুমন্ত কি আমার নাড়ি নক্ষত্র সব তার ছাত্রকে বলে দিয়েছে।
বলেনি আমি নিজে থেকে জেনেছি। ডাক্তারদাদার সঙ্গে দু-একবর কথা বলেছি। দামিনীমাসিকে দূর থেকে দেখেছি।
সুকান্ত তুমি বিবাহ করেছো।
হ্যাঁ দাদা, একটা ছেলে।
পরিবার এখানে?
হ্যাঁ।
আমি কি জন্য এখানে এসেছি জান?
জানি দাদা।
আমার হয়ে তুমি সকলকে বলে দেবে, যদি সময় পায় আগামীকাল যেন একবার আসে।
অবশ্যই বলে দেব।
তুমি তোমার পরিবার নিয়ে আসবে।
নিশ্চই আসবো।
ইসলামভাই।
বল।
তোমাকে দায়িত্ব দিলাম সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য।
ইসলামভাই আমার কথা শুনে হেসে ফেললো।
শেষ পর্যন্ত এই গুরু দায়িত্ব আমাকে দিলি।
আমি একটু চাচার সঙ্গে কথা বলি।
সব লোকজন চলে গেছে। মীরভাই খামারে দাঁড়িয়ে ইকবালের সঙ্গে কথা বলছে।
যাও সুকান্ত, মুন্সীবাবুর দিকে তাকালাম। আপনারাও যান।
ওরা বেরিয়ে গেল।
আমি চিকনার খাটেই বসে রইলাম।
ফাইলটা পাশে পরে রয়েছে। এই জায়গাটা আধো অন্ধকার। লাইট জ্বলছে বটে কিন্তু পরিপূর্ণ আলো নেই। দেয়ালের গায়ে অনেকগুলো স্যুইচ। একবার ভাবলাম টেপাটিপি করে বড়ো লাইটটা জালাই। তারপর ভাবলাম না থাক।
ফাইলটা নিয়ে সোজা ওপরে চলে এলাম।
বড়ো লাইটটা জ্বালিয়ে খাটে বসলাম। ফাইলটা খুলতেই একটা চিঠি। বুঝলাম নার্সিংহোমের এ্যাকাউন্টসের প্রিন্টআউট। এসপি একটা চিঠি লিখেছে সংক্ষেপে।
আপনি চলে যাবার পর, কৌস্তভবাবু আমাকে এই প্রিন্টআউট পৌঁছে দিয়েছে, জানিনা আপনার কতটা কাজে লাগবে, আপনাকে পাঠালাম।
একবার চোখ বোলালাম। আবার দেখলাম। লেখার মধ্যে কোথায় যেন একটু খোঁচা মারা আছে। এ্যাকাউন্টসগুলো দেখলাম। জলে ভর্তি। কাকে দিয়ে অডিট করিয়েছে? হিমাংশুর হাতের সই নয়। ফার্মের নাম দেখে চিনতে পারলাম না।
সকালবেলা যে কাগজটা পৌঁছেছিল তার সঙ্গে কোনও মিল নেই।
নিজের ঝোলা থেকে সব কাগজ বার করে ফাইলটার মধ্যে গুছিয়ে রাখলাম। অনাদির নোটগুলো গুছিয়ে একজায়গায় রাখলাম।
ফাইলটাকে ঝোলার মধ্যে ঢুকিয়ে তোষকের তলায় ঢুকিয়ে দিলাম।
ভীষণ শুতে ইচ্ছে করছে। মোবাইলটাকে মাথার শিয়রে রেখে একটু শুয়ে পরলাম। কপালের দু-পাশটা টিপ টিপ করছে। নিজে নিজেই কপালটা একটু টিপলাম।
ঘুমিয়ে পরলি নাকি?
না।
চিকনা ঘরে ঢুকলো।
কি করছিস?
একটু শুয়ে আছি।
শরীরের আর দোষ কি।
ঠিক আছে তুই শো আমি আসছি।
চিকনা বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার ঘুরে এলো।
সঙ্গে একটা ছেলে। উঠে বসলাম।
শ্যাম একে পাঠিয়েছে।
ছেলেটি আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। হাতে একটা ভারি ব্যাগ।
শ্যাম আসবে না?
কাল আসবে। আমাকে এই ব্যাগটা দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিল।
এখানে রাখো।
সোফার ওপরটা দেখালাম।
তুমি এখন চলে যাবে?
বাইক আছে অসুবিধে হবে না।
স্বরূপ কোথায়।
যেখানে থাকতে বলেছিলেন সেখানেই আছে।
চিকনার দিকে তাকালাম।
ওকে কিছু খাইয়ে দে।
চিকনা মাথা দোলালো।
ঠিক আছে। তুমি চিকনাদার সঙ্গে চলে যাও।
ওরা চলে গেল, শরীর আর দিচ্ছে না। তবু সোফা থেকে ব্যাগটা নিয়ে এলাম। হত ঢুকিয়ে দেখলাম নির্সিংহোমের অরিজিন্যাল এ্যাকাউন্টস ছাড়াও হার্ডডিক্সটা কপি করে দিয়েছে। একটা হার্ডডিক্সও আছে দেখলাম। ব্যাগটা খাটের পাশে মাথার শিয়োরে রাখলাম। মনে মনে বললাম কৌস্তভ তুমি নিজেকে ভীষণ চালাক মনে কর। তোমার অনাদির সব চালাকি ধরা পড়ে যাবে।
এখন আর ঘাঁটতে ইচ্ছে করলো না।
যেমন আছে তেমন থাক। কাল অনুপ এলে, তখন দেখা যাবে।
আবার শুয়ে পড়লাম। নিচে হই চই চলছে পুরোদমে। ক্লান্তিতে চোখের পাতা জুড়ে আসছে। কিছু ভাবতে আর ভালো লাগছে না। যেদিকেই তাকাই সেদিকেই দগদগে ঘায়ের মতো সমস্যা।
কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না।
হঠাৎ প্রচন্ড হাসির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকালাম। আমার মাথার শিয়রে বড়োমা বসে আছে। মাঝখানে ছোটোমা। পায়ের কাছে জ্যেঠিমনি। ঘর ভর্তি লোক। সোফাতে নিচে মাদুর পেতে সব বসে জমিয়ে গল্প করছে। চিকনা, ভানু, পচা, পাঁচু, সঞ্জু, বাসুও আছে।
আমি সোজা হয়ে উঠে বসলাম।
দিলি তো কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বড়োমা খিঁচিয়ে উঠলো। ছোটোমা মুখের কাছে হাতটা তুলে মুচকি মুচকি হাসছে।
কখন থেকে বলছি ওরে আস্তে, ওরে আস্তে, কে কার কথা শোনে।
রাখো তোমার কাঁচা ঘুম, এখন যদি ভঁস ভঁস করে ঘুমোয় সারারাত জাগবে। তখন আমাদের পাহাড়া দিতে হবে।
মিত্রা খ্যাড় খ্যাড় করে উঠলো।
সঞ্জুর দিকে তাকালাম।
মাথা নীচু করে নিল।
তুই শুয়ে পর। বড়োমা বললো।
না। ঠিক আছে। দাঁড়াও চোখে মুখে একটু জল দিয়ে আসি।
ছোটোমা আমার দিকে টেরিয়ে তাকিয়ে তখনও মুচকি মুচকি হাসছে।
ঘরের মধ্যে দুখানা পাখা চলছে। একটা সিলিং ফ্যান একটা স্ট্যান্ড ফ্যান। হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে যেন ঘরটা।
আমি খাট থেকে নেমে বারান্দায় এলাম। সঞ্জু মিটসেফের ওপর থেকে জলের মগটা এগিয়ে দিল।
মুখটা ধুলাম।
তোর বৌকে দেখলাম। ছেলেদের দেখতে পেলাম না।
বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। কাল আসবে।
নিজের পরনের কাপরে মুখ-হাত মুছলাম।
আমাকে দেখেছে?
হ্যাঁ।
কখন।
তুই যখন খামারে এসে দাঁড়ালি, এক ফাঁকে প্রণামও করে গেছে।
কি উজবুক দেখ তুই। কি ভাবলো বলতো ওরা।
ভাবলে সারাদিন আমার সঙ্গে এখানে পড়ে থাকত না। ওরা আধুনিক বাচ্চা। আমাদের থেকে সেন্স অনেক বেশি। তাদের মা-দাদু এ শিক্ষাটা অন্ততঃ দিয়েছে, অনিকাকা একটা অন্য মানুষ। বিশেষ করে দাদু। আমার থেকে ওরা তোর সম্বন্ধে বেশি জানে।
তুই সব বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছিস।
একটুও না।
কাকা, কাকী কেমন আছে?
ভালো।
কথাটা সঞ্জু এমনভাবে বললো একটু অবাক হলাম।
তুই এই ভাবে বললি।
আমি এখন বাড়ির ত্যাজ্য পুত্র। ব্যাঙ্ক আর দোকানটা ছিল বলে বেঁচে গেলাম। নিজের পুঁজি কিছু নেই। ব্যাঙ্ক থেকে নিই আর শোধ করি। তবে প্রচুর জিনিসপত্র করেছি। এখন কোনও অনুষ্ঠাণ হলে আমার ডাক প্রথমে আসে।
যাক তবু একটা ভালো খবর দিলি।
এটাও তোর জন্য। তুই বুদ্ধি না দিলে হয়তো ভেসে যেতাম। তাই বাড়ি ত্যাগ করেছি। ভাইদের সব লিখে দিয়েছি।
কেন!
ঝামেলা ভালো লাগে না। যে যার সুখে থাকুক।
স্যার কি বললো?
বাবার অনুমতি নিয়েই করেছি।
স্যার সায় দিয়েছেন?
আমাকে জমি দিতে চেয়েছিলেন। ঘর করার জন্য। নিই নি। এখন টেম্পোরারি থাকছি। এই বয়সে ওনাদের দেখার মতো কেউ নেই।
মিনতি বলছিল।
এই গ্রামে বাবার তো অনেক ছাত্র আছে। তোর থেকে কেউ সম্মান বা প্রতিপত্তিতে বড়ো নয়। গ্রামে ঢোকার আগে তুই বাবার কাছে গেছিস। আর কেউ ওই পথটা মারায় না। এখন বড্ডবেশি এই কথাগুল মনে পড়ে।
কেন? তুই, চিকনা, ভানুও স্যারের ছাত্র।
আমাদের কথা ছাড়।
বুঝলাম সঞ্জু কি ইঙ্গিত করছে।
হাতের পাঁচটা আঙুল সমান নয়। কালকে একবার স্যারকে আনার ব্যবস্থা করিস।
দুই নাতি দায়িত্ব নিয়েছে।
কোন ক্লাসে পড়ে রে?
একটা টেনে উঠেছে। সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। আর একটা নাইনে উঠলো।
কোন স্কুলে পড়ছে?
বরোটা আমাদের স্কুলে, ছোটোটা নতুন স্কুলে।
কে পড়ায়?
নীপা।
তাই নাকি? নীপা এখন স্যারের রোল প্লে করছে তাহলে বল।
ওইই এখন আমাদের এখানকার সেরা মাস্টারনী। আর্টস গ্রুপটা পড়ায় আর সাইন্সটা সুবীর দেখে।
যাক তাহলে স্বামী, স্ত্রী মিলে একটা ভালো কোচিন ক্লাস খুলেছে বল।
ওরা চায়নি আমরাই জোর করলাম। তারপর রাজী হলো। সেই নিয়েও ঝামেলা। স্কুলের হেডমিস্ট্রেস করতে দেবে না। আমরা ঝামেলা করলাম। তারপর রাজী হলেন।
হেডমিস্ট্রেস কি এখানকার?
না বাইরে থেকে এসেছে। চকের ওখানে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। আমরা চেয়েছিলাম নীপাকে। অনাদি করতে দেয়নি। তাহলে ও ছড়ি ঘোরাতে পারবে না।
সবেতেই একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে রেখেছে তাই না?
আর বলিস না। ওর যে এতোটা পরিবর্তন হবে আমরা কেউ ভাবতে পারিনি।
পয়সা আর ক্ষমতা।
তোর থেকে কি বেশি?
অবশ্যই। একজন মন্ত্রী বলে কথা।
তাহলে তোকে এতো ভয় পায় কেন?
উচিত নয়, তবে কেন ভয় পাচ্ছে বুঝতে পারছি না।
তুই এখনও সেইরকম রয়ে গেলি।
কি রকম?
সহজে কিছুতেই ভাঙবি না।
হাসলাম।
চল ভেতরে যাই। একটু চা পাওয়া যাবে?
দাঁড়া, আমি বলে আসি।
সঞ্জু সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল।
আমি ভেতরে এলাম।
এলাকার বাকি খবর জোগাড় করে ফেললি? মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
বড়োমা।
বড়োমা আমার দিকে তাকাল।
মিত্রা আজকাল বেশ পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছে তাই না?
হ্যাঁরে। মিত্রা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে উঠলো।
নিচে মাদুরে বসেছিল, দিলো আমার থাইতে একটা চড়।
পাকা পাকা কথা বলবো না।
বড়োমা হাসলো।
আমি ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলাম।
ছোটোমা।
বল।
তোমার বুঁচকির দলবল গেল কোথায়।
সব খামারে বসে গল্প করছে। সঞ্জুকে কোথায় পাঠালি?
একটু চা খাওয়ার ইচ্ছে হলো।
একার জন্য না সকলের জন্য।
শুধু বললাম একটু চা খাওয়াবি। এবার বুঝে নাও।
কখনও সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে জানিসনা, তাই না।
হাতটা তুললো, আমি হাতটা ধরে ফেললাম।
বৌদি, আমার মতো তুমিও মনে হচ্ছে একটা সুখনিদ্রা দিয়েছ।
খুব ক্লান্তি লাগছিল। একপেট খেয়ে নাতি, নাতনিকে নিয়ে দিলাম একটা ঘুম।
এখন একেবারে ঝড়ঝড়ে।
হ্যাঁ।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
ইসলামভাই ওই ছেলেটাকে আমার বউ, বড়োমা, ছোটোমা সবাইকে দেখালে।
হ্যাঁ।
কোন বউকে দেখালে প্রক্তন না বর্তমান।
দেখছো বড়োমা। এবার আমি বললে দোষ হয়ে যাবে। মিত্রা কটকট করে উঠলো।
হ্যাঁরে ও কি এখানকার থানার ওসি? বড়োমা বললো।
হাসি হাসি মুখ করে বড়োমার দিকে তাকালাম।
মনে হচ্ছে জাল ফেলছো?
বড়োমা হাসছে।
তোমার কি সন্দেহ আছে?
তোকে সবার সামনে ওরকম ঘটা করে পেন্নাম করলো।
ভাবছি চুল দাড়িটা কাল কাটবো না। পায়ের ধুলোর বড়ো দাম।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। বৌদি হাসছে।
ছেলেটা বড়ো ভালো।
এক পেন্নামেই মন গলে গেল।
তা না। অনিমেষের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললো।
কি বললো শুনেছো।
ওরা কথা বলছিল আমি শুনবো কেন?
নীপা, সুরো ঘরে ঢুকলো।
আসুন আসুন ম্যাডামদয় আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
ঘুমিয়ে উঠে মুডটা মনেহয় ফ্রেস হয়ে গেছে। সুরো বললো।
আপনার অসুবিধে আছে।
একটুও না।
আপনার পেছনে কে উঁকি মারিতেছেন।
আপনার ভায়ের বউ টিয়া, আপনি তার ভাসুর হইতেছেন।
ভুল বলিলেন, ভাসুর না আমি অসুর হইতে চাই।
মাথাটা গিয়ে ভেঙে দেব। সুরো চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো।
টিয়া ভেতরে এসো। আমি বললাম।
হাসছে।
তোর জন্য সুরো একেবারে পারফেক্ট চয়েস। মিত্রা বলে উঠলো।
কেনো, কোনও ঝামেলা করেছে? সুরো মিত্রার দিকে তাকালো।
মিত্রা হাসছে।
তুমি একবার বলো, সব ঠিক করে দিচ্ছি।
তনু কিছু বলবে। আমি বললাম।
তনু হাসছে। সবাই বললে শুনবে কে।
কানার কি-বা দিন কি-বা রাত্রি।
সবাই হাসা হাসি করছে। সুরো কাপ নিয়ে এগিয়ে এলো।
আমার বন্ধুরা।
ঘুমিয়ে পড়েছে।
এতো তাড়াতাড়ি! এখুনি বৌদি বললো, দুই নাতি, নাতনিকে নিয়ে টেনে ঘুম মেরেছে।
কটা বাজে খেয়াল আছে।
আমার ঘড়ি নেই।
তাই জন্য দশটার সময় চা চাইলে।
টিয়া।
বলুন দাদা।
তোমার বরটা কোথায়।
ওই তো ওখানে বসে বসে গল্প করছে।
তুমি।
নীপাদিদের সঙ্গে কাজ করছি।
কি মধুর কথা বললে।
আবার হাসি।
মিত্রা।
উঁ। চায়ে চুমুক দিতে দিতে।
জানিস নীপা এখন স্যারের রোলটা প্লে করছে।
এতক্ষণ বেশ হচ্ছিল, আবার আমার পেছনে কেন। নীপা চেঁচিয়ে উঠলো।
সামনেটা খালি নেই বলে।
হাসি জোড়ে হোলই পানিসমেন্ট স্বরূপ ছোটোমা আমার কান মূলে দিল।
তুমি কিছু বলো। নীপা বড়োমার দিকে তাকাল।
তুই ওরকম কথা বললি কেন।
তাহলে কি বলবো।
তুই তোর দাদাকে চিনিস না।
টিয়া লজ্জা পেয়ে গেছে।
নীপা আমার মিষ্টি।
মিষ্টি তোমায় কাল গেলাব। দাঁতে দাঁত চিপে বললো।
দেখো বড়োমা, এবার আমি বললেই তোমাকে রিপোর্ট করবে।
মিত্রাদি সরোতো দেখি।
কাপর কোমড়ে পেঁচিয়ে, নীপা লাফাতে লাফাতে এগিয়ে এলো।
সুরো কাছেই দাঁড়িয়েছিল।
দাঁড়াও দাঁড়াও চায়ের কাপটা আগে সরিয়ে নিই।
ছোটোমার হাতে কাপটা দেওয়ার আগেই দুজনে শুরু করে দিল। একটু ধস্তাধস্তি, কোস্তাকুস্তি, হাসাহাসি। তারপর দুজনেই গলা জড়িয়ে কোলে চেপে বসলো।
বুঝলে বড়োমা শরীরটা বেশ ম্যাজ ম্যাজ করছিল। এখন পুরো ফিট।
সুরো চিমটে ধরলো।
ওই দ্যাখ।
আর বলবে।
লাগছে।
লাগার জন্যই দেওয়া।
ঘুঁটে কুড়ুনী বলবো।
আরও জোরে চেপে ধরবো।
বৌদি সুরোর হাতটা ছাড়িয়ে দিল।
আঙুল থুতু নিয়ে ওখানে লাগিয়ে দে নোখ বসে গেছে।
সুরো তড়াক করে আমার কোল থেকে উঠে হাঁটু মুরে বসে ওখানে ঠোঁট ছোঁয়াল। নীপা তখনও আমাকে ছাড়ে নি।
হাসাহাসি চলছেই।
টিয়া প্রথম এই অবস্থায় আমাকে দেখছে। মুখে কাপর চাপা দিয়ে হাসছে।
থাম না খালি দাদার সঙ্গে কোস্তাকুস্তি। বড়োমা বললো।
সুবীর আর অংশু যদি দেখে না…। বুঝলে বড়োমা, বনবাস নিশ্চিত।
দেখলে তুমি দেখলে। কি বললো। সুরো বড়োমার দিকে তাকিয়ে বললো।
বড়োমা হাসছে।
অনিরে অনাদি শেষ পর্যন্ত সব ব্যাটাকে ছেড়ে দিয়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধরেছে।
চিকনা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো।
অনাদি। সে আবার কোথা থেকে এলো। ছোটোমা বললো।
সকাল থেকে শুধু সঞ্জুকে ফোন করে যাচ্ছে।
আমি চিকনার দিকে তাকালাম। মিত্রা, তনুকে কনুইয়ের ঠোক্কর দিল। আমার চোখ এড়াল না।
সঞ্জুকে!
সঞ্জুর দিকে তাকালাম।
কই তখন কিছু বললি না।
কি বলবো।
কি বলে কি।
তুই এসেছিস কিনা, কারা কারা এসেছে। এই সব।
আর।
মোদ্দা কথা, তুই একটু আনিকে বোঝা। চিকনা বললো।
তুই কি বললি। সঞ্জুর দিকে তাকালাম।
বললাম আমার সঙ্গে অনির এখনও কোনও কথা হয়নি।
আমাকেও ফোন করেছিল। মিত্রা বললো।
কখন!
নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে যখন আসছিলাম।
মিষ্টি খাওয়ার আগে না পরে।
পরে।
বলিসনি কেন?
সময় পেলাম কোথায়।
কি বলে।
ব্যাপারটা মিটিয়ে নিতে।
ধমকাল না রিকোয়েস্ট করলো।
ম্যাডাম ম্যাডাম করছিল।
এবার ফোন করলে বলে দিবি দুশো কোটি দিলে মিটিয়ে নেবে বলেছে।
ইসলামভাই হাঁই হাঁই করে উঠলো।
তুই কি বলছিস!
ঠিক বলছি। আমার প্রচুর টাকার দরকার।
সঞ্জুর দিকে তাকালাম। হাসছে।
(আবার আগামীকাল)