জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১০১ নং কিস্তি
সত্যি বলতে কি আমার দুদিন জ্ঞান ছিল না। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলাম আমি ম্যাড্রাসের একটা নার্সিংহোমে। মাথায় বেশ চোট পেয়েছিলাম।
সত্যি!
হ্যাঁরে। তারপর সব কেমন যেন ওলট-পালট হয়েগেল। ধীরে ধীরে অনি ব্যানার্জী চিরতরে এই জগৎ সংসার থেকে বিদায় নিল। অনিন্দ ব্যানার্জীর জন্ম হলো। সে এক বিভীষিকা ময় সময় চলছিল আমার। কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আবার মেনে নিতে হচ্ছে।
ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্য। এটা না হলে হয়তো টোডিকে জীবনে ধরতে পারতাম না।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমার পুরনো কাগজপত্র কোথায় রেখেছিস?
সব আলমাড়ীতে আছে। যেমন রেখেছিলি তেমনই আছে।
তুই ডাইরী লিখতিস, মেয়ে জানলো কি করে?
একটু বড়ো হওয়ার পর মেয়ে আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করলো, ফাঁক পেলেই ঘরে ঢুকতো। তারপর দেখলাম কেমন এ্যাডামেন্ট ভাব। একদিন চেপে ধরলাম। গড় গড় করে সব বলে দিল। তুই ধরতে পারলি কি করে।
আমি বেনামে ওদের সঙ্গে চ্যাটে কথা বলতাম।
প্রেমানন্দ।
না।
তাহলে প্রেমানন্দ কে? ওরা প্রমানন্দর সঙ্গে কথা বলতো।
ইণ্ডিয়ায় না থাকলে ওটা অনুপ, ইণ্ডিয়ায় থাকলে আমি।
অনুপ! তুই অনুপের মাধ্যমে ইনস্ট্রাকশন পাঠাতিস।
হ্যাঁ। অনুপ কন্ট্রোল করতো।
রতনরা অনুপের ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী চলতো?
আমি অনুপের সঙ্গে কথা বলে নিতাম। মাঝে মাঝে আমি নিজে প্রেমানন্দ হয়ে যেতাম।
মিত্রা হাসলো।
কেন এই ছলনা।
তখন খুব টাফ প্রিয়েড চলছিল। পাঁচবার কলকাতায় এসেছি টোডির পেছন পেছন। বাগে পাই নি। শেষবার পেলাম। ও অনেক কিছু করে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত ইন্টারপোল শুদ্ধু ওর পেছনে লেগে গেল।
তুই ওর সঙ্গে মিট করেছিলি।
প্রায় আমার সঙ্গে কথা হতো। আমিই ওর সঙ্গে বকলমে বিজনেস ট্রাংজাকসন গড়ে তুলেছিলাম।
জানত না।
দূর অনি ব্যানার্জী তখন মরে হেজে গেছে। তার খবর কাগজে বেড়িয়ে গেছে। কেউ আর সন্দেহ করে।
উইল কবে করলি।
মাঝে ওই যে পনেরো দিন হাওয়া হয়ে গেলাম, দিল্লীতে ছিলাম, তখন।
তার মানে এটা তোর প্রি-প্ল্যান্ড ছিল।
ঠিক তা নয়। তবে মনের মধ্যে একটা কু-গাইত। আমি অনেকের চিরশত্রু হয়ে পরেছি। আমি নাও বাঁচতে পারি। অনুপ তখন এই বুদ্ধিটা দিল।
তোর একবারও তখন মিত্রার কথা মনে পরলো না।
তখন তুইও এতটা সেফটি ছিলি না। তখন তোকে আমি সেফটি রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার যা হয় হোক। আমার যদি কিছু হয়েও যায় ক্ষতি নেই। কিন্তু তোর যদি কিছু হয়, সব ডুবে যাবে।
সত্যি সত্যি তোর যদি কিছু হয়ে যেত।
যেমন ভাবে গত আঠারো বছর চললি সেই ভাবে সারাটা জীবন চালিয়ে দিতিস।
চিকনা যদি না বলতো তাহলে হয়তো আমি নিজে আত্মহত্যা করতাম।
সেটা তুই মুখে বলছিস, পারতিস না।
কেন?
তখন তুই আমার জীবন তোর শরীরে ধারণ করেছিস। তাদের দিকে তাকিয়ে তুই এটা কিছুতেই করতে পারতিস না। আফটার অল তুই মা হতে চেয়েছিলি। মাতৃত্বে নারীর পরিপূর্ণতা। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। যদি তাই হতো আমি ফিরে আসতাম।
তুই এতোটা কনফিডেন্ট ছিলি।
ছিলাম বলেই কাজটা করতে পেরেছি। নিজেকে আরও অনেক বড়ো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছি। তবে কিছুটা ক্ষতি যে আমার হয় নি তা নয়। হয়েছে।
সেটা কি?
সব আজই বলে দিতে হবে।
এই তিনদিন তোকে একটুও ছুঁতে পেরেছি।
তুই চেষ্টা করিস নি।
মিত্রা আমার চোখে চোখ রাখলো।
ভেতর ভেতর তুই সব সময় আসল নকলের ফারাক খুঁজতে ব্যস্ত ছিলি।
তুই বলতে পারলি!
বলার কিছু নেই, তুই যদি আমার জায়গায় থাকতিস, আর আমি যদি তোর জায়গায় থাকতাম, তাহলে এরকমই হতো। তুই মেয়ে, তোর মধ্যে এটা থাকা স্বাভাবিক।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ভাবছিস তোর মনের কথাটা আমি কি করে বলে ফেললাম?
হ্যাঁ।
এই কয়দিনে ইসি তুই তনুকে অনেক ভাবে বাজিয়েছিস, তবে একটা কংক্রিট সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছিস। তাই কিনা?
মিত্রা আমার মুখটা চেপে ধরে বুকে মুখ ঢাকলো।
বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধে শুয়ে থাকলাম। বুঝলাম আমার বুক ভিঁজে যাচ্ছে।
কিরে কথা বলবি না।
মিত্রা চুপ।
ঠিক আছে আর কোনওদিন তোকে কিছু বলবো না।
আমি কি তোকে তাই বলেছি।
তুই এখনও সেই অবুঝ মিত্রা রয়ে গেলি। আমার দিকে তাকা।
মিত্রা কিছুতেই আমার বুক থেকে মুখ তুলছে না। বাধ্য হয়ে আমি ওর মুখটা তুলে ধরলাম। ওর চোখ বন্ধ। চোখের পাতা ভিঁজে ভিঁজে।
তোর চিনতা ভাবনাটা ঠিক কিন্তু পদ্ধতিতে সামান্য ভুল ছিল। এতদিন নিজের হাতে কাগজ চালালি এতো কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিলি, আর এটা বুঝতে পারলি না। তোর আর একটু সময় নেওয়া উচিত ছিল।
কেন?
তনুকে আমি ভালোবাসি ঠিক, কিন্তু তোর জায়গায় ওকে কখনও বসাই নি। তাহলে ও আমার ঔরসজাত সন্তানের মা হতো, দত্তক নিতাম না।
মিত্রা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
তোর কথাবার্তায় তনুর মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে, যার জন্য অনি এতোটা সেক্রিফাইস করতে পারে, তাকে এতোটা বাজাবার দরকার কি?
তুই বিশ্বাস কর।
আমি তোর ব্যাপারটা জানি।
জানিস মিত্রা এগুলো মনের সূক্ষ্ম ব্যাপার। তুই তনুর সঙ্গে বিগত তিন বছর কথা বলেছিস। তার বেশির ভাগটাই আমাকে কেন্দ্র করে। তুই আমাকে ভালোবাসিস, তনু মাঝখানে থাকুক এটা তুই কখনও চাস নি। তুই ঠারে ঠোরে তনুকে এটা বুঝিয়েছিস।
এই চাওয়াটা কি আমার অন্যায়।
একেবারে নয়। তোর দিক থেকে তুই ঠিক আছিস। আবার তনুর দিক থেকে তনু ঠিক আছে। তোরা দুজনের কেউ ভুল নয়। ভুল আমার।
কেন!
বলতে পারিস তোর শূন্যস্থান তনু একদিন পূরণ করেছিল। মুহূর্তের জন্য হলেও ওর প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পরেছিলাম। তখন তুই আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছিস। ঠিক এই জায়গাটায় আমি তনুর কাছে ঋণী।
তারপর তুই ফিরে এলি।
যখন তনু জানতে পেরেছে, তুই আমার প্রথম ও একমাত্র ভালোবাসা, তখন তনু নিজেকে নিজে সরিয়ে নিয়েছে। যাতে আমার সঙ্গে কোনও রিলেশন না থাকে তার জন্য বিবিসির কাজ নিয়ে দেশের মাটি ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে। হয়তো তুই অন্য কথা বলবি। কিন্তু আমি জানি কলকাতা ছাড়াও ভারতে বহু পত্রিকা ছিল যেখানে তনু একটা চাকরি জুটিয়ে নিতে পারতো। সেই এলিমেন্ট ওর মধ্যে ছিল। তা না করে একবুক অভিমানে নিয়ে ও ভারতের বাইরে চলে গেল। তনুর জীবন যন্ত্রনাটা তোর থেকে কোনও অংশে কম নয়। তবে ও আমার মতো মানুষ দেখেছে, তাই অভিজ্ঞতার বেড়টা একটু অন্য রকমের।
দেখ, যে তনু একবুক অভিমান নিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে তাকে যখন সাহায্য চেয়েছি এতটুকু কার্পন্য করেনি, দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে।
একটু থামলাম।
মিঃ ব্যানার্জীর সমস্ত ইনফর্মেশন আমাকে জোগাড় করে দিয়েছে।
তখন তোর শরীরের অবস্থা টালমাটাল, বার বার খবর নিয়েছে, মিত্রাদি কেমন আছে। চ্যাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে আমাকে সাহস জুগিয়েছে। বার বার বলেছে তুমি কখনও হারবে না অনি, তুমি দেখবে মিত্রাদির কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। আমি তোমায় বলছি।
এই যে এতদিন আমি কলকাতার বাইরে ছিলাম। একজন নয় আমরা চারজন। মুথাইয়া, অনুপ ইণ্ডিয়ার খরচ বহন করেছে। বাইরে প্রথম কয়েক বছরের খরচ তনু চালিয়েছে।
তুই বলতে পারিস কেন তুই আমাকে জানাস নি?
হয়তো তোকে জানাতে পারতাম। কিন্তু সে পরিবেশ পরিস্থিতি তখন ছিল না। তাহলে আমাকে এই ভেক ধারণ করতে হতো না। যখন চরম মন খারাপ হয়েছে। কলকাতায় এসেছি। লুকিয়ে লুকিয়ে তোদের দেখার চেষ্টা করেছি। কখনও দেখতে পেয়েছি, কখনও পাই নি।
তোকে মারার জন্য তখন টোডি পাগলা কুকুরের মতো হয়ে গেছে। যে ভাবেই হোক তোদের তিনজনকে সরিয়ে দিতে হবে।
তখন বলতে পারিস আমিও টেরর।
যে কটাকে কলকাতায় তোদের জন্য ঠিক করে পাঠিয়েছে সব কটাকে আমি শেষ করেছি। নিত্য নতুন ছেলে জোগাড় করেছি। মুহূর্তে মুহূর্তে চিনতা ভাবনার রদবদল ঘটিয়েছি। তখন কোথায় কি হয়ে যাচ্ছে, দেখার সময় নেই।
ওদিকে তনু দীর্ঘদিন পর আমাকে পেয়ে মা হওয়ার জন্য পাগল।
আমার জীবনটা কি হবে তুমি বলো।
বাধ্য হয়ে ওকে কলকাতা নিয়ে এলাম। সুন্দরকে নিয়ে গেলাম। আমি বাবা ও মা, লিগ্যাল কাগজপত্র সব রেডি করলাম। সুন্দরকে পেয়ে তনু ঠান্ডা হলো।
এইরকম টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়েই আঠারটা বছর কাটিয়ে দিলাম। আমার মনের এই টানাপড়েন শুধু নেপলা জানতো। ও আমার ছায়া সঙ্গী ছিল। কতো রাত দুজনে জেগে কাটিয়ে দিয়েছি। সাগির, অবতার হুকুম তামিল করার জন্য ছিল।
এরই মধ্যে কতোলোকের সঙ্গে আলাপ হলো কারুর কারুর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হলাম।
নেপলাদের একটা হিল্লে করলাম। প্রথমে ছোট করে শুরু করলাম। তারপর আস্তে আস্তে বারাতে বারাতে সেটা এখন এক-একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সের রূপ নিয়েছে। সেখানে প্রায় চারশো লোক কাজ করে ইণ্ডিয়া বাংলাদেশ মিলিয়ে প্রায় দেড়শো, বাকি ওখানকার। তিনটে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্সের মালিক তিনজন।
এখানে আবিদ আর রতনের নামে এক্সপোর্ট ইমপোর্টের লাইসেন্স বার করলাম। ফার্মের মাল কিনে ওরা এক্সপোর্ট করতে লাগলো, ওদেরও একটা হিল্লে হলো।
সুনীতদার কেসের পর নতুন ভাবে অনাদিকে আর দিবাকরকে আবিষ্কার করলাম। দেখলাম ওরা তলে তলে টোডির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। টোডি তখন অন্য নামে বিখ্যাত। সুনীতদাকে দিবাকার তখন বটকি দিয়ে ডন হয়ে উঠেছে। বম্বেতে বেশ নামডাক হয়েছে। লোকে ওকে অন্যনামে চেনে। ওকে হাতের ট্রাম্প কার্ড করলাম। খুব রিক্স নিয়ে একটা তাস ওপেন করলাম। দেখলাম তাসটা কাজে লেগে গেছে। তখন নিজে নিজের অর্গল থেকে বেরিয়ে এলাম।
এখন এই মুহূর্তে তোর সঙ্গে বিছানায় শুয়ে আছি।
কাঁঠাল খেলো, পেট ফুললো, মরে গেলো। মিত্রা বললো।
তোর মনে আছে সাহিত্য তত্ত্বের ক্লাসে ড. রায় বলতেন, রাজা মরে গেল রাণী মরে গেল। এটা ফ্যাক্ট। আর রাজা মরে গেল সেই শোকে রাণী মরে গেল সেটা হচ্ছে গল্প। তোকে ফ্যাক্ট বললাম, গল্পটা বলিনি। ধীরে ধীরে তুই গল্পটা জানতে পারবি। তার জন্য তোকে অপেক্ষা করতে হবে। আমি যে এখনও গল্পটা লিখে উঠতে পারি নি।
ওমনি কি সুন্দর পিছলে বেড়িয়ে গেলি।
হাসলাম।
বয়স হয়েছে। তোর ভূবণমহিনী হাসিতে আর ভুলবো না।
তোর শরীরটা আগে বেশ হাল্কাছিল এখন বেশ ভারী। ভুঁড়িটা একটু কমা। আমার শরীরটা দেখেছিস। এখনো কচি কচি মেয়েগুলোকে পটকে দিতে পারি।
দেবো না এমন, দাঁতগুলো ভেঙে দেবো।
মিত্রা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ঘুসি তুললো।
আমি ওকে জাপ্টে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম।
সকালে যখন ঘুম ভাঙলো দেখলাম আমি জানলার দিকে মুখ করে শুয়ে আছি।
জানলার পাল্লাগুলো হাফ ভেজানো। নিচের ঘর বলে সেরকম একটা তীব্র আলো ঘরে এসে পড়ছে না। কেমন যেন ছায়া ছায়া। আমগাছের বিশাল গুঁড়িটা দেখা যাচ্ছে। পাশেই পেয়ারা গাছটা। পাশ ফিরলাম। ঘরের দরজা ভেজান। কারুর কোনও আওয়াজ পাচ্ছি না।
পায়ের দিকে তাকালাম। টেবিলের ওপর আমার সেই ফটোটা আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। যেন আমাকে কুর্নিশ করছে।
কিরে অনি, চিনতে পারছিস। নিজের মনে নিজে হাসলাম।
না কাপরটা এলোমেলো হয়ে যায় নি। যদি হয়েও থাকে তবে মিত্রা ঠিক করে দিয়ে গেছে।
উঠে বসলাম। বড়ো বড়ো দুটো হাই উঠলো।
কটা বাজে?
উঠে গিয়ে জানলার পাল্লাদুটো হাট করে খুলে দিলাম। বাগানের এক কোনে ভজুরাম ঝাঁট দিয়ে দিয়ে শুকনো পাতা একজায়গায় জড়ো করছে। খুব একটা খারাপ বেলা হয়নি। মনে হচ্ছে দশটা বেজে গেছে। পাঁচিলের ওপর রোদের নিশানা তাইই জানান দিচ্ছে। বিছানা থেকে নেমে এলাম। আমার সেই ভাঙা চেয়ারটার ওপর দেখলাম আমার প্যান্ট, গেঞ্জি, শার্ট, পাঞ্জাবী গোছানো আছে।
ব্যাপারটা এরকম তোমার যদি কোথাও বেরনোর থাকে তাহলে তুমি তোমার পছন্দ মতো জামা-কাপর পরতে পারো।
বাথরুমে গেলাম। দেখলাম সব গোছানো রয়েছে। বাথরুমের সমস্ত কাজ সেরে ঘরে এলাম। দরজা হাট করে খোলা, বুঝলাম কেউ এসেছিল, দেখলাম বিছানাটা গোছানো। রাতের চাদর পাল্টে একটা অন্যরকমের চাদর পাতা হয়েছে।
নিজে নিজে জামাকাপরগুলো একবার উল্টে পাল্টে দেখলাম। জিনসের প্যান্টটা বার করলাম একবার পরে দেখলাম, একটু টাইট টাইট লাগছে। ঠিক আছে খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না।
মনেহচ্ছে এগুলো কালকের সান্ধ্যকালীন মার্কেটিংয়ের ফসল। সুমন্তর দেওয়া পাজামা পাঞ্জাবীটা দেখলাম কেচে ইস্ত্রি করা রয়েছে। পাঞ্জাবীটা বার করে পরলাম।
আলমাড়ির আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ঠিক আছে, খুব একটা বেমানান লাগছে না।
আমার মোবাইল কাগজপত্র সব কোথায়? নিশ্চই মিত্র কাউকে না কাউকে বলে গেছে।
ঘরের বাইরে এলাম। দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম।
বাগানে দেখলাম একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। বসার ঘরে এসে ঢুকলাম। দেখলাম রান্নাঘরে বড়োমা, দামিনীমাসি। ছোটোমাকে দেখতে পেলাম না।
বড়োমা, সব গেলো কোথায়?
বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো। ঘুম ভাঙলো।
অনেকক্ষণ।
চা খাবি?
খাবো। তাড়াতাড়ি খেয়ে বেরবো।
কোথায় যাবি?
দেখি কোথায় যাওয়া যায়।
নিজের জামাকাপর চিনতে পারলি।
চেয়ারের ওপর ছিল দেখলাম, পরে নিলাম।
সোফায় বসলাম।
ছোটোমা কোথায়?
কেন, তোর ঘরেই তো ছিল।
কই দেখলাম না।
তাহলে হয়তো ওপরে গেছে।
সাহেব শুবরা সব যার যার কাজে বেরিয়েছেন।
হ্যাঁ।
দাদা, মল্লিকদা কি অফিসে গেছে।
না ডাক্তারের সাথে কোথায় বেরোল। বললো ফিরে আসবে।
অফিসে যাবে নাকি?
মনে হয় যাবে না।
মিত্রা আমার জিনিষপত্র কোথায় রেখে গেছে জান?
আমার কাছে আছে।
একটু বার করে দাও।
এখুনি বেরবি নাকি।
কয়েকটা ফোন করার দরকার আছে।
সেই বল। কাগজপত্র আমার আলমাড়িতে। ফোনটা আমার ড্রেসিন টেবিলের ড্রয়ারে আছে। সকাল থেকে যে কতো ফোন এলো। মিত্রা কথা বলেছে। তারপর বন্ধকরে রেখে চলে গেছে।
সুন্দরবাবুও কি অফিসে গেছেন?
ঘরে থেকেই বা কি করবে। মিত্রা সঙ্গে নিয়ে গেছে। বুঁচকি পরীক্ষা দিয়ে অফিসে যাবে।
আমি উঠে বড়োমার ঘরে গেলাম। ড্রয়ার থেকে ফোনটা বার করলাম। স্যুইচ অন করলাম।
অনি কোথায় দিদি?
ছোটোমার গলা পেলাম।
কেনরে?
এই দেখে এলাম বাথরুমে ঢুকেছে তারপর ফুরুত, কি জামা পরেছে?
আমি বড়োমার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
আমি জানতাম, তুই এরকম একটা অখাদ্য মার্কা পোষাক পরবি।
খারাপটা কোথায় দেখলে! হাসছি।
জিনসের প্যান্টের সঙ্গে কেউ এই পাঞ্জাবী লাগায়।
ও ঠিক আছে, আমায় কে দেখবে বলো।
মিত্রা ঠিক বলেছে। তুমি দেখবে ছোটোমা, পাঞ্জাবীর ওপর বুবুনের একটা দুর্বলতা আছে। পাঞ্জাবীর সঙ্গে পাজামা পরবে না। প্যান্টের সঙ্গে ঠিক এই পাঞ্জাবীটা গলিয়ে নেবে।
হাসলাম।
যা পাঞ্জাবী খুলে গেঞ্জিটা লাগা।
কাল পরবো।
দামিনী মাসি লুচি আলুভাজা নিয়ে এলো।
আমার একার?
মাসির দিকে তাকালাম। মাসি হাসছে।
বড়োমা রান্নাঘরের থেকে হাসছে।
তুই খা আমরা পরে খাচ্ছি।
আগে খেয়ে নিই পরে কাজ করো। আর কি বানিয়েছো বলো।
কেন বলতো! ছোটোমা বললো।
তাহলে সব একটু একটু করে খেয়ে নিই। দুপুরে আর ভাত খাব না।
তা কি করে হয়। বড়োমা বললো।
কেন পাঠিয়ে দিও, অফিসে খেয়ে নেব।
এখন আর সে রেওয়াজ নেই।
তাহলে একবারে রাতে খাবো। এখন এইসব খেয়ে আর ভাত খেতে পারবো না।
ছোটোমা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
কি হলো তাকিয়ে রয়েছো কেন—যাও একসঙ্গে বসবো।
ফোনটা নিয়ে প্রথমে তনুকে একবার রিং করলাম।
বেশ কিছুক্ষণ রিং বাজার পর তনু ধরলো।
হ্যালো।
বলো।
যাক বাবুর তাহলে মনে পড়েছে?
কোথায় ছিলে এতক্ষণ রিং বেজে গেলো।
ব্যাগের মধ্যে ছিল, বার করতে সময় দেবে তো।
গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছ?
যাচ্ছি না ফিরছি।
কোথায় গেছিলে?
সকালে দাদার কাছে গেছিলাম।
কি হলো?
পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে যে যার ভাগাভাগি করে নেবে। তনুর গলাটা ভাড়ি ভাড়ি লাগলো।
ওই প্রপার্টির প্রতি তোমার কোনও দুর্বলতা আছে?
তা তো একটু আছে বইকি। ওই বাড়িতে জন্মেছি, ছোটো থেকে বড়ো হয়েছি।
কতো দাম চাইছে?
পঞ্চাশ লাখ।
বাড়িটা কোথায়?
চিত্তরঞ্জন পার্ক।
কতটা জায়গা।
এতো কথা জিজ্ঞাসা করছো কেন বলো? কই এতদিন জিজ্ঞাসা করো নি? তনু মুখ ঝামটা দিল।
আমি যদি কিনে নিই—
তুমি কিনে গলায় মালা ঝোলাবে?
ঝোলাতেও পারি।
না তোমায় কিনতে হবে না।
তোমার শেয়ারের দামটা তো দিতে হবে না।
খুব চালাক না। আমার ভাগটা ছাড়বো কেন।
ঠিক আছে তোমার ভাগটা তুমি নিয়ে নেবে। ওদের প্রস্তাব দাও তুমি কিনবে।
এই যে তুমি আসার সময় বললে নিঃশর্তে সব ছেড়ে দিতে।
তুমি কি তাই বলে এসেছো?
এখনও বলি নি। সব শুনলাম। বলেছি বিকেলের দিকে আমার মতামত জানাব।
ওদেরকে একটা প্রস্তাব দাও কি বলে দেখ। অনুপ মনে হয় পৌঁছে গেছে। ওর সঙ্গে একবার কথা বলে নাও। যদি রাজি হয়ে যায়। এই সপ্তাহে রেস্ট্রি করবো।
তোমার মানিপার্টস নেই, আছে একটা ঝোলা ব্যাগ, এতো টাকা পাবে কথায়?
তুমি, মিত্রা, নেপলা, সাগির, অবতার হচ্ছো আমার ব্যাঙ্ক, লোন নেব।
আগে যে লোনগুলো নিয়েছো শোধ করো, তারপর দেব।
তোমার কথা কিন্তু বড়োমা, ছোটোমা, দামিনীমাসি শুনছে।
ধ্যাৎ।
ধ্যাৎ না সত্যি। মিত্রার সঙ্গে কথা বলেছো?
সকালে বলেছি।
সুন্দরবাবু অফিসে গেছেন।
কথা হয়েছে। অফিস দেখে ও খুব ইমপ্রেসড। বললো, মা আমি আর ব্যারিস্টারি পড়বো না, মাস কমিউনিকেসন নিয়ে পড়বো।
তুমি কি এখন সানার কাছে ফিরে যাচ্ছ।
হ্যাঁ। তারপর আবার বেরবো।
ঠিক আছে। আপডেট কি হলো জানাবে।
তুমি কি এখন বেরবে?
হ্যাঁ।
ফোনটা খুলে রেখো, বন্ধ কোরো না।
আচ্ছা।
দেখলাম টেবিলে সকলের খাবার এসে গেছে। ছোটোমা আমার দিকে তাকিয়ে।
তনুর কেউ নেই?
না।
ওর মা ছিলেন না?
ছিলেন, দাদা বৌদির অত্যাধিক আদরে গতো হয়েছেন।
ওর দাদা, বৌদি এখন থাকে কোথায়?
ওখানেই থাকে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে।
বাড়ি বিক্রি করে দেবে মানে?
ওই যে ভাগের মা গঙ্গা পায় না। তনুর বৌদিটা সুবিধার নয়।
খাওয়া চলছে কথাও চলছে।
তোর মল্লিকদা তনুর সঙ্গে তোকে এ্যাসাইমেন্টে পাঠাতো।
ছোটোমার দিকে তাকালাম। কিছু একটা ইঙ্গিত করতে চাইছে।
সেই সব দিনের কথা মনে আছে তোমার।
চোখ বন্ধ করলে মনে হয় এই সেদিনের কথা।
তখন তনুর মা বেঁচে ছিল। ওদের ফ্যামিলিতে অনেক সমস্যা। তাই তনুকে বাধ্য হয়ে দিল্লী থেকে কলকাতায় চলে আসতে হয়। ওর মামারবাড়ি জোড়াসাঁকো। মামারা বনেদী পরিবার। কলেজ লাইফটা এখানে কাটায়, তারপর ক্যামেরা নিয়ে খেলতে খেলতে ফটোগ্রাফার হয়ে গেল।
তারপর তোর পাল্লায় পরলো, বলতে লজ্জা করছে। ছোটোমা বললো।
লজ্জা না। তুমি তো সব জানো, তবে তনুর কোনও ক্ষতি আমি করি নি। তনুকে তুমি আমার আড়ালে জিজ্ঞাসা করতে পারো।
আমি সে কথা বলেছি?
মেয়েটা তোর জন্য সারাটা জীবন সেক্রিফাইস করলো। বড়োমা বললো।
তুই এতো ব্যালেন্স করিস কি করে বল তো? ছোটোমা বললো।
আমার ওখানে যখন থাকতো কবিতারা ওর ঘরে ঢুকতে ভয় পেতো। দামিনীমাসি বললো।
কেন! ছোটোমা বললো।
একদিন কবিতাকে ধরে আচ্ছা করে মেরেছিল।
অনি!
হ্যাঁ গো, তাহলে বলছি কি। সাধে কি ওরা দাদা দাদা করে কেঁদে মরে।
ছোটোমা হি হি করে হেসে উঠলো।
ছোটোমার ফোনটা বেজে উঠলো। নম্বরটা দেখে আমার দিকে তাকাল।
তোর ফোন।
ফোনটা কানে দিল।
বল।
বাবু উঠেছেন।
খাচ্ছেন। তোর কথাই ঠিক বুঝলি।
মিত্রা হাসছে।
আমি ওকে চিনি। বলো ফোনটা একটু অন করতে সকাল থেকে অনাদির তিনবার ফোন হয়েগেল। সিপি একবার করেছে। যে ভাবেই হোক আমাকে একবার এ্যাপয়ন্টমেন্ট করে দিতে বলেছে।
তোর কথা শুনছে আর হাসছে।
ও কি অফিসে আসবে?
কিরে যাবি? ছোটোমা আমার দিকে তাকাল।
চেঁচিয়ে বললাম, কখন যাব বলতে পারছি না।
তুই এলে দুপুরে লাঞ্চ করবো।
কি খাওয়াবি?
কি খাবি বল।
তুই খাওয়াতে পারবি না।
বলনা শুনি একবার।
গিয়ে বলবো।
আচ্ছা।
আরও কিছুক্ষণ ছোটোমাদের সঙ্গে কথা বললাম। চা খেলাম।
বড়োমাকে বললাম আমার ঝোলা ব্যাগটা বার করে দাও।
সেটা মিত্রা তুলে রেখেছে তোর জন্য কালকে একটা ব্যাগ কিনে এনেছে।
দেখি কি রকম।
বড়োমা ঘর থেকে একটা দামি লেদারের সাইড ব্যাগ আনলো।
তুমি খেপেছো, এই ব্যাগ নিয়ে আমি বেরবো। তার থেকে তুমি একটা প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ দাও।
দেখছিস ছোটো দেখছিস। তারপর মেয়েটা এসে আমাকে দুমুড়ো গালাগাল দিক।
দেবে না। আমি বলছি।
অগত্যা বড়োমা ঘরে গেল। আমি ব্যাগ থেকে আমার কাগজ পত্র বার করলাম। খামের মধ্যে দেখে নিলাম আমার ব্যাঙ্কের কার্ড আর চেকবইটা ঠিক আছে। বড়োমা একটা প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ নিয়ে এলো।
আরও একটা ব্যাগ ছিল।
সেটা ঘরে আছে।
নিয়ে এসো।
একবারে বলিস না কেন?
বড়োমা আবার ঘর থেকে সেই ব্যাগটা নিয়ে এলো। আমি ব্যাগ থেকে হার্ডডিক্সটা বার করলাম।
এগুলো গুছিয়ে রাখো। যখন চাইবো দেবে।
প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র আর হার্ডডিক্সটা প্লাস্টিকের পলি ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম।
আমাকে পঞ্চাশটা টাকা দাও।
বড়োমা আমার দিকে এমন ভাবে তাকাল, যেন আকাশ থেকে পড়েছে। ছোটোমা, দামিনীমাসি হেসে কুটি কুটি খাচ্ছে।
ও ছোটো তুই মিত্রাকে ফোন কর।
হাসতে হাসতে ছোটোমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে। কিছুতেই হাসি থামে না।
সত্যি আমার পকেটে পয়সা নেই।
দামিনীমাসি আরও জোরে হেসে উঠলো।
যা বলেছিস বলেছিস, আর কাউকে এই কথা বলিস না। লোকে শুনলে হাসবে। দামিনীমাসি বললো।
কেন! যা সত্যি তাই বললাম।
এখুনি তুই তনুকে পঞ্চাশ লাখের গল্প শোনাচ্ছিলি। আর এখন দিদির কাছ থেকে পঞ্চাশটাকা চাইছিস। ছোটোমা বললো।
এই মুহূর্তে নেই এক ঘণ্টা পরে চলে আসবে।
গাছ থেকে পরবে।
ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নেব।
বড়োমা আমার দিকে একই ভাবে তাকিয়ে।
তুই ওর অবস্থাটা একবার দেখ ছোটো। কোনও ভ্রুক্ষেপ আছ। তোর জন্য নেপলা গাড়ি রেখে গেছে।
আমাকে পাগলা কুকুরে কামড়েছে?
নেপলার সঙ্গে কথা বলে নে।
ও আমি বুঝে নেব, তোমাকে ভাবতে হবে না।
তারপর সবাই এসে আমাকে ধরুক।
ধরলে আমার ঘারে দোষ চাপাবে।
বড়োমা নিজের ঘরে গেল।
আমি কিন্তু পঞ্চাশ টাকার বশি নেব না। তার বেশি নিয়ে এলে হেঁটে চলে যাব।
দামিনী একবার ইসলামকে ফোন করো।
সে তোমরা সবাইকে একবার করে ফোন করতে পার।
বড়োমা পাঁচটা একশো টাকার নোট আনলো আমি একটা একশো টাকার নোট নিয়ে ছোটোমাকে বললাম, ভাঙিয়ে দাও।
সেই বাস, আর অটো!
হ্যাঁ। তারপর দুটো ঠ্যাঙ আছে।
ছেলেটা যে সকাল থেকে বসে আছে। বড়োমা বললো।
ওর সঙ্গেই যাচ্ছি। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে ভাগিয়ে দেব।
তই কর। আমাদের ঘাড় থেকে তো বিদায় হবে।
ছোটোমা টাকা খুচরো করে দিল। আমি পঞ্চাশ টাকা নিয়ে বাকিটা ফেরত দিলাম।
ওরে এখন গাড়িভাড়া অনেক বেরে গেছে।
কতো বেরেছে। আট-আনার চা দেড়টাকা হয়েছে। তাহলে একটাকার গাড়িভাড়া তিন টাকা হবে।
সরল হিসেব দেখছো দিদি। নাহলে তোমার কাছ থেকে দশটাকা চাইতো। দামিনীমাসি বললো।
ছোটোমা আমার দিকে তাকাল।
তাইনা বল—দামিনীমাসি বললো।
তুমি কতো বোঝ। আমি বললাম।
মা আময় খেতে দাও।
দেখলাম ভজু ঘরে এলো। স্নানটান সেরে ঝকঝকে। আমাকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি কখন উঠেছ?
অনেকক্ষণ, তখন তুই পাতা ঝাঁটদিয়ে দেয়ালের কোনে জড়ো করছিলি।
ডাকনি কেন?
কাজ করছিলি তাই। তোর জন্য রেখেছি, খেয়ে নে।
তুমি কোথায় যাচ্ছ?
একটু কাজে যাচ্ছি।
আমি যাব।
তাহলে এদের তিনজনকে দেখবে কে?
জগাই আছে।
জগাই একা পারবে না।
তাহলে কালকে নিয়ে যাবে?
যাব।
আমি তিনজনকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম।
বারান্দায় নামতেই একটা ছেলে এগিয়ে এলো।
স্যার।
তোমাকে নেপলা পাঠিয়েছে?
না, আবিদদা।
তুমি আবিদের অফিসে কাজ করো?
হ্যাঁ স্যার।
আমাকে মোর পর্যন্ত এগিয়ে দাও, তারপর কেটে পরো।
আমার চাকরি চলে যাবে।
গেলে আমার কাছে আসবে, এর থেকে ভালো চাকরি দেব।
ছেলেটা মাথা নীচু করে রইলো।
গাড়িতে উঠে বসলাম।
গাড়ি ছারলো গেটের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
প্রথমে রাসবিহারীর মুখে এলাম। ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে ব্যাঙ্কে ঢুকলাম। টাকা তুললাম। হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলাম কালীঘাটে। রোদের তেজ বেশ। টাক গড়ম হয়ে উঠলো। ঘেমে নেয়ে গেছি। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখলাম রুমাল নেই।
প্রথমে মন্দিরে এসে ঢুকলাম। একবার মাতৃমূর্তির দিকে তাকিয়ে প্রণাম করলাম। একজন পাণ্ডা এসে মাথায় একটা টিপ পরিয়ে দিয়ে হাত পাতলো।
কি ভাই—
প্রণামী—
খুচরো নেই। খুচরো করে দেবে—
কতো—
দশটাকা—
ছেলেটি হাসলো।
পাঁচটাকা নিয়ে পাঁচটাকা ফেরত দাও।
মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার মুখে ফুটপাথে দেখলাম টুপি বক্রি হচ্ছে। একটা টুপি কিনলাম। একট চশমা কিনলাম আর একটা মানিপার্টস। কিছুদূরে গিয়ে দেখি ফুটপাথে রুমাল বিক্রি হচ্ছে। ঢালাও। যা নেবে সব দশ টাকা। একটা কিনে মুখ মুছলাম।
এখন রোদটা একটু কম লাগছে। চেলসায় ধরে চোখে চশমা নিয়েছি। কাছের জিনিষ দেখতে পাই না। দূরেরটা এখনও ঠিক আছে।
বড়ো রাস্তায় এসে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। বললাম পার্কস্ট্রীট।
বেশিক্ষণ সময় লাগল না। জ্যামে যা দু-চারবার আটকে পরেছিলাম।
পার্কস্ট্রীটে এসে দেখলাম না সব ঠিক আছে। বছর পাঁচেক আগে একবার এসেছিলাম। সোজা সুজিতদার অফিসে চলে এলাম। এসে একেবারে বোকা বনে গেলাম। সেটা এখন ট্রাভেল এজেন্সির অফিস হয়েছে। বলতেই পারল না সুজিতদার অফিস কোথায়। বুঝলাম দু-তিনবার হাত বদল হয়ে গেছে।
নীচে নেমে এসে কিছুক্ষণ ফ্লুরিসের তলায় দাঁড়ালাম। বুক ভড়ে দামি দামি কেকের সুগন্ধ নিলাম। তারপর সোজা হাঁটা আরম্ভ করলাম মির্জাগালিব স্ট্রীট ধরে।
দমকল অফিসের কাছে এসে একবার থমকে দাঁড়ালাম। রতনের চায়ের দোকানটা বন্ধ। নিচে একজন পুরনো বই রেখে বেচছে।
অতীতটা বার বার চোখের সামনে ভেসে আসছে।
সদর স্ট্রীটে ঢুকে পরলাম। এই রাস্তায় আমার কতো স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। হগ মার্কেটের গা দিয়ে সোজা চলে এলাম ধর্মতলায়। না কলকাতা বদলায়নি। যেমন দেখেছি তেমনি আছে। লোক বেড়ে গেছে, গাড়িঘোড়া বেড়ে গেছে।
পায়ে পায়ে অফিসের সামনে এসে দাঁড়ালাম। নতুন রং হয়েছে। একবারে ধব ধবে সাদা। বাইরের চাকচিক্য আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে।
গেট দিয়ে ঢুকতেই ধাক্কা খেলাম। সিকুরিটির ছেলেটা খপ করে আমার হাত ধরলো।
কোথায় যাবেন?
সন্দীপবাবুর সঙ্গে দেখা করবো।
কে সন্দীপ?
নিউজে কাজ করেন।
একবার সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকল। ভাবলো নির্ঘাৎ গাঁইয়া মাল।
দাঁড়ান।
ছেলেটি ভেতরে গেল কথা বলে এসে বললো, রিসেপশনে গিয়ে কথা বলুন।
আমি রিসেপশনে এলাম। সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
আরে বাবা! এ তো আমূল চেঞ্জ হয়ে গেছে। কোথায় সেই এ্যাডর ঘর আর কোথায় সেই রিসেপশনের ভদ্রমহিলা, কি যেন নাম? রনিতা। এখন দেখছি একটা ঝকঝকে মেয়ে বসে আছে। পোষাকটা অনেকটা এয়ার হোস্টেসদের মতো। দারুণ লুক্রেটিভ।
জায়েন্ট স্ক্রিনে টিভি চলছে।
সামনে সার সার চেয়ার। দুটো চেম্বারের মতো, একটার দেখলাম গায়ে লেখা আছে ভিজিটরস রুম। আর একটা কনফারেন্স রুম।
দুটোরই দরজা ভেজান। সেখানে হয়তো কেউ ভিজিটারদের সঙ্গে কথা বলছে।
আমার পোষাকটা মনে হয় সত্যি খুব অড দেখতে লাগছে। তারপর মাথায় ওরকম একটা টাওয়েলের কাপরের টুপি চোখে কালো চশমা।
কার সঙ্গে দেখা করবেন বলুন। মেয়েটি মিষ্টি করে বললো।
সন্দীপবাবু।
এ্যাকটিং এডিটর।
হ্যাঁ।
আপনার সঙ্গে ওনার এ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে?
না।
এ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া উনি কারুর সঙ্গে দেখা করেন না।
বহু দূর থেকে এসেছি, ফিরে যাব?
কি দরকার বলুন।
ওনার সঙ্গে দেখা করে বলতে পারলে ভালো হতো।
মনে হয় আমার কথা বার্তায় মেয়েটার মন গোলেগেলো।
স্লিপে নাম লিখুন।
মেয়েটির দিকে তাকালাম। আমার চোখ কালো কাঁচে ঢাকা। দেখতে পাচ্ছে না।
আমি স্লিপটা ফিলআপ করলাম, নাম লিখলাম, গোবর্ধন ব্যানার্জী। অনেক ভেবেচিন্তে একটা উল্টোপাল্টা এ্যাড্রেস লিখলাম। মেয়েটির হাতে দিলাম।
মেয়েটি স্লিপের নামটা দেখে মুখ টিপে একবার হাসলো। তা হাসুক।
ওখানে বসুন, অপেক্ষা করতে হবে।
ঠিক আছে।
আমি একেবারে শেষরোর একটা কর্ণারের চেয়ারে বসলাম। যাতে কারা কারা যাওয়া আসা করে দেখতে পাই। আমার এই ঝকঝকে পাঞ্জাবীর সঙ্গে জিনসের প্যান্ট আর মাথায় টুপি চোখে কালো চশমা। সকলেই একবার করে চোখ বুলিয়ে চলে যাচ্ছে। ভাবছে জোকার নম্বর ওয়ান।
আমি পামটপটা অন করে মেলগুলো ইন্টারনেটে ব্রাউস করা শুরু করলাম। প্রথমে মেলগুলো চেক করলাম। এরই ফাঁকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছি। সায়ন্তন একটা মেয়ের সঙ্গে হন হন করে ঢুকে ওপরে চলে গেল। একবার আমার দিকে তাকাল। মেয়েটা দেখছি প্রায়ই আমার দিকে টেরিয়ে টেরিয়ে দেখছে।
বৃষ্টি এবং রাত্রিকে দেখলাম ঘেমে নেয়ে ঢুকলো। নিশ্চই সন্দীপ কোথাও পাঠিয়েছিল। আমি মাথা নীচু করে নিলাম। ওরা রিসেপসনিস্ট মেয়েটির সঙ্গে ফিস ফিস করে কি যেন কথা বললো। তারপর ভেতরে চলেগেল।
অনেকেই দেখছি ওপর থেকে নিচে আসছে দেখা করছে আবার চলে যাচ্ছে। আগে যেমন নাম লিখে সোজা ওপরে চলে যাওয়া যেত এখন সেরকম নেই।
প্রায় আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর সন্দীপ নিচে নামল।
কে দেখা করতে এসেছেন?
মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটি ইশারায় আমাকে দেখাল।
আমি মাথা নীচু করে আছি।
গোবর্ধন ব্যানার্জী।
সন্দীপের বিরক্তিকর ঝাঁঝালো গলা শুনে আর যারা বসেছিল মুখ টিপে হাসছে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
এদিকে আসুন। সন্দীপ বিরক্ত এবং বেশ গম্ভীর।
সবাই যেখানে বসে কথা বলে বেড়িয়ে যাচ্ছে সন্দীপ সেই ঘরে ঢুকলো, আমি পেছন পেছন। ভেতরে দু-জন বসে ছিল আমাদের ঢুকতে দেখে বেরিয়ে এল। হয়তো অন্য কোনও ডিপার্টমেন্টের স্টাফ।
রাম ঠাণ্ডার চোটে আমার ঘামটাম অনেকক্ষণ আগে শুকিয়ে গেছে।
সন্দীপ নিজে সোফার একদিকে বসে অপরজিটের সোফাটাতে হাত দেখিয়ে বললো, বসুন।
ঘরের দরজাটা অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেল।
আমি বসতে বসতেই বললাম, জি ইউ এন ডি ইউ।
সন্দীপ তরাক করে উঠে দাঁড়িয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো।
হারামী, শালা তুই।
যে কোনও একটা বল। একসঙ্গে দুটো দিলে হজম হবে কি করে?
গোবর্ধন ব্যানার্জী। দাঁড়া দখাচ্ছি।
বেশি ক্যালাস না।
ফোনটা পকেট থেকে বার করে ডায়াল করলো।
একবার নিচে আয়।
দরজাটা খুলেই চেঁচালো, পিউ একবার শুনে যাও।
শালা তোর বানান করা দেখে চিনতে পারলাম, নাহলে চেনাই যাচ্ছে না।
পিউ দরজাটা ঠেলে হন্ত দন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। মুখটা থমথমে।
ব্যাপারটা এরকম হয়তো লোকটাকে সন্দীপদার সঙ্গে দেখা করিয়ে ভুল করেছে। কপালে আজ ঝাড় লেখা আছে।
দেখো লোকটাকে চিন্তে পারছ কিনা।
পিউ আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। চোখে মুখে একটা চাপা টেনসন।
চশমা, টুপিটা খোল।
সন্দীপ যেন ধমক দিল।
হ্যাঁ স্যার।
সন্দীপ মুচকি হাসলো।
আমি ধীরে সুস্থে আমার মাথার টুপি চোখের চশমা খুললাম।
কতো অভিনয় জানিস।
পিউয়ের দিকে তাকাল।
এখনও চিনতে পারছো না।
না। মেয়েটা মাথা দোলাচ্ছে।
তুমি যাকে দেখার জন্য প্রথম দিন থেকে আমাকে দ্বীপায়ণকে বিরক্ত করছিলে।
অনি ব্যানার্জী!
(আবার আগামীকাল)