কল্যাণ সেনগুপ্ত
প্রতিটি সভ্য দেশে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরই একটি সঠিক ও সর্বজনগ্রাহ্য নাগরিক পঞ্জি থাকা উচিৎ। কিন্তু দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনে নানাবিধ বিতর্ক ও সমস্যার কারণে বিষয়টির সুষ্ঠ সমাধান করা হয় নি। কংগ্রেসি শাসনের একটি বড় দূর্লক্ষন হচ্ছে সমস্ত বিতর্কিত সমস্যাগুলোকে সুষ্ঠু সমাধানের পথে না গিয়ে কুলুঙ্গিতে তুলে রাখা হয়, “বাদমে দেখা যায়গা” মনোভাব নিয়ে। এভাবেই নাগরিক পঞ্জির মতো দেশের গুরুত্বপূর্ন জরুরী বিষয়কেও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সেই সুযোগ নিয়ে বিজেপি তাদের মুসলিম বিদ্বেষী সংকীর্ণ ও বিভেদমূলক রাজনীতিকে চরিতার্থ করতে আসরে নেমে পরে, ধাপে ধাপে মুসলিমদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ২য় শ্রেণী বা ক্রীতদাসে পরিণত করার লক্ষ্যে। বহু শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যেও এমনই সংকীর্ণ ও দেশহীত বিরোধী মনোভাবের সমর্থন মেলে। সেকারণেই মোদি-শাহরা এই বিষয়টি নিয়ে এতখানি বেপরোয়া আচরণ করার সাহস পাচ্ছেন।
লকডাউনের কারণে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পরা নাগরিক পঞ্জী বা NRC বিরোধী আন্দোলন আপাতঃ বন্ধ থাকলেও লকডাউন উঠে গেলে তা আবার শুরু হবেনা, এমন নিশ্চয়তা নেই। দিল্লীর শাহীনবাগের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুধুমাত্র গোটাদেশেই নয় বিদেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। এই অবস্থান আন্দোলন বিজেপির এতখানি শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠে যে, পুলিশের উপস্থিতিতেই দলীয় কর্মীদের দিয়ে দিনের বেলা রিভলবার থেকে গুলি চালিয়েও ভয় দেখানো হয়। এমনকি পরবর্তীকালে দিল্লিতে দাঙ্গা পর্যন্ত করা হয় মুসলিমদের সন্ত্রস্ত করতে। লকডাউনের মধ্যেই আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারী অন্তঃস্বত্ত্বা জফুরা সহ বহু ছাত্র ছাত্রীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং জামিন পর্যন্ত মিলছেনা। অথচ আমরা দেখলাম, যে যুবকটি পুলিশের সামনে অবস্থান আন্দোলনের দিকে গুলি চালালো, তার জামিনও মঞ্জুর করা হোল। প্রশাসনের এমন নির্লজ্জ্ব বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে সমস্ত গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্ন মানুষ ফুঁসছে।
নাগরিকপঞ্জী তৈরিতে কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকার যদি দলীয় সংকীর্ণ রাজনীতি না করতো তাহলে এত বিরোধিতা হতই না। সরকার যদি শুধুমাত্র দেশের স্বার্থে নাগরিকপঞ্জী তৈরিতে ব্রতী হোত তবে বিষয়টি নিয়ে বিরোধীশক্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন স্তরে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তির কথা ভাবতো। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি, ফলে বিষয়টি এখন সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে আর-পারের লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে। দেশজুড়ে চূড়ান্ত অতিমারীর মধ্যেও সরকার তার দমন পীড়নের নীতি প্রয়োগ করে চলেছেন। ফলে লকডাউন উঠে গেলে আবার বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হবার পুরো সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নাগরিকপঞ্জীর মতো হুরুত্বপূর্ন বিষয়ের সমাধান অতীব জরুরি। এরজন্য বহু বিতর্কিত বিষয়কে আলোচনার মধ্য দিয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছবার জন্য ধৈর্য ধরে চেষ্টা করতে হবে। নাগরিকপঞ্জীর মতো অতীব সংবেদনশীল বিষয়কে স্রেফ গা জোয়ারী করে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে পাশ করিয়ে নিলে বা তা কার্যকর করলে অশান্তি অনিবার্যরূপে দেখা দেবে, যা কখনোই কাম্য নয়। এরফলে দেশের শান্তি ও সংহতির ক্ষেত্রে একটি চিরক্ষত তৈরি করবে, যা কোন দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষে কোনভাবেই করা উচিৎ নয়। সেকারণেই বারবার আলোচনার মাধ্যমে সবধরনের বিরোধকে কমিয়ে এনে সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করে সঠিক বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী নাগরিকপঞ্জী গঠন করতে হবে। এই দীর্ঘ অসমাপ্ত কাজটি সুষ্ঠরূপে সম্পন্ন করতে পারলে মোদীসরকার অবশ্যই সবার প্রশংসা দাবি করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে মোদি সরকার যেভাবে নাগরিকপঞ্জী বা NRC নিয়ে যে পদ্ধতিতে সব প্রতিবাদকে অগ্রাহ্য করে এগোতে চাইছেন তাতে কোন লাভ তো হবেই না দেশজুড়ে শুধুমাত্র অশান্তিই হবে আর বিশ্বের কাছে মুখ পুড়বে মোদীসরকারের।