নলিনী বেরা
আষাঢ় মাস। মঙলুর এখন কত কাজ! তা বলে ‘তিরিয়ো’ বা তার আড়বাঁশি কি আর বাজে না?
বাজে, বাজে।
ওই বাজল বুড়্ বুড়ি ঝর্নার ধারে। কদমডাঙায়। ওই তো বাজল পাকুড়তলায় দাঁড়-কলমি বনের ওদিকটায়।
মঙলুর মোষটা কী আর মঙলুর সাথে নেই?
আছে, আছে।
ওই তো মোষের পিঠে চড়েই মঙলু চলেছে এ ডাঙা থেকে সে ডাঙায়, এ বিল থেকে সে বিলে। বিলে-বাতানে এখন চাষাবাদের কাজ চলছে। মঙলুর মোষ কখনো লাঙল টানছে, কখনো মই টানছে।
মোষকে মঙলু ‘মোষ’ বলে না, বলে ‘কাডা’। আর মঙলুকেও লোকে ‘মঙলু’ বলে না, বলে ‘কাডা হপন’।
কাডা হপন! তার মানে মোষের ছানা।
কুসুমগাঁয়ের লায়া কুলাই টুডুর পাকুড়তলার জমিনে ধান রোয়া চলছে। লায়ার সাথে সাথে মঙলুও খাটছে। মোষের পিঠে করে ওই ধানচারা বয়ে দিচ্ছে, কোদাল দিয়ে আলের ধারের এই মাটি কোপাচ্ছে, আল কেটে অন্য জমিন থেকে এই জল আনছে।
এত যে খাটছে-খুটছে মঙলু তার একটাই কারণ লায়া তাকে ভরসা দিয়েছে— এ বছর পাহাড় পূজায় কানাইসর পাহাড়ে তাকে নিয়ে যাবেই যাবে। এই তো ক-দিন বাদে এক শনিবারে কানাইসর পাহাড়ে ‘বুরু পূজা’-র শুরু। ‘বুরু’ মানে পাহাড়ের চূড়া।
গত বছর বৈশাখে মঙলু গিয়েছিল অযোধ্যা পাহাড়ে ‘দিশম সেঁদরা’-য় বা ‘দেশ শিকার’ পরবে। এখনও কানে লেগে আছে তার ‘টিলিং ডু-বু-ল্ ডু-বু-ল্’, ‘টিলিং ডু-বু-ল্ ডু-বু-ল্’ ‘টিলিং ডু-বু-ল্ ডু-বু-ল্’, সেই নাগরার তাল।
কানাইসর পাহাড় চাকুলিয়া-বেলপাহাড়ির ওদিকটায়। বাসে করেই সেখানে যেতে হয়। মঙলু ভাবে কানাইসর পাহাড় কি অযোধ্যা পাহাড়ের থেকেও বড়ো? বড়ো হোক, ছোটো হোক, মন যখন টেনেছে মঙলু যাবেই। কিন্তু সেবারেও ‘দিশম সেঁদরা’য় মোষটাকে নিয়ে যেতে পারেনি মঙলু, এ বারেও বুরু পূজার মেলায় নিয়ে যেতে মানা করে দিয়েছে লায়া।
মোষটার গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে মঙলু বলেছে, ‘বেশ বেশ, এবারেও না হোক, আসছে বারে অন্য কোনও মেলায় তোকে নিয়ে যাবই যাব— তুই কিছু মনে করিস না, কাডা।’
মোষটাও শিং নেড়ে যেন বলছে, না না।
কামার-কুমোরদের ধান বোনা উৎসব ‘রোহিণ’ শেষ হলো। সাঁওতালদের ‘এরক্ থিম’ও শেষ। ঝাড়া হাত-পা লায়া বলল, ‘এবার তবে চ মঙলু!’
মঙলু তো এক পা বাড়িয়ে রেখেছিল, এবার লাঠি-ছাতা, পটম্ বা পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে চলতে শুরু করল। শুধু কি কুসুম গাঁ, এ-গাঁ ও-গাঁ থেকে আরও কিছু লোক জুটল। তারাও যাবে কানাইসর পাহাড়ে ‘পাহাড় পূজা’ দেখতে।
দলনেতা সেই কুসুমগাঁয়ের লায়া কুলাই টুডু। পায়ে ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া টায়ারের চটি। কাঁধে তেলতেলে বাঁশের লাঠি। লাঠির ডগায় বাঁধা একটা বড়োসড়ো পুঁটলি। আগে আগে লায়া, পিছনে গোটা দলটা।
তারা একটা শাল-মহুল আটারি-চুরচু ধ-আসনের বন পেরিয়ে পিচ সড়কে উঠে পড়ল। তারপর তো বাস। দলবলের সাথে একেবারে বাসের মাথায় চড়ে বসল মঙলু।
বাসের মাথায় চড়ে প্রথম প্রথম ভয় করছিল মঙলুর। তারপর তো হু হু হাওয়া, এগাছ সে গাছের ডাল, ধরতে চাইলে আকাশটাও ধরে ফেলা যায়।
এতক্ষণে মঙলু তার তিরিয়ো বা আড়বাঁশিটায় ফুঁ দিলো। গান বেজে উঠল—
‘জজ-ঝা জইনা ঝামকা ঝৌকুর
নুলে-দ জইনা থোপা থোপা—’
অর্থাৎ,
তেঁতুল ঝুলছে ঝামকা ঝুকুর
আম ফলেছে থোকা থোকা—
বাস কুঠিমাটের ব্রিজ পার হলো, পেরিয়ে গেল ফেঁকোঘাটের পুল। ফের একটা শাল-পিয়াশাল আঁটারি-কুড়চির বন পেরিয়ে বাস এসে থামল ঝাড়গ্রাম শহরে।
শুধু কি একটা বাস, কত যে বাসগাড়ি, মোটরগাড়ি, সাইকেল মোটর সাইকেল, দুয়েকটা গরুর গাড়ি, মোষের গাড়ি কী আর নেই!
আছে, আছে।
আর কত যে লোক, শুধু কি কুসুমগাঁয়ের, শুধু কি কুসুমগাঁয়ের আশেপাশের গাঁয়ের, কত দূর দূর গাঁ থেকে শহর থেকে কলকাতা-হাওড়া থেকে যে লোক এসেছে!
‘হেঁ লায়া, এত লোক, যাবে কানাইসর পাহাড়ে ‘পাহাড় পূজা’ আর তার মেলা দেখতে?’ মঙলু জিজ্ঞাসা করল।
‘হঁ হঁ যাবে বই-কী! তবে সবাই কি আর যাবে? এখান থেকে কেউ যাবে টাটানগরে, কেউ যাবে খড়গপুর-মেদিনীপুরে, কেউ আবার থেকে যাবে ‘ঝাড়েক গেরাম’।’ লায়া বলল।
‘ঝাড়েক গেরাম’। তার মানে ঝাড়গ্রাম। ঝাড়গ্রাম থেকে বেলপাহাড়ি চল্লিশ কিলোমিটার। বেলপাহাড়ি আর চাকুলিয়ার মাঝখানেই কানাইসর পাহাড়। ঝাড়গ্রাম-ঝিলিমিলি বাসেই উঠে পড়ল লায়া আর মঙলুরা।
বাসের ভিতর মুড়ি-পকৌড়া খেতে খেতে মঙলু চলেছে বেলপাহাড়ি। খাচ্ছে আর মনে মনে বলছে, ‘চলুক গাড়ি বেলপাহাড়ি’ ‘চলুক গাড়ি বেলপাহাড়ি’—
এতদিন কাম্হার-কুম্হার-মাহাতো ছেলেদের সাথে খেলতে গিয়ে মিছামিছিই বলেছে ‘চলুক গাড়ি বেলপাহাড়ি’, এবার তো সত্যি সত্যিই তাদের গাড়ি চলেছে বেলপাহাড়ি। বেলপাহাড়ি ভুলাবেদা বাঁশপাহাড়ি হয়ে বাঁকুড়ার ঝিলিমিলি।
ওই তো দহিজুড়ি, দহিজুড়ির দু-দুটো রাইসমিল, রাইসমিলের বয়লার থেকে ধোঁয়া উড়ছে। দহিজুড়ি-বিনপুর পেরিয়ে শিলদা। শিলদা ছাড়িয়ে ঘুরপাহাড়ি, আর তারপরেই তো বেলপাহাড়ি।
বেলপাহাড়ি, বেলবাহাড়ি।
বাসের কন্ডাক্টর হাঁকছে ঘন ঘন, ‘বেলপাহাড়ি, বেলপাহাড়ি’। এরপরে বাস যাবে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘেঁষে। ভুলাবেদা তালাজুড়ি শিয়াড়বেদা বাঁশপাহাড়ি হয়ে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার ওদিকে।
বেলপাহাড়িতে মঙলু নেমে পড়েই দেখল— একটা মোষ, অবিকল তার মোষটার মতোই দেখতে, মস্ মস্ করে একটা কলাপাতা চিবোচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে তার গলায় হাত বুলিয়ে দিলো মঙলু। চোখ বুজে পাতা চিবোতে চিবোতে অচেনা মোষটাও শিং নেড়ে যেন বলল, ‘মঙলু, তুই এখানে?’
লায়া কুলাই টুডু মঙলুকে টেনে আনল, ‘এখন ইধার-উধার যাস না মঙলু, বিদেশবিভুঁই কুথায় হারিয়ে যাবি— হাতটা ধরে থাক।’
এখনও ছ-কিলোমিটার। লায়ার হাত ধরে ট্রেকারে উঠল মঙলু। লোকে লোকারণ্য। একদল যাচ্ছে এদিক থেকে তো আরেক দল আসছে ওদিক থেকে। পায়ে হেঁটে, গরুর গাড়ি মোষের গাড়ি করে। মাদল বাজছে, ধামসা বাজছে। থেকে থেকে কুল্কুলি উঠছে আর গান—‘গাডা নাড়ে নাড়েতে’—।
ট্রেকারের ভিতর থেকেই মঙলু দেখতে পাচ্ছে— সারি সারি ছোটো-বড়ো পাহাড়। পাহাড় আর পাহাড়, যেন ছোটোভাই বড়োভাই।
আর কত বড়ো বড়ো গাছ, কতরকম পাহাড়ি ফুল। কত মনোরম পাহাড়চূড়া। তার উপর আষাঢ় মাস, মেঘ ঝুলে আছে পাহাড়ের মাথায়। মেঘে-পাহাড়ে এখন একাকার।
লায়া কুলাই টুডু হাত তুলে দেখলো—‘ওই সবচেয়ে উঁচাটাই কানাইসর। দ্যাখ, দেখে জনম সাত্থক কর রে কাডা-হপন মঙলু!’
মঙলু ট্রেকার থেকে নেমে আগেই ‘গড়’ করেছিল পাহাড় বুরুকে। লায়ার কথায় ফের একবার গড় করল কানাইসর পাহাড় চূড়াকে। চূড়ায় এখন ‘নেত্’ বাঁধা হয়েছে কত রঙের! লাল-নীল কাপড়ের।
কানাইসর পাহাড়ের আশেপাশে আরও কতরকম উঁচু-নিচু পাহাড়। কেউ বলছে—‘ওইটা লাথাউনি’, কেউ বলছে—‘ওই যে দেখতে কালো, ওইটা কালাপাহাড়, কেউ বলছে ‘ছোটো ছোটো ডুংরি, ওইটা ডুংরি পাহাড়।’ কেউ বলছে—‘ওই যে কানাইসরের থেকে একটু কম উঁচু, ওইটা ‘ঠাকরান’।’ তার মানে ঠাকুরানি।
গুণে গুণে ‘গড় জোহার’ করল লায়া কুলাই টুডু। তার দেখাদেখি মঙলুও। তারপর ‘ঠাকুর-দেখা’ দলের লোকেদের ভিড়ে মিশে গেল।
‘ঠাকুর-দেখা’ লোকের ভিড় চলেছে স্রোতের মতো। কচিকাঁচা থেকে বুড়োবুড়ি কে নেই! তবে প্রায় বেশিরভাগই আদিবাসী, মঙলুদের মতো ‘সান্তাল ভুঁইয়া ভূমিজ মাহালি মুণ্ডা হো আর উথলু বিরহড়রা।
কাম্হার-কুম্হার-মাহাতোরাও আছে। ‘দিকু’ দোকানিরাও আছে—এই তো বাঁকুড়া থেকে এসেছে সনাতন সাঁপুই। পাথরের শিলনোড়া, থালা, পাথরে পানবাটা, বাটি, গিলসা বেচছে।
খুব বিক্রি হচ্ছে ময়ূরের পালক লাগানো তালপাতার পাখা। ওই তো শিমুলপাল থেকে এসেছে কার্তিক সাউ। পাথরের ধূপদানি আর পাথরের শিব বেচছে সে। হোটেল খাবারের দোকান কি আর নেই?
আছে, আছে।
বিক্রি হচ্ছে ঘুগনি, চপ-পকৌড়া, ঝুরিভাজা, চিপ্স্, চানামটর, রাঙা নাড়ু, শোনপাপড়ি, চাউ।
খাবারের দিকে নজর নেই মঙলুর। কানাইসর পাহাড়পূজার মেলা থেকে সে কিনবে একটা কেঁদ্রি আর পাখি ধরার ফাঁস বানাবার ঘোড়ার ল্যাজের চুল। আগে তো ‘ঠাকুর দেখা’ বা ঠাকুর দর্শন হোক।
কত যে লোক চলেছে ‘মানসিক’ দিতে। কেউ দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে নিখুঁত পাঁঠা। কেউ-বা ভেড়া আর কেউ ‘সাঁডি’, ‘সিম্মপন’। মোরগ আর মুরগির ছানা। কেউ-বা হাঁস। কেউ কেউ নিয়ে চলেছে পায়রা। কেউ বলি দেবে, কেউ-বা উড়িয়ে দেবে।
একটা বাতাস দেওয়া বেলুনওয়ালা, লাল-নীল নানা রঙের ‘ফিরফিরিওয়ালা পথের ধারেই দাঁড়িয়ে ফেরি করছিল। বাতাস দেওয়া হনুমানের ল্যাজের সাথে ঘষা লেগে গেল মঙলুর। আর তাতেই রাবারের হনুমান কিরকম গর্জে উঠল, গ-র্-র-র-র!
মঙলুকে হুঁশিয়ার করে দিলো লায়া, ‘সাবোধানে দেখেশুনে উঠিস রে মঙলু, এ তোর কুসুমগেরামের ‘পাথর হুড়ি’ না।’
‘পাথর হুড়ি’। তার মানে সামান্য উঁচু চড়াই বা ঢিবি।
কানাইসর পাহাড়ের সাতশো ফুট উঁচুতে এখনও একটা কুঁয়া আছে। তাতে কাকচক্ষুর মতো জল টলটল করে। কত আর গভীর— এই বড়োজোর দু-তিন হাত। তলায় শ্যাওলা দেখা যায় আর ছোটো ছোটো মাছ দলবেঁধে খেলে বেড়ায়।
তাতে সারা বছর ছায়া পড়ে গাছের আকাশের মেঘের চাঁদের তারাদের। জল কখনও শুকোয় না। এত যে ঠাকুর-দেখা মানুষ এত যে বেপারিয়া, এত যে নাচিয়ে-গাইয়ে লোকেরা বালতিতে-ঘটিতে জল তুলে আঁজলা ভরে পেট পুরে খেয়ে যায়, তবু তো জল কখনও শুকোয় না।
জল থাকে অঝোর ঝর অঝোর ঝর।
ঠাকুর-দেখা সবলোকই তাড়াহুড়ো করছে। কখন সাতশো ফুট উঁচুতে উঠে সেই জলে হাত-মুখ ধুয়ে সেই জল পান করে সেই জলে পূজা দিয়ে পেটের যাবতীয় অসুখবিসুখ সারিয়ে ফেলবে।
কুসুমগাঁয়ের লায়া, মঙলু আর তাদের গোটা দলটাই এতক্ষণে কূপটার কাছাকাছি এসে গেছে। কাছেই একটা পোড়ো মন্দির, আগে আগে ওই মন্দিরেই কানাইসরের পূজা হতো। এখনও নাকি একটা গুহা আছে ওখানে। গুহার মুখ পাথরের দরজা দিয়ে আটকানো।
এখন কেউ খুলতেও সাহস পায় না দরজাটা।
মঙলু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল— কত সব বড়ো বড়ো গাছ! সেই শাল-পিয়াশাল ধ-আসন করম-কইম বহেড়া-কুসুম-কচড়া! কত সব ফুল-কুড়চি-আঁটারি-কদম-গুন্জ! কতরকম পাখি—টিয়া-হরিয়াল-কাক-কুইরি! দু-দশটা ময়ূরও আছে—ওই তো ডাকছে!
একটু দূরে পাহাড়ের চূড়া কিছুটা সমতল। প্রায় সাত-আট বিঘার মতো ডাঙা-ডুঙোড়। একটাও গাছপালা নেই।
মঙলু ভাবছে—কারা থাকে ওখানে? হাতিরা? নাকি দু-দুটো হাতি তো সারা বছরই কানাইসর পাহাড়ের আশেপাশেই থাকে। ফসল পাকার সময় জুটে যায় আরও কুড়ি-তিরিশটা, কী তারও বেশি। ষাট-সত্তরটা।
মঙলুরা জল খেলো পেট পুরে। কিছুটা জল লোটায় ভরল। ভগবান ‘বুরু’-র জল বলে কথা! মা যদুমণির জন্যই নিয়ে যাবে মঙলু।
জল খেয়ে বহেড়া গাছের তলায় বসে মঙলুরা ‘পাহাড় পূজা’ দেখতে আসা আর ‘হড়’-দের মুখ থেকেই শুনল, কেন আর এখন এখানে পূজা হয় না, পূজা হয় পাহাড়ের নীচে, ‘দেবুরি’র থানে।
আগে আগে হতো। সূর্য ডোবার আগে, আকাশে তারা ফোটার আগেই পূজা সেরে নীচে নেমে আসত ‘লায়া’। তার আগে থলিতে ভরে নামিয়ে দিত বলির ধড় ছাড়া পশুপাখির মাথাগুলো। জায়গাটা হয়ে থাকত লালে লাল। পূজারিরও পায়ে চটচটে লোহু। একটাও মানুষজন নামতে আর বাকি থাকত না। এমন কী সাথে আসা কুকুরটাও।
একবার কী হলো, ঠিক সময়ে পূজা সেরেও বলির খড়্যাটা নিয়ে আসতে ভুলে গেল লায়া। তখন সূর্য ডুবে গেছে। আকাশেও তারা ফুটেছে। খড়্গ আনতে পূজার জায়গায় ফিরে গিয়ে লায়া দেখল—ততক্ষণে দ্যাব্তা দু-দুটো বিশাল বাঘ মেরে খেতে বসেছেন। লায়াকে দেখেই দ্যাব্তা রাগে খড়্গটা ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘আর আসিস না। এবার থেকে পূজা করিস পাহাড়ের নীচে।’
সেই থেকে পূজা হচ্ছে নীচে। ‘দেহুরি’র থানে।
শুনে-টুনে মঙলু ভয়ে ভয়ে চারধার দেখল। হাতি যখন আছে, বাঘ কি আর নেই? আছে, আছে। তবে তারা ফোটা তো দূরের কথা, আকাশে সূর্য এখনও গনগন করছে।
পূজা শেষ হতে এখনও ঢের দেরি। পূজা শেষ হবে, তারপরেও শিকার আছে। ‘দিশম্ সেঁদ্রা’। তবু লায়ার হাত ধরে টান দিলো মঙলু, ‘লায়া, জলদি চ।’
‘কেনে রে মঙলু, তোর ডর লাগে?’
‘নাই ডর কেনে, দ্যাব্তাদের কথা। আমাদের মারাং বুরু, মঁড়েকো তুরুইকো, জাহের এরা, গোঁসাই এরা, বিরবোঙা, বামুৎ বোঙা, জমলিম বোঙা নিয়েও তো কত কথা আছে। আছে নাই?’
কানাইসর পাহাড় পূজার পূজারিরা জাতিতে ‘মাল’। যে পূজারির সাথে কানাইসর বুরুর ওইরকম কথা হয়েছিল— সে এখন আর বেঁচে নেই, তবে তার বংশধরেরা আছে। তারাই এখনও পূজা করে কানাইসরে।
কুসুমগাঁয়ের লায়া কুলাই টুডু মঙলুর হাত ধরে নেমে এলো নীচে। একদম নীচে ‘দেহুরি’র থানে। ‘দেহুরি’ মানেও পুরোহিত। ‘দেহুরির থান’। তার মানে পুরোহিতের জায়গা।
২
মেলা জমে উঠেছে। হাঁড়িয়া, মহুলের ‘বাসে’ আর সাঁওতালি নাচে জায়গাটা ম ম করছে। গম গম করছে। লাঁগড়ে, দং, ঝিকা আর দুংগেড়, এমনকী পাতা-নাচও আছে।
‘হেতাং দাঃ দিং হেতাং দাঃ—হেতাং হেতাং দাঃ’
হাঁড়িয়া খেতে মন চুক চুক করছে। জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট চাটছে লায়া বারবার—দেখে বেশ বুঝতে পারছে মঙলু। তবু, নেশা করতে হয় পূজা দেওয়ার পরে। এখন কী?
‘দেহুরির থানে’ পূজা হয়ে গেল। সেই ধূপ-ধুনা আর মেথির সুবাস, তেল-সিঁদুর। কাঁচা শালপাতা, কাঁচা দুধ আর চটকানো পাকা কলা। সিঁদুর মাখা হরিতকি-আমলকী।
ফের পাহাড়ে ওঠা। এবার পুব দিকে। সামান্য উঠতেই গড়ানো মতো চওড়া জায়গা তৈরি করা হয়েছে পাথর কেটে। দৈর্ঘ্যে প্রায় একশো কুড়ি-পঁচিশ ফুট। চওড়ায় ষাট-সত্তর ফুট। পূজা দিতে আসা লোকের ভিড় এত বেশি যে একসাথে সেখানে যাওয়া যায় না, এত লোক সেখানে ধরেও না।
তাই দলে দলে যাওয়া। ছোটো ছোটো দলে। একদলের হয়ে গেলে আরেক দল। শুধু কি যাচ্ছে মানুষ—বুড়ো বুড়ি নারী পুরুষ কচিকাঁচারা? তাদের সাথে সাথে চলেছে ‘মানসিক’ করা ছাগল-ভেড়া, হাঁস-মুরগি, মুরগির বাচ্চা, যাকে বলে ‘চিঁয়া’, গোলা পায়রা আর মাটির হাতি-ঘোড়া।
দড়ি বেঁধে টানতে টানতে, কেউ-বা ঘাড়ে-মাথায় করে, কেউ-বা চ্যাংদোলা করে সে সব এখন নিয়ে চলেছে। ধামসা-মাদলের আওয়াজ, হাজার হাজার মানুষের কলরব, গান, মাইকের ঝংকারে ‘বলি’ হতে যাওয়া সামান্য পশুপাখিদের ডাক চাপা পড়ে গেছে প্রায়। তবু কান খাড়া করে রাখল মঙলু। কই, খালি তো ঘুরে ফিরে তার মোষটারই ডাক সে শুনতে পাচ্ছে—
‘অঁ-অঁ-অঁ! অঁয়-অঁয়-অঁয়’
যার ‘মান্সিক’ আছে সে তো একা আসেনি, তার সাথে এসেছে তার গোটা পরিবারটাই। লায়া আর মঙলুর কোনও ‘মান্সিক’ ছিল না। তারা এসেছে শুধুই পাহাড় পূজার মেলা দেখতে। তবু সাথে করে নিয়ে এসেছে কুসুমগাঁয়ের কুম্হারের কুমহার রাজা কুম্হারের হাতে গড়া মাটির হাতি-ঘোড়া। ‘মানসিক’ হিসাবে পাহাড় দ্যাব্তার কাছে তাই নিবেদন করল তারা।
এতক্ষণে ছাগল-ভেড়ার ডাক শুনতে পেলো মঙলু। ‘অর্গলা’য় একেকটা ‘বলি’র ঘাড়-মাথা ঢুকিয়ে অর্গলার ‘কুলুপখাড়ি’ এঁটে দিচ্ছে বলিদার। আঁটতে আঁটতে ওইটুকু যা সময় পশুটার চেঁচিয়ে ওঠার! তারপরেই তো খড়্গাঘাত, ধড়-মাথা আলাদা। ধড়টা পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে! নীচে দাঁড়িয়ে যার ‘মান্সিক’ তার লোকজন ধড়টাকে লুফে নিচ্ছে।
এত রক্ত যে হাঁটতে-চলতে পায়ের তলা চটচট করছে। মঙলু ঘাড় ঘুরিয়ে পাহাড় চাতালের আরেক দিকটায় দেখল— খাঁচার পাখি ডানা ঝাপটিয়ে কেমন মজায় উড়ে যাচ্ছে। খাঁচার মালিক পূজা দিয়ে সিঁদুর মাখা ‘মান্সিক’ উড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝটফট করে পায়রাগুলো আশমানে উড়ে যাচ্ছে। একটা-আধটা কি? শয়ে শয়ে। যতসব গোলা পায়রা। এতক্ষণ খাঁচায় ছিল। ছাড়া পেয়ে কানাইসর পাহাড়ের মাথার উপর ঘুরে ঘুরে উড়ছে, পাক খাচ্ছে।
পাখি দেখে সেদিকেই দৌড়োলো মঙলু। পিছনে পিছনে দৌড়োচ্ছে লায়া কুলাই টুডু। ‘অ্যাই মঙলু! কাডা হপন তো কাডা হপন। ই কি তোর পাড়িয়ার বিল আর করণতলার বিল পেয়েছিল যে চোখ বুজে দৌড়োলেও কুত্থাও হোঁচট খাবি নাই। থাম! ই তো পাহাড়, পা ফসকালেই খাদে পড়ে যাবি মঙলু। আর উঠতে পারবি নাই!’
পায়ারগুলো এত উপরে থাকতে পারবে না, নেমে আসবে। ডাঙা-ডুঙোবড়ো খেতে-খামারে দানা খুঁটে খাওয়া পাখি। গাছের ডালে তো নয়, গৃহস্থের কড়িকাঠে-কার্নিশে বাসা-বাঁধা পাখি।
হাতে ধরে মঙলুকে টেনে আনল লায়া।
‘আয় এখন তো আসল পূজা।’
৩
চাতোলের উপর আরেকটি চাতাল। উপরের চাতালে একটা ফুটো। পাহাড়ে আসা মানুষগুলোর ভিড় এখন সেখানেই। মন্তর-টন্তর তো কিছু নাই, ‘কানাইসর বুরু, তবে এলাম কানাই’ অর্থাৎ ‘কানাইসর ভগবান তবে আমাদের পূজা লও’ বলে আমলকী আর ফুল চাতালের ফুটোয় ফেলা।
তারপর তো তলায় হাত পেতে বসে থাকা।
মঙলুই প্রথম। আমলকী আর ফুল নিয়ে চাতালের ফুটোয় দিলো ছুড়ে। ছোড়ামাত্রই ফুল আর আমলকী তলায় পাতা মঙলুর হাতে এসে পড়ল টুপ করে।
কানাইসর পাহাড়ের লায়া বলল, ‘যা বেটা, যা চাইছিস খুব তাড়াতাড়ি পাবি।’
কে জানে কী চেয়েছিল মঙলু। এবার কুসুমগাঁয়ের লায়ার পালা। ফুল-আমলকী ছুড়ে মারল। হাতও পাতল ফুটোর তলায়। কই কিছু তো পড়ছে না!
পুরোহিত বলল, ‘পড়ল না যখন তখন জানবি দ্যাব্তা তোর ফুল-আমলকী নেয়নি। যা চাইছিস পাবি না।’
‘পাবো না?’ বিড় বিড় করে বলতে বলতে লায়া কুলাই টুডু মঙলুর হাত ধরে সুঁড়িপথ বেয়ে নীচে নামল। ‘যাক গে, ই বছর হলো নাই। নাই হলো, আসছে বছর আবার আসব!’
মেলাটাঁড়ে নেমে রাগে-দুঃখে লায়া ছাগলের ‘আঁতি ভাজা’ বা ‘নাড়ি-ভুঁড়ি ভাজা’র চাট দিয়ে হাঁড়িয়া খেল। খোঁজ করেছিল মরা হাতির চর্বি ভাজার। নচেৎ ‘বরা’র মাংস। পায়নি। তার বদলে ‘আঁতি ভাজা’।
পাহাড় দ্যাব্তার কাছে লোকে কত কী মানত করে। খেতে বেশি বেশি করে ধান দে পাহাড় দ্যাব্তা! জলে মাছ দে! বনে বনে শিকার দে— বরা খেড়িয়া ঝিঁকর গোই গোধি! গাছে গাছে ফল দে—ভেলা বাদভেলা কেঁদু ভুড়রু বেল কোৎবেল কুসুম ফুল বৈঁচি আম জাম।
আর, রোগবালাই রাখিস না। খোঁড়াকে সোজা কর। কানাকে চোখ দে। পেট-বুকের সব ব্যারাম ভালো করে দে।
কে জানে, লায়া আর মঙলু মনে মনে কী চেয়েছিল কানাইসর পাহাড়ের কাছে!
কেউ কেউ চাইতে আসে, কেউ কেউ চাওয়া-পাওয়ার পরে দিতে আসে। কেউ কেউ আসে মেলা দেখতে ‘টুকচার’ আমোদ করতে। কেউ আসে দু-পয়সা কামাতে— এই যেমন ‘ঢেণ্ডিপালী’রা, এই যেমন দোকানিরা। কেউ আগে দরাদরি করে কম দামে সওদা করতে।
কেঁদ্রি কিনল মঙলু মাত্র তিরিশ টাকায়। এত কম দামে! অবিকল বেহালার মতো দেখতে। তারের। বাজাতেও হয় ধনুকের ছড় দিয়ে। কিনেই সে বাজাতে লাগল—
‘র্যাঁ-এঃ-চ! র্যাঁ-এঃ-চ!! র্যাঁ-এঃ-চ!!’
লায়ার বিশেষ কেনাকাটা নেই। তবু লায়া বুড়ির জন্য একটা সাঁওতালি শাড়ি কিনল। মাদার টেরিজার শাড়ির পাড়ের মতো পাড়। মঙলু কিনল তার মায়ের জন্য পাথরের জামবাটি একটা।
তারপর তারা মিশে গেল একটা নাচের দলে। ‘দিশম্ সেঁদরা’য় তারা আর গেল না। শুধু কি মঙলু আর লায়া, কুসুমগাঁয়ের আশেপাশের গাঁ থেকে যারা যারা এসেছিল তারাও জুটে গেল দলটায়।
দলটা বেশ বড়ো হলো। ধীরে ধীরে গোলাকারে বাড়তে লাগল। ‘হেতাং হেতাং দাঁ দাতাং দাতিং। হেতাং দি হেতাং হেতাং দাঁ।’ কখনও কেঁদরি কখনও তিরিয়ো বা আড়বাঁশি।
গোটা আসরটাকেই মাতিয়ে দিলো মঙলু।
কানাইসর পাহাড়ের পিছনে সূর্য ডুবে গেল। বিজ বিজ করে আকাশে অজস্র তারা ফুটল। কানাইসর পাহাড়ের গা বেয়ে হুড়মুড়িয়ে ‘ঠাকুর দেখা’ লোকজন নেমে এলো।
আর নয়, আর নয়। আসছে বছর আবার হবে। নাচের দলটা নাচতে নাচতে বড়ো হতে হতে বরাবর নারানপুর গাঁ অবধি যাবে। আজ রাতটা ওখানেই কাটাবে মঙলুরা। কালকের বাস ধরে শিলদা-দহিজুড়ি হয়ে ঝাড়গাঁ যাবে।
দলটার পুরোভাগে লায়া কুলাই টুডু তার কাঁধের গামছা ডান হাতে ধরে নাড়াতে নাড়াতে ‘তা-না-না-না’ ‘তা-না-না-না’ করে বেদম নাচছে। নেচেই চলেছে।
সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৮ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত