| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সমকালীন সমাজপ্রেক্ষিতে বঙ্কিমচন্দ্র

Reporter Default
রিপোর্টার / ১২৫৮ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২০

পার্থপ্রতিম চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (২৬ জুন ১৮৩৮—৮ এপ্রিল ১৮৯৪) ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক। শুধুমাত্র সাহিত্যসাধনা কিংবা বাংলা ভাষার উন্নতিবিধানই নয়, ‘বঙ্গদর্শন’-এর মতো যুগান্তকারী পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়ে বাঙালির সমগ্র চিন্তা-চেতনার আমূল পরিবর্তন-সাধনে প্রয়াসী হয়েছিলেন তিনি। তাঁর সিদ্ধান্তে কোথাও হয়তো অসম্পূর্ণতা বা স্ববিরোধ ছিল, কিন্তু সেই যুগপরিবেশে দাঁড়িয়ে যে প্রগতিশীল ও বাস্তবমুখী মানসিকতার পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন তাতে করে তাঁকে যুগন্ধর পুরুষরূপেই চিহ্নিত করতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্র সরাসরি কোনও সমাজসংস্কার আন্দোলনে যোগদান না করলেও সমকালীন সমাজ-অর্থনীতি এমনকী রাজনৈতিক প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহকেই ছুঁয়ে গেছে তাঁর লেখনী। তাঁর জ্ঞানগর্ভ ও মননঋদ্ধ রচনাসম্ভারের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই এ কথার প্রমাণ মিলবে। বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের মতো বিষয়গুলি নিয়ে তিনি যেমন নিজস্ব মতামত পোষণ করেছেন, তেমন কলম ধরেছেন বাংলার কৃষকদের জন্য। বঙ্কিমচন্দ্রই প্রথম স্পষ্টভাবে বললেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস নাই’, তিনি মনে-প্রাণে চেয়েছিলেন কোনও বাঙালির দ্বারা বাংলার প্রকৃত ইতিহাস রচিত হোক। তাঁর মতে, ‘সাহেবরা বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে ভুরি ভুরি গ্রন্থ লিখিয়াছেন।… আমাদিগের বিবেচনায় একখানি ইংরাজি গ্রন্থেও বাঙ্গালার প্রকৃত ইতিহাস নাই।’ বঙ্কিমচন্দ্রের আকাঙ্ক্ষা ছিল ইউরোপের মতো এদেশেও নবজাগরণ সঞ্চারিত হোক। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন—‘‘কাব্যের চেয়ে ইতিহাসেই তাঁহার বেশি শখ ছিল। ইউরোপের ইতিহাস তিনি খুব পড়িয়াছিলেন।… ‘রিনাইসেন্স’ (Renaissance) ইতিহাস তিনি খুব আয়ত্ত করিয়াছিলেন এবং সেই পথ ধরিয়া বাংলারও যাহাতে আবার নবজীবন সঞ্চার হয়, তাহার জন্য তিনি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিতেন।’’

বাঙালিকে কুসংস্কার মুক্ত হয়ে আধুনিক বিজ্ঞানচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলতে ‘বঙ্গদর্শন’-এর পাতায় বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করলেন বিজ্ঞানবিষয়ক আশ্চর্য সব নিবন্ধাবলী। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে এই নিবন্ধগুলিকে ‘বিজ্ঞানরহস্য’ নামে গ্রন্থভুক্ত করলেন। ভূমিকায় লিখলেন—‘‘লেখকের প্রধান উদ্দেশ্য এই যে আলোচিত বৈজ্ঞানিকতত্ত্বসকল সাধারণ বাঙ্গালী পাঠক, বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের উচ্চতর শ্রেণীর বালকেরা এবং আধুনিক শিক্ষিত বাঙ্গালী স্ত্রী বুঝিতে পারেন।’’ গ্রন্থটি পাঠ করলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়, পড়াশোনার জগৎ কতটা বিস্তৃত হলে, আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে কতটা পরিচিতি থাকলে এমন সব রচনা, বিজ্ঞানের এমন সব জটিল তত্ত্ব, এমন সহজ-সরল ভাষায় লেখা সম্ভব! বঙ্কিমচন্দ্র যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই দেশবাসীকে আধুনিক বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে পরিচিত করতে প্রয়াসী হয়েছেন। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার Indian Association for the Cultivation of Science নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এক আবেদনপত্র প্রচার করেন। এই আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিজ্ঞান সংস্থাটির জন্য দেশবাসীর কাছ থেকে অর্থসাহায্য চাওয়া হয়। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যায় ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের ‘ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞানসভা’-র অনুষ্ঠানপত্রের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের দীর্ঘ আট পৃষ্ঠার একটি মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন মহেন্দ্রলাল সরকারের উদ্যোগে দেশে বিজ্ঞান অনুশীলন বৃদ্ধি পাক।

সাধারণত ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে কমলমণিকে লেখা সূর্যমুখীর একটি পত্রের উদ্ধৃত বিধবাবিবাহের প্রসঙ্গকে সামনে রেখে বলা হয়ে থাকে, বঙ্কিমচন্দ্র নাকি বিধবাবিবাহের বিপক্ষে ছিলেন। সূর্যমুখী পত্রে লিখেছেন—‘‘আর একটি হাসির কথা। ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে না কি বড় পণ্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বই বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত, তবে মূর্খ কে?’’ কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র কি বাস্তবিক অর্থেই বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন, উপন্যাসের চরিত্রবিশেষের উক্তিকে কি লেখকের অভিমত বলে ধরে নেওয়া যায়? তা যদি হবে তাহলে পূর্ববর্তী ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে মনোরমার উদ্দেশে পশুপতি যখন বলে—‘‘আমি এক্ষণে রাজ্যভৃত্য, ইচ্ছামত কার্য্য করিতে পারি না। এখন বিধবাবিবাহ করিলে জনসমাজে পরিত্যক্ত হইব; কিন্তু যখন আমি স্বয়ং রাজা হইব, তখন কে আমায় ত্যাগ করিবে? যেমন বল্লাল সেন কৌলিন্যের নূতন পদ্ধতি প্রচলিত করিয়াছিলেন, আমি সেইরূপ বিধবা-পরিণয়ের নূতন পদ্ধতি প্রচলিত করিব।’’ তখন কোন অভিমতটিকে আমরা বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব মত বলে গ্রহণ করব? আমাদের বিবেচনায় কোনটিই বঙ্কিমচন্দ্রের অভিমত নয়, উপন্যাসের চরিত্র বিশেষের অভিমত। বঙ্কিমচন্দ্র প্লটের প্রয়োজনে চরিত্রের মুখে এ জাতীয় সংলাপ ব্যবহার করেছেন। বিদ্যাসাগর এবং বিধবাবিবাহ সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম মূল্যায়নটি আমরা পাচ্ছি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে Calcutta Review পত্রিকায় প্রকাশিত Bengali Literature শীর্ষক প্রবন্ধে। যেখানে বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে বলেছেন, হিন্দু বিধবাদের জন্য তাঁর উদ্যোগ, একজন পণ্ডিত ও অধ্যাপক হয়ে প্রথম এগিয়ে আসা, যথেষ্ট মহত্ত্ব ও সাহসের পরিচায়ক— “His exertions in the cause of Hindu widows, the noble courge with which he, a pundit and a professor first advocated their cause.” ‘ধর্ম্ম ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন—‘‘আট বৎসরের কুমারী কন্যা বিধবা হইয়াছে, যে ব্রহ্মচর্যের সে কিছু জানে না, যাহা ষাট বৎসরের বুড়ারও দূরাচরণীয়, সেই ব্রহ্মচর্যের পীড়নে পীড়িত করিয়া তাহাকে কাঁদাইতে হইবে, আপনি কাঁদিতে হইবে, পরিবারবর্গকে কাঁদাইতে হইবে, নহিলে ধর্ম্ম থাকে না।’’ আর ‘সাম্য’-এ সাম্যনীতির বশবর্তী হয়ে বললেন— ‘‘যদি পুরুষ পত্নী বিয়োগের পর পুনর্ব্বার দারপরিগ্রহের অধিকারী হয়, তবে সাম্যনীতির ফলে স্ত্রী পতিবিয়োগের পর অবশ্য, ইচ্ছা করিলে, পুনর্ব্বার পতিগ্রহণে অধিকারিণী।’’ এ জাতীয় মন্তব্যে কিন্তু বিধবাবিবাহের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রচ্ছন্ন সমর্থনই ধরা পড়ে। তবে পাশাপাশি এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা, এ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করেছে। ঠিক একইরকম দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয় বহুবিবাহের প্রচলন প্রসঙ্গেও। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় বিদ্যাসাগরের ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার’ গ্রন্থটি। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ১২৮০-র আষাঢ় সংখ্যায় উক্ত গ্রন্থের সমালোচনা করেন। সমালোচনাটি যে অত্যন্ত কঠোর ছিল এ কথা বলাইবাহুল্য। এমনকী বিদ্যাসাগরের জীবিতকালে বঙ্কিমচন্দ্র লেখাটির পুনর্মুদ্রণও করেননি। তবে ওই প্রবন্ধেই কিন্তু তিনি এ কথাও বলেছেন— ‘‘বহুবিবাহ সমাজের অনিষ্টকারক, সকলের বর্জ্জনীয় এবং স্বাভাবিক নীতিবিরুদ্ধ।’’ তাহলে বিরোধটা ঠিক কোথায়? আসলে বিদ্যাসাগরের উদ্দেশ্য ছিল, শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে কিংবা আইন প্রচারের মাধ্যমে সমাজে বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ প্রথার নিবারণ। আর বঙ্কিমচন্দ্র মনে করেছেন লোকাচার শাস্ত্রের নিষেধে নিবারিত হয় না; এবং যে কুব্যবস্থা প্রজার হিতার্থ সমাজ থেকে দূরীভূত হওয়া উচিত তা আইনের দ্বারা নিবারণের সময় ধর্মশাস্ত্রের দোহাই দেবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নেই।

লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার কৃষকদের যে দুরবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছিল তারই প্রেক্ষিতে বঙ্কিমচন্দ্র লেখেনে ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ শীর্ষক প্রবন্ধটি; যেখানে তিনি বলেছেন— ‘‘প্রজারাই চিরকালের ভূস্বামী; জমীদারেরা কস্মিন্‌ কালে কেহ নহেন—কেবল সরকারী তহশীলদার। কর্ণওয়ালিস্‌ যথার্থ ভূস্বামীর নিকট হইতে ভূমি কাড়িয়া লইয়া তহশীলদারকে দিলেন।… ইংরাজ-রাজ্যে বঙ্গদেশের কৃষকদিগের এ প্রথম কপাল ভাঙ্গিল। এই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বঙ্গদেশের চিরস্থায়ী অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মাত্র—ইংরাজদিগের এ কলঙ্ক চিরস্থায়ী; কেন না এ বন্দোবস্ত ‘চিরস্থায়ী’।’’ ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাধারণভাবে ইংরেজি শিক্ষিত শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে সমর্থন করেছেন। প্রথমার্ধে রামমোহন কিংবা দ্বিতীয়ার্ধে রমেশচন্দ্র দত্তের মতো মনীষী রায়তের দুরবস্থা সম্পর্কে সচেতন থেকেও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মুগ্ধ গুণগ্রাহী ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাতেই আমরা প্রথম পেলাম ‘প্রজাওয়ারি বন্দোবস্তে’-র কথা। মানবতাবাদে বিশ্বাসী বঙ্কিমচন্দ্র প্রশ্ন তুলেছেন— ‘‘আমাদের দেশের বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে, এতকাল আমাদিগের দেশ উৎসন্ন যাইতেছিল, এক্ষণে ইংরাজের শাসনকৌশলে আমরা সভ্য হইতেছি। আমাদের দেশের মঙ্গল হইতেছে।… কাহার এত মঙ্গল?… হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্তের কি উপকার হইয়াছে? আমি বলি অনুমাত্র না, কণামাত্রও না। দেশের মঙ্গল কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয় জন? আর এই কৃষিজীবী কয় জন? তাহাদের ত্যাগ করিলে দেশে কয়জন থাকে? হিসাব করিলে তাহারাই দেশ—দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী। তোমা হইতে আমা হইতে কোন কার্য্য হইতে পারে? যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।’’ একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর অভিমতেও। ‘বঙ্গদর্শন’-এর ‘পত্রসূচনা’য় তিনি লিখেছেন— ‘‘এ কথা কৃতবিদ্য বাঙ্গালিরা কেন যে বুঝেন না, তাহা বলিতে পারি না। যে উক্তি ইংরাজিতে হয়, তাহা কয় জন বাঙ্গালীর হৃদয়ঙ্গম হয়? সেই উক্তি বাঙ্গালায় হইলে কে তাহা হৃদয়গত না করিতে পারে? যদি কেহ এমন মনে করেন যে, সুশিক্ষিতদিগের উক্তি কেবল সুশিক্ষিতদিগেরই বুঝা প্রয়োজন, সকলের জন্য সে সকল কথা নয়, তবে তাহারা বিশেষ ভ্রান্ত। সমগ্র বাঙ্গালীর উন্নতি না হইলে দেশের কোন মঙ্গল নাই।… যে কথা দেশের সকল লোকে বুঝে না, বা শুনে না, সে কথায় সামাজিক বিশেষ কোন উন্নতির সম্ভাবনা নাই।’’

জন্মের ১৮০ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, আজও বঙ্কিমচন্দ্রের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। সমকাল এবং উত্তরকালে দেশবাসীর কাছ থেকে তাঁকে যে আক্রমণ সহ্য করতে হয়েছে, তা কি আদৌ তাঁর প্রাপ্য ছিল! আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে কতটুকু পড়েছি, কতটুকু জেনেছি! সম্প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রকে হিন্দু ধর্মের প্রচারক সাজিয়ে যাঁরা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন, তাঁদের মনে কি একবারের জন্যও এ প্রশ্ন জাগেনি যে বঙ্কিমচন্দ্র কি আদৌ সেই হিন্দু ধর্মের কথা বলেছেন? ‘প্রচার’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (শ্রাবণ ১২৯১) ‘হিন্দুধর্ম্ম’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রকৃত হিন্দু ধর্ম কী, সে সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন— ‘‘মনুতে যাহা কিছু আছে,… এ সকলকে যদি ধর্ম্ম বলা যায়, তবে সে ধর্ম্ম শব্দের অপব্যবহার। যখন বলি, চোরের ধর্ম্ম লুকাচুরি, তখন যেমন ধর্ম্ম শব্দ অর্থান্তরে প্রযুক্ত হয়, এ সকল বিধিকে ‘রাজধর্ম্ম’ ইত্যাদি বলা, সেইরূপ।’’ অনেকেই বলে থাকেন, শেষজীবনে বঙ্কিমচন্দ্র ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আমরা তাঁদের সঙ্গে সহমত পোষণে সক্ষম নই। সমকালের প্রয়োজনে বঙ্কিমচন্দ্রকে যেমন বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষা, বাংলার ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞানালোচনায় কলম ধরতে হয়েছিল, তেমন সে যুগের ‘পতিত হিন্দুসমাজ ও বিকৃত হিন্দুধর্মের উপর’ অস্ত্রাঘাতের উদ্দেশ্যেই তাঁকে ধর্মতত্ত্ব আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে হয়েছিল।

সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২৩ জুন ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev