জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫১ নং কিস্তি
সত্যি এই মেয়ে দুটোকে নিয়ে পারা যাবে না। নির্ঘাৎ ছোটোমার কাছে বমি করছে।
নীরু ক-পিস।
গুনিনি।
বটা।
হাফকিলো।
দেবা।
সকাল থেকে এসে খেয়ে যাচ্ছি।
শুনলাম কালকে গণ্ডগোল করেছিস।
আমার থেকে নীরু বেশি। কচি ছেলে হয়েছিল।
হ্যাঁরে ঢ্যা….।
নীরু বিরাট একটা জিভ বার করলো।
শ্রীপর্ণা কোমড় চিমটে ধরেছে। নীরু উ উ করছে।
দিদি এবারের মতো ছেড়ে দাও। মিলি বলে উঠলো।
কিরে এবার কিছু বলতে পারছিস না। ওতো বানান করে দিতে পারতো। সন্দীপ চেঁচালো।
কিছুক্ষণ তরজা চললো, ওদের খাওয়ার শেষে আমরা খেতে বসলাম। আজ আমি বড়োমা, বৌদির মাঝখানে। ছোটোমা, তনু-মিত্রার মাঝখানে। টিনারা সবাই পরিবেশন করছে।
ইসি, পিকুকে দেখলাম, বরুণদা কোথায়?
সুবীর ও দুজনে কোথায় বেরোল।
আর একদিন করে খাওয়াস। বৌদি আমার দিকে তাকালো।
সুন্দর, অনন্য কাছে এসে বসলো। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম।
কিরে, নিবি?
না।
তাহলে!
রাতের মেনুটা আজ একটু বানিয়ে দাও। আমরা সব রেডি করে দেব।
ছোটোমা হেসে উঠলো।
বোন, দিদি দুজনে যুক্তি করে পাঠালো বুঝি?
এতক্ষণ দুজনে উবু হয়ে বসেছিল। এবার থেবড়ে বসে পরলো। দরজা দিয়ে অনিকা, অনিসা দুজনে ঢুকলো।
কিরে দাদা, আমি সবার আগে লাইন দিয়েছি। দু-জনে এসে বসে পরলো।
বেশি না আলুর পরটা, চিকেন ফ্রাই, আর তড়কা।
আমি হাসছি।
ভজু—
আমি কিছু বলিনি, বিশ্বাস করো—
দেখলি ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাইনি।
ওরা হাসছে।
পরোটা ভজুমামা বলেছে বানিয়ে দেবে। অনন্য বললো।
এক কাজ কর।
বলো।
ছগনলালাকে বল, ছাতুর লেট্টি বানিয়ে দেবে, তেঁতুলের চাটনি দিয়ে খেয়ে নিবি।
টকাস করে একটা আওয়াজ হলো। মুখ তুলে দেখলাম টিনা, মিলি মুখ টিপে হাসছে।
ওরা খায়নি আমরা খেয়েছি। টিফিনে ভালো লাগবে। রাতের খাবারটা বোচন ঠিক বলেছে। মিলি হাসতে হাসতে বললো।
এরপর আবার টিফিন!
সেই কোন রাতে খাব, খিদে পেয়ে যাবে না। টিনা আমার দিকে তাকিয়ে।
তোমাদের পেটকে নমস্কার। তোমরা কি ডাইজিন জাতীয় কিছু খাও নাকি? এত তারাতারি হজম হয়ে যায়।
ভালো খাবার তারাতারি হজম হয়ে যায়। মিলি বললো।
মিলিদের কথায় বড়োমারা হাসছে।
বোন—সুন্দর, অনিসার দিকে তাকালো।
কি—
চল ছগনদাদুকে গিয়ে ধরি।
বড়োমা আস্তে করে বললো, ওরা আনন্দ করে বলছে যখন করে দে না। একদিন তো।
আজকে সারাদিন রান্নাঘরে ঢোকোনি।
একদিন একটু রেস্ট নিলাম। তোকে যে অতোবার চা করে দিলাম।
ছোটোমা, মিত্রা, তনু ফুসুর ফুসুর গুজুর গুজুর করেই চলেছে।
যা, বাবা করে দেবে, এখন খেতে দে।
বড়োমার দিকে তাকালাম। হাসছে। দামিনীমাসিও তালে তাল দিচ্ছে।
কালকে মোচার ঘন্ট বানিয়ে খাওয়াবে।
খাওয়াবো। বড়োমা বললো।
হঠাৎ চেঁচামিচিতে বড়োমার ঘরের দিকে তাকালাম।
সুরো চেঁচাতে চেঁচাতে দুটোকে ঘর থেকে বার করে দিল। আঙ্কেল সোহাগী হয়েছো, মেরে পিঠের চামড়া তুলে দেব।
দুটোই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করছে।
টিনা থালা ছেড়ে উঠে গেল। মিলি হাসছে।
ওদের জন্য সুরোই ঠিক। আমাকে একবারে পাত্তা দেয় না। আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
এতো খাই খাই করলে পাত্তা দেবে কি করে।
তুমি ভাল ভাল রান্না করলে, খাই খাই করবো না কেন।
টিনা দুটোকে হাত ধরে কাছে টেনে আনলো।
আমি কাছে নিয়ে বসালাম। দই খাবি?
দু-জনের চোখ জলে ভেঁজা। ফোঁপাচ্ছে। মাথা দোলালো, খাবে।
সুরোকেও বলিহারি কতো ঘুমোবেরে। বড়োমা ঘ্যাঁক করে উঠলো।
ঘুমোসনি—আমি বললাম।
হিসি করে ফেলেছি। মাম্পি গলা জড়িয়ে ধরলো।
পাছুতে প্যান্ট আছে?
বাঁহাত দিয়ে দেখলাম খালি পাছু। টিনার দিকে তাকালাম।
একটা প্যান্ট নিয়ে এসো।
সবাই হাসছে।
সত্যবাদী যুধিষ্ঠির। বৌদি বললো।
খাওয়া শেষ হতে উঠলাম। দু-জনে টুক টুক করে বেশ দই রসোগোল্লা খেল।
আমি বেসিনে মুখ ধুয়ে, এই ঘরে এলাম। দেখলাম বাগানে কেউ নেই। তারমানে সব পেছনে গিয়ে বসেছে।
আমি বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম। বেশ ক্লান্তি লাগছে। আজকাল একটুতেই কেমন যেন ক্লান্ত হয়ে পরি। শরীরটা কেমন ছেড়ে দেয়। মিলি ঘরে ঢুকলো জলের গ্লাস নিয়ে।
কিগো মিলি জলের গ্লাস হাতে।
ওষুধগুলো কোথায়?
হাসলাম। আজ তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছে।
না। সবাই আসছে একটু গুছিয়ে দিক। কাজের লোক এসেগেছে।
দেখো টেবিলের ওপর আছে। কনিষ্কর হাতের লেখাটা দুপুরের, নীরুরটা সকালের।
তুমি এইভাবে মনে রেখেছো।
কি করবো বলো, মনে থাকে না। সব একটা করে নিয়ে এসো।
সেন্টার টেবিলে জলের গ্লাসটা রেখে, মিলি টেবিলের দিকে গেল।
কনিষ্করা কোথায় মিলি?
নার্সিংহোম গেল। অনিকেতদা ডাকলো, একজন সিরিয়াস পেসেন্ট এসেছে।
দাদারা বাগানে?
হ্যাঁ।
অফিসের খোঁজ খবর নিয়েছো?
পিকু গেছে।
এই তো কিছুক্ষণ আগে পিকুকে দেখলাম।
খেয়েদেয়ে গেল। বললো ঘণ্টা দুয়েক পর ফিরে আসছি।
মিলি ওষুধ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো।
উঠে বসে খেলাম।
বাচ্চাদুটো আছে, না বাগানে নেমে পরেছে।
বাগানে।
মিলি গ্লাসটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি আবার শুয়ে পরলাম। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সামান্য চোখটা লেগেগেছিল।
কিরে ঘুমোলি নাকি?
তাকালাম।
ডাক্তারদাদারা গেটের মুখে দাঁড়িয়ে।
এসো।
দাদা, ডাক্তারদাদা, অনিমেষদা, বিধানদা, মল্লিকদা, সুরোর শ্বশুর মশাই।
সবাই সোফায় আর চেয়ারে ভাগাভাগি করে বসলো।
আমি পাশ ফিরে শুলাম।
তুমি যে বললে মিটিং আছে—অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
যেতে ইচ্ছে করলো না। অনুপ, রূপায়ণকে বললাম তোমরা বরং মিটিংটা সামলে নাও।
বিধানদা খেতে কোনও অসুবিধে হয়নি?
একবারে না। তুই এসব সুস্বাদু রান্না শিখলি কি করে বলতো?
সত্যি কথা বলবো।
বল শুনি।
বই পড়ে।
বইতে এসব লেখা আছে।
কৃষ্ণদার হোটেলে যখন কাজ করতাম, তখন যে ছেলেটি রান্না করতো তার বড়ো দেমাক ছিল। বলতে পারো, ড্রাইভার আর কন্ট্রাক্টরের মতো। মাঝে মাঝে ও যখন রান্না করতো সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম, আর ব্যাটা কি করে প্রিপারেশন করে দেখতাম।
একদিন লাইব্রেরী থেকে তৎকালীন যুগের রাজরাজারা কি খাওয়া দাওয়া করতেন তার একটা বই জোগার করলাম।
দেখলাম মাংসের বেশির ভাগ প্রিপারেশন লক্ষ্ণৌ আর হায়দ্রাবাদ ঘরানার।
এক এক ধরণের মাংসের প্রিপারেশনের এক এক ধরণের নাম।
সেখানে একটা গল্প পেলাম। সম্রাট বুড়ো হয়ে গেছে, দাঁত পড়ে গেছে, কিন্তু মাংসের নেশা ছাড়তে পারে না। তাই বুড়ো সম্রাটকে কি করে মাংস নরম করে খাওয়ান যায়। আবার সেই রান্নাকরা মাংস খেলে সম্রাটের শরীরও খারাপ করবে না।
সম্রাটের খাস বাবুর্চিরা এক্সপেরিমেন্ট করে এই সব খাবার তৈরি করতো। আমি ওখান থেকে স্রেফ টুকলাম।
একদিন কৃষ্ণদাকে বললাম, আমি একটু মাংস রান্না করবো।
কৃষ্ণদা বললো, পারবি?
বললাম, খুব বেশি হলে একটু মাংস নষ্ট হবে। আপনি আমার মাইনে থেকে কেটে নেবেন। সাহস করে রেঁধে ফেললাম।
মার দিয়া কেল্লা। বই পড়ি আর ওখানে গিয়ে টুকে দিই। দেখলাম কয়েকদিনের মধ্যে বেশ নাম করে ফেললাম। তারপর থেকে যে এসব রান্না করতো কৃষ্ণদা তাকে বললো, তুমি বাবু রুটি ফুটি করো, মাংসের পার্টটা অনিকে ছেড়ে দাও।
আমার হেল্পার ভজুরাম। টেবিল মোছা বয় থেকে আমার হেল্পার।
উনি তোর পড়াশুনার ব্যাপারটা জানতেন না।
জানলে চাকরি চলে যেত। তাই এইটপাস সার্টিফিকেট।
বিধানদারা সবাই হাসছে।
তখন আমার প্রচুর টাকার দরকার বুঝলে, নিজেকে নিয়ে চার চারটে পোষ্য। আস্তে আস্তে কৃষ্ণদারও পকেট কাটতে শুরু করলাম। ব্যাপারটা জমে যেতে প্লেট হিসাবে টাকা নিতে শুরু করলাম। ভালই ইনকাম করলাম।
অনিমেষদা হাসছে।
তবে না ছেলেমেয়েগুলো এতো বড়ো হলো।
বিধানদা হাঁ করে রয়েছে।
আমি হাসতে হাসতে বললাম তুমি অন্য কিছু ভাবছো।
অ্যাঁ, হ্যাঁ। ভাবছি তোর আই কিউ, আর নিষ্ঠা।
এই রোগটা আমার প্রথম থেকে। নতুন কিছু দেখলে ভীষণ শেখার ইচ্ছে। শেখার পর তাকে কি করে আরও ভালো করা যায় সেটা নিয়ে নারা-চড়া করা।
খুব ভাল স্বভাব। তাই তুই আজ এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছিস।
না গো, তোমাদের আর্শীবাদের হাতটা আমার মাথায় না থাকলে সেটা সম্ভব হতো না।
একটু থামলাম।
জানো বিধানদা, উনা মাস্টারের কথাটা এখনও কানে ধরে রেখেছি।
বিধানদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
আসার সময় বলেছিলেন, কলকাতায় যাচ্ছ, বয়ে যেওনা যেন। নিজেকে এস্টাব্লিশ করো। এই অজ গ্রামের মুখটা উজ্জ্বল করো। আর দশজন যেমন তোমাকে চিনবে, তোমার গ্রামও তোমাকে চিনবে। জানিনা স্যারের আশা কতটা পূরণ করতে পেরেছি। তবে নিজেকে এস্টাব্লিশ করেছি। এটা জোড়গলায় বলতে পারি।
দেখ ছোটো দেখ। খুঁজে পাচ্ছিলি না। ছেলেটা একটু শুয়েছে, তাতেও এদের চোখ টাটায়।
বড়োমারা সবাই গেটের মুখে দাঁড়িয়ে, বৌদি, জ্যেঠিমনিরা হাসছে।
কথা না বলে এখানে এসে বোসো। দাদা ব্যাজার মুখ করে বলে উঠলো।
বড়োমা সবার মুখ চোখ দেখে বুঝলো, কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে, শুর শুর করে এসে সবাই বসে পরলো।
তারমানে রেসিপি নিয়ে তুই একসময় বেশ ভালোভাবে এক্সপেরিমেন্ট করেছিস। বিধানদা বললো।
তা বলতে পারো। তবে যতদিন কৃষ্ণদার ওখানে ছিলাম।
বইটার নাম কি বলতো?
এই মুহূর্তে তোমাকে সঠিক বলতে পারবো না। তবে যতদূর মনে হয় বাদশাহী রান্নাবান্না। বইটা কিন্তু একটা রিসার্চ ওয়ার্ক। ভদ্রলোক এই পেপারটা সাবমিট করে পিএইচডি পেয়েছিলেন। আমার এই একটা সাধ জীবনে অপূর্ণ রয়েগেল।
বিধানদা হাসলো। এখন করে নে।
হবে না। মনটা কনসেনট্রেট করা খুব মুস্কিল।
আমরা তোকে ওই ডিগ্রীটা দেব।
আমি ওভাবে নেব না।
কেন তোর সাংবাদিকতার জন্য যদি দেওয়া হয়।
আমার থেকেও অনেক বড়ো বড়ো কলামিস্ট আছেন। আমার ঘরেই দুজন আছেন।
আমাকে কলামিস্ট বলিস না। লজ্জা পেয়ে যাব। আমি খুব ভালো এডিট করতে পারি। এটা আমি জোড় গলায় বলবো। একটা অখাদ্য লেখাকে এডিট করে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি।
দাদা খুব আন্তরিক ভাবে কথাটা বললো।
তবে হ্যাঁ দু-একটা ভালো নিউজ কি ব্রেক করিনি? করেছি। সেটা বলার মতো নয়। আমার থেকে তুই অনেক বেশি নিউজ ব্রেক করেছিস। এখনও তোর কাছে যা মেটিরিয়ালস আছে তুই নিত্য নতুন ব্রেক করতে পারিস।
এটা তুমি আমাকে অত্যাধিক স্নেহ করো বলে সবার সামনে বারিয়ে বলছো।
তুই মল্লিককে জিজ্ঞাসা কর, অনিমেষকে জিজ্ঞাসা কর, ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা কর, আমরা তোকে নিয়ে কি আলোচনা করছিলাম মাঠে বসে। কি যেন নাম ভদ্রলোকের মল্লিক?
আফতাব হোসেন।
একজন সাধারণ সাংবাদিক হিসাবে ওর কাছে পৌঁছন যায়, কিন্তু তার ঘরের লোক হওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে একটা বিশেষ কোয়ালিটির দরকার লাগে। সেটা তোর মধ্যে আছে।
বিধানবাবুকেও বলেছি, এটা আপনি কোনও মতে অস্বীকার করতে পারবেন না।
আচ্ছা আমার কথা বাদ দে। অনিমেষের পার্টিতে যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। দিল্লীতেও ওর চেনা পরিচিতি খুব একটা কম নয়।
প্রবীর চিফ-মিনিস্টার হতে পারে, অনিমেষ যদি কিছু বলে প্রবীর সহজে না করতে পারবে? তারমানে চিফ মিনিস্টার হয়েও প্রবীরকে অনিমেষ আর বিধানবাবুর অনেক কথা শুনতে হয়। এটা পার্টিগত ডেকরাম।
আমি দাদার দিকে তাকিয়ে আছি।
অনিমেষ কতোভাবে ভদ্রলোককে বোঝালেন। উনি যে বোঝেননি তা নয়। সব বুঝে, শেষে এক কথা। অনিমেষবাবু, অনির কাছে সব ফাইল আছে ও গ্রীণ সিগন্যাল দিলে করবো, না হলে করবো না। এটা এমনি এমনি হয় না অনি।
ওই লেবেলের একটা মানুষ তোকে অন্ধবিশ্বাস করছে, তার পেছনেও একটা সলিড রিজিন থাকবে। এটা বোঝার বয়স অনেক দিন আগে আমরা এই কজন পার করে এসেছি। তুই যতই গল্প ফাঁদিস।
আমি হাসছি। বড়োমা আমার দিকে তাকিয়ে, তনুরা সবাই ঘরে ঢুকলো।
এই কথাটার সঙ্গে আমি একমত। অনিমেষের মুখ থেকে সব শোনার পর আমারও এই ধারনা হয়েছে। সেদিন ভদ্রলোকের ওয়াইফও ওকে ফোন করলো। বিধানদা বললো।
অনিমেষদা হাসছে।
বুঁচকি না বললে বুঝতেই পারতাম না। কি সাংঘাতিক বলো অনিমেষ। ওর কাছে টাকা নেই সে খবরটাও ওখানে পৌঁছে যায়।
দাদার কথা শেষ হতে না হতেই অনিমেষদা বলে উঠলো—তনুমা একটু চা খাওয়াবি?
এই তো ঘণ্টা খানেক হলো খেয়ে উঠলে। বৌদি বললো।
আমি যাচ্ছি। তনু উঠে দাঁড়াল।
তুই বোস আমি ভজুকে বলে আসছি। বৌদি উঠে দাঁড়াল।
ভজু কোথায়? আমি বললাম।
সে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বসে পরেছে।
এরই মধ্যে!
বললো ভিঁজিয়ে না রাখলে স্বাদ হবে না।
আমি হাসছি।
তুই রান্না করবি, সকাল থেকে ছেলেটার কি উৎসাহ। যেন পকেট থেকে ট্রাম্পকার্ড বার করেছে।
অনিমেষদার কথা শুনে মাসি মুখ নিচু করে নিল।
ছোটো তুই যে বললি কি বলবি। বড়োমা বললো।
ওকে একা না পেলে হবে না।
আমি ছোটোমার দিকে তাকালাম। হাসছে।
যুদ্ধ করবে নাকি।
অনিমেষদার ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে বার করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
বলো প্রবীর….না অনির সঙ্গে একটু কথা বলছি….অনুপকে, রূপায়ণকে পাঠালাম ….চলে এসো, আমি বিধানবাবু আছি।
বৌদি এসে আমার মাথার কাছে বসলো। আমি বৌদির কোলে মাথা রাখলাম।
নিজেদের মধ্যে এলোমেলো গল্প করতে করতেই, প্রবীরদা এসে হাজির হলো। আমি বৌদির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি। ঢুকেই চোখ বড়ো বড়ো।
কিরে শরীর খারাপ নাকি!
রন্নাকরে ক্লান্ত। তনু বলে হাসছে।
ছিটে ফোঁটা কিছু নেই? প্রবীরদা বড়োমার দিকে তাকালো।
কজন লোক সঙ্গে নিয়ে এসেছো? বড়োমা বলে উঠলো।
বিশ্বাস করো, একজনকেও নিয় আসিনি। শুধু আমার সিএ আছে। আর লোকাল থানার একটা গাড়ি আছে। সবাই গেটের বাইরে।
এ বাড়ির লোকেরা কি অভদ্র। ছোটোমা বললো।
ছিঃ ছিঃ এ কথা কেন বলছো।
ওদের ভেতরে ডাকো।
আমি হাসছি।
একদম হাসবি না, তুই আমার বহুত কাজ বাড়িয়ে দিয়েছিস। প্রবীরদা আমার দিকে তাকিয়ে।
মিত্রা, তুই তনু যা। মাইক্রোওভেনের ভেতর একটা প্লেট গোটা ধরা আছে। আর ডেচকিতে রাইস রাখা রয়েছে।
তারমানে! মিত্রার চোখ বড়ো বড়ো।
সঙ্গে সঙ্গে বড়োমা বললো।
তোদের যেতে হবে না। ছোটো তুই যা। ওঘর থেকে আর এ ঘরে এসে পৌঁছবে না।
তনু চল। মিত্রা বললো।
দু-জনে উঠে দাঁড়িয়েছে। ভজু এসে গেটের কাছে দাঁড়ালো।
বড়োমা আলমাড়ি থেকে কাপ বার করি।
কেন রান্নাঘরে নেই।
শেষ হয়ে গেছে।
বার কর।
ভজু চলেগেল।
ছোটোমা হাসছে, ওরা যাক।
তুই কি ভাবলি, প্লেটে যা রয়েছে আর থাকবে।
প্রবীরকে আর ওদের দিয়ে ওরা খেয়ে নিক, কি হবে রেখে।
তুইও ওদের দলে?
বড়োমা আর কথা বললো না। ছোটোমাও ওদের সঙ্গে বেরিয়েগেল।
ফাইলপত্র নিয়ে আসোনি। প্রবীরদার দিকে তাকালাম।
অনিমেষদা আছেন বিধানদা আছেন ফাইল পত্রের আর দরকার আছে?
এরপর বলবে, আমিই একটা ফাইল।
প্রবীরদা হাসছে। তোর সব খবর এখন রাখি মনে রাখবি।
কি খবর বলো, গোপালকে হাতে পেয়েও কেন ছেড়ে দিলাম, এই তো?
আমি এমনভাবে বললাম, অনিমেষদা চমকে আমার দিকে তাকাল।
অনি কি বললো প্রবীর? বিধানদা বললো।
কিছু না পরে বলবো আপনাকে।
এটা কোন গোপাল! মাসিদের পাড়ার, না ভাসিলা ভেঁড়ি? অনিমেষদা বললো।
প্রবীরদা চুপ করে থাকলো।
কি হলো প্রবীর? অনিমেষদা আবার রিপিট করলো।
দুটোই। ও এখন অনেক বড়ো খেলোয়াড়। একঢিলে দুই পাখি মেরে দিল।
প্রবীরদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সকালের কেশটা আমি সামলালাম, ও এখনও জানে না। অনিমেষদা, প্রবীরদার দিকে তাকিয়েছে।
আপনার সামলাবার আগেই ওর নাম করে কে গিয়ে ধমকে এসেছে। আবার বলে এসেছে, অনিকে বলবেন আমি আপনাকে বললাম। এমনকি ওর ফোন নম্বর এবং তার নিজের নম্বরটা পর্যন্ত দিয়ে এসেছে। ওকে মনে হয় ফোনও করেছিল, ও না ধরে অন্য কেউ ধরেছিল।
সকাল থেকে ফোন ওর কাছে নেই। মিত্রার কাছে ছিল, তারপর নেপলা ওর ফোন সামলেছে।
এখন বুঁচকির কাছে আছে। বৌদি বললো।
তুমি গোপালকে জিজ্ঞাসা করো নি? অনিমেষদা বললো।
করেছি, বলতে চায়নি। শুধু বললো, আমি কাউকে পাঠাই নি, ছেলেগুলো গেছিল। তবে আমি যা গেইজ করেছি, যে ছেলেটি গেছিল সে আমাদের সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মী।
আমি প্রবীরদার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে।
দাঁড়াও, ইসলাম আসুক, খবর পাবো।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকালো।
তুই এখন এইসব ছোটোখাট ব্যাপারে মাথা গলাস না। তোর এখন অনেক বড়ো কাজ। ওটাতে মন দে। কোনও সমস্যা হলে বলিস আমি সামলাব।
বৌদি হেসে ফেললো। তুমি তো ওর পেছনে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছো।
তুমি জানো না সুতপা, ওর একটা হ্যাঁ বলাতে রাতারাতি অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে।
তোমাদের কথা আমি ঠিক ধরতে পারছি না। আমি বললাম।
তোকে আর ধরতে হবে না। প্রবীরদা হাসছে।
মিত্রারা ঘরে ঢুকলো। হাতে খাবারের ট্রে। সেন্টার টেবিলে রাখল।
কিরে সব ধোঁয়া উঠছে যে! প্রবীরদী বললো।
ওভেনে একটু গরম করে নিলাম। মিত্রা বললো।
অবেলায় এতো খাওয়া যায় নাকি?
সকাল থেকে কিছু খেয়েছো? মিত্রা বললো।
খেয়ে নাও, আজকের বাবুর্চি হচ্ছে অনি। অনিমেষদা বললো।
পকেট থেকে ফোনটা আবার বার করলো। রিং বাজছে।
বলো অনুপ….হ্যাঁ প্রবীর চলে এসেছে…. তোমাদের কাজ শেষ….তাহলে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে চলে এসো।
অনিমেষদা ফোনটা পকেটে রাখলো।
প্রবীরদা খেতে শুরু করেছে।
তোরা একটু নে। তনুদের দিকে তাকাল।
আমরা না খেয়ে তোমাকে দিচ্ছি ভাবলে কি করে? মিত্রা বললো।
প্রবীরদা হাসছে। ভজু চায়ের ট্রে, পট নিয়ে ঢুকলো। পেছনে ছোটোমা।
চিকেনটাও ও তৈরি করেছে? প্রবীরদা বৌদির দিকে তাকালো।
তাহলে কি ভেবেছো, কিনে আনা হয়েছে।
তুই কি ফাইভস্টার হোটেল বানাবার মতলব আঁটছিস।
আমি প্রবীরদার দিকে তাকিয়ে হাসছি।
ছোটোমা সেন্টার টেবিলে কাপ রেখে, চায়ের পট থেকে সবাইকে চা দিল।
মিত্রা আমার ফোনটা একটু মেয়ের কাছ থেকে নিয়ে আয়।
ফোন নিয়ে কি করবি বেশ তো গল্প হচ্ছে। বৌদি বললো।
ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো টুকরো কথা। চা খাওয়া চলছে। হঠাৎ প্রবীরদা বললো।
তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো। বলতে পারিস এটা আমার রিকোয়েস্ট।
অনিমেষদা, বিধানদা আবার প্রবীরদার দিকে তাকাল।
ও কি বাড়িতে বসে বসে গণ্ডগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। দাদা বিরক্তি সহকারে বললো।
না ও গণ্ডগোল পাকায় নি।
তাহলে! তুমি তখন একটা কি বললে, গোপাল না কি, এখন আবার বলছো….।
কি করবো দাদা, অন্য কেউ হলে বলতাম না। ও ঘরের লোক, অনুরোধ করলে যদি কাজটা মিটে যায়, তাহলে আর গণ্ডগোলের সম্ভাবনা থাকে না।
আবার কি শ্যাম….?
না। আমাদের পিডব্লুডি ডিপার্টমেন্টের একজন এ গ্রেড কনট্রাক্টরের সমস্যা। আমাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। দিন কয়েক আগে সে গেছিল। ওর লোক তার কাছে গেছিল।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। বৌদি আমার চুলের মুটি ধরেছে।
আমি বৌদির দিকে তাকালাম। হাসছে।
ছোটোমা আমাকে চা দিলে না।
আমরা যখন খাবো তখন খাবি।
প্রবীরদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
তোর শোনার ইন্টারেস্ট নেই?
তুমি বলছো কোথায়? বললে শুনবো।
তুই সাগরকে ছেড়ে দে। ও যাকে এতদিন টপমোস্ট ভাবতো সে যে চুনোপুঁটি আজ জেনেছে।
একজন কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে তোমার এত খাতির কিসের?
ওদেরকে দিয়ে কাজ করাতে হয়, খাতির না রাখলে চলে কি করে?
এই কাজের জন্য সরকার ওদের পয়সা দেয় না?
দেয়। ওরাও তো অনেক টাকা ইনভেস্ট করে রাখে।
আমাকে একটা লাইসেন্স বার করে দেবে। আমি কাজ করবো। বছরে একবার বিল করবো, আমাকে পয়সা দেবে। সাগরের থেকে বেশি পয়সা ইনভেস্ট করার ক্ষমতা আমার রয়েছে।
অনিমেষদা, বিধানদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
যাক সাগর তোমার কাছে শুধু এই কারণে যায় নি। আসল কারণটা বলো।
সেটা তুই জানিস।
ওখানকার জমির ভ্যালুয়েশন এখন পনেরো কোটি চলছে। হিসেব করে ক্যাশ আমার বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলবে। তাহলে ওরিজিন্যাল কাগজ পেয়ে যাবে, ও নির্ঝঞ্ঝাটে থাকতে পারবে। আমি আর কিছু ডিমান্ড করছি না।
অনিমেষদা বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। ডাক্তারদাদা হাসতে হাসতে মাথা দোলাচ্ছে।
তুই একবারে হিটলারি মেজাজে কথা বলছিস, আমি কি তোর সঙ্গে এইভাবে কথা বলছি।
তুমি মুখ্যমন্ত্রী, আমি ব্যবসায়ী।
অনিমেষদারা হাসছে। আমাদের ডুয়েটে সবাই নীরব দর্শক।
পঁচিশ বছরের হিসাব আমাকে করতেই হবে। তার ইন্টারেস্ট তস্য ইন্টারেস্ট….।
তুই একটা মধ্যপন্থা বার কর।
তাহলে একটা কাজ করো, তদন্ত কমিশন বসাও। যতদিন চলে।
তুই ভীষণ ঘার বেঁকা।
ও জানলো কি করে তোমার সঙ্গে আমার রিলেশন আছে। আমি ঘার বেঁকা তাই….।
ব্যাপারটা কি বলোতো প্রবীর!
কেন তুমি এর মধ্যে ঢুকছো অনিমেষ? মাথাটা প্রবীর পেতেছে। প্রবীর ও বুঝে নিক। তুমি আমি এর মধ্যে একবারে মাথা গলাবো না। বিধানদা বললো।
ছোটোবৌদি একটু চা খাওয়াও। প্রবীরদা ছোটোমার দিকে তাকাল।
সে খাওয়াচ্ছি, আগে তোমাদের দ্বৈরথ শেষ হোক। ছোটোমা আমার দিকে তাকাল।
বুঝলাম তনু, মিত্রা তখনকার কথাগুলো খুব ভালো ব্রিফ করেছে।
এতো তারাতারি হবে না।
কেন?
একবার মুখ দিয়ে বলে ফেলেছে। ওটা এই মুহূর্তে পরিবর্তন হবে না। তাহলে অন্য একটা অপশন দেবে, সেটা আরও টাফ। ওকে নিয়ে অনেক জ্বালা বুঝেছো।
তুমি মন্ত্রী টাইট দিতে পারছো না? ছোটোমা বললো।
বিধানদার মতো তুমিও আমাকে টুকছো?
না। আমি শুধু ওর দৌড় কতটা তা বোঝার চেষ্টা করছি।
ও ছোটো থেকে বড়ো সবার সঙ্গে খুব ভালো একটা রিলেশন তৈরি করে রেখেছে। এটা ন্যাচারালি দেখা যায় না। তাছাড়া ও খুব হেল্পফুল, সবার ক্ষেত্রে। দুর্ভাগ্য বশতঃ কেউ না কেউ সেই সব লোকের কাছে গিয়েই ওর নিন্দা করে। আর প্রচণ্ড ঝাড় খায়।
অনিসা, অনিকা দুজনে ঢুকলো।
বাবা আন্টি ফোন করেছে।
মেয়ে আমার হাতে ফোনটা দিল।
হ্যালো।
সকলকে রেঁধে খাওয়ালি আমারটা কোথায় গেল?
কোরিয়ার করেছি। কাল সকালে পেয়ে যাবে।
হাসির চোটে আমার পর্দা প্রায় ফেটে যাওয়ার অবস্থা। অনিমেষদার সঙ্গে অনিসার ইসারায় কথা হয়ে গেল কে ফোন করেছে। আমার দিকে তাকাল।
অনিকাকে নিয়ে এলি আমাকে জানালি না।
কেন তুমি জানোনি? বরং নিয়ে আসার আগে জেনে গেছ।
আবার হাসি।
বসির একুশ তারিখ যাবে।
কোন মাসে? এই মাসে না সামনের মাসে?
ফিচলেম হচ্ছে। কেউ শুনছে না—
না। আজকে ভয়েজ অফ করে রেখেছি।
বসির সব রেডি করছে।
তুমি এতো তারাহুরা করছো কেন বলো। ডাল মে কুছ….।
কোনও কালা-ফালা নেই।
ছেলের জন্য কি মেয়ে দেখেছো ইন্ডিয়াতে।
হ্যাঁ।
কোথায় বলো খোঁজ খবর নিই।
গিয়ে বলবো।
তুমি আসবে!
যাব।
দাদা।
না না করছে।
শোনো আমি মেয়েকে পাঠাচ্ছি তোমাদের আনার জন্য।
এই তুই আর একটা ফন্দি আঁটলি।
কোনও ফন্দি না। তোমরা আসবে একজনকে না পাঠালে হয়।
সত্যি তুই পাঠাবি!
বললাম তো পাঠাব।
সাতদিন আগে।
কেন?
ওকে নিয়ে একটু ঘুরবো না।
ঠিক আছে দেখছি, সাহেব কোথায়?
অফিসে।
কখন ফিরবে?
কিছু বলে নি।
আর কি আছে বলো?
তোকে রাতে ফোন করবো। তুই তোর এ্যাকাউন্টটা চেক করেছিস?
করার দরকার আছে?
আছে।
বাড়ি থেকে বেরোই নি, বেরোলে চেক করে নেব।
ঠিক আছে রাখছি। তোর ফোন বন্ধ থাকলে মেয়ের ফোনে করবো।
আচ্ছা।
আমি ফোনটা কান থেকে নামাবার আগেই মেয়ে বলে উঠলো ওটা এখন তোমার কাছে থাক।
হাঁপিয়ে উঠেছিলি?
মাথা দোলাচ্ছে। বাবা সত্যি আমি যাব—
কোথায়?
তুমি যে আন্টিকে বললে।
রাতে কথা হোক। তোকে তো আবার ঘণ্টাখানেক বাদে ফোন করবে।
মেয়ে হাসছে। আন্টি দিদির সঙ্গে কথা বলেছে। দিদি কি সুন্দর উর্দু বলতে পারে।
তাই? দিদির কাছ থেকে শিখে নে।
অনিসা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
এককাজ কর, দুজনে মিলে একটু চা কর। কড়া করে।
দু-জনে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।
প্রবীরদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।
তুমি এত ব্যস্ত মানুষ, আজ তোমার কাজ নেই?
সাতটা থেকে কোনও কাজ রাখি নি। তার আগে দুটো মিটিং ছিল, ক্যানসেল করলাম, ভালো লাগছিল না।
বৌদিকে একবার ফোন করে দাও। রাতে চলে আসুক। রুটি তড়কা খেয়ে যাবে।
প্রবীরদা হাসছে।
আর কি কি খবর পেয়েছো?
সবার সামনে বলা যাবে না। ওটা যখন মিটিং শুরু হবে তখন বলবো।
মিটিং তো চলছে। সবাই বসে আছে।
মেয়ে আবার ঘুর এলো।
বাবা আফু আঙ্কেল। তোমার ফোন বন্ধ।
না তো।
মেয়ে আবার ফোনটা দিল।
হ্যালো।
তোকে টিকিট কাটতে হবে না।
কান থেকে সড়িয়ে নিলাম। ভয়েজ অন করা আছে।
আমি টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
কমসে কম ভিসাটা করতে দাও।
রাঘবনকে বলে দিয়েছি। তোকে চিন্তা করতে হবে না। মেয়ে আমার কাছে আসবে।
সে হয় নাকি!
কেন হবে না—
তারমানে!
তোকে বক বক করতে হবে না। ওর সঙ্গে অনিকাকে পাঠিয়ে দিবি।
ওর পাসপোর্ট নেই।
তোর অনিমেষদাকে বল, একদিনে পাসপোর্ট বানিয়ে দেবে।
অনিমেষদারা হাসছে।
হবে না—
কেন—
তাহলে আমার একটা কথা রাখতে হবে।
বল।
তোমার টিকিটটাও বানিয়ে নাও।
হবে না।
তাহলে আমারটাও হবে না।
ঠিক আছে এখন তাড়া আছে, তোকে পড়ে ফোন করছি।
সেই ভালো।
লাইনটা নিজেই কেটে দিল।
তুই তো ভালোই জড়িয়েছিস। দাদা আমার দিকে তাকাল।
এবার ইংরাজীতে বললো বলে বুঝতে পারলেন। বিধানদা বললো।
মেয়ের হাতে ফোনটা দিলাম। চা হয়েছে?
নিয়ে আসছি।
আমি বৌদির কোল থেকে এবার উঠে বসলাম।
তুই কি ওদের পাঠাবি? বড়োমা গম্ভীর হয়ে বললো।
কেন বলোতো?
ওই যে বললি।
তুমি যাবে?
না।
তাহলে ওরা যাক। ওরা এলে তুমি বেশ কয়েকদিন মোচার ঘন্ট খাওয়াতে পারবে।
বড়োমা হাসি হাসি চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।
তুই কি প্ল্যান ভেঁজেছিস বলতো—ছোটোমা বললো।
কেন, কানে যায় নি?
না।
একিগো, তোমার বিশ্বস্ত সৈনিকরা শেষ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে এইভাবে বিট্রে করলো!
একবারে বাজে কথা বলবে না। তনু বলে উঠলো।
দেখলে। কথায় কি ঝাঁজ। খুঁটি ধরে ফেলেছে।
বৌদি আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।
তনুর দিকে তাকিয়ে একটা বিটকেল হাসি হাসলাম।
পেটটা পরিষ্কার করো, বরো অপরিষ্কার হয়ে গেছে।
তোমার থেকে পরিষ্কার আছে।
সে তো বুঝতেই পারছি।
বড়োমা হাসছে।
আর একটাকে দেখেছো। তোমার ঘারে বন্ধুক রেখে ফটাফট আওয়াজ করে চলেছে।
বড়োমা শুনতে পাচ্ছ। মিত্রা বললো।
তোরা ওর সঙ্গে কথা বলিস না।
সবাই নিস্তব্ধে হেসে চলেছে।
প্রবীরদার দিকে তাকালাম।
তোমার সিএকে বলো গাড়ি থেকে ফাইলগুলো নিয়ে আসতে।
সত্যি বলছি কিছু আনিনি।
তুমি এখানে খালি হাতে পোলাও, মাংস খেতে এসেছো, তা হয় নাকি?
অনুপ নিয়ে আসছে। অনিমেষদা বললো।
তুমি আফতাবভাইয়ের সঙ্গে কি ব্যাপারে কথা বলেছো? অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
সেরকম স্পেশিফিক কিছু নয়। তবে কথা শুনে মনে হলো, তোর সঙ্গে আলোচনা সেরে রেখেছে।
এমনি কোনও আওয়াজ দেয় নি? কতটাকা কি বৃতান্ত?
বললো টাকাটা কোনও ফ্যাক্টর নয়।
কিভাবে করতে চাও। প্রাইভেট না জয়েন্ট ভেনচার।
যেটা খুশী। মোট কথা স্টেটে লগ্নি হলেই হলো।
বিধানদা, অনিমেষদা হাসছে। অনুপদা, রূপায়ণদা ঘরে ঢুকলো।
ভজু ওঘর থেকে চায়ের ট্রে নিয়ে বেরিয়েছে। অনুপদা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো।
দু-জনেই এসে খাটে বসে পরলো।
তনু, মিত্রা, ইসি জায়গা করে দিল। ওরা ভেতরে ঢুকে এসে আমার পেছনে বসলো।
ফাইল নিয়ে এসেছো? অনুপদার দিকে তাকিয়ে অনিমেষদা হাসছে।
হ্যাঁ। অনি কি শুরু করে দিয়েছে?
না এমনি কথা বলছি।
তাহলে দু-জনে মিলে হাসছেন যে।
ওর কথাবার্তা জানো তো। খুব ধীরে সুস্থে খায়।
অনুপদা আমার দিকে তাকালো।
আমরা কতো টাকার প্রজেক্ট দেখিয়েছিলাম রাঘবনকে। অনিমেষদা বললো।
মেইন প্রজেক্ট না অনুসারী শিল্পগুলো নিয়ে।
টোটালটা বলো।
পাঁচ সাড়ে পাঁচ হাজার কোটির মধ্যে আছে।
অনিমেষদা আমার দিকে তাকালো। এবার তুই বল।
তোমরা স্টেটলেভেল থেকে কতো ইনভেস্ট করবে।
স্টেটের টাকা কোথায়?
সেন্ট্রালের থেকে লোন নাও।
এই তুই ঝামেলা শুরু করলি। অনুপদা বললো।
দাঁড়াও অনুপ। বিধানদা বললো।
কতো পার্সেন্ট স্টেটকে দিতে হবে।
আমি বিধানদার দিকে তাকালাম।
তোমরা কতোটা বেয়ার করতে পারবে বলো।
ধর কিছুই পারবো না, তাহলে কি প্রজেক্টটা হবে না—বিধানদা বললো।
প্রজেক্টের সঙ্গে তোমাদের থাকতে হবে। কি ভাবে, সেটা তোমরা ঠিক করো।
কতোটা বল—
এটলিস্ট পঁচিশ শতাংশ।
সেতো অনেক টাকা!
স্টেট চাইলে ব্যাঙ্ক লোন দেবে না তা হয় নাকি?
তুই একটা ভালো অঙ্ক করে রেখেছিস।
তা করেছি। এই মুহূর্তে আফতাবভাই যে টাকাটা ইনভেস্ট করতে চাইছে। তাতে আমি দুটো প্রজেক্ট করতে চাইছি।
কতোটা বল।
ছয় পর্যন্ত বলেছে। একটু চাপাচাপি করলে সাত পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে রিফাইনারির দিকে ওর ঝোঁক বেশি। র-মেটিরিয়াল নিজে পাঠাবে। সব কিছুই ওর নিজস্ব আছে। কারুর ওপর ওকে নির্ভরশীল হতে হবে না।
আর একটা কি করতে চাইছিস বল?
পাওয়ার স্টেশন।
অনুপদা হাসলো।
অনুপ হেসো না। একটুও বার্তি কথা বলছে না। অনিমেষদা বললো।
আচ্ছা ওটায় আমরা ভাগ পাবো না? বিধানদা বললো।
অবশ্যই। এটা যদি পঁচিশ নাও ওটা ফর্টি পর্যন্ত নিতে পারো।
তারমানে এই যে দেড়হাজার কোটি তুই সরিয়ে রাখলি ওটা কি করবি?
স্টেটের লোয়ার পার্টে ইকো পার্ক তৈরি করার ইচ্ছে আছে। পরিবেশকে ডিস্টার্ব না করে।
তারমানে লোয়ার পার্টের সমুদ্র সম্পদকে তুই কাজে লাগাবি?
অনুপদার দিকে তাকালাম।
ওরে তুই তো অনেক দূর পর্যন্ত খেলে রেখেছিস!
আমি হাসলাম।
ছোটোবৌদি।
ছোটোমা অনুপদার দিকে তাকাল।
সবে মাত্র ভূমিকা চলছে। খিদে পেয়ে গেছে। ভজু ব্যাটা চা দিলো, ঠিক জমলো না।
অপেক্ষা করো ছগনলাল লেট্টি বানাচ্ছে, খাবে।
অনুপদা হাসছে।
রূপায়ণদা কারুর সাথে কোনও কথা না বলে সোজা বাথরুমে চলে গেল।
কি অসভ্য দেখো। বৌদি বলে উঠলো।
বাইরের দিকে তাকালাম। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। দিনের আলো নিভু নিভু। অনিমেষদা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে।
ওরকমভাবে তাকিয়ে আছো কেন?
ভাবছি তুই কতদূর পর্যন্ত ঘুঁটি সাজিয়েছিস।
কি রকম।
বিয়াল্লিশ-ছত্রিশ-চল্লিশ। বিয়াল্লিশ আর চল্লিশ বিরাশি প্লাস ছত্রিশ মোট একশো আঠারো।
তুমি কি বির বির করছো বলোতো, অষ্টআশি একশো আঠারো….। বৌদি বলে উঠলো।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
আপনি হাসছেন ডাক্তারবাবু?
তুমি ওর ব্যাপারগুলো এতো সূক্ষ্মভাবে ধরতে পারো।
আমি অঙ্কটা ঠিক বলছি কিনা?
একবারে অব্যর্থ। ও এটা ছাড়া কিছু ভাবতেই পারে না।
সুতপা, ছেলের মাথাটা ফাটার পর আরও ধারালো হয়েছে।
বিধানদা মনে হয় এবার ধরতে পেরে ফিক করে হেসে উঠলো।
ওরে ব্যাস দারুণ ক্যালকুলেশন। অনুপদা চেঁচিয়ে উঠলো।
প্রবীর মনেহয় এখনও ঘোরে আছে।
না আমি ভাবছি ও এই অঙ্কটা জানলো কি করে ওটা আমরা সব সময় মনে রাখি।
তাই জন্য তুমি ওর বাড়িতে এসেছো, ও তোমার বাড়িতে হিসাব করতে যায়নি। একটু আগে কি বলছিলে ও সবার উপকার করতে চায়। ওটাই ওর প্লাস পয়েন্ট।
বড়োমারা সবাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে।
মল্লিকদা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে মুখ নিচু করলো।
বুঝলে না—অনিমেষদা, বৌদির দিকে তাকালো।
না! বৌদির চোখে বিষ্ময়।
যে প্রজেক্ট তিনটের কথা ও বললো। তার যা স্পট ও ভেবে রেখেছে। যদিও ও মুখে কিছু বলছে না। আমি গেইস করছি। সেই তিনটে জলায় আমাদের আধিপত্য কম। তিনটে জেলায় টোটাল একশো আঠারোটা সিট আছে।
বৌদি আমার কানে হাত দিতে যাচ্ছিল মিত্রা বৌদির হাতটা ধরে ফেললো।
চোখে মুখে এমন একটা ইসারা করলো, সবাই হেসে ফেললো।
রূপায়ণদা বাথরুম থেকে জামা গুঁজতে গুঁজতে বেরোল।
রূপায়ণ একটু ভদ্র হও। বৌদি হাসতে হাসতে বললো।
নিজের বাড়িতে ভদ্রতা করতে গেলে সমস্যায় পরে যাব।
অনিমেষদার দিকে তাকাল।
কি দাদা হিসাব মিলেছে?
মিলেছে।
প্রথম বারের গল্প শুনে, আপনাকে একটা ছোটো হিন্টস দিয়েছিলাম।
অনিমেষদা মাথা দোলালো।
তখনই বলেছিলাম দাদা তারাহুরা একবারে করবেন না।
অনিমেষদা, রূপায়ণদার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
মিত্রা, যা কিছু খাবার নিয়ে আয়।
কথা শুনে খিদে পেয়ে গেল। মিত্রা ভ্রু বাঁকিয়ে বললো।
পাবে না! তোর বরের অঙ্কটা একবার ভেবে দেখেছিস।
ও এখন আমার বর নয়।
তাহলে কে!
ভালো বন্ধু।
তুইও যে আইনের প্যাঁচ মারতে শিখে গেলি।
পাশে থেকে থেকে।
মিত্রা, তনু-ইসির দিকে তাকিয়ে বললো, চল তনু—দিদিভাই যাবি?
ইসি হাসছে। যেন এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল।
একটু ঘুরে আসি। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। অমি বললাম।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটা ঝেড়ে আলিস্যি ঝাড়লাম।
তুই কোথায় উঠছিস! প্রবীরদা চোখ পাকালো।
বড্ড সাপোকেশন লাগছে।
বৌদি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
ওদের পেছন পেছন আমিও বারিয়ে এলাম।
(আবার আগামীকাল)