জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬১ নং কিস্তি
ভিড়টা এখন খাওয়ার টেবিলকে ঘিরে। সবার হাতেই গ্লাস। খাচ্ছে আর নাচ চলছে।
এই টেবিলে আমি একা গ্লাস সাজিয়ে চলেছি।
কনিষ্ক এসে বলে গেল দারুণ বানিয়েছিস। পরিমাণ মতো সব পরেছে।
ভাল করে ওদিকটা সামলাবি।
যা বানিয়েছিস নেশা হতে বহুত সময় লাগবে।
কনিষ্ক চলে গেল। নিজেই ক্রেট থেকে গ্লাস বার করি সাজাই। নিমেষে গ্লাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। কে কখন নিয়ে যাচ্ছে বুঝতেই পারছি না।
নীপা এসে দুটো গ্লাস তুললো।
কিগো দুটো!
ও আসতে লজ্জা পাচ্ছে।
কয় রাউণ্ড হলো।
আমার দুটো হয়ে গেছে। তিন নম্বর চলছে।
করেছো কি!
খাওয়াচ্ছ কেন।
নীপা কোমড় দোলাতে দোলাতে চলে গেল।
আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিলাম। মাঝে মাঝে চেয়ে দেখছি। সবাই ভীষণ আনন্দ করছে। হঠাৎ পিঠে নরম হাতের ছোঁয়ায় ফিরে তাকালাম। মিত্রা, তনু পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওদের দেখে হেসে ফেললাম।
চোখ চক চক করছে। মুখে হাসি। আমি দু-জনের দিকেই একবার করে তাকাই। খেয়েছে কিনা। ঠিক বুঝতে পারছি না। একবার একটু চারদিক দেখে নিয়ে মিত্রা বললো, তোকে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।
সখ উথলে উঠছে মনে হচ্ছে।
খাই না, ওরকম করছো কেন। তনু বললো।
বুঝেছি মিত্রাদির পাল্লায় পরে….।
তুই তো আর পেছন ফিরে দেখছিস না। একবার পেছন ফিরে দেখ বুঝতে পারবি। মিত্রা বললো।
আমি পেছন ফিরে দেখলাম বড়োমারা সবাই চলে এসেছে। ডাক্তারদাদার সঙ্গে চূড়ান্ত চলছে। হাতে এখানকার গ্লাস। আমি বোতলটা টেবিলে রেখে এগিয়ে যেতে গেলাম।
মিত্রা হাতটা টেনে ধরলো।
জীবনে এতটা আনন্দ কোনওদিন করেনি। প্লিজ নষ্ট করে দিস না। তোর জন্যে আজ আমি আমার দুই মাকে এতটা আনন্দ করতে দেখছি। দু-চোখ ভরে একটু দেখতে দে।
মিত্রার চোখে চোখ রাখলাম। চোখের কোল সামান্য চিক চিক করছে।
তুই কি সারাজীবন শুধু সার্ভিস দিয়ে যাবি। একটুও আনন্দ করতে ইচ্ছে করে না।
চল যাচ্ছি।
আর তোমাকে করতে হব না। এবার চলো। শুরুটা তুমি করে দিয়েছো ওরা শেষ করুক।
তনু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।
তোমরা খেয়েছো?
তনু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
তুমি খাও নি, আমরা খাবো কেন?
হাঁ করো।
কেন হাঁ করবো।
একটু ঢেলে দিই।
ঠিক আছে চলো, আমরা তিনজনে তিনটে গ্লাস নিয়ে চিয়ার্স করি।
আমি নিজে ওদের হাতে দুটো গ্লাস তুলে দিলাম, নিজেও একটা নিলাম। গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ালাম।
ধীরে ধীরে খাওয়ার টেবিলটার কাছে এগিয়ে এলাম। তখন তুমুল চলছে।
অনিকা-অনিসা, ছোটোমা, বৌদিকে জড়িয়ে ধরে নাচছে। দিদান দাঁড়িয়ে নাতনি কোমড় দুলিয়ে চলেছে। মুখে সব হাই হুই বিভৎস আওয়াজ। ইসি, বড়োমাকে জড়িয়ে ধরেছে। সুরো, জ্যেঠিমনির কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে। বেসামালের আর কিছু বাকি নেই। মিলি, টিনা, অদিতি, শ্রীপর্ণা, নীপা, আন্টিকে ধরে নাচছে। মাঝে মাঝে পার্টনার চেঞ্জ হচ্ছে। অনিমেষদারা সোফায় বসে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিছু বলছে হয়তো এখান থেকে শুনতে পাচ্ছি না। যে যেরকম ভাবে পারে মজা লুটে নিচ্ছে।
চিকনা, রতন দেখলাম খাবার সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে।
আবিদ, চাঁদ, চিনা, ওমর, নেপলা কাউকে দেখতে পেলাম না।
মাঝে অনুপদা-রূপায়ণদা একবার অনিকা-অনিসাদের সঙ্গে নেচে চলে গেল।
বুঝলাম মেইন রোল প্লে করছে দুই বোন। বেনারসীকে কোমড়ে আচ্ছা করে পেঁচিয়ে নিয়েছে।
মাঝে মাঝে ছুটে চলে যাচ্ছে অনিমেষদাদের কাছে।
দুদুন দেখো এইভাবে নাচতে হয়, কোমড় দুলিয়ে আবার ময়দানে নেমে পড়ছে।
সোফাতে বসে অনিমেষদা, বিধানদা, দাদা, ডাক্তারদাদা, মল্লিকদা হেসে গড়াগড়ি খায়। সকলেই বেশ মজা করছে। ইকবালভাই, ইসলামভাই হাসতে হাসতে সব দেখা শুন করছে।
আর একপাশে কনিষ্কদের গ্রুপ সেখানে ঝিমলি, সঞ্জয়কে দেখতে পেলাম। অনিকা, অনিসাদের মতো অতোটা উচ্ছ্বাস নেই। তবে মিউজিকের তালে তালে কোমড় দুলে উঠছে।
ছোটোমার সঙ্গে চোখা চুখি হয়ে গেল। হেসে ফেললো।
আমাকে ইশারায় কাছে ডাকলো।
অনিকা দেখে ফেলেছে। ছুটে কাছে চলে এলো। হাত ধরে বললো, চলো একটু নাচবে।
মিত্রা-তনু হাসছে।
তনু গ্লাসটা তাড়ি তাড়ি শেষ কর, এবার আমাদের পালা। মিত্রা বললো।
তোরা নাচছিস তো। বেশ ভালো লাগছে। আমি বললাম।
তুমি চলো। সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, বোন।
অনিসা এবার তাকিয়েছে।
ছুটে চলে এসে তিনজনের হাত ধরে টানা টানি শুরু করে দিয়েছে।
বাধ্য হয়ে ওদের সঙ্গে গিয়ে একটু কোমর দোলালাম আমার চারপাশে ছেলে-মেয়েরা, পিকু, নম্রতা হাসছে। ওদের হাত ধরেও একটু নাচলাম। চারদিকে হই হই করছে সকলে।
কনিষ্করা ছাড়া আর যারা ডাক্তার ছিল তারাও একটু নেচে নিল।
নীরু জড়িয়ে ধরে বললো, গুরু একটু শ্রীপর্ণাকে নিয়ে বল ডান্স কর।
ওর দিকে তাকালাম। চোখে চোখ রাখলাম। মনে হচ্ছে লেগে গেছে।
নীরু আমার চোখের ভাষা বুঝেগেছে।
একটুও খাই নি বিশ্বাস কর।
কনিষ্ক তেড়েগেল। শালা, ছটা অলরেডি মেরে দিয়েছিস।
তোরা ভুল দেখেছিস।
শ্রীপর্ণা আজ থেকে আমার।
যা তোকে দিয়ে দিলাম।
আবার একচোট হাসি।
তনু আমার কোমড়ে চিমটি কাটলো।
মেয়েরা একসঙ্গে কোমড় ধরে নাচলো। তাল দিল মিলি, টিনা, অদিতি, নীপা, শ্রাপর্ণা।
আবার একচোট হই হই।
আমি ছোটোমাকে জড়িয়ে ধরলাম। আস্তে করে বললাম, দিলে তো সব মাটি করে।
তোকে সব বলবো, দিদি যা শুরু করলো।
কেন তোমরা সামালাতে পারলে না।
কি বলবো, তবু তোর নাম বলাতে একটু চুপ করলো।
বড়োমা তখন জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরে আছে। চোখ চক চক করছে। মনে হচ্ছে যেন চল্লিশ বছর আগে ফিরে গেছে। ভীষন ভাল লাগছিল। কনটিনিউ হাত পা শরীর নেড়ে চলেছে।
এই সন্ধ্যেটা যেন মায়াবী। যে যার ইচ্ছে মতন ভাষায় শরীরের প্রকাশ করে চলেছে।
অনিকা এসে বললো, মামা এবার রসোগোল্লা খাওয়া হোক।
ছোটোমা চোখ পাকাল।
না। সেদিনের মতো….।
কিচ্ছু হবে না। অনিকা ঘ্যান ঘ্যান করছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম। চোখদুটো সামান্য লালচে আভা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটা চুলের টুকরো ঘামে জড়িয়ে আছে। ঠোঁটের লিপস্টিক এরিমধ্যে উধাও হয়ে গেছে। অফুরন্ত প্রাণ শক্তি চুঁইয়ে চুইয়ে পড়ছে চোখ মুখ থেকে।
বলো না।
হাসলাম। বাবাকে বল।
অনিকা ছুটে ইসলামভাইয়ের কাছে চলে গেল। ইসলামভাই মনে হয়, না বলছে। জেদা জেদি শুরু করে দিয়েছে। কিছুতেই শুনবে না।
ইসলামভাই আমার দিকে তাকাল। আমি হাসছি।
আবার একচোট শুরু হয়ে গেল।
দেখলাম এবার অনুপদারা সবাই এমনকি মল্লিকদা, ছোটোমা পর্যন্ত ওদের সঙ্গে লেগে পড়েছে।
কে জিতলো বুঝে ওঠার আগেই হই হই শুরু হয়ে গেল।
এই পর্বটাও বেশ ভালয় ভালয় কাটলো।
আমি চারদিক ঘুর ঘুরে দেখছি। বেশ মজা লাগছে। যে যার ইচ্ছে মতো হাঁটছে, চলছে, গান গাইছে। একপাশে দেখলাম সুবীর, অংশু, বরুণদা সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। সবাই চলশক্তি হীন। পায়ে পায়ে ওদের কাছে এলাম।
আজ ওপরে যাচ্ছি না অনি। বরুণদার কথা বেশ জড়িয়ে গেছে। চোখ টেনে টেনে কথা বলছে।
আমি মুচকি মুচকি হাসছি।
সেদিনের থেকে আজকে একটু বেশি খেয়ে ফেললাম।
অংশু, সুবীর মুচকি মুচকি হাসছে।
কি হলো অংশু?
ঠিক আছি। ছোট্ট উত্তর।
সুবীর?
আমি খাই নি।
ওপরে যাবে তো?
না।
কেন।
বেশ ফুর ফুর করে হাওয়া দিচ্ছে।
হাওয়াটা বেশ ভালো লাগছে না?
হ্যাঁ।
বুঝলাম এখান থেকে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা এদের নেই।
তিনজনের চোখেই বোকা বোকা হাসি।
সুরোকে দেখেছো?
যা খুশি করুক।
চিকনা কাছে এগিয়ে এসে বললো, ছোটোমা বলছে তুই আগে বড়োমাকে নিয়ে ভেতরে যা।
কেন কি হলো!
ডাক্তারদাকে পুরো বাটনা বেটে ছেড়ে দিচ্ছে।
কতো নতুন নতুন কথা শুনতে পাচ্ছিস বল।
সে আর বলতে, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল।
আউট হয়েছে কি?
এখনও হয় নি এবার হয়ে যাবে।
কেন বেশি খেয়ে ফেলেছে?
তোকে গুরুমা কিছু বলেনি!
না। তোর গুরুমা জেনে ফেলেছে নাকি!
এখন বহুত সেয়ানা হয়ে গেছে।
তাহলে তোকে পাহাড়াদার রাখলাম কেন।
আমার যাওয়ার আগেই কেশ গড়বড়।
পাঁচু, পচা, বাসুকে দেখছি না।
সব পাল্টি খেয়েছে, সতরঞ্চি পেতে পেছনের ঘরে ঢুকে পড়েছে। তুই আর পাত্তা পাবি না।
মীরচাচা।
মীরচাচা, চাঁদ, চিনা, ওমর সবাই।
আবিদ কোথায়?
আবিদ, রতন, নেপলা সামলাচ্ছে।
ওরা খায়নি।
খেয়েছে অল্প। সবাই শুয়ে পরলে আকণ্ঠ খাবে।
বরুনদা-অংশু-সুবীরকে নিয়ে ওপরে তুলে দে।
কেউ এখন এখান থেকে নড়বে না।
অনিমেষদারা?
একটা বলেছিলি, সব একটার বেশি খেয়ে ফেলেছে।
খাবার খেয়েছে?
সব খেয়েছে। শেষে রসগোল্লা পর্যন্ত খেয়েছে।
বড়োমার ঘরে বাচ্চাদুটো শুয়ে আছে।
জগনভাইকে বসিয়ে এসেছি।
ভাল করেছিস।
তুই এদিকটা গোছা। আমি এবার আস্তে আস্তে সকলকে ঘরে ঢোকাই।
তাই কর।
আমি আস্তে আস্তে অনিমেষদাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। বড়োমার কাঁধে হাত রাখলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে হেসে ফেললো।
ছেলে ছেলে করছিলে, খুঁজে পেয়েছো। ডাক্তারদাদা চেঁচাল।
তোমার মতো অখাদ্য নাকি।
আমার দিকে তাকাল।
কোথায় ছিলি?
তোমার কাছেই ছিলাম।
অনি তোর বড়োমাকে এবার ভেতরে নিয়ে যা। দাদা বললো।
কেন তোমার গা জ্বলছে নাকি।
বড়োমা গলা খেঁকিয়ে উঠলো। দাদা হাসছে।
আজ অনেক পরিশ্রম করে ফেলেছো। কাল সকালে আবার উঠতে পারবে না। গা ব্যাথা করবে।
আমার দিকে বড়োমা তাকাল। পরিতৃপ্ত চোখ মুখ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
এবার চলো।
বড়োমা জ্যেঠিমনির দিকে তাকাল।
দিদি চলো, ছোটো চলরে। সুতপা কোথায় ছোটো?
আমি তোমার পেছেনে।
বৌদি কাছে এগিয়ে এলো। দারুণ এনজয় করলাম বুঝেছিস। এতটা আনন্দ আগে কোনওদিন করিনি।
বৌদি আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
দাদা কিছু বলেনি।
বললেই হলো, দিতাম মুখে ঝামা ঘোষে।
এতো দেখছি তুমি বড়োমার মতো শুরু করে দিলে।
মিত্রা, জ্যেঠিমনিকে জড়িয়ে ধরেছে। তনু ছোটোমাকে।
আন্টি, দামিনীমাসিকে বললাম ভেতরে চলো।
চিকনা এগিয়ে গিয়ে আন্টিকে ধরলো নেপলা দামিনীমাসিকে।
দামিনীমাসি চোখ পাকাচ্ছে।
তখনও অনিসারা ক্যাঁচর ম্যাচর করছে।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, অনিকা এবার প্যাক আপ। আর নয়।
দিদান আর একটু ঝিং কু-রুকুর ঝিং কু-রুকুর হবে নাকি।
অনিসা ছোটোমার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি রাজি তোর বাবাকে বল। ছোটোমা বললো।
সুন্দর এবার সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ করে দাও। আমি চেঁচালাম।
দিচ্ছি তুমি যাও।
আর নয় অনেক রাত হয়েছে।
নম্রতা ছুটে আমার কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো।
আঙ্কেল তোমার জন্য আজ ভীষণ এনজয় করলাম।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। ত্রস্ত হরিণীর মতো চোখ দুটো কাঁপছে।
তোমার ভালো লেগেছে।
ভীষণ। ক্লাবে বহু পার্টিতে এ্যাটেন্ড করেছি এরকম এনজয় করতে পারিনি।
এখন আর নয়, এবার অনিকাদের সঙ্গে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নিয়ে শুয়ে পরো।
কনিষ্কদের মাঠে দেখতে পাচ্ছি না। বুঝলাম ওরা যে যার সটকে পড়েছে।
রতন কাছে এসে বললো, এবার গোছ গাছ শুরু করি।
তোরা শুরু কর, আমি এসে সাহায্য করছি।
তোমাকে আর এই উপকারটুকু করতে হবে না।
একটু করি না। তোদের পাশে থাকলেই কাজ হয়ে যাবে।
বড়োমাদের দিকে তাকালাম।
আর দেরি নয়, রাত হয়ে গেছে এবার চলো।
আমি বড়োমার কোমড় ধরে নিয়ে চললাম। বুঝলাম পায়ের স্টেপিং ঠিক ঠাক পড়ছে না।
একটু খানি এসে, আস্তে করে বললাম।
একটু রয়ে সয়ে আনন্দ করবে তো, দিলে সব গণ্ডগোল পাকিয়ে।
আমি না, ছোটো আর সুতপা। কত করে বললাম বেশি খাস না, নেশা হয়ে যাবে, শুনলে আমার কথা। দামিনীটাও মহা তেঁদড়। তুই যেমন ঢেলেছিলি, তার থেকে বেশে বেশি করে ঢাললো।
ছোটোমা, বৌদি হাসছে।
তনু-মিত্রা জ্যেঠিমনি, আন্টিকে ধরে ধরে আনছে।
আজ তনু-মিত্রা দুজনেই ঠিক আছে। বুঝলাম বেশি খায়নি।
বারান্দায় এসে মিত্রাদের বললাম সব কাপর-চোপর ছাড়িয়ে ঠিক ঠাক করে শুইয়ে দে।
তোকে ভাবতে হবে না, আমরা করে নিচ্ছি। ছোটোমা বললো।
আমি জানি তোমরা পারবে, ওরা একটু সাহয্য করবে।
আমি আবার মাঠে ফিরে এলাম।
দাদাকে বললাম, ঠিক আছো তো?
হেসে ফেললো, বেশি খাইনি।
আমি সে কথা বলিনি। অনেক দিন পর এতটা স্টেইন নিলে শরীরে।
বেশ এনজয় করলাম। জানিষ ওখানকার ডাক্তার বলেছিল যদি ওষুধের মতো রেগুলার একটু খান শরীর ঠিক থাকবে।
আমাকে বলোনি কেন?
ডাক্তার বললো, তোমাকে এই বুড়ো বয়সে আর ওই সব সেবন করতে হবে না। ওদের ওখানকার আবহাওয়া আর আমাদের এখানকার আবহাওয়া সমান নয়।
তুমি কি এই বাড়িতে থাকবে, না ডাক্তারদাদার বাড়িতে?
আজ এই বাড়িতে থাকি। তোর বড়োমা গণ্ডগোল পাকিয়ে বসেছে।
তুমি কিছু বলতে পারোনি?
আমার বলার আগেই কাজ সেরে ফেলেছে। কোনওদিন খায় না। ওখানে গিয়ে ঠাণ্ডর হাত থেকে বাঁচার জন্য একটু আধটু ব্র্যান্ডি জাতীয় খেয়েছিল। তাও আবার ডাক্তার হিসেব করে খাইয়েছিল।
ওই জন্য ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছিলাম।
অনেক দিন এতো আনন্দ করেনি বুঝলি অনি। আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চললো, কোথাও একটু নিয়েই যেতে পারলাম না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিষ্ঠা পেলাম। তখন সখ আহ্লাদ সব শেষ। তবু তোকে পেলাম বলে জীবনটা একটু উপভোগ করতে পারছি।
আমি দাদার দিকে তাকালাম।
শুধু আমি একা বললে ভুল হবে। জানিস অনি, ডাক্তার, অনিমেষ, বিধানবাবু, মল্লিক তোর ছোটোমা সুতপা কতো নাম বলি বলতো।
তোমাদের দেখে আমারও বেশ ভালোলাগছিল।
মদ খাওয়াটা আমাদের সমাজে একটা গর্হিত কাজ, লুকিয়ে চুরিয়ে খেতে হয় জানতুম। তুই সকলের মধ্যে সেই ভেদাভেদ টুকু মুছে দিলি। প্রথমটা একটু সঙ্কোচ লাগছিল বুঝলি। তারপর দেখলাম কেউ যেন মদ খাচ্ছে না। সরবতের গ্লাস খাচ্ছে।
তখন মনটা ভীষণ আনন্দে ভড়ে গেল। মদটা যে এই ভাবে সকলের সঙ্গে খাওয়া যায় সেটা কোনওদিন অনুভব করিনি।
আমি তো ভাবতেই পারছি না অনিকা, অনিসা ওইভাবে নাচতে পারে। সুন্দররা কি সুন্দর নাচছিল, মাঝে মাঝে টিভি প্রোগ্রামে দেখি।
দাদা কথা বলে যাচ্ছে। আমি শ্রোতা।
সেদিন তোর বড়োমা রাতে শোবার সময় বলছিল, অনি কোনওদিন জীবনে একা একা আনন্দ করতে শিখলো না। মেয়েটাকে নিয়ে যে একটু কোথাও ঘুরতে যাবে তারও সময় নেই। মাঝে মাঝে সবাই মিলে হই হই করবে।
তা আমি তোর বড়োমাকে বললাম।
একা একা আনন্দ করা ভালো, না সবার মধ্যে সেই আনন্দের বীজটা বপন করা ভাল, কোনটা ঠিক। তোর বড়োমা চুপ করে রইলো।
আমি বাইরের ঘরে আসতেই দেখলাম ছোটোমা রেডি হয়ে গেছে। বড়োমা মনে হয় ঘরের মধ্যে। আমি দাদাকে সোফায় বসিয়ে বেরিয়ে এলাম। বারান্দা থেকে মাঠে নামতে দেখলাম ছেলেমেয়েরা নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে পিকু, নম্রতাও আছে।
মামা, নেক্সট পার্টির ডেটটা বলো। ঘণ্টা জড়িয়ে ধরলো।
যা এখন গিয়ে ফ্রেস হয়ে শুয়ে পর। কাল কিছু কাজ দেব, করবি।
অফ কোর্স, হোয়াই নট।
সবাই হাসছে।
ওরা পাশ দিয়ে নিজেদের মতো নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল। আমি এগিয়ে যেতে গিয়ে দেখলাম অনিমেষদারা সবাই ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। সবাই বেশ স্বাভাবিক। ডাক্তারদাও সঙ্গে আছে।
কাছে যেতে প্রবীরদা জড়িয়ে ধরলো।
অনেকদিন পর একটু নিখাদ আনন্দ করলাম বুঝলি।
কোনও অসুবিধে হয়নি?
একবারে না।
রূপায়ণদা হাসছে।
তোর জন্য একটা কাজ ঠিক করেছি।
খুব ভালো হয়, দাও। কাল থেকে লেগে পরি।
আমাদের সরকারী হোটেলে একটা বার ম্যানেজারের পদ খালি আছে। তোকে এ্যাপয়েন্টমেন্ট দেব ভাবছি।
ভাবছো কেন দিয়ে দাও। কাল থেকেই জয়েন করবো।
সবাই হাসছে।
প্রীরদার দিকে তাকালাম।
বৌদিকে দেখতে পাচ্ছি না।
বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।
কাল তোমার একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে।
অনুপ এই প্রশ্নের উত্তরটা তুই দে। প্রবীরদা বললো।
বিধানদা, ডাক্তারদাদা মুচকি মুচকি হাসছে।
দাঁড়া দাঁড়া উত্তর দিলেই হবে না। ও নিশ্চই একটা প্ল্যান ভেঁজে রেখেছে।
অনুপদা, অনিমেষদার দিকে তাকাল।
বুঁচকি, অনিকা কবে যাচ্ছে দাদা।
পর্শুদিন।
অনুপদা আমার দিকে তাকাল। আমি হাসছি।
কাল তোর কখন এ্যাপয়েন্টমেন্ট চাই।
চারটে থেকে আটটা। প্রথম দু-ঘণ্টা তোমাদের সঙ্গে, শেষের দু-ঘণ্টা তোমাদের আমলাদের সঙ্গে। তাছাড়া ওই সব দফতরের মন্ত্রীরা থাকলে ভালো হয়।
দাদা চলুন দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। ঘণ্টা চারেক ঘুমিয়ে নিই, কাল সকাল থেকে প্রোগ্রাম সেট করবো।
অনিমেষদা, অনুপদার কথায় হাসছে।
তুমি ওকে একবার….।
ওঃ ওকে আর নতুন করে জিজ্ঞাসা করে লাভ আছে? লাস্ট আপডেট এসে গেছে। কালকে মিটিং করে যা বোঝার বুঝে ফাইল রেডি করে বুঁচকিদের হাতে পাঠাবে। উনিও সাতদিন সময় পাবেন। তারপর এখানে এসে একপ্রস্থ মিটিং হবে।
অনুপদা আমার দিকে তাকাল।
কিরে আমি ঠিক বলছি?
আমি হাসছি।
তুই ওকে বেশ ভাল বুঝতে পারছিস আজকাল। প্রবীরদা বললো।
এর জন্য কতো গুপ্তচর লাগাতে হয়েছে জানিস।
টিম ওয়ার্ক। রূপায়ণদা হাসতে হাসতে বললো।
একবার নিরঞ্জনদাকে বলো কালকে আসতে। অনিমেষদার দিকে তাকালাম।
অনিমেষ এখন চলো, অনুপ ঠিক বলেছে, কাল সকালে চিন্তা-ভাবনা করবো। মনের মধ্যে যে আবেশটা আছে এই মুহূর্তে নষ্ট করতে চাই না। ডাক্তারদা বললো।
সামন্তদা আমি রূপায়ণ ফিরবো না। আপনার একটা ঘর দখল করবো। অনুপদা বললো।
ডাক্তারদাদা হাসছে।
অনিমষদারা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। আমি রতনদের কাছে এলাম। গোছ গাছ চলছে।
চিকনা কোথায় রতন?
বরুণদাদের ওপরে নিয়ে গেছে।
ইসলামভাই, ইকবালভাই?
আজকে পরিশ্রমটা একটু বেশি হয়ে গেছে। ঘরে চলে গেল।
সব ঠিক আছে?
হ্যাঁ।
সাগর এসেছিল?
আসবে না মানে, পুকুত করে এসে ফুকুত করে খেয়েদেয়ে চলে গেছে। নিজেদের মধ্যে একটু কথাবার্তা বললো দেখলো সেইভাবে কেউ পাত্তা দিল না। চলে গেল।
মেয়েকে কিছু বলেনি।
কি বলবে। বিকেলে অনিমেষদা যা ঠাটা পোড়া দিয়েছে, আর মুখ আছে।
তোদের মেটিরিয়াল।
এইট্টি পার্সেন্ট দিয়েছে, বাকিটা সাতদিন সময় চেয়েছে।
সুবীরের সঙ্গে কথা বলেছিস।
সামান্য কথা হয়েছে। বলেছে, কাল তোমার সঙ্গে একবার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করবে। হিমাংশুদাকে একবার আসতে বলেছে।
হিমাংশু এসেছিল?
তুম কি কাউকেই দেখনি!
খেয়াল করিনি।
বুঁচকির সঙ্গে নাচলো।
নেচেছে!
কে নাচেনি বলোতো। দাদাভাইকে নিয়ে অনিকা যা নেচেছে না আবিদ মুভি করেছে তোমায় দেখাব।
আয়েশা আসেনি।
শরীরটা গড়বড় করেছে।
আবার কি হল!
এই সময় যা হয়। নীরুদা দেখে এসেছে। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
নেপলা কোথায়?
আবিদকে ছাড়তে গেছে।
ওমররা আছে না চলে গেছে।
সব বেহুঁশ। সেদিন কম খেয়েছিল, আজ একবারে গলাপর্যন্ত।
কিছু খেয়েছে না খালি পেটে।
বিরিয়ানি, চিকেন চাঁপ এক ফোঁটা নেই। কয়েকটা কাটলেট পরে রয়েছে। মিষ্টি আছে।
আইসক্রীম?
কাপ শেষ হয়েগেছিল, বাধ্য হয়ে বার কিনে নিয়ে এসেছিলাম।
আছে না শেষ?
হাফ পরে আছে।
যা একটু কেটে নিয়ে আয় দুজনে খাই। যারা কাজ করেছে তাদের দিয়েছিস?
কেউ না খেয়ে নেই।
হ্যাঁরে ডাক্তারদাদারা ঠিক ছিল।
দারুণ মেজাজে ছিল। বড়োমার নাচতো দেখোনি। তখন যেটা চিকনাদা আনল তুমি কি ভেতরে গিয়ে বড়োমাদের খাইয়েছিলে?
বুঝলি কি করে!
আজকে ম্যাডাম তনুদি মাত্র একটা করে খেয়েছে। বাকি সময়টা শুধু তোমাকে লক্ষ্য করছিল।
নেপলা, চিকনা এলো। রতন আইস্ক্রীম নিয়ে এলো।
কিরে রতনদা আইসক্রীম নিয়ে এলি! নেপলা বললো।
দাদা চাইল।
এত রাতে তোমার আইসক্রীম খাওয়ার সখ হলো!
রতন বললো হাফ পড়ে আছে, তাই বললাম নিয়ে আয়।
নেপলা হাসছে। রতনের দিকে তাকাল।
রতনদা, হিমাংশুদা কাল বারোটায় আসবে। সুবীরদাকে বলে দিতে বলেছে।
তুই কাকে ছাড়তে গেছিলি, হিমাংশু না আবিদ?
দু-জনকে।
চিকনা।
বল।
কাল কখন যাবি।
ভেবেছিলাম সকালে যাব। অনিমেষদা বললো, তুই কালকের দিনটা থেকে যা পর্শুদিন যাস।
বুঝেছি। রতন, কাল বাড়িতে রান্নার ঝামেলা করিস না। বাইরে থেকে আনার ব্যবস্থা করিস। কাল অনেকে আসবে। আর দেরি করিস না, চল একটু শুয়ে পরি।
তুমি যাও, আমি চিকনাদা রতনদা এক ফোঁটা মুখে দিইনি। এখন একটু….।
কাল সকালে যাতে উঠতে পারিস সেরকম করে মুখে দিস।
তোমাকে আর বলতে হবে না তুমি যাও। নেপলা আমাকে ঠেলে এপাসে পাঠালো।
আমি বাগান পেড়িয়ে নিজের ঘরের সামনে এলাম। দরজা ভেজান। নক করতেই ভেতের থেকে মিত্রার গলা পেলাম।
চলে আয়। ভেজিয়ে রেখেছি।
আমি ভেতরে এলাম। দেখলাম মিত্রা একা দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে।
কিরে আর সব গেল কোথায়?
সব ছোটোমার ঘরে।
সেদিনের মতো?
প্রায়।
তনু কোথায়?
বাথরুমে। আমার জন্য একটু নিয়ে আসতে পারতিস।
কি বলতো?
আইসক্রীম।
তুই দেখেছিস। হাসলাম। বলতে পারতিস, দিয়ে যেতাম।
তোর ইচ্ছে থাকলেও হতো না।
আমারটাই দিতাম।
সবই তো দিয়েছিস নিজের বলতে কিছু আছে?
মিত্রার মুখের দিকে তাকালাম। চোখ দুটো অনেক কথা বলছে। হাসি হাসি মুখটা। চুলটা তিন ভাগে ভাগ করে বিনুনি করছে।
তুই আছিস।
মিত্রা হসলো।
তুই, তনু পাশে থাকলেই যথেষ্ট। আমার আর কিছু চাই না।
মেয়ে, অনিকা।
হেসে ফেললাম।
বাবাঃ কখন এলে?
তনু বাথরুমের দরজায় মুখ বাড়িয়ে।
ওর দিকে তাকালাম। হাসছে। বুকের ওপর টাওয়েলটা বাঁধা। যতটুকু ঢেকে ঢুক রাখা যায়।
মিত্রাদি নাইট গাউনটা দাও তো।
চলে আয়।
না। দাও না।
ঢং।
তুমি ওদিকে ফিরে তাকও।
তনু আমার দিকে তাকায় আর হাসে।
দাঁড়াও আমি বাথরুমে যাচ্ছি। তুমি বেরিয়ে আসবে।
তনু বাথরুমের গেটের আড়ালে শরীর ঢেকেছে। মাথার চুলটা চূড়ো করে জড়িয়ে নিয়েছে। কপালে যে দু-একটা চুল জড়িয়ে আছে তাতে শিশির দানা। অনাবৃত বুকের গভীরতা ওইটুকু টাওয়েলে ঢাকতে পারেনি। একসময় তনুর শরীরটা নেশা ধরাতো। এখনও যে ধরায় না তা নয়। তবু একটা সঙ্কোচ মনের মধ্যে অবিরাম কাজ করে চলে। মিত্রা অনেকটা তা ভেঙে দিয়েছে। আমি পাজামা-পাঞ্জাবী খুলে টাওয়েলটা পরে বাথরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম।
ওরকমভাবে তাকিয়ে থাকার কি আছে। কোনওদিন দেখনি যেন।
তনু সামান্য সরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলো আমি বাথরুমে ঢোকার মুহূর্তে টাওয়েলটায় টান মারলাম। অর্গল খসে পরলো। তনু হাঁই হাঁই করে উঠলো আমি বাথরুমের দরজা বন্ধ করলাম। ভেতর থেকে স্পষ্ট শুনলাম, মিত্রা জোড়ে জোড়ে হাসছে।
তনু গজরাচ্ছে।
তুমি বেরও দেখবে তোমারটাও খুলে দেব।
আর তরপে লাভ নেই। নে চুল আঁচড়ে নে।
শয়তান। বুড়ো হয়েছে এখনও স্বভাব যায়নি।
আমি ধীরে সুস্থে বাথরুমের কাজ সেরে বেরিয়ে এলাম।
তনু আলমাড়ির আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ক্রিম লাগাচ্ছে। মিত্রা বিছানায় হেলান দিয়ে আধ শোয়া অবস্থায়। তনু চেঁচিয়ে উঠলো।
মিত্রাদি টাওয়েলটা খুলে দাও তো।
তুই দে। তোরটা খুলেছে।
আমি হাসছি।
খাটের এক কোনে রাখা আমার পাজামা পাঞ্জাবী নিয়ে পরতে শুরু করলাম।
মিত্রার দিকে তাকাচ্ছি। মিত্রা হাসছে।
আজ ঘুমোস না অনেক জরুরি কথা আছে।
আমি চুপচাপ।
নিজের কাজ গুছিয়ে টাওয়েলটা তনুর গায়ে ছুঁড়ে দিলাম।
তনু আবার ক্যাচ ক্যাচ করে উঠলো।
আজ মনে হচ্ছে তোরা কম খেয়েছিস।
তাতে তোর অসুবিধে।
না ভেবেছিলাম আজ আয়েস করে একটু পাহাড়-পর্বত-গিরিখাত-আগ্নেয়গিরির দর্শন করতাম।
সে তুই চাইলে এমনিই দর্শন করতে পারিস।
আমার মতো করে টর্চ জেলে জেলে দর্শন করতে পারবো না।
তনু দুম করে পিঠে একটা কিল মারলো।
পাহাড়, পর্বত, গিরিখাত….।
আমি তেড়ে গেলাম।
ঠিক আছে ঠিক আছে আর হবে না।
আমি খাটে উঠে মিত্রার পাশে শুয়ে পড়লাম।
তনু ছোটো লাইটটা আজ অফ করে দে। মিত্রা বললো।
কেন?
নিচে সব আছে।
আমি টান টান হয়ে শুয়ে পড়লাম।
মিত্রা আমার দিকে ফিরে বুকে উঠে এলো।
সারাটা দিন আজ বেশ ভালই কাটালি?
তোদের খারপ কেটেছে।
আমি একবারও সেই কথা বলেছি।
তাহলে আমার ভালো কাটলো এটা বলছিস কেন?
মিত্রা আমার নাকটা চেপে ধরে নাড়িয়ে দিল।
এই শুরু করলি কিন্তু। আমি কিছু করলে দোষ দিবি না।
কি বক বক করছেগো মিত্রাদি।
তনু ধপ করে আমার পাশে শুয়ে পরে আমার ওপর ঠ্যাং তুলে দিল।
আমি তনুর দিকে তাকালাম।
সারাদিন অনেক হাঁটা হাঁটি হয়েছে, ব্যাথা করছে।
মিত্রা আমার মাথাটা ওর বুকের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। ওর ভারি বুকের মধ্যে আমার নাক মুখ আটকে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বুঝতে পারছি তনু খোঁচাখুঁচি শুরু করে দিয়েছে। আমি কিছুক্ষণ ছটফট করার পর মিত্রা ছেড়ে দিল।
হাঁপিয়ে পড়েছি।
হাসতে হাসতে বললাম, তোরা কিন্তু আমাকে শারীরিক ভাবে নির্যাতন করছিস। আমি সারা বাংলা পীরিত পতি সমাজে দরখাস্ত করবো।
দু-জনে হেসে আমার বুকের ওপর লুটোপুটি খায়।
সেটা আবার কি রে? মিত্রা হাসছে।
একটা নতুন অর্গানাইজেশন। যেসব স্ত্রী তার স্বামীদের ওপর অত্যাচার করে এই সোসাইটি সেই সব স্বামীর হয়ে কোর্টে কেশ করে।
তুই জানলি কোথা থেকে?
টনা বলছিল।
টনা!
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছি।
টনার শালি দীপা ভীষণ খাণ্ডানী। ও ওর বড়টাকে ধরে বেধড়ক মারধোর করে।
যাঃ।
হ্যাঁরে। মেয়েকে জিজ্ঞাসা করিস। গত সপ্তাহে দু-জনকে নিয়ে একবার গেছিলাম। অনিকা যে ঘরে থাকতো সেই ঘর থেকে মালপত্র আনতে। গিয়ে দেখি কিছু নেই। বললো ঘরে যা কিছু আছে সব টনামামা আর মনামামার। আমার কয়েকটা জামা-কাপর আছে।
ওদের সঙ্গে বসে কথা বলছিলাম।
মালতী এসে মুড়ি দিয়ে গেল। বললো তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে। তুমি মুড়ি খাও, আমি ডালটা শাঁতলে আসি।
তিনজনে বসে বসে মুড়ি খাচ্ছি। টনা এলো। পরকে পর দীপা এলো ওর বড় এলো।
আরও চার পাঁচজন।
টনা বললো, দাদা তোমাকে একটা বিহিত করতে হবে।
কার কি সমস্যা হলো?
আমার শালিটার।
কি হলো আবার!
ওর ভাতার বলেছে কেশ করবে।
দু-জনকে কাছে ডাকলাম। বল কি হয়েছে।
বলতে বলতে দু-জনে ঝগড়া শুরু করে দিল। মেয়ে অনিকা শুধু হেসে যায়।
দীপা মাঝে একবার ধমকে উঠেছিল দিদিমনি তুমি হাসবে না।
মোদ্দা কথা দীপার বড় মাঝে মাঝে মাসিদের মতো পাড়ায় যাতায়াত করে। নতুন নতুন জিনস-পত্র শিখে আসে, এবার রাতে মদ খেয়ে দীপার শরীরে ওঠে। যখন ওইসব করতে যায় দীপা বুঝতে পারে, ওর পেট থেকে কথা বার করে। মদের ঘোরে ওর বড় সব বলে। দীপা উত্তম মধ্যম ঝাঁটার বাড়ি মেরে ঘর থেকে দূর করে দেয়। তাই দীপার বড় নতুন বিয়ে করবে ওকে ছেড়ে দেবে।
দু-জনে হেসে আমার বুকে মুখ লুকিয়েছে।
সত্যি তুই পারিস বুবুন।
মেয়ে অনিকা সাক্ষী। তোরা ওদের জিজ্ঞাসা করিস।
তারপর কি হলো?
সমস্যার সমাধান করলাম।
কি করলি একটু শুনি।
ওরা আমাদের মতো শিক্ষিত নয়। তাই যা বিধান দিবি খুব সহজে মেনে নেয়।
তনু হাসছে।
দীপাকে বললাম ও যেমন অন্য মেয়ের কাছে যায় কালকে থেকে তুই তোর পছন্দের পুরুষের কাছে যাবি। যদি তোকে কিছু বলে আমাকে বলবি।
তখন ওর বড় বলে আমার বিয়ে করা বউ অন্য পুরুষের কাছে কেন যাবে?
তুই যাস কেন?
আমি পুরুষ মানুষ। ও মেয়ে মানুষ।
তাতে কি হয়েছে, তুই গেলে দোষ নেই ও গেলে দোষ।
ঠিক আছে আজ থেকে যাব না। ও মদ খেতে বারন করে।
খাবি না। ওই পয়সায় মাংস কিনে খাবি।
ও বলে তেল বেশি লাগে।
তেলের পয়সা দিয়ে দিবি।
তেলের পয়সা দিয়ে দিই। ও সেই পয়সা বাপের বাড়ি পাঠায়।
দীপা তেলে-বেগুনে জলে উঠলো। সে কি গালাগাল। একটু থামা থামি হতে দীপাকে বললাম, ও মদ খেয়ে ঘরে ঢুকলেই নুন জল গুলে ওর বুকের ওপর চেপে বসে, সাঁড়াশি দিয়ে জিভ টেনে বার করে গলায় ঢেলে দিবি।
এই তোর বিধান।
হ্যাঁ।
তাতে শান্তি ফিরলো।
অন্ততঃ কেশ করেনি। বাকিটা কম বেশি থাকবে। ওই ব্যাপারগুলো ওদের অভ্যাস হয়ে গেছে।
ট্র্যাডিসন্যালি।
হ্যাঁ। কেশ-কামারি পুলিশকে ওরা একটু বেশি ভয় পায়।
আজ সাগর, দিদিভাই জ্যেঠিমনিকে কি বলেছে শুনেছিস।
শুনলাম ওদের সঙ্গে বসে আলাদা কথা বলছিল।
সাগর চাইছে না, নম্রতার সঙ্গে পিকুর বিয়ে হোক।
এ তো ভাল কথা। আমি নড়ে চড়ে উঠলাম।
নম্রতা বেঁকে বসেছে। সে পিকুকে বিয়ে করবে।
হাসলাম।
সাগর তো চেয়েছিল মেয়ের সঙ্গে পিকুকে ফাঁসিয়ে দিতে।
তখন তো জানতো না, অনি ব্যানার্জী উইলে এই সব প্যাঁচ মেরে রেখেছে।
এখন জেনেছে।
মনে হয় জেনেছে।
জ্যেঠিমনি ইসি কি বললো।
কনটিনিউ তোর ঘারে বন্ধুক রেখে আওয়াজ করে গেছে। তুই যা ডিসিশন নিবি, তাই সবাই মেনে নেবে।
তখন কি বলে।
মেয়ের কোনও ক্ষতি হলে দিদিভাই, বরুণদাকে ছাড়বে না।
ধমক ধামক দিয়েছি নাকি!
ঠিক ধমক ধামক না। প্রচ্ছন্ন হুমকি বলতে পারিস।
ইসি কি বলেছে?
ওটা আপনার আর অনির ব্যাপার। তাছাড়া আপনার মেয়ে এ্যাডাল্ট আমার ছেলেও এ্যাডাল্ট আইনতঃ ওরা এখন স্বামী-স্ত্রী। ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ওদের ব্যক্তিগত, মানা না মানার ব্যাপারটা আমাদের। পারলে আপনি আপনার মেয়েকে বোঝান।
তারপর।
দিদিভাই ওখানেই চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিয়েছে। তারপর সাগর নিচে এসে অনিমেষদার সঙ্গে বসেছিল।
বরুণদাকে কিছু বলেছিস?
সে বেচারা টেনশনে কাবু। আজ একবারে আকণ্ঠ খেয়েছে। আমাকে বললো, তুমি আজ আমার দিকে তাকিও না। আজ আমার এইটা বড্ড দরকার ছিল।
অনিমেষদাকে কি বললো?
তখন আমি, দিদিভাই, জ্যেঠিমনির সঙ্গে বসে ওপরের ঘরে কথা বলছিলাম। তনু সব শুনেছে।
তনুর দিকে তাকালাম।
খুব শোনার ইচ্ছে না।
লাইট পোস্টের মতো ঠ্যাংটা আমার ওপর অনেকক্ষণ তুলে রেখেছো। পা-টা ঝিঁ ঝিঁ ধরে গেছে।
বেশ করেছি।
আমি কিন্তু এখুনি সরাবার ব্যবস্থা করতে পারি।
আমাদেরও গায়ে শক্তি আছে।
কেশ করবো।
মিত্রা আমার ঠোঁট দুটো চিমটে ধরলো।
আমি হঁ হঁ করছি।
আর বলবি।
মাথা দোলালাম, না।
মিত্রা ছেড়ে দিল।
বুঝতে পেরেছি দু-জনে মিলে পালা করে ষড়যন্ত্র রচনা করছিস।
তোর জন্য আজ একফোঁটাও মুখে দিই নি।
শুঁকেছিস। আমার সঙ্গে খেয়েছিস। এখনও মুখ থেকে গন্ধ পাচ্ছি।
শুধু ছুঁয়েছি।
হাত দুটো একটু তলা দিয়ে ঢোকাই শরীরটা একটু তোল।
দু-জনেই সামান্য উঠলো আমি হাত দুটো ওদের দুই শরীরের তলা দিয়ে চালান করে দিলাম।
দু-জনে আমার ওপরে উঠে এলো।
এবার বলো তনু।
অনিমেষদা খুব ঝেড়েছে সাগরকে।
কেন!
কথাবার্তা শুনে প্রথমে যেটা মনে হলো, ও পার্টির খুব ভালো ডোনার।
এটা তুমি ঠিক ধরেছো।
তাছাড়া পার্টির সব লবিতেই ওর বেশ ভালো দহরম মহরম।
এটাও একদম ঠিক কথা।
ব্যবসায়ীরা যে ভাবে কথা বলে, সেই ভাবেই ও অনিমেষদার সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছিল।
আর কে ছিল?
আন্টি, ডাক্তারদাদা, বিধানদা, দাদা, মল্লিকদা। আর সবাই যেমন ও ঘরে ঘোরা ঘুরি করে সেরকম।
আমি তনুর দিকে তাকিয়ে।
প্রথমে তোমার নামে বললো, তুমি খুব নোংরামো শুরু করছো জায়গাটা নিয়ে।
তুমি অনির নামে এফআইআর করছো না কেন। অনিমেষদা একটু রেগে গেল।
সেটা করলে ওনার ক্ষতি হবে।
তাতে তোমার কি।
আপনারা আছেন।
জমিটা যদি সত্যি তোমার হয় এত কথা বলার কোনও দরকার নেই। তুমি অরিজিন্যাল কাগজ দেখিয়ে দাও সব মিটে যাবে, ও নিশ্চই তোমার জমি জোড় করে নিতে চাইছে না।
আমার শ্বাশুড়ীমাকে নিয়ে এসে অনিবাবু একটা গেম খেলতে চাইছেন।
তুমি আজ ঠিক ব্যাবসায়ীর মতো কথা বলছো না।
উনি এটা খুব অন্যায় করছেন।
তোমার শ্বাশুড়ীমাকে বলো। উনি তো তোমার সামনে বসে আছেন।
উনি এখন আমার থেকে অনিবাবুকে বেশি ট্রাস্ট করছেন।
তারজন্য আমি কি করতে পারি।
আপনি একটু মধ্যস্থতা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে দিন।
তুমি যখন এখানে এসেছো, সব কিছু জেনে বুঝেই এসেছো। মিটিয়ে আমি দেব, কিন্তু তার বিনিময়ে ও যদি অহেতুক কিছু চেয়ে বসে তুমি সামলাতে পারবে।
কেন চাইবেন, ওনার পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দিলেই হলো।
অনিমেষদার তখন কি ফুলে ফুলে হাসি।
ডাক্তারদাদা প্রথমে একটু অবাক হয়েছিল। আন্টিও অবাক। বিধানদা দেখলাম মিটি মিটি হাসছে।
সাগর তুমি ভুল জায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছো, আমি যতদূর জানি, তোমার সঙ্গে ওর কোনও শত্রুতা নেই। তবু তুমি দৌড়ো-দৌড়ি করছো।
আপনি আমাকে একবার বোঝার চেষ্টা করুণ।
সামন্তদা আপনি ঠিক ধরতে পারছেন না, কেন আমি হাসছি। অনিমেষদা বললো।
ঠিক তা নয় অনিমেষ। আমার সব কিছু কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে। সকালে কথা বলতে বলতে ও ঘরে সাগর অনির পা ধরে ফেললো। অনেক কিছু বললো। বললো সব মিটিয়ে নেবে। আবার এখন অন্যরকম দেখছি।
(আবার আগামীকাল)