সব দেশেই নানা সময় বিভিন্ন প্রণয় কাহিনি জনপ্রিয় হয়েছে। তবে আধুনিক সময় দেবদাস কাহিনি বিপুল জনপ্রিয়তার পাশে দাঁড়াতে পারে এরকম কোনও গল্পের কথা সহজে বলা যাবে না। একসময় লায়লা-মজনু, হির-রাঞ্ঝা, সোনি-মাহিওয়াল—এঁদের প্রণয় গল্প গ্রামে-গঞ্জে, ঘরে ঘরে মানুষের কাছে শোনাতেন ব্যালার্ড গায়করা। ইউরোপে এঁদের ত্রুবাদুরও বলা হতো।
সে সময়ের বিখ্যাত পত্রিকা ভারতবর্ষে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬—১৫ জানুয়ারি ১৯৩৮) উপন্যাস দেবদাস। গল্পের ধরনটা আজ সবার জানা। মুখুজ্জে বাড়ির দেবদাস মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে চক্কোত্তি বাড়ির পার্বতী চক্রবর্তীর প্রেম। অল্পবয়স থেকেই এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দুই বাড়ির বয়জ্যেষ্ঠদের প্রাথমিক সম্মতি ছিল। ক্রমশ, জটিলতা বাড়লো, তারপর দুই পরিবারের মধ্যে সেতুবন্ধন যেন অসম্ভব হয়ে উঠলো। কিন্তু দেবদাস-পার্বতীর এই প্রণয় বজায় থাকে। তারপর পারিবারিক চাপে পার্বতী অন্য ব্যক্তিকে বিবাহ করেন। আর এখানেই শুরু হয় দেবদাসের যন্ত্রণার দিন-রাত্রি। দেবদাস ক্রমশ মদ্যপানে আসক্ত হন। এইসময় তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় ফুর্তিবাজ চুণীবাবুর। এর মাধ্যমে দেবদাস যান চন্দ্রমুখীর কাছে। চন্দ্রমুখী একজন বারবধু অথচ দেবদাসের প্রতি তিনি নিবেদিতপ্রাণ। এ এক আশ্চর্য জগৎ—এখানে নারীরা কেবলই সর্বস্ব দিয়ে পুরুষকে ভালোবাসতে চান। প্রতিদানে কিছুই চান না। চন্দ্রমুখী এবং পার্বতী একটি বিষয়ে পরস্পরের প্রতি সহানুভুতিশীল যে দুজনই ভালোবাসেন দেবদাসকে। দেবদাস মুখোপাধ্যায়ের পরিচিতিতেই যেন তাঁদের পরিচয় গড়ে উঠেছে। দেবদাসের সাপেক্ষেই পার্বতী এবং একই পুরুষের সাপেক্ষে চন্দ্রমুখীও। গৃহবধূ হন কিংবা জনপদবধূ তাঁদের জীবনে একটাই অভিমুখ দেবদাসকে ভালোবাসো। এই কাহিনির আজ ঠিক একশো বছর পূর্তি হচ্ছে। অথচ এখনও সতেজ, প্রচণ্ড জনপ্রিয় দেবদাস, শরৎচন্দ্রের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস জনপ্রিয় হয়েছে যেমন—বিপ্রদাস, শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন, বৈকুণ্ঠের উইল, বড়দিদি, মেজদিদি, পথের দাবী, পরিণীতা এরকম অনেক নাম করা যায়। কিন্তু দেবদাস একেবারেই আলাদা। পথের দাবী উপন্যাসের সব্যসাচী নিয়ে অনেক শরৎ-অনুরাগীও অতিকথা দোষের প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু দেবদাস উপন্যাসের এই বিন্যাস কোনও প্রশ্নের মুখে পড়ার কথা আলাদা, একের পর এক ফিল্ম নির্মিত হয়েছে দেবদাসকে ঘিরে। কে অভিনয় করেননি দেবদাসের চরিত্রে। সে প্রিন্স প্রমথেশ বড়ুয়া হন, কুন্দললাল সায়গল, দিলিপকুমার থেকে শুরু করে আজকের শাহরুখ খান কিংবা অভয় দেওল, বাংলায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়—নামের তালিকা দীর্ঘই হবে।
শরৎবাবু এই উপন্যাস নাকি ছাপতে দিতে চাননি। রেখে দিয়েছিলেন পরে প্রকাশ করবেন বলে। লিখেওছিলেন অল্পবয়সে। এই উপন্যাসের বিষ্ফোরক ক্ষমতা সম্পর্কে খুব কিছু উল্লেখ করেননি এই কথাশিল্পী। এক ধরনের হিরোইক বা নায়কোচিত ধরন যোগ করলেন শরৎবাবু। দেবদাস উপন্যাসের এক জায়গায় বলা হয়েছে, কিছু মানুষ থাকেন যাদের সব কিছুই কেমন ভাসাভাসা। কোনও বিষয়েই কোনও আঁট নেই। একটি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যেতে যাঁদের খুব কিছু বিচার-বিবেচনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। তরল সামাজিকতায় এদের মর্মস্থল ভরা। একবার মনে হলো প্রেম, কখনও নেশা—আবার এই দুইয়ের মিলমিশ। নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে নিজেরাই যেন কেমন দ্বিধায় ভোগেন। এইসব মানুষের প্রতিনিধি দেবদাস। মজার কথা হলো শরৎবাবুর প্রশস্তি করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বেশিরভাগ মানুষের মনের ধরনটা এঁর গোচরে। সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠিতে বললেন, কবি আসলে চতুরচূড়ামণি—ঘুরিয়ে খোঁচা দিতে সিদ্ধহস্ত।
তবে দেবদাসের জনপ্রিয়তার পতাকা আজও সমান উজ্জ্বলতায় বজায় রয়েছে। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে প্রবেশ করার যে আয়াস সেটার ভার বইতে কেউ পারুন বা না পারুন, আমরা শীঘ্রই খবর পাবো, দেবদাস কাহিনির নতুন কোনও ফিল্মি সংস্করণ শীঘ্রই মুক্তি পাবে। ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও নতুন উপস্থাপনে মানুষের কাছে শতবর্ষে পৌঁছে যাবে শরৎবাবুর দেবদাস।
Amar mot e “grihodaha” all time best!!!kano I otake niye movie kara hoy na,setai bujhlam na!!!