উত্তর কলকাতার বিধান সরনি, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, বিবেকানন্দ রোড, ভূপেন বোস অ্যাভিনিউ প্রভৃতির ঐতিহ্যশালী রাস্তার দু-পাশের বাসিন্দারা বেশ কিছুদিন হল সকাল থেকে সারা রাত ভূকম্পনের স্বাদ অনুভব করছেন। এই রাস্তাগুলির দু-দিকে যেসব বাড়িঘর রয়েছে, সেগুলির গড় বয়স শতাব্দী প্রাচীন। এলাকাবাসী আমজনতার অভিযোগ, কলাকাতার বুকে ভারী যানবাহন চালানোয় যে লাগাম পড়ানোর কথা বারবার শোনা গোলেও আদতে কিছু হয়নি। প্রত্যহ রাত বাড়তে শ্যামবাজার থেকে বউবাজার, মানিকতলা থেকে গণেশ টকিজ মোড় প্রভৃতি রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ পেট্রোলিং থাকলেও তাদের খুশি করে অবাধে বড়ো বড়ো ভারী ভারী ট্র্যাক, ডোর-টু-ডোর মাল পৌঁছানোর বিশাল আকৃতির সিন্দুক গাড়ি রাস্তায় অবলীলায় অতিক্রম করছে। তাদের কম্পনে রাস্তার দু-দিকের বাড়িঘর প্রতিদিন থরথর করে কাঁপছে এবং অনেক বাড়িতে ফাটল ধরেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ২৫ এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী বিবেকানন্দ রোডে দু-দিকের বাড়িগুলি। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি বাড়ির বারান্দার প্রাচীন পলেস্তরা খসে পড়েছে। কংক্রিটের চাঙর ভেঙে পথচলতি মানুষের মাথায় পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এরপরেও করোর কোনও টনক নড়ে নি। ১২, ১৪, ১৬ চাকার ট্রাক লরি, কন্টেনার, ট্রেলার প্রতিদিন বিবেকানন্দ রোড কাঁপিয়ে যাতায়াত করছে। বাড়ি বাড়ি ফাটল বাড়ছে। এরফলে যে কোনও দিন বড়ো রকমের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আতঙ্কিত বাড়ি ওয়ালারা ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন, যে তারা নিয়মিত কলকাতা পুরসভার কর দেন। অথচ তাঁদের বাড়ি সম্পত্তির নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিকে না পুরসভা না প্রশাসন কারুরি কোনও নজর নেই। ভারী ট্রাক লরির যাতায়াতের ফলে বিবেকানন্দ রোডের ম্যাস্টিক অ্যাসফলটের চাদর মাঝে মধ্যেই উঠে গিয়ে এবরো খেবরো গর্ত হয়ে উঠেছে। এই গর্তগুলিতে ভারী ট্রাকের চাকা পড়ে কম্পন বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবেকনন্দ রোডের মতো পুরনো রাস্তার বহন ক্ষমতা এবং আশপাশের বাড়িগুলি বয়সের কথা চিন্তা না করে যদি এইভাবে যথেচ্ছ ভারী ট্রাক লরি চলতে দেওয়া হয় তাহলে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। ওই খানা খন্দর গর্তগুলি ভূমিকম্পের এপিসেন্টার। পুরসভার পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে গর্ত বোঝাইয়ের প্যাচ ওয়ার্ক হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। কিছুদিন পরেই সেই প্যাচ ওয়ার্ক উঠে গিয়ে অবস্থা যে কে সেই দাঁড়াচ্ছে। ইতি মধ্যেই এই ভয়ঙ্কর আতঙ্কের কথা জানিয়ে বিবেকানন্দ রোডের বেশ কিছু বাড়িওয়ালা ও বাসিন্দা অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক তথা মন্ত্রী ডা. শশী পাঁজা, কলকাতার উপ নগরপাল (ট্রাফিক), কলকাতা পুরসভার কমিশনার, ৪নং বরো এলাকার বর্তমান কো-অর্ডিনেটর ও বিধায়ক স্মিতা বক্সীকে। তাদের দাবি অবিলম্বে বিবেকানন্দ রোডের রাস্তা প্যাচ ওয়ার্কের বদলে সামগ্রিক মেরামতি করা হোক এবং এই রাস্তা দিয়ে ভারী যানবহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জাড়ি করা হোক।

একটা সময় সরকারি ভাবে বলা হয়েছিল যে, ডানকুনি এবং হাওড়ার ধূলাগড়ে বড়ো ভারী যানবাহন এসে থামবে এবং সেখান থেকে ছোটো গাড়িতে মালপত্র শহরের বিভিন্ন বাজারে ঢুকবে। কিন্তু এই সরকারি ঘোষণা বা উদ্যোগ প্রতিদিন দু-পায়ে মাড়ানো হচ্ছে। তাতে সাবেকি পুরানো কলকাতার বহু বাড়ি বিপর্যস্ত। বাসিন্দারা উদ্বিগ্ন। সরকারি ঘোষণা পালন করানোর দায় যাদের সেই উর্দিধারীরা রাত পোহালে পাখি বলে দেরে খাই, দেরে খাই, দেরে খাই। সরকার ও প্রশাসন অবিলম্বে এই ব্যাপারে নজর দিলে উত্তর কলকাতার মানুষ একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারেন। নইলে এই ইস্যুতে বিরোধী রাজনৈতিক দল মাঠে নামলে শাসকদলের বিড়ম্বনার শেষ থাকবে না।