ভুবনডাঙ্গার মাঠ পেরিয়ে মেয়েটি চলেছে শান্তিনিকেতনে পড়তে। এমনই এক ভাদ্র মাসের দিনে। এর ঠিক ২০ দিন আগে ২২ শ্রাবণ চিরবিদায় নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মেয়েটি ভাবছে কাকে সে বলবে যন্ত্রণার কথা! যাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় অনুরাগে সে শহর ছেড়ে চলে এসেছে এই ঘন বনছায়ায় তিনিই তো চলে গেলেন। মাত্র ২০ দিন সে দেরি করে ফেলেছিল। তাই বলে এত বড়ো শাস্তি। ২২ শ্রাবণের ২০ দিন পর সত্যিই তো পৃথিবীটাই কেমন পাল্টে গেছে। মেয়েটির নাম সুচিত্রা মুখোপাধ্যায়। তাঁর জন্ম হয়েছিল ট্রেনের মধ্যে, ১৯২৪ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর। সে বার পুজোর ছুটিতে তাঁর বাবা-মা গিয়েছিলেন ডেহেরি-অন-শোনে।
সুচিত্রার বাবা সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, মা সুবর্ণলতা দেবী। সৌরীন্দ্রমোহন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাতা মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে সম্পাদনা করতেন সে সময়ের বিখ্যাত পত্রিকা ভারতবর্ষ। সৌরীন্দ্রমোহন ছিলেন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক-নাট্যকার। তাঁর লেখা নাটকে অভিনয় করেছেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণভামিনী, মধু বসু, সাধনা বসু প্রমুখ। হাতিবাগানে মিত্রা সিনেমা হলের কাছে তাঁদের বাড়ি। সেখানেই বড়ো হয়েছেন। বেথুন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। আবার সরকারি স্কলারশিপ পেয়ে শান্তিনিকেতনে সংগীতভবনে পড়তে গেলেন। পরবর্তীকালে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন ধ্রুব মিত্রের সঙ্গে। আজ যে নামটি বললে সকলে এক বাক্যে চেনেন তা সুচিত্রা মিত্র। রবীন্দ্রনাথের গান এবং রবীন্দ্র সংস্কৃতি চর্চায় আজ কিংবদন্তিরও অধিক হয়ে উঠেছেন এই গায়িকা।
সংগীতভবনে গান শিখেছেন শৈলজারঞ্জন মজুমদার, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখের কাছে। শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছেন ভি ভি ওয়াঝল ওয়ারের কাছে। অশেষচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এসরাজের তালিম নিয়েছেন। সেই সঙ্গে নাট্যশিক্ষা, নৃত্যশিক্ষা, ছবি আঁকা এসবও চলেছে। সুচিত্রা লিখেছেন, রাত দশটায় তখন শান্তিনিকেতনে আলো নিভিয়ে দেওয়া হতো। মোমের আলো জ্বালিয়ে পড়েছেন একের পর এক রবীন্দ্রনাথের লেখা। কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ ইত্যাদি। তাঁর জীবন জুড়েই তো রবীন্দ্রনাথ। সুচিত্র মিত্র বলেছেন, এমন করে অস্তিত্বের সমস্তটা জুড়ে কেউ তো এভাবে বিরাজ করতে পারেননি। সত্যিই তো রবীন্দ্রনাথের সমতুল্য গোটা পৃথিবী ঢুঁড়ে পাওয়া ভারী কঠিন।
খুব অল্পবয়সে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে। দুটি গান ছিল সেই রেকর্ডে। মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান/হৃদয়ের একূল ওকূল দু কূল ভেসে যায়। কলকাতার ডেকার্স লেনে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হলেন প্রখ্যাত সংগীত বিশারদ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ধূর্জটিবাবুর সঙ্গে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গান নিয়ে, ছন্দ নিয়ে রীতিমতো তর্ক জুড়তেন। সারা ভারতবর্ষে সংগীতশিল্পীরা বিশেষত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীরা ধূর্জটিবাবুকে খুবই সম্মান করতেন। লখনউয়ের এক অনুষ্ঠানে সুচিত্রা মিত্রের গান শুনে দারুণ প্রশংসা করলেন ধূর্জটিবাবু।
গণনাট্য আন্দোলনে প্রবলভাবে শরিক হলেন সুচিত্রা। তাঁর কথায় আমি, জর্জ, হেমন্ত তখন মাঠে-ঘাটে গান গেয়ে বেড়াচ্ছি। শান্তিনিকেতন থাকতে অনাদি ঘোষ দস্তিদার মশাই রটিয়ে দিলেন সুচিত্রাকে গাইতে বললে সে আর থামে না। এ কথা যেন সার্থক হলো মাঠে-প্রান্তরে। দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এঁদের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। সুচিত্রার গান শুনে ধূর্জটিবাবু তো লিখেইছিলেন এ যেন স্বয়ং দীনু ঠাকুর। অর্থাৎ দীনেন্দ্রনাথ যাঁকে রবীন্দ্রনাথের সব গানের ভাণ্ডারি বলা হতো। একদিকে গণনাট্যের গান সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কোণে কোণে পৌঁছে গেছেন সুচিত্রা মিত্র। ছবিতে অভিনয় করেছেন, থিয়েটার করেছেন, থিয়েটারের সংগীত পরিচালনা করেছেন—বিপুল তাঁর কর্মকাণ্ড। অল টাইম লেজেন্ডের শিরোপা এসেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে। বহু গানে তবলা আর খোল অদলবদল করে গানের ডায়মেনশনই বদলে দিতে পারতেন সুচিত্রা, বলেছেন দেবব্রত বিশ্বাস। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, সুচিত্রা মিত্রের গানে জেগে ওঠে ঘরের পাথরও। কবির এই কথা মর্মে মর্মে সত্যি।