গত বছর আর্থাৎ ২০১৯-এ আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। এবছর (২০২০তে) এই উৎসবের ২৬তম সংস্করণ কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে বা আদৌ হবে কি না তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সংশয় ছিল। গত কয়েকদিনে কোভিদ-১৯-এর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে হাজারো জল্পনা। অবশেষে ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দেন, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২০২১ সালের ৮ থেকে ১৬ জানুয়ারি। তাঁর টুইট বার্তায় মমতা বলেছেন, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যাক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা স্থির করেছি, আগামী জানুয়ারি মাসে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। আসুন আমরা একযোগে প্রস্তুতি শুরু করি।
আপাতত স্থগিত রাখতেই হলো চলচ্চিত্র উৎসব। কিন্তু KIFF-এর পক্ষে এর আগে জানানো হয়েছিল, চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ৫ থেকে ১২ নভেম্বর ২০২০। প্রথমে শোনা গিয়েছিল গোটা উৎসবই এই মহামরির পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল রূপ নেবে। কিন্তু সময় যেমন গড়িয়েছে চলচ্চিত্র উৎসব প্রেক্ষাগৃহেই অনুষ্ঠিত হবে জানা গিয়েছে। ফেস্টিভ্যালের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে কয়েকটি বিভাগের ফিল্মের তালিকা আপলোডও করা হয়েছিল। তাছাড়া এবছর সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষের সূচনা হয়েছে। নেপালের ছবি ‘মহানগর (এ নাইট ইন কাঠমান্ডু)’ উদ্বোধনী ছবি হবে এমনটাও ঘোষনা করা হয়েছিল।

এবছর, সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষ সূচনা। বুঝি-বা তাঁর ছবির নেপালি অ্যাডাপটেশনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে কলকাতার বাসিন্দা বিশ্ববরেণ্য এই চিত্রপরিচালককে। ছবির পরিচালক মোহন রাই অবশ্য জানিয়েছেন, এই ভুলটা অনেকেরই হতে পারে। ছবিটি সত্যজিৎ রায়ের কিংবদন্তিতুল্য ‘মহানগর’ (১৯৬৩) ছবির নেপালী অ্যাডাপটেশন বলে অনেকে মনে করে ফেলেন। তবে তাঁর অনুপ্রেরণা সত্যজিৎ রায় সেটা তিনি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন।
উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, স্মৃতিকথা প্রভৃতির ফিল্ম এডাপটেশনের কথা আমাদের জানা ছিল। কিন্তু একটি ছবি থেকে আর একটি ছবিতে অ্যাডাপটেশন— এহেন সংযোজনের ভাবনাকে অভিনব বলতেই হবে।

এরিক রোমের
একদা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতা। ব্রিটিশ রাজের হাজারো স্মৃতি প্রবলভাবে উপস্থিত আজও। সত্যজিৎ রায় তো আজ থেকে ৫৭ বছর আগে ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। মহানগরীর পথজোড়া ট্রামের তারে এক জটিল বিন্যাসকে অত্যাশ্চর্য মহিমা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। সেটা ছিল নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প থেকে অ্যাডাপটেশন। মোহন রাই-এর ছবি নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড বিভাগে প্রদর্শিত হওয়ার কথা ছিল।
তবে এবছর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কোথায় কীভাবে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় সত্যজিৎ রায়ের স্মারক বক্তৃত্বা। শতবর্ষের সূচনায় স্বাভাবিক ভাবেই ভাবা হয়েছিল সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হবে এই স্মারক বক্তৃত্বা। প্রত্যেক বছর জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাদৃত কোনো ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এই স্মারক বক্তৃত্বা প্রদানে। এ বছর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উড়ান পরিষেবা প্রায় বন্ধ বললেই চলে। ফলে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে ঘিরে সভা সমিতি সেমিনারগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

ফেদেরিকো ফেলিনি
এসব সত্বেও নন্দন রবীন্দ্রসদন শিশিরমঞ্চ প্রভৃতি প্রেক্ষাগৃহে ছবি দেখানো একপ্রকার সুনিশ্চিতই ছিল। শোনা যাচ্ছিল ফেদেরিকো ফেলিনি এবং এরিক রোমের— এই দুই কিংবদন্তি চিত্রনির্মাতার শতবর্ষে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল কমপিটিশন-সহ বিভিন্ন বিভাগে ছবি নির্বাচনও করা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান সূচির পরিবর্তন করতেই হলো। টানা চারদিন কোভিদ সংক্রমণ এবং মৃত্যুর নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। চিকিৎসকদের একটা বড়ো অংশ বলতে শুরু করেছেন, কলকাতা হাইকোর্টের বিধিনিষেধ সত্বেও বিভিন্ন পূজামন্ডপে যেটুকু লোকসমাগম হয়েছে তার ফলেই নাকি এই মারন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি। তাঁদের বক্তব্য, জনসমাগম বন্ধ করতেই হবে, নাহলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে।

সত্যজিৎ রায়
ইউরোপে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল কিন্তু ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি এই সব দেশগুলিতে নব কোরনা ভাইরাস নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় লকডাউনএর পথেই হাঁটার কথা ভাবছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি। ইউরোপেও বেশ কিছু চলচ্চিত্র উৎসব ঘোষণা করেও স্থগিত করতে হয়েছে। ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল প্রচন্ড কঠিন নিয়মাবলির মধ্যে বিবিধ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সামলে কোনোক্রমে গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশই করেছেন বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির সদস্যরা। আগামী দিনে দেখার, জানুয়ারিতে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয় কি না।
এই পরিস্থিতিতে ভালো সিদ্ধান্তই বলতে হবে।