আজ শারদ পুর্ণিমা। দুর্গাপুজার পরে প্রথম পুর্ণিমা। এই পুর্ণিমাতেই বাংলা, ওড়িশা, অসম, ত্রিপুরা ইত্যাদি রাজ্যে মহা ধূমধামে পালিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজা। এই দিনটিকে কোজাগরী পুর্ণিমাও বলা হয়। উত্তর ভারতে লক্ষীপুজা হয় কালীপুজার রাতে, ঘোর অমাবস্যায়। ব্রজভূমিতে আবার এই শারদ পূর্নিমাকে রাস পুর্ণিমা বলে। কারণ, ঐদিন নাকি শ্রীকৃষ্ণ মহা রাসলীলায় অংশ নেন। লোককাহিনী অনুযায়ী, অতীতে জনৈক রাজা তাঁর রাজ্যের শিল্পীদের বলেন, তাদের যে কোনও শিল্পকীর্তি যদি কখনও অবিক্রিত থাকে তাহলে তিনি তা কিনে নেবেন।
একদিন জনৈক শিল্পী রাজাকে বলেন, তার একটি মূর্তি বিক্রি হয়নি। আর এটি অলক্ষ্মীর মূর্তি। রাজা পড়লেন বিপদে। না কিনলে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে। আবার কিনলেও সর্বনাশ হবে। শেষপর্য্যন্ত তিনি ধর্মরাজের শরণাপন্ন হলেন। ধর্মরাজ রাজাকে বললেন, ঐ অলক্ষ্মী কিনে আপনি দেবালয়ে প্রতিষ্ঠা করুন। মহালক্ষ্মীর পুজার সাথে অলক্ষ্মীর পুজাও হবে। আর এই পুজা করবেন মহারাণী। নিজে উপোস করে নিশিজাগরণ ও ভক্তিভরে অলক্ষ্মীর পুজা করবেন তিনি। তাই হল। দেখা গেল, অলক্ষ্মীর পুজা যত এগোতে থাকল, ততই তার মূর্তি গলতে গলতে অদৃশ্য হয়ে পড়ল।
ছেলেবেলায় এমন নানা কাহিনী শুনেছি। এখনও বোধহয় কালীপুজার রাতে অলক্ষ্মী পুজার রেওয়াজ আছে কোন কোন প্রদেশে। ক’দিন আগে থেকেই বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয়ে যেত পুজার প্রস্তুতি। দিনভর যাঁতায় চাল পেষান হত। সেই চালের গুঁড়ো দিয়ে মা লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকতেন বাড়ির মহিলারা। সব পদচিহ্নই অন্দরমুখী। অর্থাৎ মা লক্ষ্মী ঘরে আসছেন, ঘরেই থাকবেন।
চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী হত নাড়ু। এছাড়া তিলের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু; পিসীমা তৈরী করতেন গোকুল পিঠে। কত ধরণের মিষ্টি, ফলমুল। ধূপ-ধুনোর গন্ধে সারা বাড়ি মও মও করত। ঠাকুর মশাই পুজা ও আরতি শেষ করে চলে যাওয়ার পরে মহিলারা গোল হয়ে বসে পড়তেন। লক্ষ্মীর পাঁচালী সুর করে পাঠ করতেন মা। রাতে উঠোনে বিশাল ফরাস পেতে ওরা এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠতেন। একেবারে ছোট্ট একটা ছুঁচের ফুটোর ভেতর দিয়ে সূতো বের করতে হবে। কে কতবার পারে তার প্রতিযোগিতা চলত। আবার একসঙ্গে গান গাইতেন। আমি ওই গান শুনতে শুনতে শুয়ে পড়তাম। ওরা জেগে থাকতেন। জ্যোৎস্নার আলোয় স্নান করবেন বলে। কারণ, ওই সময় নাকি চাঁদ অমৃত বর্ষণ করে। সেই অমৃত বারিধারায় তাঁদের দেহমনকে তৃপ্ত, পবিত্র করে তোলার এক অদ্ভুত নিশিযাপন। সব মনে পড়ে।
অনবদ্য প্রাচীন কাহিনী বর্ণন এবং স্মৃতিচারণ । খুব ভালো লাগলো। কেবল ধর্মাচারণ ছাড়াও প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই ধরনের সামাজিক লোক-ঐতিহ্যগুলি সংরক্ষণ করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।