রাঁচি থেকে মুরি যাবার পথে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছুটে চলেছে খাদের দিকে। সৌভাগ্যক্রমে খাদে না পড়ে গিয়ে সেই বাসটা একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে খানিকটা উল্টে গেল। আমি বলছি ১৯৫৩ সালের একটি দিনের কথা। রাঁচির গভর্নরস্ কাপে খেলতে রাঁচি গেছে বেহালার রামকৃষ্ণ স্পোর্টিং ক্লাব। আর জামশেদপুর থেকেও একটি ক্লাব গেছিল খেলতে। খেলার শেষে তারা সবাই একটি বাসে করে রাঁচি থেকে মুরির পথে ফিরছিল। সেই বাসে ছিল আগামী দিনের ভারতবর্ষের দুই ভাবী সুপারস্টার—প্রদীপ আর সুবিমল। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উপরোক্ত ঘটনাটি ঘটেছিল সেদিন। সৌভাগ্যক্রমে কোনো ক্ষতি হয়নি সেবার। বেঁচে গিয়েছিল প্রদীপ-সুবিমল। আঠারো মাসের ছোটোবড়ো। ততদিনে সাড়া ফেলে দিয়েছে তারা। সবাই ধরে নিয়েছে আগামী দিনে ভারত কাঁপাবে তারা। ভাগ্যিস সেই পাথরটা রাস্তায় ছিল, যেটাতে আটকে বাসটার আর খাদে পড়া হয়নি। নাহলে?
চলুন সাত বছর এগিয়ে আসি। ১৯৬০ এর রোম অলিম্পিক। হাঙ্গেরির সাথে দুর্দান্ত খেলেছে ভারত। ইতালিয়ান একটা নিউজপেপারে একটা হেডিং বেরোলো—Another football power is rising, India। নাহ, ইতালিয়ান খবরের কাগজের সেই ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হয়নি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু ১৯৬৯ অবধি সেই ভবিষ্যৎবাণী ছিল অনেকটাই কার্যকর। এশিয়ান ফুটবলের শ্রেষ্ঠ পাওয়ার হাউস হিসাবে উঠে এসেছিল ভারতবর্ষ। তার অন্যতম কাণ্ডারী সেদিনের বাস অ্যাক্সিডেন্টে ভাগ্যাক্রমে বেঁচে যাওয়া সেই দুজন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। প্রদীপ-সুবিমল। এই সাত বছরে অবিশ্যি কেটে গেছে অনেকগুলো অধ্যায়। ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। সুবিমল নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে মোহনবাগান ক্লাবে। অপরদিকে প্রদীপ খেলে ইস্টার্ন রেলে। একজন কর্তা তাকে বড়ো ক্লাবে খেলাবে বলেও খেলায়নি। বাধ্য হয়ে এরিয়ানে যোগ দিয়েছিল। সেখান থেকে এসে গেলো রেলের সুযোগ। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়ো প্রদীপ। কাজেই রেলের চাকরি অনেক স্বস্তি দিয়েছে তাকে। সে চাকরি ছাড়েনি কোনোদিন। মাঝে একবার মোহনবাগানের বিদেশ সফরে আমন্ত্রিত প্লেয়ার হিসাবে খেলেছিল। সেটা পূর্ব আফ্রিকা সফর। সে গপ্পো করবো একদিন পরে। কিন্তু বড়ো দলে না খেললেও প্রতিভা কি চেপে রাখা যায়। রেলে বাঘা সোমের হাতে পরে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে প্রদীপ। ৫৮’ তে তিনপ্রধানের বাইরে গিয়ে ইস্টার্ন রেল জিতে নেয় কলকাতা লিগ। ভারতীয় ফুটবলে শুরু হয় নতুন যুগ। প্রদীপ-সুবিমলের যুগ। পিকে ব্যানার্জি আর চুনী গোস্বামী।
কেমন ছিল এদের বন্ধুত্ব? তাদের বন্ধুত্ব লেগে আছে ময়দান থেকে রোমে। লেগে আছে জীবন থেকে ফুটবলে। লেগে আছে ইহলোক থেকে অমর্ত্যলোকে। মজার কথা হলো ১৯৫৪-এ জামশেদপুর থেকে খেলতে পিকে এসেছিল ময়দানে। আবার ১৯৫৪ তেই ময়দানে মোহনবাগানের জার্সি গায়ে মাঠে নামে চুনী গোস্বামী। ১৯৬৮ তে অবসর নেন চুনী গোস্বামী, আর একবছর পরেই ১৯৬৯ এ অবসর নেন পি কে ব্যানার্জি। আবার ১৯৬৯ এ দুজনে একসাথে জাপান গিয়েছিলেন কোচিং ডিগ্রী করতে৷ দুজনেই সেবার ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করলেন। কিন্তু ফুটবলের অবসরোত্তর জীবনে দুজনের পথ কিছুটা হলেও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। পিকে ব্যানার্জি পুরোপুরি কোচিং এ মনোনিবেশ করেন। আর চুনী গোস্বামী মনোনিবেশ করেন ক্রিকেটে (চুনী গোস্বামী অবশ্য ফুটবলে অবসর নেবার অনেক আগে থেকেই ক্রিকেট খেলতেন। বলা বাহুল্য, ফুটবলে অবসরের পরে ক্রিকেটের উপর মনোনিবেশ আরও জোড়ালো হয়)। কিন্তু কী অদ্ভুত! দুজনেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যাধিক সফল হলেন। ব্যাট হাতে চুনী গোস্বামী সামলালেন সুভাষ গুপ্তে থেকে রয় গিলক্রিস্টকে। আর পিকে ব্যানার্জি হয়ে উঠলেন ফুটবল কোচিং-এ ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রত্ন।
কিন্তু কি আশ্চর্য, এই দ্বিধাবিভক্ত পথটা যে আবার মিলে গেলো….অমর্ত্যলোকে। কি জানি সেখানেও হয়তো এখন ড্রিবল করতে করতে বলটাকে এগিয়ে ডান দিকের টাচলাইন থেকে ইনসাইড ডজ করে সুবিমল বল বাড়িয়ে দেয় প্রদীপকে, আর উভয়পায়ের শট স্পেশালিষ্ট প্রদীপের গোলাশটে আজও নেট ছেঁড়ে সেখানে। আজ বন্ধুত্ব দিবসে সৌরভ-শচীন কিংবা ভিভ-বোথামের চেয়ে পিকে-চুনীর বন্ধুত্বটা অনেক বেশী তীব্র। অনেক কম আলোচিত, কিন্তু অনেক বেশী বাস্তব। কেউ কোনোদিন আঘাত হানেনি কারোর ওপর। অথচ, এটাই তো ময়দান যেখানে তর্ক-পাল্টা তর্ক, বিবাদ এসব চলতেই থাকে। কিন্তু এই ময়দানে পিকে-চুনীর বন্ধুত্বের ফুল রয়ে গেছে অক্ষত….কোনো ভ্রমর ক্ষত করেনি যেখানে।
শেষটা করবো একটা ঘটনা দিয়ে। ১৯৬২-এর এশিয়ান গেমস খেলতে যাবার আগের এক সন্ধ্যা বেলা। ৬০-এর রোম অলিম্পিকে পিকে ছিলেন ভারতের অধিনায়ক। কিন্তু ৬২-তে অধিনায়ক করা হয় চুনীকে। সেই সন্ধ্যাবেলায় ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই চুনীকে জড়িয়ে ধরেন পিকে, বললেন—‘তুই অধিনায়ক হয়েছিস, আমি খুব খুশি’। মাঝেমাঝে মনে হয় পিকে-চুনীর বন্ধুত্বের চেয়ে বড়ো সত্যি ভারতে বোধহয় আর নেই।
সেদিনের বাসজার্নি থেকে শুরু হয়ে আজ তাদের বন্ধুত্বের গল্পটা পৌঁছে গেছে অমর্ত্যলোকে। অমরাবতীর ধারে আজও হয়তো গপ্পো করেন দুইজন…প্রদীপ আর সুবিমল।