আমিও মানুষ,
তুমিও মানুষ
তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়…
কলকাতায় গেলে সাধারণত বিভিন্ন ভাস্কর্য শিল্প বা দর্শণীয় স্থানের চেয়ে বেশী টানে আমায় গুণী মানুষদের সান্নিধ্য। একবার অপর্ণা দি’র (অপর্ণা সেন) এক অনুষ্ঠানে গিয়ে হরেক রঙের নায়ক-নায়িকাদের ভীড়ে আমি কোনায় দাঁড়ানো শ্রীজাত’র কাছে গিয়ে বললাম। আমি আপনার ভীষণ ভক্ত।
শ্রীজাত হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি এত সুন্দরী নায়িকা, এত প্রভাবশালী নির্মাতা অভিনেতাদের বাদ দিয়ে আমার কাছে এলেন; এতেই আমি আনন্দিত!
শ্রীজাতের সেই সারল্য এক জাত কবির সারল্য। কবিরা তো এমনই।
আমিও মানুষ, তুমিও মানুষ তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়। শ্রীজাত রচিত
এমন তিনটে লাইন লেখার পর মরেও যে শান্তি!
ঠিক এই লাইন ক’টা বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল হে উত্সবের নজরুল মঞ্চে খোদ জয় গোস্বামী যখন বলছিলেন। নিজের অনুজতম কবির পঙক্তি নিয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন তিনি। এখানেই বড় কবির মহানুভবতা। কলকাতার বিভাস, শ্রীজাত, বাংলাদেশের শামীম রেজার প্রশংসা করছিলেন খুব করে। বারবার কথা প্রসঙ্গে সেই আলো আঁধারীর সন্ধ্যা মুখর করে তুলছিলেন জয় দা।
কবিকে প্রশ্ন রাখি অনুজদের এত প্রশংসা সমকালীন অনেকের কাছেই তো শুনতে পাওয়া যায় না? আপনি কেন করেন? কী ভেবে করেন?
—এই যে; তুমি তো দেখছি জেরায় ফেলে দিচ্ছ। আসলে এগুলো অগ্রজের কাছ থেকেই শেখা। তুমি সুনীল দা’র কাছে নিশ্চয়ই আমার কথা শুনেছ। আমি মনে করো সেই অভ্যেসটাই আরো বিস্তারিত করছি—
নিজে গানের সাথে জড়িত বলেই প্রশ্ন রাখি লিরিক আর কাব্যের কোনো বিরোধ আছে কি না?
—না না, ওসব বিরোধ-টিরোধ নেই। এ সবই আমাদের বানানো। কবিদের এই অবস্থানে থাকতে হবে। অমুক উঁচুতে যাওয়া যাবে না। এত নিচে যাওয়া যাবে না। এসবই বাজে গল্প।
…অনুষ্ঠানে কবি শামীম রেজা তার চমত্কার উপস্থাপনায় বলছিলেন, ‘আপনার হাত ধরে এই যে অনেকেই উঠে এসেছে। আপনি অনেক কবির পথ হাঁটতে দেখিয়েছেন। এটা কীভাবে দেখেন?
জয় গোস্বামীকে এমন প্রশ্নে আবারও ভর করলো তার নান্দনিক সারল্য। বললেন—
‘ওসব কিছু না। আমি তরুণদের জন্য কিচ্ছু করিনি। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি মাত্র। সেখানে বয়োজৈষ্ঠ্য হিসেবে অনুজদের কিছু দায়িত্ব বর্তায়; আমি সেগুলোই করে গিয়েছি।
তবে এই কাজটি মহান ভাবে যিনি করেছেন। করে গেছেন এক জীবনের পুরোটাকাল। তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৯৭ সালে তার ‘কৃত্তিবাস’ যখন তরুণ কবিদের পুরস্কার প্রবর্তন করলেন, তখন তিনজন নির্বাচকদের ভেতরে আমাকেও রাখলেন তিনি। সেই সময় সুনীলদা’র কাছ থেকে কাজ করে, শিখে বুঝেছি তিনি তরুণদের জন্য কতটা উদার। প্রায় সময় কোনো দুর্বল কবির ক্ষেত্রেও বলতেন দেখো এই যে, ওর ভেতরে যে কবির বসবাসটা। সেটা ওকে ধমক দিয়ে বোঝালে উধাও হয়ে যাবে! হয়তো ওর শব্দ দূর্বল কিন্তু আমি ছেপে যদি তার উত্সাহটাকে আরো বাড়িয়ে দিই, তাহলেই সে আরো নতুন শব্দ খুঁজবে।
এই সেই ঘর যেখানে তোমার গল্প এখনও ভেসে আছে
সব কিছুই আজ রূপকথা বলে মনে হয়
(কবিতা সমগ্র, ভাস্কর চক্রবর্তী)
নিষিদ্ধ প্রেমের কবিতা শিরোনামের এমন অজস্র কবিতা আর তা নিয়ে লেখা বিস্তর জার্নাল সমগ্র হলো ‘গোঁসাইবাগান’। এই যে এত এত কবি আর কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে ধারাবাহিক লেখা পরবর্তীতে তা গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ, আপনার গোঁসাইবাগানের সিরিজের কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল?
—না, তা বলতে পারবো না। তবে চাপ ছিল। চাপটা ঋতুপর্ণ ঘোষের। ওর চাপাচাপিতেই গোঁসাইবাগানের জন্ম। নইলে এত গদ্য লিখতে পারতাম কি না বলতে পারবো না।
আমি যখন তার লেখা গোঁসাইবাগানের বইটি মঞ্চে তার হাতে দিয়ে যখন অটোগ্রাফ চাইলাম, তখন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরাও এসব বই পড় নাকি-
সেই বিষ্ময়টিই তার কাছে ফিরিয়ে দিতে যখন বললাম কেন এমন কথা বলেছিলেন-
—দেখো আমি মনে করি দৈনিকের পৃষ্ঠায় যা লেখে কবিরা, অন্য হাজার মুখরোচক খবরের মাঝে ওই পঙক্তিমালায় পড়ে নেয় তরুণ। বা গুছিয়ে রাখে মনে। পরে হয়তো সেই শব্দরাশি ব্যবহার করে তার কোনো প্রেমিকার জন্য। যদি তার সেই অনুসঙ্গে আমার শব্দগুলো মিলে যায়। এই তো হয় আজকাল। কিন্তু বই আকারে কবির লেখা এমন নিবন্ধ পড়া খুব মুশকিল। সেও আবার কলকাতা থেকে কেনা। তবে আমি আমার গোঁসাইবাগান বইটিরও বেশ সাড়া পেয়েছি। সেই জন্য অবশ্যই কৃতজ্ঞ তোমাদের মতো পাঠকদের প্রতি।
সন্ধ্যার নিমজ্জনে কবি। ব্যস্ততা বেশ। এদেশে কবি-কথা সাহিত্যিক নির্মলেন্দু গুনের অসম্ভব ভক্ত আর অনুসারী তিনি। তার কথা উঠতেই চোখ কপালে জয় দা’র। গুন দা’র তো এক একটি লাইন বারুদের মতো। মঞ্চেও দেশ বিভাগের উদাহরণ টেনে নিয়ে বললেন সেই কথা। নির্মলেন্দু গুনের লেখা সেই সময়ের দুটি কবিতার পুরো মুখস্ত বললেন তার দরাজ ও খানিক কিন্নর মিশেল কণ্ঠে।
নিরাশায় থামলো কবিতা
হতাশায় উঠে দাঁড়ালো সে।
বিষাদে টান টান ক’রে শিরদাঁড়া
কবিতাটি রক্ত দেখলো পিঠে হাত ঘষে।
(কবিতা- ধানতলার পরে)
কবিতা কি নিরাশ করে। আপনি শেষ বয়সে কবিতায় অনেক নারী, যৌনতা এনেছেন। এর কারণ কী। প্রেমটা আপনার কাছে কী?
ঠিক এরকম প্রশ্ন যখন করা হয়, তখন তার ঠোঁটে মৃদু হাসি!
প্রেমটা আসলে বয়সের সাথে বড়ই পরিবর্তনশীল। প্রথম দিকে চরম উত্তেজনাকর। এরপর বয়সের সাথে সাথে সে প্রেমটা থিতিয়ে একরকম অভ্যেসে পরিণত হয়। একটা অন্যরকম গতিতে রূপ নেয়। তখন জীবনটা সেই উত্তেজনার স্মৃতিগুলো নিয়ে বাঁচতে শেখায়। কিন্তু প্রেমটা তবুও বর্তমানই থাকে।
এরকম অদ্ভুত চরণ যখন বলছিলেন উপস্থিত দর্শকদের সামনে। তখন আলো-আঁধারী মঞ্চের পরিবেশ বড্ড অন্যরকম।
আমি আমার বিচ্ছিন্ন আলাপে তুলি সুনীল দা’র কথা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভক্ত আমাদের সারা বাংলাদেশের অগণিত তরুণ। আমিও তার সাথে কলকাতায় দু’বার দেখা করি। সাক্ষাত্কার নিই। সেই সাক্ষাতে তিনি বারবার জয় গোস্বামীর কথা বলেছিলেন। একথা শুনেই জয় দা বলেন, ‘কী বলেছিলেন সুনীল দা আমায় নিয়ে, বল তো!
মহাপ্রস্থানে যাওয়া এক অমর কবির বলে যাওয়া কথাগুলো নিয়ে এরকম উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম কলকাতার চলচ্চিত্রকার কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। এবারে জয় গোস্বামী চোখে মুখে দেখলাম। তিনি বললেন, ‘তিনি আমায় স্নেহ করতেন সেটা বুঝতাম। অনেক কিছু শিখেছি। আমার জন্মের আগে তো তিনি কৃত্তিবাস সম্পাদনা করতেন তিনি।
বললাম আমি সুনীল দা’কে প্রশ্ন রেখেছিলাম, এই পশ্চিমবাংলায় আপনার মোহে বারবার আসতে ইচ্ছে করে আমাদের।
তিনি বলেছিলেন মোহ’রা ঘুরে বেড়ায়। আমি চলে গেলে তখন জয় গোস্বামীর জন্য আসতে হবে তোমাদের। বাংলাদেশে যেমন আমি যাই হুমায়ূন আহমেদের সাথে আড্ডা আর কিছু দারুণ সময় কাটানোর নেশায়। এই ভাবেই তো একে অপরকে টানে। টেনেছিল কিংবা টানবে আজন্মকাল।
কিন্তু এই সাইবার যুগের ভয় তাড়িত এখন সারাক্ষণ। আপনাদের কবিতা তো দাদা তবুও পড়ছে, কিনছে সকলে। কিন্তু এখনকার এই ই-সাহিত্যের যুগে কি বই এর অস্তিত্ব থাকবে?
খানিক ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘শোনো আরো বেশি থাকবে। বই হাত দিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখার যে আনন্দ, এটা আগামীতে আরো আগ্রাসী হবে। এখন তো সাইবার প্রেম শুনি। এই প্রেম করতে করতে করতে তরুণরা একসময় বিরক্ত হয়ে উঠবে। আমরা তো প্রেমিকাকে এক নজর দেখার জন্য কাটিয়ে দিলাম এক যৌবন। আর এখন কিনা সকলে ইন্টারনেটে চ্যাট করে দেখে। এই মোহ বেশিদিন টিকবে না।
খুব বেশি সময় মিলল না গোঁসাইবাগানের এই মালীর সাথে। মনের ভেতরে কত প্রশ্ন! হাঁটছেন তিনি বাংলা একাডেমির চত্ত্বরে। এবারে তবু শামীম রেজার আমায় জোর করে ধরে আনলো। নয়তো আসা হতো না। কবি মঞ্চেও এই একই কথা বলেছেন জয় দা। হাঁটতে হাঁটতেও সেই কথাই আবার বললেন। কাকে বললেন? কেউ তো আবার জানতে চান নি। হয়তো কবি মন এই বাংলা একাডেমি চত্ত্বরকে বলে গেলেন।
আচ্ছা দাদা এই যে এত এত ইন্টারভিউ দেন। প্রতিবার আপনার শৈশব, আপনার প্রথম লেখা, আপনার প্রথম প্রেম এইসব জানতে চায়। বিরক্ত লাগে না।
—ভাল প্রশ্ন করলে তো! আসলে কি জানো আমি আনন্দিতই হই। কারণ তখনতো ঐ প্রশ্নের বাহানায় আমারও খানিকটা শৈশবে ফেরা হয়। আমারও প্রথম কিশোর মনের প্রেমিকার ছবিটা ভাসে। আমিও খানিকটা স্মৃতির জাবর কেটে নিই। এটা বলতে পার কবি হওয়ার আরেক সুবিধা। আত্মজীবনী লিখবেন না দাদা?
—এই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে সবাই করছে এখন। কেন জানি না লিখতে ইচ্ছে করে। আবার পারি না। সব কী লিখতে পারব? সব কি লেখা যায় বা সব কি লেখা উচিত? এই যে আজ যারা এই চত্ত্বরে আমার কথা, আবৃত্তি শুনলেন তাদের ভেতরে এক অস্পষ্ট ছবি আছে তাদের সবার মনে। আমি অকপট আত্মজীবনী লিখলে সেই অস্পষ্ট ছবিগুলো আর ভাসবে না। নিরেট ফ্রেমে বাঁধা ছবি থাকবে তখন। সেটা কারো ভাল লাগবে আবার লাগবে না। কী দরকার? তবু হয়তো লিখবো।
সময় শেষ। সাভারের জাহাঙ্গীরনগরেই অবস্থান করলেন কবি সেদিন। আবারও খানিকবাদে জানতে চাইলেন সুনীল দা’ আর কী বলেছিলেন?
এই আকুতিকে আমি তখনকার এক কবির সারল্য ছাড়া কী বলবো। বড় কবি বা প্রকৃত কবি বুঝি এমনই!