জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
অষ্টাদশ কিস্তি
কিছুক্ষণ পর বুড়ীমাসি ছোটোমা ঢুকলো। বুড়ীমাসির চোখের কোল ভারি, মিত্রা বুড়ীমাসির দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নিচু করলো, বুড়ীমাসি মাটিতে বসলো।
তুমি জানোনা ছোটোমা, পই পই করে বারন করেছি, কে কার কথা শোনে।
আমি বুড়ীমাসির দিকে তাকালাম। বুড়ীমাসি চুপ করে গেল।
দেখেছো তোমার মিত্রাকে, যাও নিচে গিয়ে বোস।
বুড়ীমাসি কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে থেকে নিচে চলে গেল।
ছোটোমার দিকে তাকিয়ে বললাম, ডাক্তার কি বললো।
সাবালক মেয়ে, শরীরের ওপর অনেক অত্যাচার করেছে, একটু সময় লাগবে। খাবার চার্ট দিয়ে গেলেন।
আমি গ্যারেজ?
দেবো কান মূলে, কি কাজ আছেরে তোর। ছোটোমা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে উঠলো।
দাওনা দাও, মুখে বলছো কেন।
দেখলে কেশটা সকালে, তাহলে বলছো কেন।
সত্যি অনি আমরা অবাক হয়ে গেছিলাম, ভাবলাম তুই হয়তো ত ত করবি। তোকে নিয়ে নিচে তিনজনে যা হৈ চৈ করছে না, বড়োর বুক ফুলে ছাপান্ন ইঞ্চি।
আমি ছোটোমাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, তোমার।
ছোটোমা আমার কপালে চুমু খেলো। মিত্রার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো।
বুঝেছি। মিত্রা বললো।
কি বুঝেছিস!
তোকে বুঝতে হবে না।
ছোটোমা মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
আমার খাওয়া শেষ, ট্রে-টা ছোটোমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, চা।
নিয়ে আসা হচ্ছে। ওরটা শেষ হোক।
ভোর হয়ে যাবে।
তার মানে।
কয়লার ইঞ্জিন।
খুব কথা না। আমার চুলে মুটি ধরে একটু নাড়িয়ে দিল।
মিত্রা হাসলো।
ছোটোমা আমার ট্রে-টা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
দাঁড়া আজ স্নান করার সময় তোর শরীর একেবারে ঠিক করে দেব।
দিবি! সত্যি?
আমি চুপ থাকলাম।
চা এলো, ছোটোমার দিকে তাকিয়ে বললাম, অনাদিরা আসতে পারে।
কেন!
কাল ফোন করেছিল, উনি বলেছেন, আমার শরীর খারাপ। বুঝলে এবার।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো, কি দুষ্টু বুদ্ধিরে তোর।
অতএব আমি চা খেয়েই তোমার ঘরে গিয়ে ঘুমবো। দু-রাত অনেক জালাতন সহ্য করেছি। রবিন নিচে আছে, বুড়ীমাসিও এসে গেছে, ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও।
না আমি যাব না।
কেন যাবি না?
তোকেও যেতে হবে।
হুঁ।
দাঁড়া নিচে গিয়ে বড়োমাকে বলছি, তুই এইসব বলছিস।
বলনা, বয়েই গেছে।
আমি উঠে পরলাম।
কিরে সত্যি চলে যাচ্ছিস।
হ্যাঁ।
এখন ঘুমোস না দুপুরে। তুই তো স্ট্রং ম্যান।
এদিকে তো টনটনে জ্ঞান আছে।
ছোটোমা আমাদের কথা শুনে মুখে কাপর চাপা দিয়ে হাসছে।
ট্রে-টা দে, নিচে অনেক কাজ।
আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুই একটু বোস, আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে চলে আসব।
অগত্যা আবার ইজি চেয়ার।
মিত্রার খাওয়া শেষ হতে ওকে ওষুধটা দিলাম।
কিরে কত খাব?
রোগ বাধিয়েছিস খেতে হবে।
অনাদিরা যথা সময়ে এলো। সব জানলো। ওদের চোখ ছানাবড়া। বলিস কি!
কাকার সাথে ফোনে কথা বলিয়ে দিল। কাকাকে সব জানালাম। নীপা কাঁদছে। আমি মিত্রার সঙ্গে ওকে কথা বলিয়ে দিলাম। অনাদিকে বললাম, আমরা আগামী সপ্তাহে যাবো। বড়োমা ছোটোমাও যাবে। তুই ওই কয়দিন জেনারেটরের ব্যবস্থা কর। আর একটা বাথরুম বানাবার ব্যবস্থা কর। কোথায় কি করবি নিজেরা ঠিক করবি। একটা ট্রলির ব্যবস্থা রাখিস। এদিক ওদিক ঘোড়ার জন্য।
অনাদি বললো, ওদিকটা আমরা সামলে দেব, তুই ভাবিস না।
বাসু, মিত্রার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
অনাদিকে বললাম, চিকনার খবর কি?
তোর বাড়িতে বসিয়ে এসেছি, বলেছি আমি না যাওয়া পর্যন্ত কোথাও বেরবি না।
অনাদিকে বললাম আমি চিকনার জন্য একটা ব্যবস্থা করেছি, তুই বল ঠিক না ভুল, মিত্রাকে বাসুকে বললাম আমি ভুল কিছু বললে তোরা বিরোধিতা করিস।
আমি একটা মিনি রাইস মিলের কথা ভাবছি। এই মুহূর্তে চিকনা এখন আমাদের গ্রাম, আশে-পাশের গ্রাম থেকে ধান কিনবে কিছু নিজে চাল তৈরি করবে, বাকি ধান রাইস মিলে বিক্রি করবে। আমি মিত্রা চিকনা থাকব এই ব্যবসায়। চিকনার চল্লিশ ভাগ আমার তিরিশ, মিত্রার তিরিশ, তারপর যখন দেখব একটু দাঁড়িয়েছে। রাইস মিল বানাব, আমাদের ওখানে পঞ্চাশ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও রাইস মিল নেই।
জায়গা। অনাদি বললো।
কেন আমার বাড়িটা এখন কাজে লাগাক। অতো বড়ো বাড়ি ফাঁকা পড়ে রয়েছে।
স্যার রাজি হবে?
কাকাকে আমি বুঝিয়ে বলবো।
আর আমার ভাগের জমি জমা আমি বাসন্তীমা, পীরসাহেবকে ভাগা-ভাগি করে দিয়ে দেব, ওটা নিয়ে আমার একটা প্ল্যান আছে, আমি ওখানে যাই, গিয়ে বড়দের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করবো।
বাসু আমার দিকে বিস্ময় ভরা চোখে তাকাল।
তুই ওখানে আর যাবি না!
কেন যাব না?
তাহলে সব দিয়ে দিবি বলছিস?
এই বুদ্ধি নিয়ে তুই কি করে ব্যবসা করিস।
মিত্রা হাসলো।
চিকনার পয়সা কোথায়? অনাদি বললো।
তোকে কি পয়সার কথা বললাম।
না, ওর চল্লিশ ভাগ মানে ওকে শেয়ারের চল্লিশ পার্সেন্ট দিতে হবে।
কেন, আমরা শেয়ারের ষাট ভাগ দিচ্ছি, কাজ আমরা করবো না, ও করবে, তার জন্য ও একটা মাসে মাসে মাইনে পাবে, তাছাড়া লভ্যাংশ ও নেবে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত ওর চল্লিশভাগ কোম্পানীতে জমা না পড়ছে।
তুই এতো ভাবিস!
ভাবতে হয়। আর একটা কথা শোন, মনে পরে গেল, অমূল্যর থেকে তুই দূরে থাকিস।
কেন!
মালটা তোর এ্যারাইভাল হয়ে গেছে।
তুই জানলি কি করে?
তুই পার্টি করিস কেন, চাষ কর, মাঠে মজুর খাট।
বলনা, তোর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়, তাই তুই সকলের গুরু।
গ্যাস খাওয়াস না।
সত্যি বলছি অনি, আমিও সেরকম বুঝছি, তাই তোকে বলছি।
কিরকম?
ও ঠিক আগের মতো বিহেভ করছে না।
কেন জানিস?
বল।
তোর কিছু হলে অনি ব্যাক করবে, প্রয়োজনে তোকে একলাফে অনেক ওপরেও তুলে দিতে পারে, অমূল্য সেটা জেনে ফেলেছে।
সত্যি বলছি অনি এতটা ভাবিনি।
তুই ভাবিসনি, আমি ভাবি।
তোকে দিয়ে আমি একটা কাজ করাব, যেটা কামিং ইলেকসনে আমি কাজে লাগাব। হয়তো তোকে এমএলএ বানাতে পারি।
যাঃ কি বলছিস।
যা বলছি এখানে বলছি ওখানে কিছু বলবো না। তুই তোর কমিউনিকেসন বাড়িয়ে যা, এমন কোনও কাজ করবি না, যাতে ব্যাড রিপার্কেসন হয়। বাসু কথাটা যেন পাঁচ কান না হয়।
তুই বিশ্বাস করতে পারিস আমি দিবাকর হবো না।
মিত্রা হো হো করে হেসে উঠলো।
তোদের বাজারে পাঁচকাঠা মতো জায়গা পাওয়া যাবে?
আছে। একটু বেশি দাম পরবে।
কতো?
লাখ চারেক টাকা।
কাদের জায়গা?
সুতনু বেরা আছে, আমাদের পাশের গ্রামে, তার।
তুই একটু কথা বলে রাখ। জায়গাটা আমার দরকার।
ঠিক আছে, প্রয়োজন পড়লে, কিছুটাকা হাতে গুঁজে ধরে রাখ।
কি করবি?
সব বলে দিলে হয়। ওখানে গিয়ে বলবো। চিকনার ব্যাপারটা ফাইন্যাল কর।
ওখানে যাই কথা বলি, কাল তোকে জানাব।
আমাকে না পাস, মিত্রার ফোনে জানাস।
কিরে মিত্রা, তোর কি মত বল।
ভালোই হবে, মাসে একবার করে যাওয়া যাবে, তুই তো এমনি যাবি না।
যার যা ধান্দা, ওটা হলে তুই আর চিকনা কন্ট্রল করবি।
অনাদি একটা বাথরুমের ব্যবস্থা করো।
হবে ম্যাডাম, আপনি গিয়ে দেখবেন বাথরুম রেডি।
আমি দেয়াল আলমাড়ি থেকে ব্যাগটা বার করলাম, দেখলাম বেশি পয়সা নেই।
মিত্রাকে বললাম, নোট দে।
আমার পার্স নিচে, বড়োমার ঘরে।
যা নিয়ে আয়। উঠতে পারবি?
পারবো।
মিত্রা নিচে গিয়ে ওর পার্স নিয়ে এলো। কতো নিবি?
হাজার পনেরো দে।
অতো নেই।
কত আছে।
বারো।
তাই দে।
আমি অনাদির হাতে সতেরো হাজার টাকা দিলাম। কাজ চালা তারপর আমি যাচ্ছি।
এখন থাক না।
আরে রাখ, আমি দুপুরে এক ফাঁকে বেরিয়ে তুলে আনবো।
ওরা খাওয়া দাওয়া করে চলে গেল।
নিচে কাউকে দেখতে পেলাম না, বড়োমাকে জিজ্ঞাসা করলাম। বড়োমা বললো।
বুড়ীমাসি চলে গেছে, ছোটোমা কোথায় বেরিয়েছে, ব্যাঙ্ক হয়ে আসবে।
কখন ফিরবে?
খাওয়ার আগে ফিরবে বলেছে। তুই এক কাজ কর, মিত্রার জন্য এটা নিয়ে যা।
কি?
ভেজিটেবিল স্যুপ আছে।
এটা কেন?
কথা বলিস না।
দাও। দাদারা বেড়িয়ে গেছে।
হ্যাঁ। আর শোন স্যুপটা খেয়ে ওকে স্নান করতে বল, তেল গরম করে দিচ্ছি।
ঠিক আছে।
স্যুপের বাটি নিয়ে ওপরে এলাম।
এটা কি রে?
ভেজিটেবিল স্যুপ।
মানে!
ডাক্তারের হুকুম। তারপর তেল গরম হচ্ছে, স্নান। দুপুরে খেয়ে দেয়ে ঘুম।
মিত্রার চোখ দুটো ভারি হয়ে এলো।
আবার কি হলো?
কিছু না।
খেয়ে নে।
তুই একটু খা।
এক চামচ।
মিত্রার চোখ দুটো চিক চিক করে উঠল।
ও আমাকে এক চামচ নিয়ে খাইয়ে দিল।
দারুন খেতেরে।
নিজে একচামচ খেল।
আর একবার নে।
না।
নে না।
আর একবার, থার্ড রিকোয়েস্ট বড়োমাকে ডাকব।
ঠিক আছে আর বলবো না।
আমি নিচ থেকে মিত্রার জামা কাপর নিয়ে এলাম, প্যান্টিটা কাপরের ভেতরে নিয়ে আসতে ভুললাম না। বড়োমা রান্নাঘর থেকে বললো, তেল গরম করবো।
দাঁড়াও খাওয়া হোক।
আমি ওপরে গেলাম।
কিরে খাওয়া হয়েছে?
তুই কাপর নিয়ে এলি।
কে নিয়ে আসবে। কেউ নেই। আমি তুই বড়োমা। সবাই কাজে বেরিয়েছে।
কি মজা।
তার মানে!
আমি তুই ওপরে, বড়োমা নিচে।
বুঝেছি, আনন্দ রাখ। বড়োমা তেল গরম করেছে, নিয়ে আসছি, স্নান কর।
আমি মিত্রার কাছ থেকে বাটিটা নিয়ে নিচে চলে এলাম। রান্নাঘরের বেসিনে রেখে বড়োমাকে বললাম, তেল গরম করেছো?
একটু দাঁড়া।
বড়োমা ধোঁকা তৈরি করছে, আমি একটা ধোঁকা ভাজা তুলে খেয়ে নিলাম।
নিজেখেলি, ওর জন্য নিয়ে যা।
ছাড়ো, বেশি খেলে শরীর খারাপ করবে।
কি আহম্মকরে তুই!
ঠিক আছে দাও।
বড়োমা কয়েকটা ধোঁকার বড়া একটা প্লেটে করে থালার ওপর দিল আর গরম তেলের বাটি। তেলটা থেকে বেশ ঝাঁজ বেরচ্ছে।
তুমি কি রসুন দিয়েছ?
হ্যাঁ।
ওপরে চলে এলাম। মিত্রা মাথা নিচু করে বসে আছে।
কিরে কি ভাবছিস?
কিছু না।
আমি টেবিলের ওপর থালাটা রেখে ওকে ধোঁকার বড়া দিলাম।
কে দিল?
বড়োমা।
তুই নিয়ে এলি, না বড়োমা দিল?
আমি আনতে চাইনি, আমাকে আহম্মক বললো, তাই নিয়ে এলাম।
মিত্রা একটা গোটা খেল, আর একটা হাফ কামড়িয়ে আমাকে দিল। আমি খেয়ে ফেললাম।
নে রেডি হ। তৈল মর্দন শুরু হবে।
দরজা বন্ধ কর।
কেন? কেউ তো নেই।
মিত্রা হাসলো।
আমি দরজা বন্ধ করলাম।
মিত্রা নিচে নেমে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
এখন শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।
এই কদিন একটু ঠিক করে থাক। কাল রাতে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি।
তোর চোখমুখ দেখে বুঝেছিলাম।
তাহলে কেন অবুঝপানা করিস।
তোকে দেখলে আমি ঠিক থাকতে পারিনা।
ঠিক থাকতে হবে।
তুই আছিস, আমার আর ভয় নেই, তোর কাছে আমাকে কনফেস করতে হবে।
সময় হলে করিস।
মিত্রা আমার ঠোঁটে চুমু খেল।
তেল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
যাক, আমার এখন যা খুশি তাই করবো।
কর।
তুই পাজামা পাঞ্জাবী খুলে টাওয়েল পর।
কেউ চলে এলে।
আসুক।
আচ্ছা।
আমি পাজামা পাঞ্জাবী খুলে টাওয়েল পরলাম। মিত্রা কাপর ব্লাউজ খুললো। আমি ওকে টেবিলটা ধরে পেছন ফিরে দাঁড়াতে বললাম, ভালো করে ওর পিঠে শিড়দাঁড়ায় গরম তেল মালিশ করলাম, তারপর ওর পা-দুটোয় ভলোকরে তেল মালিশ করলাম।
বুবুন আমার কিন্তু শির শির করছে।
আমি কোনও কথা বললাম না। নিজের কাজ করে চলেছি।
উঠে দাঁড়ালাম। ঘুরে দাঁড়া।
ও ঘুড়ে দাঁড়াল, আমি তেল নিয়ে ওর বুকে পিঠে ভালো করে ডলছি।
বুবুন তুই ইচ্ছে করে হাত দিচ্ছিস।
আমি চুপচাপ। নির্বিকার চোখমুখ।
ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আমার মতো তেল ঘসছি। মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করছিনা তা নয়। খুব গম্ভীর হয়ে কাজ করছি। ওর কাঁধে হাত দিলাম, গলায় তেল মাখাচ্ছি।
তবেরে। দিল আমার টাওয়েলে টান। চেপে ধরলাম।
আমি হাসছি।
তোর শরীর খারাপ।
একবার, প্লিজ একবার।
না। শরীর ঠিক হোক তারপর।
প্লিজ। ও আমাকে জাপ্টে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো।
ওর সারা গা তেল চপচপে, পিছলে পিছলে যাচ্ছে। আমার গায়ে রসুন তেলের গন্ধে ভরে গেলো।
তোর সমস্ত তেল আমার শরীরে।
বড়োমাকে বলবো বেশি হয়ে গেছিল তুইও মেখেছিস।
মিত্রার চোখ চকচক করছে। চোখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকালেই বোঝা যায় ও সুস্থ নয়।
ওরা ঝিনুক মুখে দিয়ে চলে।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে আমার বুকে ঠোঁট ছোঁয়াল।
আমাদের মতো কত হাজার বার এসব করেছে জানিস।
তোকে নিয়ে পারা যাবে না।
ও লাফিয়ে আমার কোলে উঠে পরলো। আমাকে জাপ্টে ধরে আছে।
কি হলো।
এই ভাবে আমায় বাথরুমে নিয়ে চল।
তুই দেড় কুইন্টালের বস্তা।
তা হোক।
অগত্যা আমি ওই ভাবে ওকে কোলে তুলে নিয়ে গেলাম। ও আমার গলা জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে।
বাথরুমে গিয়ে বললাম, নাম।
দাঁড়া না একটু।
আমার দম নেই।
ও নিচে নেমে দাঁড়াল।
আমি হাসলাম।
ছোটোমা এলো একটু দেরি করে, আমরা ছোটোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
কিরে তোরা খেয়ে নিসনি কেন?
আমি ছোটোমার দিকে তাকালাম, মুখের সেই হাসি হাসি ভাবটা কোথাও উধাও হয়ে গেছে, কেমন যেন ফ্যাকাশে।
কি হয়েছে তোমার?
কিছু না।
ওটা তোমার ঠোঁটের ঘর্ষণে বুঝতে পারছি। তোমার মুখের আয়না অন্য কথা বলছে।
তোর সব সময়….।
চুপ করে গেলাম।
বড়োমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, মিত্রা আমার কথা বোঝার চেষ্টা করছে।
ছোটো হাতমুখ ধুয়েনে। ভাত বাড়ি। বড়োমা বললো।
হ্যাঁ দিদি, আমি এখুনি রেডি হয়ে নিচ্ছি।
সবাই একসঙ্গে টেবিলে বসলাম। বড়োমা খাবার বেড়ে দিল, ছোটোমা বড়োমাকে সাহায্য করছে।
খাওয়া শুরু হলো, নিস্তব্ধ, ব্যাপারটা আমার ভালোলাগল না, কোথায় যেন তাল কেটে গেছে মনে হচ্ছে।
ওবাড়িতে কেন গেছিলে?
যাব না। চার পাঁচদিন যাই নি, ঘরদোর একটু পরিষ্কার করার দরকার আছে।
ফিরে আসার পর তোমার মুখটা গম্ভীর দেখাচ্ছে, কিছু হয়েছে?
না।
তুমিও কি আমার মতো….?
ছোটোমা আমার দিকে তাকাল। চোখের ভাষা কিছু বলতে চায়। বলতে পারছে না।
জান ছোটোমা আমার জীবনে কতগুলো মিশন আছে। বলতে পার স্বপ্ন….।
বল।
যেমন প্রথম হচ্ছে, আমার যারা খুব কাছের মানুষ, আমি তাদের হাসিখুশি দেখতে চাই। জানি তাদেরও অনেক কষ্ট আছে, হয়তো সব কষ্টের সমাধান আমি করতে পারবনা। তবে আশিভাগ চেষ্টা করলে পারব। তোমার সমস্যা তোমায় বলতে হবে না, আমি জেনে নেব।
অনি!
আমি ঠিক বলছি ছোটোমা।
না এইভুল তুই করবি না, তাহলে আমার থেকে বড় কষ্ট আর কেউ পাবেনা।
আমি ছোটোমার দিকে তাকালাম।
আর একটা কথা, আমার কাছের মানুষের কাজে ভুল হলে সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু কেউ যদি অপমান করে থাকে, তাহলে বুঝবে তাকে ওই মুহূর্তে জ্যন্ত পুঁতে ফেলব। সেই সময় অনি ভীষণ হিংস্র।
তুই কেন এইসব বাজে চিন্তা করছিস, আমার কিছু হয়নি।
একটা গল্প বলি এই প্রসঙ্গে, ভালো করে শোনো।
তখন ক্লাস টেনে পরি। কৈশোর যৌবনের সন্ধিক্ষণ। চোখে অনেক স্বপ্ন। ডাক্তার হব, বদ্যি হবো। প্রথম ব্যাঙ কাটা হবে স্কুলে। আগের দিন রাতে সারারাত ঘুমলাম না। আমার কোনও বাইওলোজিক্যাল বক্স ছিল না। অনাদির ছিল, আর বাসুর ছিল।
উনামাস্টার সাইন্সের টিচার।
টিফিনের পর ব্যাঙ কাটা হবে। চিকনা ব্যাঙ ধরে আনল পচা পুকুর থেকে। গ্রামের স্কুল, ওই সব মোমলাগান ট্রে পাবে কোথায়। তাই একটা কলাগাছের চোকলায় ব্যাঙ রেখে, বাবলাকাঁটা ফুটিয়ে হাত-পা বেঁধে তাকে কাটা হলো। স্কুলে একটা মাইকোস্ক্রোপ ছিল তাকে আনা হলো। স্লাইডে ব্যাঙের কি সব তুলে উনামাস্টার সবাইকে দাখাচ্ছেন। কেউ ঠিক বলছে কেউ ভুল বলছে। আমাকেও ডাকলেন। আমি গেলাম।
সত্যি বলতে কি ছোটোমা আমি শুনে শুনে একটা কিছু বলতে পারতাম, কিন্তু আমি সত্যিটা বললাম। সবাই যা বললো, আমি তার ঠিক উল্টোটা বললাম। বললাম আমি হিজিবিজি ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছিনা। উনামাস্টার গুনে গুনে দশটা বেতের বাড়ি মারল।
কাঁদিনি। কেননা আমার মনের কথা বোঝার মতো উনামাস্টারের মানসিকতা ছিল না।
ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে এসে উনামাস্টারকে মনেমনে প্রচুর গালাগাল দিলাম।
চলে গেলাম পীরসাহেবের থানে। ওখানে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। মনেমনে প্রার্থনা করলাম, সত্যি তুমি যদি থাক, তুমি যদি সত্যি কেউ হও, তাহলে আমার চোখটাকে মাইকোস্ক্রোপ বানিয়ে দাও।
আমি মানুষ চিনতে চাই, আর মানুষের ভেতরটা যেন দেখতে পাই। সত্যি বলতে কি কিছুক্ষণ পর হাওয়ায় ভেসে এলো একটা কথা।
ওরে এতে অনেক বেশি কষ্ট, পারবি সহ্য করতে। তখন ছোটো ছিলাম, এখন হলে বলতাম, না। তখন কিন্তু আমি বলেফেলছিলাম, হোক কষ্ট, তবু তুমি আমায় এই শক্তি দাও।
সবাই চুপচাপ। বড়োমা আমার মাথায় হাত রাখলেন, মিত্রা, ছোটোমা ভাতের থালা থেকে হাত তুলে আমার মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে। আমি নিস্তব্ধে খেয়ে চলেছি। বুঝতে পারছি আমার চোখে মুখের চেহারায় পরিবর্তন ঘটেছে।
পাগল। বড়োমা বললো।
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। যে যার নিজের মতো খাচ্ছে।
শোন অনি তুই আজ সকাল বেলা যেভাবে ওই মন্ত্রীটার সাথে কথা বললি, তোর দাদা আজ পঁচিশ বছরে ওই ভাবে কারুর সঙ্গে কথা বলেছে? চেষ্টা করলেও পারবে না। এটা হচ্ছে উইল পাওয়ার, সবার থাকে না। পৃথিবীতে কজন মানুষের এরকমটা থাকে বল। বড়োমা বললো।
আমি বড়োমার দিকে তাকালাম।
একটা কথা তোমায় বলি বড়োমা, বলতে পারো আবার রিপিড করছি। তোমাদের পাঁচ জনের কাছে আমি আমার জীবনের না পাওয়া অনেক জিনিস পেয়েছি। যা মনাকাকা, কাকিমা সারাজীবনে দিতে পারেনি। কিন্তু তাদের দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। আমার বাবারও কম ছিল না।
জানি।
তোমাদের কাউকে কেউ যদি কোনও দিন অপমান সূচক কথা বলে থাকে। আর আমি আমার উপলব্ধি দিয়ে যদি বুঝতে পারি, সে ইচ্ছে করে এটা করেছে তার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। তাহলে মনে রাখবে, আমার কাছে তার শাস্তি, নৃশংস মৃত্যু। আমার হাত থেকে সে রেহাই পাবে না। তবে আমি তাকে নিজের হাতে কোনও দিন মারব না।
অনি! ছোটোমার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো।
ছোটোমা এঁটো হাতে আমার কাছে উঠে এলো। আমার গলা জড়িয়ে ধরলো, বাঁ হাতে আমার থুতনিটা ধরে মুখটা নিজের দিকে ঘোরাল।
শোন বাবা, তুই পাগলাম করিস না। সত্যি বলছি, আমার তোর মল্লিকদার কিছু হয়নি। পারিবারিক সমস্যা সকলের থাকে, আমারও আছে।
আমি তোমার কাছ থেকে কিছু জানতে চাইনি। প্রয়োজন বোধ করলে জেনে নেব।
পরিবেশ থম থমে, আমি ছোটোমাকে বললাম, ভাত দাও।
ছোটোমা আমার পাতে বাঁহাত দিয়ে দু-হাতা ভাত দিল। একটু মাছের ঝোল নে।
দাও।
মিত্রা নিবি।
দাও একটু।
ছোটোমা মিত্রাকে দিল। আমি বড়োমার পাত থেকে একটা চিংড়িমাছ তুলে নিলাম, মিত্রা দেখল।
কিরে তুই একলা একলা।
তুই খাবি?
আবার জিজ্ঞাসা করছিস!
তারপর সারারাত পায়খানা করবি।
শয়তান।
বড়োমার তাহলে খাওয়া হবে না।
তুই খেলি কেন?
তুই ছোটোর পাত থেকে নে। দুজনে ভাগাভাগি করি। দেখ বাটিতে সব ফুরুত।
তোর মতো রাক্ষস থাকলে….।
আচ্ছা দাঁড়া দাঁড়া আমি দিচ্ছি।
বড়োমা একটা চিংড়িমাছ মিত্রার পাতে তুলে দিল।
তোর থেকে আমারটা সাইজে বড়ো।
তুই মালকিন, বড়ো হওয়া স্বাভাবিক।
মালকিন মালকিন করবিনা বলে দিচ্ছি।
হাসলাম।
খাওয়া চলছে।
জান ছোটোমা, তোমাদের আমার মানুষ দেখার কয়েকটা গল্প বলি।
আমার চাক্ষুষ দেখা। তোমরা এর নির্যাসটা বলবে, সবাইকে সাতদিন সময় দিলাম। তারপর আমার ব্যক্তিগত মতামত তোমাদের সঙ্গে শেয়ার কোরবো।
বল।
একদিন অফিসে ঢুকলাম একটু দেরি করে। তখন আমি গণিকাপল্লীর বাসিন্দা। সারারাত ঘুম হয় না। ভোরের দিকে একটু ঘুমই। তাছাড়া সারারাতের খুচখাচ ফাই-ফরমাশ আছেই।
সেদিন মনে হয় দাদার মন মেজাজাটা ভালো ছিল না। আমায় খুব বকাবকি করলো। তারপর বললো, এক কাজ কর, নিকোপার্কে একটা ছোটোদের কার্নিভাল চলছে। একজন ফটোগ্রাফার গেছে, তুই লেখাটা রেডি করে দে।
আমি অফিসের গাড়ি জীবনে খুব কম ব্যবহার করেছি। সেদিনও বাসে করে চলে গেলাম। সারাদিন পার্কে বাচ্চাদের সঙ্গে থাকলাম। শেষ হলো প্রায় রাত আটটা।
দাদাকে ফোন করে বললাম, লেখাটা কি আজকেই লাগবে।
দাদা বললো, কেন।
আমি বললাম, প্রোগ্রাম এই শেষ হলো, সবে বেরচ্ছি।
দাদা বললো, তাহলে এক কাজ কর, কাল সকালে দে, সানডে চিলড্রেন্স পেজে দিয়ে দেব।
আর বাসে উঠতে ইচ্ছে করলো না। ওখান থেকে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। চিংড়িহাটার মুখে যখন এসে পরেছি, দেখি একটা পাগলি ভয়ার্ত চোখ মুখ করে রাস্তার ওপার থেকে এপারে আসছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ওমা দেখি, ওর পেছন পেছন একটা পাগল, হাসতে হাসতে আসছে। বেশ ধীর পায়ে দুলকি চালে রাস্তা পার হলো।
দৃশ্যটা দেখে আমার কেমন যেন একটু খটকা লাগলো।
কি মনে হতে আমি ওদের পিছু নিতে শুরু করলাম। রাস্তা পার হয়ে একটা ক্যালভার্ট পরে। পাগলিটা দেখি ওই ক্যালভার্টের পাশে গিয়ে বসে পরলো।
জায়গাটা একটু অন্ধকার অন্ধকার। রাস্তার আলো যতটা আসছে ঠিক ততটাই চারদিকে ছড়িয়ে পরেছে। আমি সেই অন্ধকারে একটু দূরত্বে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ্য করছি।
পাগলটা পাগলির পাশে এসে বসলো। এ ওর মুখ দেখে, ও এর মুখ দেখে। বেশ কিছুক্ষণ পর পাগলিটা উঠে দাঁড়াল, ছুটে পালাতে চাইল। পাগলটা ওকে ধরে ফেলে আবার পাশে বসাল।
গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বিশ্বাস করবে না, আমি প্রায় একঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হলো। বাসে আস্তে আস্তে অনেক ভাবলাম, গনিকা পল্লীতে ঢুকেও মিলন দেখলাম।
বিশ্বাস করবে না ছোটোমা দুটোই মিলন, একটার মধ্যে প্রাণ খুঁজে পেলাম, একটার মধ্যে পেলাম না। সেদিন সারারাত ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেটে গেছিল।
ভোররাতে কি খেয়াল হলো কার্নিভালের লেখাটা লিখে ফেললাম।
লেখাটা বেরোবার পর দাদা আমাকে ডেকে একটা ফাউন্টেন পেন দিয়েছিল। আমি পেনটাতে এখনও লিখিনি, নতুন অবস্থায় রেখে দিয়েছি।
ওরা সবাই আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
ছোটোমার গালদুটো ফোলা।
ভাতটা গিলে ফেল। বিষম লেগে যাবে।
মিত্রা হাসল, ছোটোমা গোঁত করে ভাতটা গিলে ফেললো।
দ্বিতীয়টা শুনবে।
বল। বড়োমা বললো।
শিয়ালদা ক্যাফের অপরজিটে।
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো, ছোটোমাও হাসছে।
তোরা হাসছিস কেন। বড়োমা বললো।
মিত্রার দিকে তাকাবার পর, মিত্রা ইশারায় কালকের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিল।
কালকে, মোগলাই পরটা।
বড়োমা বললো, ও হরি।
আচ্ছা তোর মাথায় কি কুবুদ্ধি ছাড়া কিছু নেই।
শুনলেই না ওমনি বলে দিলে কুবুদ্ধি। দাও শেষ চিংড়িটা।
না একেবারে দেবে না, বড়োমা ওটা তুমি খাবে। মিত্রা বললো।
তোর হিংসে হচ্ছে কেন।
সব তো তুই খেয়ে নিলি, বড়োমা কি খেল।
খাক না ওরকম করিস কেন।
সব সময় তুমি….।
ঠিক আছে মল্লিককে বলবো কালকে বেশি করে আনতে। বল তোর গল্পটা।
সেদিন শ্যামবাজার হয়ে অফিসে আসছি। শিয়লাদার জ্যামে বাসটা দাঁড়িয়ে।
বুঝলে বড়োমা আমার একটা বদ অভ্যাস আছে, আমি জানলার ধার ছাড়া বাসে বসি না, তার থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাব সে ভালো।
এটা ভালো অভ্যেস বেশ রাস্তা দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। তাই না। বড়োমা বললো।
ওপাশে তাকিয়ে বলো।
মিথ্যুক তুই কোনওদিন আমাকে জানলার ধারে বসতে দিসনি। কতো বোঁটকা গন্ধ ওয়ালা লোক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কি বলেছে জান? তুই তো সেন্ট মেখেছিস লোকটা একটু শুঁকুক না তাহলে তোর সেন্টেরও মহিমা ছড়িয়ে পরবে।
হাসি থেমে নেই।
বাসটা থামতেই, মুখটা বার করে দেখলাম, জ্যাম কতটা। দেখলাম ওড়াল পুলের ওপর পর্যন্ত জ্যাম। তারপর রাস্তায় চোখ চলে গেল। দেখি একটা পাগল বসে আছে।
আবার পাগল!
ভেটকি কোথাকার। আগে শোন। তোর তো ঘটে বুদ্ধি নেই, কি বলছি তার উত্তর দেওয়ার। অন্তঃত চুপ করে শোন।
তা বলে তুই ভেটকি বলবি! ছোটোমা বললো।
না চুমা দেব।
বড়োমা আমার কানটা ধরে নেড়ে দিল।
তুমি ওকে মারতে পার না, শুধু হাত বোলাও। মিত্রা চেঁচাল।
বড়োমা পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, কত অভিজ্ঞতা বলতো এইটুকু বয়সে।
হুঁ।
এমন হয়না অনেক সময় কেউ রাস্তায় সিগারেট খেতে খেতে যাচ্ছে, হঠাৎ বাস এসেগেছে, সিগারেটটা কোনও প্রকারে একটু টেনে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে বাসে উঠে পড়ে।
হ্যাঁ।
সেরকম একটা সিগারেট টানছিল পাগলটা।
ফুটপাথে একটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে।
তুমি যদি তার সিগারেট খাওয়াটা দেখতে তাহলে বুঝতে, যেন কোন রাজবাড়ির ছোটোবাবু। ঠ্যাংয়ের ওপর ঠ্যাং তুলে। যেন সেটা সিগারেট নয় পাইপ। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।
বলা নেই কওয়া নেই হঠাত দেখি কোথা থেকে একটা পাগলি এসে হাজির।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাগলটার সিগারেট খাওয়া দেখলো। তারপর পাগলটার কাঁধে একটা টোকা দিয়ে সিগারেটটা চাইল।
পাগলটা একবার পাগলিটার দিকে তাকাল। পাগলিটার চাইবার চাহুনি, আর পাগলটার চাহুনি তুমি যদি দেখতে, আমি ঠিক তোমায় ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। সমস্ত ব্যাপারটা অনুভূতি সাপেক্ষ, তারপর পাগলটা আস্তে আস্তে উঠে চলে গেল। পাগলিটা ওর পেছন পেছন হাঁটল। বাসটা ছেড়ে দিল। বাকিটা দেখতে পেলাম না।
ছোটোমা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
দুটো খণ্ড চিত্র। কিন্তু একটু ভেবে দেখ, তোমাদের জীবনদর্শনের সঙ্গে অনেক কিছুর মিল খুঁজে পাবে।
বড়োমা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
কি দেখছো।
তোকে।
আমি কি সুন্দরী মেয়ে।
না। পুরুষ। তোর চোখ দিয়ে সেই পাগল পাগলিকে দেখছি।
সিনেমা শেষ। ঘড়ির দিকে একবার তাকাও। এরপর আর বলতে পারবে না। অনি তুই এখানে আসা ভুলে গেছিস।
আর একটু বোস।
কেন।
তুই যে বললি আর একটা বলবি।
সব একদিনে বললে হজম করতে পারবে না।
বড়োমা আমার কানটা ধরলো।
আমি উ করে উঠলাম।
আমার কথা আমাকে ঘুরিয়ে বলা।
আঃ কি আনন্দ। এবার জম্পেশ দিয়েছো বড়োমা। মিত্রা হাসছে।
বড়োমা কান ছারলো।
শোনো শেষ গল্পটা বলছি।
বল।
দুরাত ঘুমই নি। আজ তুমি ছোটো আর মিত্রা এক ঘরে, মল্লিকদা দাদা এক ঘরে, আর আমি একা দরজা লাগিয়ে রসুনতেল নাকে দিয়ে ভস ভস। ডোন্ট ডিস্টার্ব।
শয়তান। মিত্রা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো।
বড়োমাগো গেলাম।
মিত্রা আমার পিঠে গোটা কয়েক কিল মারলো।
মিত্রা এখন বেশ ভালো। আমি রেগুলার কিছুক্ষণের জন্য অফিসে যাই। ডাক্তারবাবু সাতদিন সাতদিন করে প্রায় একমাস কাটিয়ে দিয়েছেন। মিত্রা বেশির ভাগ সময়টা এ বাড়িতেই আছে। মাঝে মাঝে বড়োমা, ছোটোমাকে নিয়ে নিজের বাড়িতে কাটিয়ে আসছে। ওদের অবর্তমানে আমি, দাদা, মল্লিকদা রান্না করে খাচ্ছি। রান্না আমিই করেছি।
দামিনীমাসীর ছেলে ভজুকে নিয়ে এসেছি এ বাড়িতে। বড়োমা, ছোটোমার অনেক কাজ ভজু করে দেয়। ভজুর একটা জোরদার বায়না হচ্ছে, সে ঘরে শোবে না। তাই তাকে ওপরের বারান্দায় আমার ঘরের সামনে ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।
মিত্রা অফিসের কাজ এখন বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে। আমার কাছে মাঝে মাঝে ক্লাস করছে। অনাদি, চিকনার ব্যাপারে ফোন করেছিল। চিকনা মহাখুশী। সে কাজ শুরু করে দিয়েছে। বাড়িতে বাথরুম বানানো হয়েছে।
অফিসের অবস্থা এখন অনেকটা স্থিতিশীল, আমি সবসময় সবাইকে একটা চাপের মধ্যে রেখেছি। সবার সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ রাখার দরকার তা রেখেছি। এই একমাসে অফিসের আয় কিছুটা হলেও আমি বাড়িয়েছি। আপাতত অনি নামক বস্তুকে সবাই সমীহ কিংবা ভয় করতে শুরু করেছে।
আমার বাড়িতে যাওয়ার ডেট ফিক্সড হয়েছে আগামীকাল।
মিত্রা, ছোটোমা বড়োমাকে নিয়ে কয়েকদিন হলো নিজের বাড়িতে গেছে। গুছিয়ে গাছিয়ে আজ রাতে ফিরবে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি ভজুকে সঙ্গে নিয়ে রান্নার কাজ শেষ করে ফেললাম। তারপর নিজেরা খেয়ে নিলাম। বড়োমা এরইমধ্যে তিনবার ফোন করে ফেলেছে।
কিরে কতদূর। তুই সবেতেই এক্সপার্ট।
আমি বড়োমাকে বললাম, কেউ যখন ছিল না তখন সব নিজে হাতে করতাম। বছর খানেক হলো, সব ভুলে গেছিলাম। তোমাদের আর্শীবাদে আবার রপ্ত হলাম।
মিত্রার গলা পেলাম।
বড়োমা বলো না শয়তান একা একা বেশ ভালোমন্দ খাচ্ছে। আমাদের জন্য যেন রাতে থাকে।
শুনতে পাচ্ছিস।
এখন ছাড়ো। ভাতের হাঁড়ি উল্টেছি। কথা বলতে গেলে হাত পোরাব।
বড়োমা বললো, ঠিক আছে ঠিক আছে রাখছি।
দাদা মল্লিকদা আগে আগে বেরিয়ে গেল। আমি স্নান সেরে ভজুকে নিয়ে খেতে বসলাম। ভজুকে বললাম, দুপুরে খিদে পেলে, ফ্রিজ থেকে বার করে গরম করে নিয়ে খাবি।
ভজু এই ক-দিনে তৈরি হয়ে গেছে। ব্যাটা নিজের মনে নিজে থাকে। ওর কথাও ঠিক পরিষ্কার নয়। হাঁটা চলায় একটা এ্যাবনর্মালিটি আছে। ওর এসবে আমি অভ্যস্ত। বড়োমারা কতটা অভ্যস্ত হয়েছে জানিনা।
সামন্ত ডাক্তারকে দেখিয়েছি। ওষুধ দিয়েছেন। বলেছেন দীর্ঘদিন চিকিৎসা করলে যদি একটু উপকার হয়। ডাক্তারের কথা মতো ভজুরামের ওষুধ চলছে। প্রথম প্রথম দিতে হতো। এখন নিজেরটা নিজে নিয়ে খায়।
কিরে ভজু আমরা না থাকলে দাদাদের চা তৈরি করে দিতে পারবি?
সব পারবো।
আমি হাসলাম, ভজুও হাসছে।
এখন বাড়ির দায়িত্বে গেটে ছগনলাল, ভেতরে ভজু। এই কদিনেই ভজুর সঙ্গে ছগনলালের বেশ ভাব জমে গেছে। তবে দুজনেই খুব সজাগ। মাছি গলতে পারে না।
আমি ওপরে এসে জামাকাপর পরলাম। রেডি হয়ে বেরতে যাব, ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম অদিতির নামটা ভেসে উঠেছে।
হ্যালো।
বলো অদিতি।
কেমন আছ?
ভালো।
মিত্রাদি।
আপাতত ভালো আছে। তবে এখানে নেই।
কোথায়!
নিজের বাড়িতে।
তাই। বড়োমা, ছোটোমা?
সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছি।
তাহলে খাওয়া দাওয়া?
রান্না করছি খাচ্ছি।
তুমি!
হ্যাঁ।
তোমার এই গুণটাও আছে?
একসময় ছিল। মাঝে কিছুদিন বন্ধ রেখেছিলাম। এখন আবার একটু ঝালিয়ে নিচ্ছি।
সত্যি অনিদা তুমি পারও বটে।
তারপর তোমাদের খবর কি?
ভালো।
আজ তোমার প্রোগ্রাম?
সেই ভাবে কিছু নেই। একবার অফিসে যাব। তারপর এদিক ওদিক।
দুপুরে একটু সময় দিতে পারবে?
কখন বলো?
আমি তোমায় তুলে নেব।
কোথায় দাঁড়াতে হবে?
পার্ক স্ট্রীট।
ঠিক আছে।
আমি এ্যাসিয়াটিক সোসাইটির তলায় থাকব।
কটায় বলো।
দুটো।
আচ্ছা।
জামাকাপর পড়ে ভজুকে সব বুঝিয়ে দিলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম।
অফিসে এলাম এগারটা নাগাদ। নিউজরুমে ঢুকতেই, মল্লিকদা ডাকলো।
উঠে গিয়ে মল্লিকদার ওপরজিট চেয়ারে বসলাম।
ছোটো ফোন করেছিল?
কেন!
তোকে একবার ফোন করতে বলেছে।
কারন?
কি করে জানব।
দ্যাখো পিঁয়াজি মেরো না। ছোটো ফোন করলো আর তুমি জানবে না। এটা হয়?
এই শুরু করে দিলি। তুই এখন মালিক। মুখে যা আসবে তাই বলে যাবি।
উঠে চলে এলাম।
নিজের টেবিলে বসে মিত্রাকে ফোন করলাম।
বল।
ছোটোমাকে দে—
ওপরে। তুই কোথায়?
পাতালে।
এক থাপ্পর।
আর মারিসনা সেদিন বড্ড লেগেছে।
মিত্রা খিল খিল করে হেসে উঠল। ছোটোমা বলে চিল্লাল, শুনতে পাচ্ছি।
তুই কি অফিসে?
হ্যাঁ।
কি করছিস?
কিছু না, আসতেই মল্লিকদা বললো, ছোটোমা ফোন করতে বলেছে তাই ফোন করছি।
তোর আজকে হবে।
কেনরে, আবার কি করলাম!
কি করলি দেখ না।
তুই একটু হিন্টস দে।
ধর।
তুই কোথায়রে? ছোটোমার গলা।
অফিসে।
এরইমধ্যে ঢুকে পরেছিস?
হ্যাঁ।
কখন ফিরবি?
বলতে পারব না।
তারমানে!
আসি আমার ইচ্ছেয়, যাব কাজের ইচ্ছেয়। কাজ শেষ হলেই বেরব।
মাছের ঝোল কে রান্না করেছে?
আমি।
আমাদের জন্য রেখেছিস?
পাঁচ-ছ-পিস পরে আছে। ভজুকে বলেছি, খিদেপেলে টেনে দিস।
তার মানে!
ওই রান্না তোমাদের মুখে রুচবে না। আমরা ছেলেরা ম্যানেজ করে নিয়েছি। তোমরা পারবে না। আসল কথা বলো। এর জন্য তুমি ফোন করতে বলোনি।
তুই একবার আসবি?
অবশ্যই না।
কেন?
কাজ আছে। দুটো থেকে এক জায়গায় মিটিং। কখন শেষ হবে জানি না।
তাহলে তোকে বলা যাবে না।
রাতে কথা হবে। বড়োমা ঠিক আছে?
ঠিক আছে কইরে, মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।
কেন!
তার গতরে নাকি শুঁয়োপোকা পড়ে যাচ্ছে।
কেন!
এখানে কোনও কাজ নেই। শুধু বসে থাকা।
হেসে ফেললাম।
রাখছি।
ফোনটা পকেটে ভরে অমিতাভদার ঘরে গেলাম। দেখলাম চম্পকদা আর সুনিতদা বসে আছে। আমাকে দেখেই বললেন, আসুন ছোটোসাহেব।
আমি একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম।
দাদাকে বললাম আমার কোনও কাজ আছে?
দু-জনে হেসে ফেললো।
সত্যি অনি তোকে দেখে বোঝা মুস্কিল তোর রোলটা এই হাউসে কি। চম্পকদা বললো।
কেন আমি যা আছি তাই। তোমরা একটা বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছ। সেটা বইছি। যেদিন পারব না, বলে দেব এবার খান্ত দাও।
সে সময় আসবে?
কেন আসবে না।
বাই দা বাই, শোন মন্ত্রী মহাশয় টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে।
আমার কমিশন।
তোর জিনিস তুই পুরোটাই নে না, কে বারন করতে যাচ্ছে।
সবাই হাসছে।
তোমার টার্গেট কতদূর।
মনে হচ্ছে ফুলফিল করতে পারব। তুই এরকম ভাবে হেল্প করলেই হবে।
আমি যতটা পারব কোরবো, বাকিটা তুমি তোমার টিম।
হ্যাঁরে দাদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল ওই জায়গাটা নিয়ে কিছু ভাবলি।
কাগজপত্র রেডি করতে দিয়েছি, হয়ে যাক তারপর ভাববো। এখন অফিসের ঋণ শোধ করতে হবে। এটা আমার থেকে তোমরা দু-জন ভালো করে জান।
সুনিতদা, চম্পকদা মাথা নিচু করলো।
মাথায় রাখবে জিনিসটা আমার একার নয়।
সুনিতদা আমার দিকে তাকিয়ে।
এই বটগাছটাকে বাঁচাতে পারলে, আমরা সবাই বাঁচব।
তুই বিশ্বাসকর অনি তুই আমার ছেলের মতো।
অমি চম্পকদার দিকে তাকালাম।
এখনও সেই দিনটার কথা মনে পড়লে, রাতে ঘুম হয় না।
সুনিতদার ওই সব কিছু হয় না, রাতে বেশ ভালো ঘুম হয়, সুনিতদার কিছু মনে থাকে না।
সুনিতদা আমার দিকে তাকাল!
তুই এই ভাবে বলছিস কেন?
তুমি ভেবে দেখ।
সুনিতদা চুপ।
সুনিতদা এখনও সময় আছে, তোমাকে নিয়ে আমার অনেক বড়ো কাজ করার স্বপ্ন আছে, তুমি এখনও শোধরাও নি।
অনি বিশ্বাস কর, ওরা আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল।
আমার এখান থেকে অনেক বেশি মাইনের অফার আছে তোমার কাছে, চলে যাও। তোমাকে কেউ ধরে রাখেনি।
আমি যাবনা বলে দিয়েছি।
তুমি তা বলোনি। ঝুলিয়ে রেখেছো।
সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
আবার কি হলো? দাদা বললো।
আবার বলি সুনিতদা তুমি যদি ভেবে থাক অনি খুব দুর্বল প্রকৃতির ছেলে, তাহলে ভুল করবে। তোমাকে আমি ওয়াচে রাখছি।
কিরে সুনিত তোর লজ্জা করে না। চম্পকদা বললো।
না তুই বিশ্বাস কর চম্পক।
তাহলে অনি যা বলছে তুই প্রতিবাদ করছিস না কেন? ও তোর পেছনে বলছে না?
সুনিতদা চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেল।
বুঝলে চম্পকদা, সুনিতদার স্বভাবটা মনে হয় চেঞ্জ করতে পারবো না।
আমায় একটু সময় দে।
দাদার ফোন থেকে সনাতনবাবুকে ডেকে পাঠালাম। সনাতনবাবু এলেন। চেয়ারে বসলেন।
সুনিতবাবুর আবার কি হলো? সবার দিকে তাকালেন।
ও অন্যায় করেছে, অনি বললো। চম্পকদা বললো।
আমরা শুধরে নিচ্ছি, উনি পারছেন না।
দাদা একটু চা খাওয়াবে। আমি বললাম।
আমায় বলছিস কেন, তুই হরিকে ডেকে বল।
তুমি বলো, তোমার বলা আর আমার বলার মধ্যে পার্থক্য আছে।
সবাই মুচকি হাসছে। দাদা বেলে হাত দিল। হরিদা উঁকি মারল। বুঝে গেল।
সনাতানবাবুকে বললাম আমার কাগজপত্র রেডি।
না ছোটোবাবু, ওরা এখনও দেয়নি।
কেন!
তুমি একটু বলো।
তাহলে আপনি কি করতে আছেন?
ওই রকম, এক কথা কতবার বলি বলো।
মেমো দিন, কি উত্তর দেয় দেখুন। আমি এর মধ্যে ঢুকলে এ্যাকসন অন্য হবে।
ফোনটা সনাতনবাবুর দিকে এগিয়ে দিলাম। ডাকুন এখানে।
সনাতনবাবু দুজনকেই ডাকলেন।
কিছুক্ষণ পর অরিন্দম আর কিংশুকবাবু ঢুকল। আমাকে দেখেই চমকে গেল।
আমিই বললাম, বসুন।
আপনার কাগজ রেডি করেছি এখুনি দিয়ে দেব। কিংশুকবাবু বললো।
আমায় কেন, ওটা সনাতনবাবুর টেবিলে পাঠানর কথা।
এই সবে শেষ করলাম।
কেন। কাজের চাপ বেরে গেছে।
না….।
পার্টি ফার্টি বন্ধ করুণ, আগে কাজ, তারপর ফুর্তি।
না মানে….।
তোতলাবেন না। প্রফেশনাল হাউসে কাজ করছেন। আজকে কিছু বললাম না। এরপর দিন সনাতনবাবুকে মেমো ধরাতে বলেছি।
অনিবাবু!
আপনার কি খবর। অরিন্দমবাবুর দিকে তাকালাম।
ওরা কিছুতেই মানছে না।
কলকাতায় আর লোক নেই, কালকে একটা টেন্ডার ফেলুন কাগজে। টেন্ডার জমা পরলে আমি ওপেন করবো।
কয়েকদিন সময় দিলে….।
অরিন্দমবাবু আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না, ব-কলমে ব্যবসা করবেন না।
কেউ যেন অরিন্দমবাবুর গালে ঠাস করে একটা চড় মারলো।
কি হলো, চুপ করে গেলেন কেন। অনি সব জেনে ফেলেছে। এতো কান্ড হওয়ার পরও আপনারা নিজেদের কি ভাবেন। আমি সব ভুলেগেছি। আপনাদের বলেছি না, বাহান্ন কার্ডের মধ্যে মাত্র ছটা কার্ড নিয়ে আমি গেম খেলছি। আপনারা তা সত্ত্বেও আমার সঙ্গে পারবেন না….।
অনি দূর কর এগুলোকে। অমিতাভদা, চম্পকদা দুজনেই চেঁচিয়ে উঠল।
অরিন্দমবাবু মাথা নিচু করে বসে আছে।
আমি কাল বাইরে যাচ্ছি। দাদা আজ তারাতারি বাড়ি যাবে। কাগজ দাদার হাতে পৌঁছে দেবেন। আমি তিনদিন পর এসে আবার বসবো।
সনাতনবাবু এই সপ্তাহের স্টেটমেন্ট।
দাদার হাতে দিয়ে দেব।
হরিদা চা নিয়ে এলো, চায়ে চুমুক দিলাম, ফোনটা বেজে উঠলো, অদিতি।
তুমি কোথায়?
অফিসে।
কটা বাজে দেখেছো।
বেরচ্ছি।
চম্পকদা আমার দিকে তাকাল, মুচকি হেসে বললো, কিরে আবার দাঁও মারবি?
জানিনা।
তুই আমাকে চাকরি থেকে দূর কর।
কেন!
তুই সব নিয়ে এলে আমি কি করবো।
আমার থেকে তুমি বেশি নিয়ে আসতে পারলে তুমি যাও।
এই জায়গায় তোর সঙ্গে পারবো না।
জানো চম্পকদা কাগজের প্রতি তোমার ডেডিকেসন যদি ঠিক থাকে, কাগজ তোমার সব দায়িত্ব নেবে। একবার সুযোগ দিয়ে দেখ না।
চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে টেবিলে রাখলাম।
উঠি।
তোর আর্টিকেলটা। দাদা বললো।
সবাই হেসে ফেললো।
ঠিক আছে রাতে দিয়ে দেব।
দাদার ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। হরিদা বেরতেই বললো, ছোটোবাবু তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।
এখন।
হ্যাঁ।
দাদাকে বলে দিও, রাতে জেনে নেব।
ঠিক আছে।
অফিস থেকে বেরিয়ে এসে একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা চলে এলাম পার্কস্ট্রীট। এ্যাসিয়াটিক সোসাইটির তলায় দাঁড়ালাম। এদিক ওদিক তাকালাম। চেনা লোক চোখে পরলো না।
মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়েছি, দেখি অদিতি গাড়ির কাঁচ খুলে ডাকছে। আমি একটু এগিয়ে এসে গাড়িতে উঠে বসলাম। ওমা দেখি মিলিও আছে। একটু অবাক হলাম। গাড়িতে বসে ওদের ভালো করে লক্ষ্য করলাম।
দুজনে যা ড্রেস হাঁকিয়েছে, মাথা খারাপ করে দেওয়ার মতো। জিনসের প্যান্ট স্যান্ডো গেঞ্জি, তাও আবার নাভির ঠিক ওপরের দুইঞ্চি আর নিচের চার ইঞ্চি উন্মুক্ত, আমি পেছনে হেলান দিলাম। লুকিং গ্লাস দিয়ে দেখলাম। অদিতি, মিলিকে ইসারায় কি বলছে। আমি জানলার দিকে মুখ করে চোরা চাহুনি মারছি। অদিতি স্টিয়ারিংয়ে বসেছে। বুঝলাম এদের কিছু মতলোব আছে।
অনিদা।
উঁ।
তোমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছি বলো?
কি করে বলবো।
গেইজ করো।
আমায় হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা আমি যে পথো চিনি না।
দুজনেই হেসে উঠলো। সত্যি অনিদা তোমার সঙ্গ উপভোগ করা ভাগ্যের ব্যাপার।
কেন!
তুমি খুব এনজয়বেল।
সে-কি-গো! শেষ পর্যন্ত….।
আচ্ছা আচ্ছা বাবা উইথড্র করছি।
ক্যাঁচ করে ব্রেক মারল অদিতি।
সামনে একটা গাড়ি হঠাত ব্রেক কষেছে। আমি পেছনের সিটে জবু থবু।
কি হলো?
ভাবছি।
কি।
জীবনের রূপ-রস-গন্ধ-শব্দ-স্পর্শ এখনও কিছুই উপভোগ করতে পারলাম না, এরই মধ্যে যদি বে-ঘরে প্রাণটা যায়।
হা হা হা। দুজনেই হাসছে।
হাসবেই, তোমরা তবু ছিটে-ফোঁটা পেয়েছ। আমি এখনও মরুভূমিতে মরিচিকার মতো ঘুরছি।
তুমি কিন্তু চাইলেই পেয়ে যাবে।
এখানেই সব শেষ।
কেন!
মুখ ফুটে যে চাইতে পারি না।
কেন মিত্রাদি?
সবাই তাই বলে, কিন্তু মালকিন বলে কথা, যতই হোক আমাকে মাসের ভাতটুকু দেয়।
তুমি এখন মালিক।
সেটা এখনও নিজে ভাবতে পারছি না।
সেকি!
হ্যাঁগো, তোমাদের মিথ্যে বলতে যাব কেন। মালিক হওয়ার পর থেকে যা ঝড় উঠেছে, তাই সামাল দিতেই ত্রাহি ত্রাহি রব ছাড়ছি। ভাববার সময় পেলাম কোথায়।
তা ঠিক। তুমি বলে লড়ে যাচ্ছ, আমরা হলে হাল ছেড়ে দিতাম।
গাড়িটা বাইপাস হয়ে স্প্রিং ভ্যালিতে ঢুকল। আমি পেছনে বসে আছি। এই ছোটো গাড়ির এসি মেসিন বেশ স্ট্রং। একটুতেই ঠান্ডা লাগে আর শীত শীত করে।
আমরা এসে গেছি।
এটা কি তোমাদের নতুন অফিস?
সত্যি অনিদা এসব বলো না। তোমার মুখে এসব মানায় না।
কেন।
এখানে মিলির ফ্ল্যাট।
এখানে!
হ্যাঁ।
আরি ব্যাস, তার মানে মিলি তো….।
চুপ।
কেন!
চলো আমরা নেমে দাঁড়াই, অদিতি গাড়িটা পার্ক করে আসুক।
আমি আর মিলি নেমে দাঁড়ালাম। মিলি গেঞ্জিটা টেনে নামাবার চেষ্টা করলো, একটু নামলো। একটু নড়-চড়া করতেই যেইকে সেই। মিলির সুগভীর নাভির দিকে চোখ চলে যাচ্ছে, চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছি। মিলি বুঝতে পেরেছে। চোখে মুখে হাসির ছটা।
তোমার ফ্ল্যাট ক-তলায়।
এইটিনথ ফ্লোর।
উনিশ তলা!
হ্যাঁ।
কোনওদিন হেঁটে উঠেছো?
না।
একবার উঠে দেখো।
এজীবনে সম্ভব নয়।
কেন!
চব্বিশ ঘণ্টা লিফট আছে।
কারেন্ট যায় না?
যায়। জেনারেটর আছে।
অদিতি আসছে, অদিতির হাঁটার স্টাইলটা অনেকটা মডেলদের মতো। কোমরটা এতো সুন্দর দুলছে তাকিয়ে থাকার মতো। মাথার ঘনো কালো চুল কোমরের ওপরে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। চোখে স্নান গ্লাস। হাইট পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি মেয়েদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট লম্বা। মিলি সেই তুলনায় সামান্য বেঁটে, আর টিনা এদের কাছে লিলিপুট।
চলো।
আমি ওদের পাশাপাশি হেঁটে লিফ্টের কাছে এলাম। মিলি লিফট বক্সের বোতামে হাত দিল। দরজা খুললো, আমরা ভেতরে এলাম, হাউইয়ের মতো সোঁ করে লিফট ওপরে উঠে এলো। মিনিটখানেক লাগলো হয়তো। লিফট থামলো, আমরা নামলাম, এক একটা ফ্লোরে ছটা করে দরজা। মানে ছটা করেই ফ্ল্যাট। একেবারে বাঁদিকের শেষরটায় দেখলাম কোলাপসিবল গেট টানা, দরজায় লেখা আছে, মিলি সান্যাল, চিফ এক্সিকিউটিভ, এয়ারটেল। মিলি পার্সথেকে চাবি বার করে প্রথমে কোলাপসিবল গেটটা খুললো, তারপর ভেতরের দরজাটা, আমি অদিতির পাশে দাঁড়িয়ে। এদের ব্যাপার স্যাপার মাথায় ঢুকছে না।
খুব অবাক হচ্ছো তাই না? অদিতি বললো।
মোটেই না।
অদিতা স্নানগ্লাসটা খুলে, আমার দিকে তাকাল। চোখে বিস্ময়।
তুমি জানতে আমরা এখানে আসবো!
এখানে আসবে এটা জানতাম না, তবে তোমাদের দুজনের কারুর একজনের বাড়িতে যাচ্ছি গেইজ করেছিলাম।
এরপরের এপিসোড গেইজ করো।
তাও ভেবে রেখেছি।
বলো।
একটু আড্ডা হবে চুটিয়ে।
ভেতরে এলাম। এক্সিকিউটিভদের মতোই ফ্ল্যাট। চারিদিকে ঝকঝকে আধুনিকতার ছাপ, টিনার ফল্যাটে একটা অন্য গন্ধ পেয়েছিলাম। সেখানে রুচি এবং প্রানের আনন্দ দুইই ছিল। কিন্তু মিলির ফল্যাটে রুচির ছোঁয়া থাকলেও প্রাণের আনন্দ নেই। এখানে কেমন যেন একটা অন্য গন্ধ পাচ্ছি। ড্রইংরুমটা দারুন সাজানো গোছানো। প্রায় ১২০০ স্কোয়ারফুটের ফ্ল্যাট। মিলি কি এখানে একা থাকে নাকি? এসব প্রশ্ন এখানে করা বৃথা।
বসো। দাঁড়িয়ে আছো কেন? মিলি বললো।
আমি ড্রইংরুমের মাঝখানে পাতা বড় সোফায় হেলান দিলাম। অদিতি আমার পাশের সোফায় বসেছে। হাতদুটো বুকের কাছে ভাঁজ করা। ওর সুডৌল বুক হাতের ওপর দিয়ে উপচে পরেছে। গেঞ্জিটা অনেক ওপরে উঠে গেছে। প্রায় এক বেগদ দেখা যাচ্ছে। আমি ঘরের চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছি। মাঝে মাঝে চোখ চলে যাচ্ছে অদিতির নিরাভরণ জায়গায়।
জরিপ করা হলো।
হাসলাম। সামান্য।
কি বুঝলে?
মিলি বেশ বড়লোক।
তোমার থেকেও।
আমি! হাসলাম।
তুমি এরকম একটা কিনে নিতে পার।
পয়সা কোথায়?
অদিতি শব্দ করে হাসল।
এতো হাসি কিসের? মিলি ভেতর থেকে বাইরে এলো।
অনিদাকে জিজ্ঞাসা কর।
কিগো অনিদা?
দিতি বলছে এরকম একটা ফ্ল্যাট কিনতে, আমি বললাম পয়সা নেই।
মিলি মুচকি হাসলো।
অদিতি বললো, তুমি কি নাম বললে এখুনি?
দিতি।
বাঃ নামটা ছোটোকরাতে বেশ স্মার্ট লাগছে। মিলির দিকে তাকিয়ে, কিরে মিলি তাই না।
অনিদার মাথা।
মিলি আমার পাশে এসে বসলো। ঠান্ডা না গরম।
ঠান্ডা তো খাচ্ছি।
মিলি হাসছে।
তুমি পাশে এসে বসলে, তারওপর তোমার ঘরের কুল পরিবেশ।
তোমার সঙ্গে কথায় পাড়া যাবে না। যা অদিতি নিয়ে আয়। আমি রেডি করতে দিয়ে এসেছি, মনে হয় হয়ে গেছে।
কি করতে দিয়ে এসেছো?
চারটে সরবতি লেবু কেটে মেসিনে ফেলে এসেছি।
বাবা তুমি বেশ করিতকর্মা মেয়ে।
তোমার থেকে নয়। এত ঝঞ্ঝাটের মধ্যেও তুমি রান্নাকরে খেয়ে বেরও।
এই লেটেস্ট নিউজটা আবার কে দিল?
অদিতি।
আমার নামে কি বলছিস।
অদিতি ট্রেতে করে তিনটে গ্লাস নিয়ে এলো, বরফ দেওয়া দেখলাম।
সকাল বেলা অনিদার রান্নার কথা বললাম।
তাই বল।
অদিতি টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখল। গেঞ্জির ফাঁক দিয়ে ওর বুকের গভীর ভাঁজ চোখ পরলো।
এটা আবার চিয়ারস করতে হবে নাকি।
ধ্যুস তুমি না, এটা কি হার্ড ড্রিংকস।
তোমাদের কাছে এই ব্যাপার-স্যাপারগুলো রপ্ত করতে হবে।
আমাদের সঙ্গে দু-চারদিন ঘোরো শিখে যাবে।
অদিতি নিজের জায়গায় বসলো।
নাও।
মিলি আমার হাতে একটা গ্লাস তুলে দিল।
অনিদা সেই গল্পটা আর একবার বলবে। মিলি বললো।
কোনটা।
না অনিদা বলবে না। অদিতি বললো।
হাসলাম।
তুমি কোনওবারই পুরটা বলো নি। কিছুটা রেখে ঢেকে বলেছো।
তাহলে তোরটাও অনিদাকে বলতে বলবো। মিলির কণ্ঠে আদো আদো সুর।
অনিদা আমার তোর দুজনেরটাই বলবে।
আমি হাসলাম ওদের কথায়। গ্লাসে চুমুক দিলাম। লেবুর রসটা সামান্য তেঁতো লাগল, বুঝলাম একটু বেশি পেশা হয়ে গেছে।
ওরা দুজনেই উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে।
যতদূর মনে পরেছে, সেদিন বাংলা ক্লাস করে ১১ নং ঘর থেকে বেরিয়ে হলঘরে এসেছি, মিত্রা বললো, যাবি।
কোথায়?
বসন্ত কেবিনে।
কেন!
কবিরাজী খাওয়াব।
নিশ্চই তোর কোনও ধান্দা আছে?
ধান্দা না থাকলে তোকে কবিরাজী কাটলেট খাওয়াব কেন।
আগে তোর ধান্দাটা বল?
তুই আমাকে যে নোট দিয়েছিস সঞ্চিতা, পায়েল, শ্যামলীকে একই নোট দিয়েছিস।
তাতে কি হয়েছে!
তোর নোটটা আমাকে দে।
আমার! কেন?
তুই ধান্দা বাজ, ভালোনোটটা নিজের জন্য রেখে, ফালতুটা আমাদের দিয়েছিস।
যা ফোট, পাবি না।
তুমি কি নোট বিক্রী করতে। অদিতি বললো।
(আবার আগামীকাল)