উত্তর বাঁকুড়ার দামোদর সংলগ্ন এক গ্রাম পোখন্না। এক সময়ের বিশিষ্ট জনপদ পুষ্করণা বা পোখন্না অনেক প্রাচীণ জনপদেরমতই আজ তার অতীত গৌরব হারিয়েছে। শেকড়ে ফিরে যাওয়ার ব্রত নেওয়া স্থানীয় কিছু মানুষ আর কিছু উত্সর্গীকৃত মানুষ বা সংস্থা ছাড়া এ নিয়ে মাথাব্যাথা নেই প্রায় কারোরই। ৬৫-৬৬তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগের খননকার্যে এই এলাকার গিধুনিয়া, বাঁকাজোড়, ভরতপুর, বাঘডিহা, রামনাথপুর, শুশুনিয়া, কুশবন্যা, শিউলিবনা, শুয়াবসা, পারুল্যা, পাহাড়ঘাটা, ধানকেড়া, করকাটা, বাবলাডাঙা, নেটেল্যা, শিমুলবেড়া, হাপানিয়া, চাঁদড়া, বিন্দিসা-সহ বেশকিছু গ্রাম ঘিরে বেশ পুরোনো মানব বসবাসের চিহ্ন পাওয়া যায়। এই সব গ্রমে বর্ষাফলক, হাতকুঠার, নানান হাতিয়ার, মসৃণ কুঠার, ছিদ্রযুক্ত ক্ষুদ্রাকার চক্র পাওয়া যায়। বাংলার ইতিহাস আবার নতুনকরে লেখা শুরু হয়। শুশুনিয়া সংলগ্ন প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকায় নানান বহুবিচিত্র অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যাওয়া। মানিকলাল সিংহ বা পরেশ দাশগুপ্ত মশাই-এর অনুসারে আদি প্রত্নশ্মর আমলের ছোট বসতি শুরু হয়, তিন-চার লক্ষ বছর থেকে বাঁকুড়ার শুশুনিয়া, দ্বারকেশ্বর ও কুমারী নদীর এলাকায় তা বাড়তে শুরু করে মানব সমাজের পরিপূর্ণ বসতিতে রূপান্তরিত হয়।
প্রাগৈতিহিসিক শুশুনিয়ার প্রমাণ পাহাড়ের উত্তরদিকের গুহায় লিপিবদ্ধ শিলালিপি
পুষ্করণাধিপতে মহারাজ শ্রীসিঙ্ঘবর্মণঃ পুত্রস্য
মহারাজশ্রীচন্দ্রবর্ণণঃ কৃতিঃ
চক্রস্বামিণঃ দোসগ্রেণতিসৃষ্টঃ।
এই দুই লিপির কাল খ্রীষ্টীয় চতুর্থ দশক—গুপ্তযুগ প্রায় দেড় হাজার বছর আগের। লিপির হরফ ব্রাহ্মী কিন্তু ভাষা সংস্কৃত। এর সঙ্গে পাওয়া গিয়েছে একটি বিষ্ণুচক্রও।
আমাদের আলোচ্য পোখন্না শুশুনিয়ার প্রায় ৪০ কিমি দূরে অবস্থিত। এই গ্রামের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে আমরা দ্বারস্থ হই রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের—বঙ্গদেশে বাঁকুড়া জেলার শুশুলিয়ার পর্বতগাত্রে চন্দ্রবর্মার যে শিলালিপি আছে, তাহা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, তাঁহার পিতার নাম সিংহবর্মা এবং তিনি চক্রস্বামী বা বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন।… মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মালবদেশে প্রাচীণ দশপুরের (বর্তমান মন্দশোর) ধ্বংসাবশেষের মধ্যে একটি শিলালিপি আবিষ্কার করিয়াছেন। তাহা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, চন্দ্রবর্মার ভ্রাতার নাম নরবর্মা এবং তিনি ৪৬১ বিক্রমাব্দে (৪০৪-০৫ খ্রী.) জীবিত ছিলেন। এই সকল প্রমানের ওপর নির্ভর করিয়া শাস্ত্রী মহাশয় নির্ণয় করিয়াছেন যে, শুশুনিয়া পর্বতলিপির চন্দ্রবর্মা ও দিল্লির লৌহস্তম্ভ লিপির চন্দ্র একই ব্যক্তি, এবং দশপুর বা মন্দশোরের শিলালিপির নরবর্মা তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা। চন্দ্রবর্মা সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় যাত্রা অব্যবহিত পূর্বে বঙ্গদেশ হইতে বহ্লীকদেশ পর্যন্ত সমগ্র আর্যাবর্ত জয় করিয়াছিলেন। এলাহাবাদের দুর্গমধ্যে অশোকের শিলাস্তম্ভে সমুদ্রগুপ্তের যে প্রশস্তি উত্কীর্ণ আছে, তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায় যে, সমুদ্রগুপ্ত চন্দ্রবর্মা নামে জনৈক আর্যাবর্তরাজকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন। সমুদ্রগুপ্তের প্রশস্তি ও শুশুনিয়া শিলালিপির চন্দ্রবর্মা এবং দিল্লির স্তম্ভলিপির চন্দ্র যে অভিন্ন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।