সর্বসাধনায় সিদ্ধিলাভ করার পর অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ লোকালয় ছেড়ে গিরিগুহায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেননি, আশ্রয় গ্রহণ করেননি কোন শ্মশানের রহস্যময় পরিমণ্ডলে, বরং ভক্তজনের টানে ভগবান ফিরে এসেছিলেন সংসারজীবনের মূল কেন্দ্রে। তিনি মানুষকে আহ্বান জানিযেছিলেন— “তোরা কে কোথায় আছিস, আয় আয়,” পণ্ডিত-মূর্খ, ধনী-দরিদ্র, নামী-অনামী— সর্বজনকেই তিনি ডাক দিয়েছিলেন।
তার সেই প্রাণ জাগানিয়া ডাকে সে কালের অনেক আর্ত ও পিপাসার্ত মানুষ ছুটে এসেছিলেন। সমবেত হয়েছিলেন তাঁর আনন্দ-সভায়। দক্ষিণেশ্বর হয়ে উঠেছিল নবযুগের মানবতীর্থ। সেদিন যাঁরা তাঁর অদৃশ্য— আকর্ষণে ছুটে এসেছিলেন তাঁরাই পদপ্রান্তে, তাঁদেরই মধ্যে একজন ছিলেন মহিমাচরণ চক্রবর্তী। করুণাসন শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় মহিমাচরণ আজও আমাদের জীবনে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।
অপূর্ব-দর্শন ছিলেন এই মানুষ। শ্রীরামকৃষ্ণের আনন্দ-সভায় যখন তিনি গৈরিক বসন পরে একতারা হাতে নিয়ে বসতেন — তখন অনেকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অবশ্য সবসময় গৈরিক বসন পরতেন না। খুব সুন্দর কথা বলতে পারতেন। ঠাকুরও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তাঁর বাক্যচ্ছায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই তাঁর সামনে অনেক আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তুলে ধরতেন। ঠাকুরও অনেক আধ্যাত্মিক প্রশ্ন উত্থাপন করতেন। ভালো গান গাইতে পারতেন। স্বামী সারদানন্দ তাঁর “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গে” লিখেছেন, “ঠাকুর তাঁহাকে এক আঁচড়েই চিনিয়া লইয়াছিলেন” (উদ্বোধন সং, পৃঃ ৩৬৭)
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর এই ভক্তকে চিনেছিলেন প্রথম দর্শনেই। মহিমাচরণ যে পাণ্ডিত্যের অহংকার বর্জন করতে পারেননি— সেটাও ঠাকুর জানতেন। তাই কোন কোন সময় সমবেত সকলকে দেখিয়ে তিনি মহিমাচরণকে বলতেন— “তুমি পণ্ডিত, এদের কিছু উপদেশ দাও।” মন্ত্র সাধকের মাঝে মাঝে মহিমাচরণ অন্যান্য ভক্তের সঙ্গে ধ্যানালাপ করতেন। আসলে গুরুগিরি করার একটা প্রচ্ছন্ন বাসনা সবসময় তাঁর মধ্যে সক্রিয় ছিল, সক্রিয় ছিল র্ধম্ম উপদেষ্টারূপে নিজেকে জাহির করার।
অথচ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসার পর থেকেই তিলে তিলে তাঁর যাবতীয় অহংকার চূর্ণ হতে থাকে, পাণ্ডিত্যের অহমিকা মিলিয়ে গিয়ে তাঁর অন্তরে জেগে উঠতে থাকে ভক্তিভাব। শ্রীরামকৃষ্ণ রূপজ্ঞান সূর্যের উত্তাপে তাঁর অহংকারের বরফ গলে জল হতে থাকে।

মহিমাচরণ চক্রবর্তী
পাণ্ডিত্য-গর্বের অহংকার গলে ভক্তিভাবের জল কিন্তু একদিনেই উত্সারিত হয়নি। তারজন্যও প্রয়োজন ছিল উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুতের। প্রয়োজন ছিল উপযুক্ত প্রস্তুতির।
কাশীপুর উদ্যানবাটির কাছেই ছিল মহিমাচরণের বাড়ি। এ প্রসঙ্গে পরে আরও কিছু তথ্য আমরা জানতে পারব। তিনি ছোটখাটো একজন জমিদার। জমিদারির যা আয় হতো, তাতেই তাঁর জীবনধারা উপকরণ সংগ্রহ হয়ে যেত। মনের আনন্দে বিদ্যাচর্চা নিয়ে দিন কাটাতেন। বাড়িতেই পণ্ডিত রেখে শাস্ত্র অধ্যায়ন করতেন। এতেই পেতেন আত্মতৃপ্তি। এবং কিছুটা আত্মশ্লাঘাও।
সেদিন তিনি নিজের বাড়িতে বসে আপনমনে শাস্ত্রপাঠ ও শাস্ত্রচর্চা করছিলেন। এমন সময় তাঁর বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন অধরলাল সেন। মহিমাচরণের সঙ্গে ঠাকুরের প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৭৫ সালে। আর অধরলালের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ দক্ষিণেশ্বরে ১৮৮৩ সালে। অর্থাৎ, আটবছর পরে। অবশ্য পরবর্তীকালে অধরলালও শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় গৃহীভক্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর পিতা রামগোপাল সেন ছিলেন পরম বৈষ্ণব। প্রতিভাবান কৃতী ছাত্র অধরলাল ছিলেন ডেপুটিম্যাজিস্ট্রেট। প্রথম জীবনে নাস্তিক অধরলাল ঠাকুরের সংস্পর্শে এসে তাঁরাই প্রভাবে পরম ভক্ত হয়ে ওঠেন। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে হঠাৎই তাঁর মৃত্যু হয়।
সেদিন সেই অধরলাল সেন এসে উপস্থিত হয়েছিলেন মহিমাচরণের বাড়িতে। মহিমাচরণ তখন গুরু ও শিষ্যের ভূমিকা সম্পর্কে গভীর শাস্ত্রব্যাখ্যায় নিয়োজিত ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত অধরলাল ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ সেইসব ব্যাখ্যা শুনে শেষটায় প্রতিবাদ করেন এবং নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেন। বলা বাহুল্য মহিমাচরণও পাণ্ডিত্যের অভিমানে জর্জরিত। তিনিও অধরলালের ব্যাখ্যা মেনে নিতে রাজি হলেন না। ফলে দেখা দিল একটা ঘোরতর অচল অবস্থা।
শেষপর্যন্ত দু-জনেই একমত হয়ে ঠিক করলেন, তাঁরা দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে যাবেন। তিনি যাঁর মত সমর্থন করবেন, অপরজন সেটাই মেনে নেবেন। তর্কের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে দু-জনেই এলেন দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। ঠাকুর অন্তর্যামী— তিনি সবই জানেন, সবই জানতেন। তবুও রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে দিয়ে দু-জনের একসঙ্গে আসার কারণ জানতে চান। দু-জনের কুশল প্রশ্ন করেন।
মহিমাচরণ তাঁদের বক্তব্য ও সমস্যার কথা সবিস্তারে জানালেন। ঠাকুর হাসিমুখে তাঁদের সব বক্তব্য শুনলেন। তারপর গুরু শিষ্য সম্পর্কে তাঁদের তিনরকম ব্যাখ্যার উপর অত্যন্ত সহজ ও সরল ভাষায় চতুর্থ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেন। সেই ব্যাখ্যা শুনে তাঁরা দু-জনেই হতবাক, উপস্থিত সকলেই বিস্ময়-বিমুগ্ধ। পাণ্ডিত্যের অভিমানে গর্বোদ্ধত মহিমাচরণের মাথা তখনই যেন বেশ কিছুটা নুইয়ে পড়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণের পদতলে।
সাড়ে তিনশ বছরের পথ অতিক্রম করে আমরা যদি ইতিহাসের গতিতে পিছন ফিরে তাকাই, তাহলে অনুরূপ আরেক ঘটনার কথা অতি সহজেই স্মরণ করতে পারব। নীলাচলে উপস্থিত হয়েছেন তরুণ সন্ন্যাসী শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। জগন্নাথ মন্দিরে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁর পরিচয় হয়েছিল সেকালের বিখ্যাত পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌমের সঙ্গে। বাসুদেবই সাগ্রহে শ্রীচৈতন্যকে সাদরে নিয়ে এসেছিলেন স্বগৃহে। কিন্তু এই নবীন সন্ন্যাসীকে দেখে পাণ্ডিত্যের অহংকারে স্ফীত বাসুদেব তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু মহাপ্রভু তর্কের পথ গ্রহণ করলেন না। তিনি সার্বভৌমের কাছে ভাগবত ব্যাখ্যা শুনতে চাইলেন। সার্বভৌম আত্মরামাশ্চ মুনয়ো ইত্যাদি ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের ষষ্ঠ শ্লোকের তেরো প্রকার ব্যাখ্যা করলেন। তখন মহাপ্রভু শোনালেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং দেখালেন নিজের ষড়ভূজ মূর্তি। সার্বভৌম পাণ্ডিত্যের অহংকার বিসর্জন দিয়ে শ্রীচৈতন্যের স্তব করতে শুরু করলেন। এ এক অপূর্ব আত্মনিবেদন। ঠিক একইভাবে সেদিন মহিমাচরণও আত্মনিবেদন করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের চরণ সমীপে।
২
এবার আমরা মহিমাচরণ চক্রবর্তীর লৌকিক পরিচয় কিছুটা জেনে নিতে পারি। “লৌকিক পরিচয়” কথাটা বললাম এই জন্য যে, তাঁর আসল পরিচয় তিনি অবতারের লীলা-সঙ্গী, অবতারের পার্ষদ। কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটার মতই তাঁর সেই আসল পরিচয়ও ধীরে ধীরে ফুটতে থাকে। বহু-বিচিত্র চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের আনন্দ-সভায়—এ যেন অনন্তকালের জনস্রোত এসে মিলিত হয়েছে রামকৃষ্ণ-সাগরে। মহিমাচরণ সেই অনন্ত-স্রোতেরই এক বর্ণময় সুরভিত ফুল।
“শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি” অনুসরণ করে জানতে পারি— “শ্রী মহিমাচরণ চক্রবর্তী কাশীপুরে ঘর।/ জমিদার, তদুপরি পণ্ডিত প্রবর।। (পৃঃ ৩৪৭)
গণ্যমান্য লোকে করে অতুল সম্মান।/ বড়ই বেদান্তবাদী জ্ঞানমার্গে টান।।” (পৃঃ ২৯৯)
আগেই উল্লেখ করেছি, পরেও করব, কাশীপুর উদ্যানবাটির কাছেই ছিল মহিমাচরণের বাড়ি। তাঁর যেটুকু জমিদারি ছিল (এমন কিছু বড় ছিল না), তাতেই তাঁর জীবনযাত্রা নির্বাহ হয়ে যেত। শাস্ত্রপাঠ ও চর্চার দিকে ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। তাই বাড়িতেই পণ্ডিত রেখে তিনি শাস্ত্রপাঠ করেছেন। তিনি নিজেকে মনে করতেন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও জ্ঞানমার্গী সাধক। এখানেই শ্রীচৈতন্য-লীলায় প্রকটিত বাসুদেব সার্বভৌমের সঙ্গে আমরা বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাই। সে প্রসঙ্গ আগেই আলোচিত হয়েছে।
অহংকার ছিল নিজের সম্পর্কে। তাঁকে যদি কেউ দীক্ষা সম্পর্কে, বা তাঁর গুরুর সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন, তিনি বলতেন, “আমরা গুরুর নাম আগমাচার্য ওমরুবল্লভ।” শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ অনুসরণ করে জানতে পারি (পৃঃ ৩৬৮, উদ্বোধন), আবার কখনও কখনও বলতেন, ঠাকুরের ন্যায় তিনিও পরমহংস পরিব্রাজক শ্রীযুক্ত তোতাপুরীর কাছেই দীক্ষা করেছেন। তিনি বলতেন, পশ্চিমে তীর্থ-পর্যটনকালে একস্থানে তাঁর দর্শন পেয়েছিলেন এবং দীক্ষিত হয়েছিলাম। তোতাপুরীই নাকি শ্রীরামকৃষ্ণকে “ভক্তি অবলম্বন” করে থাকতে বলেছিলেন, এবং তাঁকে “জ্ঞানমার্গের সাধক” হয়ে থাকতে উপদেশ দিয়েছিলেন।
এ-রকম অহংবোধে আচ্ছন্ন কথাবার্তা ছিল তাঁর। ঠাকুরের দীপ্ত-প্রভাবে সেই অহংবোধই তাঁর তপ্ত চোখের জলে বাষ্প হয়ে শূন্যে মিলিয়ে গিয়েছিল। তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের পদতলে। ভক্তিভাবে হয়েছিলেন শুদ্ধ-চিত্ত।
“লীলাপ্রসঙ্গ” অনুসরণ করেই আমরা জানতে পারি, নাম-যশের প্রত্যাশা ছিল তাঁর প্রবল, সদাই নিজেকে জাহির করতে চাইতেন। লীলাপ্রসঙ্গকার লিখছেন, “…নানা সদ্গুণ-ভূষিত হইলেও চক্রবর্তী মহাশয় লোকমান্যের জন্য নিরন্তর লালায়িত ছিলেন। বোধহয় মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিলে যদি লোকমান্য পাওয়া যাইত, তাহা হইলে তাহা করিতেও তিনি কুণ্ঠিত হইতেন না। কিসে লোকে তাঁহাকে ধনী, বিদ্বান, বুদ্ধিমান, ধার্মিক, দানশীল ইত্যাদি যাবতীয় সদ্গুণশালী বলিবেন, এই ভাবনা তাঁহার জীবনের প্রত্যেক কার্য নিয়মিত করিয়াও সময়ে সময়ে তাহাকে লোকের নিকট হাস্যাস্পদ করিয়া তুলিত। চক্রবর্তী মহাশয় কোন সময়ে এক অবৈতনিক বিদ্যালয় খুলিয়া তাহার নাম রাখিয়াছিলেন “প্রাচ্য-আর্য-কান্ড-পরিষন্তু,” তাঁহার একমাত্র পুত্রের নাম রাখিয়াছিলেন মৃগাঙ্কমৌলী পূততুন্ডী…।” তিনি মনে করতেন, তাঁর মত একজন স্বনামধন্য পণ্ডিতের পক্ষে কোনও সাধারণ নাম রাখা সম্ভব নয়। তাই শুধু নিজের পুত্রের নাম নয়, তাঁর বাড়িতে একটা হরিণ ছিল, তিনি তার নাম রেখেছিলেন ‘কপিঞ্জল।’
এক একটা বিশেষ পার্বনে দেখা যেত, দক্ষিণেশ্বর পঞ্চবটীতলে ব্যাঘ্রচর্ম বিছিয়ে গেরুয়াবসন পরে বসে আছেন। সেইসময় তিনি রুদ্রাক্ষ ধারণ করতেন এবং একতারা হাতে নিয়ে সাধনায় বসতেন। বাড়ি ফেরার সময় কিন্তু ওই ব্যাঘ্রচর্ম সঙ্গে নিয়ে যেতেন না, ওটি ঠাকুরের ঘরে ঝুলিযে রেখে যেতেন। এই বর্ণনা দেওয়ার পর লীলাপ্রসঙ্গকার প্রশ্ন করছেন, “…কেন জান?” তারপর নিজেই উত্তর দিচ্ছেন, লোকে ওটা দেখে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করবে, ওটা কার? তখন ঠাকুর তাঁর নাম করলে শ্রোতারা ধারণা করবেন, মহিমাচরণ একজন মস্তবড় সাধক।
এমন একজন মানুষের অহংকারও একদিন লুপ্ত হয়ে গেল। এখানে আমরা এই প্রসঙ্গে এক ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারি।
গঙ্গার পূর্বপাড়ে দক্ষিণেশ্বর। পশ্চিমপাড়ে ভদ্রকালী গ্রাম। উত্তরপাড়ার সন্নিহিত এই জনপদ। এখানেই ঠাকুর এসেছিলেন সে যুগের নাম করা পাঁচালী গায়ক শিবু আচার্য়ের আমন্ত্রণে। ওই গ্রামে ছিল তাঁর শ্বশুরবাড়ি। গানের ঐশ্বর্যেই শিবু আচার্য শ্রীরামকৃষ্ণকে মুগ্ধ করেছিলেন এবং তাঁর পুণ্য সংস্পর্শে এসেছিলেন। তারপর এক সময় গানের তরী বেয়েই ভেসে গিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ-সাগরে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের পরম ভক্ত।

অধরলাল সেন
শিবু আচার্যের আমন্ত্রণে সদলবলে ঠাকুর এসেছেন তাঁর শ্বশুরবাড়িতে। সঙ্গে মহিমাচরণও আছেন। চারদিকে রটে গেছে, ঠাকুর এসেছেন, তাই পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর ভিড়ও হয়েছে খুব। ভিড়ের তুলনায় বাড়িটা খুবই ছোট। তাই তিল ধারণের স্থান নেই। সেই উৎসবে একজন তার্কিক পণ্ডিতও এসেছেন। নাম ব্রহ্মব্রত সামধ্যায়ী। তাঁর মনোবাসনা, শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে একটু শাস্ত্র আলোচনা করবেন। ঠাকুর অন্তর্যামী। তিনি একবার দেখেই সামধ্যায়ীর মনোভাব বুঝে নিয়েছেন। সামনেই বসে ছিলেন মহিমাচরণ। ঠাকুর তাঁকেই প্রথমে আলোচনা শুরু করতে বললেন। মহিমাচরণ সম্ভবত এরকম একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাই, বাক্যব্যয় না করে ঠাকুরের আদেশ পালন করতে এগিয়ে গেলেন।
তর্ক শোনার জন্য ভিড় জমে ওঠে। তর্ক শুরু হল দ্বৈত-অদ্বৈত ভাব নিয়ে। ঈশ্বর এক না বহু— এই হল বিষয়।
সামধ্যায়ী প্রবল যুক্তিজালে দ্বৈতভাবকে উড়িয়ে দেন। পরে উঠল সেবা-সেবকের ও ভক্তিভাব নিয়ে কথা। সামধ্যায়ী ঝড়ের গতিতে সে-সবও উড়িয়ে দিতে থাকেন। এ-সব তত্ত্ব তিনি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন। তাঁর ক্ষুরধার যুক্তি ও উপস্থিত বুদ্ধির সামনে মহিমাচরণ একসময় অসহায় হয়ে পড়লেন। সামধ্যায়ীর গতিকে রুদ্ধ করবে কে? মহিমাচরণ নিজের বক্তব্যকে কিছুতেই প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে একেবারে ম্রিয়মান হয়ে পড়লেন। হলেন পরাভূত।
এতক্ষণ ঠাকুর সবকিছুই লক্ষ্য করছিলেন, পর্যবেক্ষণ করছিলেন গভীরভাবে। এবার তিনি তর্কের আসরে এলেন মহিমাচরণের পক্ষ নিয়ে। কিন্তু এলে কি হবে? ঠাকুর যা বলেন সামধ্যায়ী যুক্তির খড়্গ দিয়ে সেটাকেই কেটে দেন। ঠাকুর বুঝলেন, এ একজন পাকা তার্কিক। মনে মনে বুঝলেন, একটা কিছু না করলেই নয়। এরকম সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে তিনি ভাইপো রামলালকে নিয়ে একটু বাইরে গেলেন। একান্তে মা ভবতারিণীকে বললেন, “মা, ব্যাটা বেজায় তার্কিক। মাতৃ-স্মরণেই তাঁর ভাব হল, হলেন ভাবাবিষ্ট। সঙ্গে সঙ্গে চলে এলেন তর্কের আসরে, পণ্ডিতের কাছে গিয়ে তাঁর হাত ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “এতক্ষণ কি বলছিলে— আবার বলো।”
ঠাকুরের দিব্যস্পর্শে সামধ্যায়ী যেন বাক্যহারা হয়ে গেলেন। হয়ে গেলেন স্তম্ভিত, বোধবুদ্ধিহীন। এ-এক অদ্ভুত অবস্থা। তাঁর মুখ দিয়ে কোন কথাই সরছে না। ঠাকুর বারবার তাঁকে প্রশ্ন করতে থাকেন, উত্তরে তিনি আমতা আমতা করে শুধু বলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন, সবই ঠিক।” সামধ্যায়ী তখন যেন আর এ-জগতে নেই— ঠাকুরের দিব্যস্পর্শে তিনি তখন বাহ্যজ্ঞান হারা।
এভাবেই শুষ্ক পাণ্ডিত্য হল পর্যুদস্ত, পাণ্ডিত্যের দর্প হল চূর্ণ। সমবেত সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রত্যক্ষ করলেন এই ঐশীলীলা। মহিমাচরণও হলেন আত্মস্থ। নিজের অহমিকা অনেকাংশে হল ম্লান।
লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, মহিমাচরণের এই অহংবোধ ও পাণ্ডিত্যের মিথ্যা গরিমার কথা জেনেও শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর গৃহে পদার্পণ করেছেন, তাকে কৃপা করেছেন। ধীরে ধীরে সেই মানুষটির জীবনকে নিজের মত করে গড়ে নিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ।
আমরা “কথামৃত,” “লীলাপ্রসঙ্গ” ও “রামকৃষ্ণ পুঁথিতে” বারবার মহিমাচরণের উল্লেখ পাই, উপস্থিতি লক্ষ্য করি এবং শ্রীরামকৃষ্ণ লীলায় তাঁর অবিচ্ছেদ্য ভূমিকার কথা স্মরণ করি।
এবার আমরা “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে” উল্লিখিত মহিমাচরণ প্রসঙ্গ স্মরণ করব দু-একটা ঘটনা ও বর্ণনার মাধ্যমে।
৩
স্বামী সারদানন্দ রচিত “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গে” বলা হয়েছে (উদ্বোধন সং-পৃ: ৩৪৭), “কলিকাতাবাসী ভক্তসকলের ঠাকুরের নিকট যাইবার বহু বৎসর পূর্ণ হইতে মহিমাচরণ দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতেন।” এটুকুই জানা যায়।
কিন্তু মহিমাচরণ চক্রবর্তী প্রথম কবে শ্রীরামকৃষ্ণের পুণ্য-সন্নিধানে আসেন বা আসতে থাকেন— তার কোন সুস্পষ্ট উত্তর কোথাও পাওয়া যায়নি। সম্ভবত, সেই সময় কথামৃত শেখার আগে পর্যন্ত এই ইতিবৃত্ত লেখারও কোন উদ্যোগ ছিল না। মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত (শ্রীম) কথিত “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে”র উপক্রমণিকায় (উদ্বোধন সং, পৃ:-৫) বলা হয়েছে, “শ্রীযুক্ত কেশব সেন যখন বেলঘরের বাগানে ভক্তসঙ্গে ঈশ্বরের ধ্যান চিন্তা করেন, তখন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ভাগিনেয় হৃদয়ের সঙ্গে তাকে দেখতে যান; ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বনাথ উপাধ্যায়, ‘নেপালের কাপ্তেন’ এই সময় (ঠাকুরের কাছে) আসতে থাকেন। সিঁথির গোপাল (বুড়ো গোপাল) ও মহেন্দ্র কবিরাজ, কৃষ্ণনগরের কিশোরী ও মহিমাচরণ এই সময় ঠাকুরকে দর্শন করেছিলেন।”
সেই প্রথম দর্শন শুরু। সেই ভক্ত-ভগবানের সেতু তৈরির সূচনা। তারপর অন্তত পঁচিশবার আমরা “কথামৃতে” তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করি। শ্রীরামকৃষ্ণ লীলায় তিনিও এক মহৎ চরিত্র। অর্থাৎ, নরেন্দ্রনাথ দত্ত ও অন্যান্য ত্যাগী সন্তানরা ঠাকুরের কাছে আসার অনেক আগেই মহিমাচরণ সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে, নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঠাকুরের প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৮১ সালে সিমলাপাড়ায় সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে।
এখানে স্মরণে রাখা প্রযোজন, “কথামৃত” রচয়িতা শ্রীম দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আসেন ১৮৮২ সালের মার্চ মাসে। তারপর থেকে তিনি ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। ফলে ১৮৮২ সালের মার্চ মাস ও তার পরবর্তী সময়ের দিনলিপি তিনি লিখে রেখেছেন। তার আগে কোন বিবরণ আমরা তাঁর লেখায় প্রত্যক্ষভাবে পাই না। সেই জন্য ১৮৭৫ থেকে ১৮৮২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কালে মহিমাচরণ কতবার ঠাকুরের কাছে এসেছেন, তার কোন তথ্য বা বর্ণনা আমরা পাইনি। তাছাড়া শ্রীম কেবলমাত্র ছুটির দিনে দক্ষিণেশ্বরে আসতেন। সেইসব দিনের বিবরণই তিনি লিখেছেন। তার বাইরে অন্যান্য দিনের ঘটনা “কথামৃতে” নেই। সেইজন্য “কথামৃতে” বর্ণিত ১৮৮২ থেকে ১৮৮৬ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে আমরা ২৫ বার মহিমাচরণের সাক্ষাৎ পাই কথামৃতে। তার বাইরে তিনি নিশ্চয়ই এসেছিলেন— সে তথ্য আমাদের জানা নেই।
শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে আমরা প্রথম মহিমাচরণের সাক্ষাৎ পাই ১৮৮৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। সে দিনটা ছিল শনিবার বিকেল তিনটা। স্থান— দক্ষিণেশ্বর মন্দির। সেইসময় পড়ে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের বাঁ হাতের হাড় সরে গিয়েছিল। খুবই আঘাত পেয়েছিলেন। ঠাকুর নিজের ঘরে খাটে বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে বসে আছেন ভক্তরা। সেই ভক্তদের মধ্যে একজন হচ্ছেন মহিমাচরণ।
মহিমাচরণ নিজের তীর্থদর্শনের গল্প বলছিলেন। ঠাকুর গভীর আগ্রহ নিয়ে সেই গল্প শুনছিলেন। বারো বছর আগে মহিমাচরণ একবার তীর্থদর্শনে গিয়েছিলেন— সেই কাহিনী। তিনি বলছেন, কাশী সিক্রোলের এক বাগানে একজন ব্রহ্মচারী দেখলাম। ব্রহ্মচারী বললেন, ‘এ বাগানে কুড়ি বছর আছি। কিন্তু কার বাগান জানি না।’ মহিমাচরণকে ওই ব্রহ্মচারী জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি নৌকরী কর বাবু?” তিনি জবাব দিলেন, “না।” এবার ব্রহ্মচারী আবার জানতে চাইলেন, “তবে কি তুমি পরিব্রাজক?”
এরকম বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা ঠাকুরকে বলে চলেছেন। বললেন, নর্মদা নদীর তীরে এমন একজন সাধু দেখলেন, যিনি অন্তরে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করছেন— আর বাইরে তার শরীরে পুলক হচ্ছে। আবার তিনি এমন প্রণব আর গায়ত্রী উচ্চারণ করেন যে, যারা তাঁর সামনে বসে থাকে, তাদের দেহে-মনে রোমাঞ্চ হয়, পুলক হয়।
এরকম একটার পর একটা প্রসঙ্গ চলতে থাকে আনন্দরূপ শ্রীরামকৃষ্ণের আনন্দ সভায়। একসময় শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমাচরণ ও অন্যান্য ভক্তদের শেখাচ্ছেন, কীভাবে মাকে ডাকতে হয়। ঠাকুর বলছেন, “আমি মা বলে এইরূপে ডাকতাম— ‘মা আনন্দময়ী— দেখা দিতে যে হবে!’ তিনি ব্যাকুলভাবে অতি করুণ স্বরে মা আনন্দমযীকে কিভাবে ডাকতে হয় শেখাচ্ছেন, আর তা শুনতে শুনতে পরমভক্ত চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছেন। ভগবানের পদতলে বসে ভক্তের এই অশ্রু বিসর্জন সমগ্র পরিবেশকে এক দিব্য আনন্দে পূর্ণ করে তুলেছে। ঠাকুর এবার ভক্তকে “ডাক দেখি মন ডাকার মত, কেমন শ্যামা থাকতে পারে।” গান চলতে থাকে। মহিমাচরণ শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গেই ভাসতে থাকেন আনন্দ-সাগরে।
শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তলীলায় আমরা কাশীপুর উদ্যান বাটিতে মহিমাচরণ চক্রবর্তীর উল্লেখ “শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে”র পাতায় শেষবারের মত দেখতে পাই। এরপর কথামৃতে তাঁর আর উল্লেখ বা উপস্থিতি নেই।

অধরলাল সেনের বাড়ি
সেদিনটা ছিল ১৮৮৬ সালের ১১ মার্চ। বৃহস্পতিবার। শ্রীরামকৃষ্ণ অসুস্থ। খুবই অসুস্থ। শুয়ে আছেন। ভক্তরা কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। নরেন্দ্রনাথ (পরবর্তীকালের স্বামী বিবেকানন্দ), শশী (রামকৃষ্ণানন্দ), মাস্টার (কথামৃতকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) এবং আরও অনেকে সেখানে উপস্থিত।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কণ্ঠরোগের চিকিৎসার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণকে দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে প্রথমে আনা হয় উত্তর কলকাতার ৫৫ নং শ্যামপুকুর স্ট্রিরে এক ভাড়া বাড়িতে। এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ ১৮৮৫ সালের ২ অক্টোবর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন। এই বাড়িটি আজ “শ্যামপুকুর বাটি” নামে অক্ষয় স্মৃতির ধারক। তারপর ডাক্তারের পরামর্শে তাঁকে উন্মুক্ত পরিবেশে রেখে চিকিৎসা করার জন্য নিয়ে আসা হয় কাশীপুরে গোপাল চন্দ্র ঘোষের উদ্যানবাটিতে। এখানে তিনি আসেন ১ ডিসেম্বর। উদ্যানবাটির বর্তমান ঠিকানা— ৯০, কাশীপুর রোড (কলকাতা-২)। এই বাড়িতেই ১৮৮৬ সালের পয়লা জানুযারি শ্রীরামকৃষ্ণ আত্মপ্রকাশ করেন, কল্পতরু হন। আবার এই উদ্যানবাটিতেই ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট তিনি লীলাসংবরণ করেন।
আমরা এখানে যে দিনটির কথা বলছি, সে তার লীলা সংবরণের মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা।
শ্রীরামকৃষ্ণ ওই অসুস্থ শরীর নিয়েই ভক্তদের সঙ্গে নানা প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলছেন। মহিমাচরণের প্রসঙ্গটা উল্লেখ করলেন নরেন্দ্রনাথই। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে বললেন, “সেদিন মহিম চক্রবর্তীর বাড়িতে আমরা গিয়েছিলাম।”
মহিমাচরণের নাম শুনে ঠাকুরের খুব আনন্দ হল। তিনি প্রসন্ন হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে জানতে চাইলেন। “তারপর?”
নরেন্দ্রনাথের কণ্ঠে ক্ষোভ। বললেন, “ওর মতো এমন শুষ্ক জ্ঞানী দেখিনি।” এ-কথাতেও রহস্যময় ঠাকুরের আনন্দ যেন ঝরে পড়ল। হাসতে হাসতে আবার জানতে চাইলেন, “কেন, কি হয়েছিল?”
নরেন্দ্রনাথ বললেন, তিনি (মহিমাচরণ) আমাদের গান গাইতে বললেন। গঙ্গাধর (স্বামী অখণ্ডানন্দ) গান ধরল,—
“শ্যামসমে প্রাণ পেয়ে ইতি উতি চায়,/সম্মুখে তমাল বৃক্ষ দেখিবারে পায়।”
এই গান শুনে মহিমাচরণ বললেন, “ও সব গান কেন? প্রেম ট্রেম ভাল লাগে না। তাছাড়া স্ত্রী-পুত্র নিয়ে থাকি, এ সব গান এখানে কেন?”
এবার শ্রীরামকৃষ্ণের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। একটু বিমর্ষ হয়েই কথামৃতকার মাস্টারমশাইকে বললেন, “ভয় দেখেছ!” অর্থাৎ, এই যে রাধার ব্যাকুলতা, এই যে প্রেমভাব, এটা মহিমাচরণের পছন্দ হয়নি। তিনি পাণ্ডিত্যের অভিমানী— ও সব মধুর ভাব “প্রেম ট্রেম” তাঁর ভালো লাগে না।
এই একটা ঘটনাতেই আমরা মহিমাচরণ চক্রবর্তীর মানসিক-গঠনের যথার্থ পরিচয় পাই।
শুধু নরেন্দ্রনাথই নন, শ্রীরামকৃষ্ণও তাঁর পরম ভক্ত মহিমাচরণের বাড়িতে বেশ কয়েকবার গিযেছিলেন— ভক্তের টানে এবং ভক্তির আকর্ষণে। ভগবান যে ভক্তের অধীন। কিন্তু কোথায় ছিল তাঁর বাড়ি, যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের পদার্পণ ঘটেছিল? কাশীপুর উদ্যানবাটির কাছেই কাশীপুর রোড়ের উপর দিয়ে যেখানে “গান এন্ড শেল ফ্যাক্টরির” রেল লাইন গিয়েছে, তারই পূর্বসীমায় বসাক বাগানে মহিমাচরণ চক্রবর্তীর উদ্যানবাটি অবস্থিত ছিল। এই পূত-পবিত্র ভবনে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন শুভাগমন করেন, তখন এখানে শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি “প্রণেতা অক্ষয়কুমার সেন প্রথম ঠাকুরকে দর্শন করেন। দুঃখের বিষয়, এই ভবনটির কোন অস্তিত্বই নেই বর্তমানে।”
৪
“শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি”তে আমরা বেশ কয়েকবার মহিমাচরণের উল্লেখ পাই। সেই সূত্রেই আমরা জানতে পারি, মহিমাচরণ সব কিছুতেই নিজের প্রচার চাইতেন। সেই প্রচারের একটা বড় উপলক্ষ ছিল তাঁর বাড়িতে ঠাকুরের পদার্পণ। যে দিন শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর বাড়িতে আসতেন, সেই দিনটির কথা তিনি। আগেভাগেই সর্বত্র প্রচার করে দিতেন। তিনি একটা সমারোহপূর্ণ উৎসবের আয়োজন করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিতে চাইতেন— এমন একটা উৎসব, যা আগে কখনও হয়নি।
সেবার ঠাকুর তাঁর বাড়িতে আসবেন। সেই খবরটা জানিয়ে তিনি সকলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পুঁথির ভাষায়, “ভক্তবর্গে করে নিমন্ত্রণ।” নির্দিষ্ট দিনে ঠাকুরকে গাড়িতে করে মহিমাচরণের বাড়িতে নিয়ে এলেন পরম গৃহীভক্ত দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার। সঙ্গে অন্যান্য ভক্তদের সঙ্গে ছিলেন ভাই ধীরেন্দ্র ও পুঁথিকার অক্ষয় সেন। মহিমাচরণের বাড়ি-ঘর কেমন ছিল, তার একটা সুন্দর বর্ণনা আমরা “রামকৃষ্ণ পুঁথি”তে পাই। পুঁথিকার লিখেছেন, “উদ্যান-ভবন বাড়ি, গাছপাতা রকমারি, চারিদিকে তাহার ভিতর।” (পৃ:-৪০৩)
বাড়িতে ঢুকেই সাজানো উদ্যান। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পথ। শ্রীরামকৃষ্ণ গাড়ি থেকে নেমে সেই পথ ধরে এলেন বাড়ির মধ্যে। প্রথমেই বৈঠকখানা। সেখানে সাদা ধবধবে ফরাস পাতা। আগে থেকেই বহু ভক্ত সেখানে বসে আছেন। সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন। ভক্তদের ঠিক মাঝখানে পাতা হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের আসন। ঠাকুর আসবেন— তাই তাঁকে দর্শন করতে অসংখ্য মানুষ এসেছেন। প্রথমেই দু-ভাই দেবেন্দ্র ও ধীরেন্দ্র তাঁকে প্রণাম করলেন।
এখানে দেবেন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে দু-এক কথা বলা প্রয়োজন। শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহীভক্ত দেবেন্দ্রনাথ যশোহর জেলার নড়াইল মহকুমার জগন্নাথপুর গ্রামে ‘মজুমদার’ উপাধিধারী বন্দ্যোপাধ্যায় বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্বগৃহে “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ অর্চনালয়” প্রতিষ্ঠা করে সেখানে স্বরচিত শ্রীরামকৃষ্ণ ভজন, কীর্তন পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন। এই গানগুলিই ‘দেবগীতি’ নামে পরিচিত।
সেদিন মহিমাচরণের ভবনে উপস্থিত অক্ষয় সেনও ঠাকুরের পদবন্দনা করলেন। ভক্তদের মাঝখানে গিয়ে ঠাকুর আসন গ্রহণ করলেন। তাঁর দিব্য উপস্থিতিতে গোটা পরিবেশাই যেন আলোকিত হয়ে উঠল। শুরু হল ঈশ্বরীয় কথা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সকলে শুনছেন। তারপর বেজে উঠল খোল করতাল। বাইরের প্রাঙ্গণে সঙ্কীর্তন শুরু হল। কীর্তন যখন জমে উঠল, সকলে যখন মাতোয়ারা— ঠিক তখনই সেই কীর্তনের আসরে গিয়ে ঝাঁপ দিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ভক্তের সঙ্গে যোগ দিলেন ভগবান। তাঁর অপরূপ কণ্ঠ, স্বর্গীয় দেহসুষমা সমগ্র পরিমণ্ডলকে এক দিব্যজ্যোতিতে প্লাবিত করে দিল। নৃত্যে ও গানে তিনি তখন বাহ্যজ্ঞানহারা। প্রেমময় ঠাকুর প্রাণ পাগল করা কণ্ঠে গান ধরলেন— “যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে; ওরে, তারা দু-ভাই এসেছেরে…।”
সমবেত ভক্তজন মুগ্ধ নয়নে দেখলেন ভগবানের শ্রীঅঙ্গে মহাশক্তির খেলা। এমন দৃশ্য কি সহজে দেখা যায়? তাঁর মুখমণ্ডলে বিভাসিত দিব্যদ্যুতি। একসময় তিনি ফিরে এলেন নিজের আসনে। নৃত্য-গীতের পর এবার ভক্তজনের উদ্দেশে শুরু হল সহজ কথায় নানা উপদেশ। অতি সহজ-সরল কথা, কিন্তু গভীর অর্থ ও ভাবে পূর্ণ। মুগ্ধ দৃষ্টিতে সকলে তাকিয়ে আছেন ঠাকুরের দিকে। এত যে নাচলেন, গাইলেন, এত যে কথা বলছেন— তবু যেন তাঁর ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই। সকলের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াতেই যেন তাঁর সব আনন্দ। তিনি যেখানে, সেখানেই এ ভাবে জমে ওঠে আনন্দের হাট।
তারপর একসময় শেষ হল এই স্বর্গীয় সভা। এরপর প্রসাদ বিতরণ। মহিমাচরণ বিরাট আয়োজন করেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে পাই তার বর্ণনা (পৃ:-৪০৫)—
“ফল-মূল আদি করি লুচি তরকারি।
অগণন ব্যঞ্জন সুতার রকমারি।।
তাজা তাজা ভাজি কত নাহি ধরে পাতে।
দেড়গন্ডা রকমের অম্বল পশ্চাতে।।
নানা জাতি মিষ্ট দধি ক্ষীর কর্চরায়।
যাঁর যাহা রুচি প্রিয় তাই দেন তাঁয়।।
সৌরভ শীতল জল অতি তৃপ্ত কর।
কতই মশলা ছাঁচি পানের ভিতর।।”
বাড়িটির আয়তনের তুলনায় ভিড় হয়েছিল বেশি। তাই অনেকে প্রসাদ গ্রহণ করেই চলে গেলেন। অনেকে আবার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে থাকেন। তাঁদের যেন দেখায় ক্লান্তি নেই। নরদেহে আবির্ভূত এই ভগবানের রূপ যে অনন্ত। আর মহিমাচরণ? ভগবানের পায়ে আত্মসমর্পণের জন্য তিনি তো তাঁর সব অহংকার বিসর্জন দিয়েই বসে আছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার মধুরকণ্ঠে গান ধরলেন— “আমি ভক্তি দিতে কাতর হই। আমি মুক্তি দিতে কাতর নইরে।।…..” তবে কি তিনি মহিমাচরণকে লক্ষ্য করেই এই গান গাইছেন? আত্মগরিমার বর্ম দিয়ে ঘিরে রাখা মহিমাচরণের হৃদয়ে ভক্তিভাবের যে ফল্গুধারা প্রবাহিত, তারই উৎসমুখটা যেন ওই গানের সুরে সুরে খুলে যেতে বসেছে। মুক্তিই তো তিনি চান— তাই পাণ্ডিত্যের সব অলংকার একে একে খুলে দিয়ে তিনি তো আজ বৈরাগীর হৃদয় নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের করুণা ভিখারি।
সারাদিনের আনন্দ যজ্ঞ একসময় শেষ হয়। এবার শ্রীরামকৃষ্ণ মহিমাচরণের গৃহ থেকে বিদায় নেবেন। কিন্তু মহিমাচরণতো তাঁকে বিদায় দিতে চান না। তাই তাঁর দু-চোখের কোলে পরম প্রাপ্তির আনন্দময় অশ্রু চিকচিক করতে থাকে। ভগবানের করুণাসাগরে স্নান করে মহিমাচরণ চক্রবর্তী লাভ করলেন এক নতুন জীবন।