কথায় বলে, ভাগের মা গঙ্গা পায়না। পরিবেশের অবস্থা অনেকটা সেইরকম। কংগ্রেস, জনতা, বিজেপি, সিপিআইএম ইত্যাদি কোন রাজনৈতিক দলের আমলে দেশ ও রাজ্যগুলিতে তার অবস্থা ভালো ছিলনা। সে যেন চিরকেলে দুয়োরাণী। লাগাতার দূষণে বিধ্বস্ত হয়েছে তার শরীর, কাটা পড়েছে মাইলের পর মাইল অরণ্য, দূষিত হয়েছে নদী ও সমুদ্র, অবাধে চলেছে বন্যপ্রাণ বাণিজ্য, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট করে বাড়িয়ে দেয় দুর্যোগ।
রাজনৈতিক দলগুলি পরিবেশ সংরক্ষণের কথা বললেও তাকে যারা ধ্বংস করছে তাদের বিরুদ্ধে সরব হয়নি, এমনকি তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। প্রায় সব দলের আমলেই দেশে ঘটেছে বড় বড় পরিবেশ কেলেঙ্কারি। অনুমতি পেয়েছে বেআইনি কারখানা, শাস্তি পায়নি হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া বহুজাতিক উদ্যোগগুলি।
এমনটাই যে হবে তার আভাস কিন্তু বরাবরই ছিল। ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহার লক্ষ্য করুন, সেখানে নমো নমো করে পরিবেশের উল্লেখ থাকে একেবারে শেষের দিকে। যেন সেটা উল্লেখ করার মত ব্যাপারই না। দলগুলির দৃষ্টিভঙ্গিও অনেকটা সেরকম। পরিবেশ মন্ত্রীরাও যেন একটু নির্বিরোধী মানুষ, ততটা দাপুটে নন। হাঁকডাক করা তাদের ধাতে সয় না।
পরিবেশকে গুরুত্ব না দিলেও তার বুকের ওপর দাঁড়িয়েই ভোট হয়। নেতারা বাণী দেন এবং ভোটে জিতে মন্ত্রী হন। বিত্তে ও চিত্তে রসেবশে থাকেন। শুধু উপেক্ষিত থেকে যায় পরিবেশ। মাতা বসুন্ধরা শুধুই থেকে যান দলের ইস্তাহার ও ঘোষণায়। পাহাড় কেটে গড়া হয় হোটেল, আবাসন, নদী ভরাট করে শুরু হয়ে যায় চাষবাস, জলা বুজিয়ে ওঠে বহুতল! সবুজ বৃক্ষ লরি বোঝাই হয়ে চালান যায় কাঠচেরাই কলে!

আমি এ লেখায় বিশেষ কোন জায়গার উদাহরণ দেবো না, তাতে পক্ষপাত হবে। কারণ পরিবেশ দূষণ একটা সর্বব্যাপী ঘটনা। দেশে পরিবেশ ধ্বংসের ব্যাপকতা বুঝতে আদালতে জমে থাকা পরিবেশ সংক্রান্ত মামলাগুলিই যথেষ্ট। এখন দেশের আদালতগুলিতে জমে আছে প্রায় ৫০ হাজার পরিবেশ সংক্রান্ত মামলা, যা নিস্পত্তি করতে হলে প্রতিদিন ১৩৭টি করে মামলা নিস্পত্তি করতে হবে। অবশ্য তা করলেও সমস্যা মিটবে বলে মনে হয়না। কারণ প্রতিদিনই দেশের প্রতিটি প্রান্তে ঘটে চলেছে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত অপরাধ। বাড়ছে মামলার সংখ্যা। ২০১৯-২০তে দেশে গড়ে দিনে দুটি করে পরিবেশ সংক্রান্ত মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে তার নিস্পত্তি হয়নি।
পরিসংখ্যানের ভারে আপনি, আমি সবাই ক্লান্ত। সেই ক্লান্তি বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু তথ্যে কোন লাভ হয়না। তথ্য থেকে সত্যে পৌঁছতে হয়। আমরা সচেতন না হলে এ সমস্যা মিটবে না, বরং বাড়বে। কারণ পরিবেশ লুঠ করা সবচেয়ে সহজ, এতে খরচাপাতি এবং পরিশ্রম কম। তাই এ ঘটনা দেশের সর্বত্র ঘটে এবং তা আপনার আমার মত লোকের চোখের সামনেই। তবে এখন এ অপরাধ সবচেয়ে বেশি ঘটছে উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানে। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতেও পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধ বেড়েছে।
প্রশ্ন হল, আমরা সাধারণ মানুষরা কী করবো? পরিবেশ দূষণ যাতে না ছড়ায়, নিজেরা যাতে ভুল করে দূষণ বাড়ানোর মত কাজ না করি সেব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে আমাদের। দলবেঁধে কিংবা প্রয়োজনে একা যে কোন মূল্যে রুখতে হবে পরিবেশ দূষণ। এটা আমাদের বাঁচা-মরার সমস্যা। শুধুই রাজনীতি, প্রশাসন, দলের ওপর এই সমস্যার সমাধানের ভার ছেড়ে দিলে ভুল হবে। এ দায় আপনার, আমার। পরিবেশ চিরকাল বেঁচে এসেছে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং যত্নে।