দশ ভাই চম্পার এক বোন পারুল। কলজে ছিঁড়ে লিখেছিল, ‘এই যে ঈশান কোণ – বাংলা আমার মাতৃভাষা, ঈশান বাংলা মা।’—কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী এভাবেই লিখেছিলেন বোন পারুলের কথা, কমলার কথা। দশ শহীদের সঙ্গে সেদিন শহীদ হয়েছিল কিশোরী কমলা।
দিনটা ছিল ১৯ মে, ১৯৬১, শুক্রবার। ওইদিন শিলচর রেল স্টেশনে বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে সত্যাগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের বুলেটে প্রাণ দিল কিশোরী কমলা। তাঁর সঙ্গে জীবন দিল আরো দশ জন ভাষা সৈনিক। মনীশ ঘটক কমলা কে মনে রেখে লিখলেন, ‘নেহরু-ফকরু-চালিহার দল বলে বুলেট না বাংলা / জান দেবো তবু জবান দেবো না- করুক না যত হামলা।’ বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্রের দাবিতে বুলেটকেই বরণ করেছিল কমলা। পুলিশের গুলি ওর মাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। বিশ্বের প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্রাচার্য । কমলার কথা খুব কমই আলোচনায় আসে।
কমলা ভট্রাচার্যের জন্ম পূর্ববঙ্গে। বাবা রামরমণ ভট্রাচার্য অকাল প্রয়াত হন। কমলারা ছিল তিন ভাই চার বোন। ভাই বোনদের মধ্যে কমলা পঞ্চম। মা সুপ্রবাসিনী দেবী ছেলেমেয়েদের নিয়ে কী করবেন, কোথায় যাবেন! এর মধ্যে হল দেশভাগ। বাঙালির ভূগোলটাই পালটে গেল। আজন্ম বসবাসের জায়গা আর নিরাপদ নয়। ১৯৫০ এ সুপ্রবাসিনী ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেশান্তরিত হয়ে এলেন এপারের আসামের শিলচরে। তিনি ছেলেমেয়েদের নিয়ে উঠলেন শিলচর পাবলিক স্কুল রোডে এক ভাড়া বাড়িতে। অভাবের সংসার। কি করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করবেন। স্বস্তির খোঁজে এপারে এলেন। কিন্তু স্বস্তি কী এখানেও পেলেন! ওপারে ছিল নিরাপত্তার ভয়, আর এপারে অসমীয়া জাত্যাভিমানীদের ভাষিক আগ্রাসন। মুখের ভাষা বাংলা বলা চলবে না। কাজের ভাষা হবে অসমীয়া। সেনসাসে বাঙালি নয়, অসমীয়া বলে নাম তোল ; না হলে আসাম ছাড়ো।
এইভাবেই চলছিল দিন। ১৯৬০ এর গোড়ায় অবস্থা এইভাবেই আর থাকলো না। আগ্রাসী ভাষিক অসমীয়া জাতীয়তাবাদ নগ্ন রূপ নিল। অসমীয়া ভাষাকে একক সরকারি ভাষা করতে হবে – এই দাবীতে শুরু হল আন্দোলন, উগ্র জাতীয়তাবাদ এর আস্ফালন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে চলল তান্ডব। বাঙালি খেদাও এর দাপট। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে শিলচরে অনুষ্ঠিত হল নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন। এই সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে সভাপতিত্ব করলেন আনন্দবাজার পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক চপলাকান্ত ভট্টাচার্য। সম্মেলনে প্রস্তাব গৃহীত হল বাংলা হোক আসামের দ্বিতীয় সরকারি ভাষা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে মাথা নত করলেন। বিধানসভায় পেশ হল অসমীয়া ভাষা বিল। উল্লেখ্য, বিমলাপ্রসাদ আপার আসামে নিজের সম্প্রদায়ের ভোটে হেরে গেলে তাকে বিধানসভায় জিতিয়ে এনেছিলেন কাছাড়ের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষ। সেই চালিহাই বাঙালির মুখের ভাষা বাঙলা কেড়ে নিতে উদ্যোগ নিলেন। আইরনি অফ হিস্টরি!

এই আবহেই বড় হচ্ছিল কমলা। একদিকে বাড়িতে দারিদ্র, অন্যদিকে অসমীয়া ভাষীদের দাপটে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সামনে মাধ্যমিক পরীক্ষা। বই নেই, দেখিয়ে দেওয়ার জন্য নেই তেমন কেউ। ভরসা স্কুলের দিদিমনিরা। আর বন্ধুরা। ওদের বই চেয়ে এনে পরীক্ষার জন্য কাজে লাগবে এমন জায়গা গুলো খাতায় লিখে নেওয়া ছাড়া কিই বা করার আছে! স্কুলে পড়ে যাওয়ার তেমন ভাল কাপড় নেই। থাকবেই বা কি করে। দারিদ্র যাদের নিত্যসঙ্গী, জীবন ধারণটাই সেখানে এক মস্ত বিলাসিতা। বড়দিদি বেণু’র সামান্য উপার্জনে তিন ভাই চার বোনের সংসার চলে। দিদির কাছে আবদার করেছিল কমলা একটা অভিধান কিনে দেওয়ার জন্য। দিদি তাঁর অক্ষমতা জানালে কমলা বলেছিল, ‘থাক না দিদি, এমনিই বলছিলাম।’ দিদিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ‘গ্রাজুয়েট আমি হবই।’
কিশোরী মনে কত স্বপ্নই থাকে। স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে সামনের দিনকে। কমলা তার ব্যতিক্রম ছিলনা। লেখাপড়া শিখতেই হবে, দরিদ্রের বাঁচার অস্ত্র ওটাই। বাড়িতে ভাই বোন। একা মা সেই কবে থেকে টানছেন সংসার। স্কুলের শেষ পরীক্ষা শেষ হলেই টাইপ রাইটিং এ ভর্তি হতে হবে, সঙ্গে সর্ট হ্যান্ড। কিছু না কিছু একটা কাজ জুটিয়ে নিতে হবে। মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে, পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। কিশোরী কমলার মনেও ভাষা জননীর দুর্দশা নাড়া দিল। এভাবে চলতে পারেনা। মাতৃভাষা বিপন্ন, এখন কি ঘরে থাকা যায়! ডাক এসেছে সত্যাগ্রহের। জান যায় যাক, জবান দেবোনা, করুক না কত হামলা। কিশোরী কমলা বুঝতেই পারেনি কেবল মুখের ভাষার অধিকারটুকু আদায় করতে গিয়ে তাকে প্রাণ দিতে হবে।
আগের দিন শেষ হয়েছে পরীক্ষা। এতদিন পরীক্ষার জন্য আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত ছিল। আজ আবার শুরু হবে সত্যাগ্রহ। শিলচর রেলস্টেশনে অবরোধ হবে, এখানেই সত্যাগ্রহীরা পিকেটিং করবেন। বড়দা বাড়িতে নেই, বড়দি চাকরির ট্রেনিং নিতে শহরের বাইরে। সেজদির শাড়ি পরে কমলা প্রস্তুত। মাকে বলে গেল কিছু হবে না মা, সবাই তো যাচ্ছে। সঙ্গে ছোটবোন মঙ্গলা, এলাকার কুড়ি বাইশ জন মেয়ে। পুলিশ যদি কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে, তাই সঙ্গে ভেজা ন্যাকড়া, প্রয়োজনে কাজে লাগবে। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই প্রতিরোধের হাতিয়ার বানিয়ে নেয়। কিশোরী কমলা এর বাইরে কেন হবে! পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাবে, সত্যাগ্রহীরা স্বপ্নেও তা ভাবেন নি হয়তো। কমলাও ভাবেনি কি হতে চলেছে সেদিন।
রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ চলছে দেশজুড়ে। আর দেশের উত্তর- পুর্বের এক অংশে চলছে বাংলা ভাষার স্বাধীকারের দাবিতে আন্দোলন। এও এক প্যারাডক্স বটে! কদিন আগেই পালিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী। তার রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে এল আসাম রাইফেলস ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের নিষ্ঠুর আক্রমণ বঙ্গভাষীদের উপর।
কমলা শিলচর স্টেশনে। নানারকম খবর আসছে। সুপ্রবাসিনী বাড়িতে। মায়ের মন কূ ডাকছে, কি হবে মেয়েগুলোর। মেয়ে না খেয়েই বেড়িয়ে গেল। দুপুর গড়াচ্ছে। কই কমলা। মা নিজেই গেলেন স্টেশনে। মা মেয়েতে সেই শেষ দেখা। অনেক বুঝিয়ে মাকে বাড়ি পাঠালো কমলা। মা ফিরে আসার একটু পরেই শুরু হল পুলিশের লাঠিচার্জ। লাঠি আর বন্দুকের কুঁদোর আঘাত পড়তে লাগল ছোটবোন মঙ্গলার উপর। বোনকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হল কমলা। তখনও চারপাশে শোনা যাচ্ছে , বাংলাভাষা জিন্দাবাদ, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ। মঙ্গলা সংজ্ঞাহীন ছিল দীর্ঘদিন। সেজদি প্রতিভার শাড়ি পরেই কমলা গেছিল সত্যাগ্রহে। প্রতিভা এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ছিন্নমূল এক পরিবারের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার, ছিন্নপত্রের মত।
স্বাধীন দেশে মাতৃভাষার অধিকার হরণের এই ঘটনা আজ এক রক্তাক্ত ইতিহাস। সুপ্রবাসিনী জানতে চেয়েছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নেহরুর কাছে, ‘আমরা তো কেউ জহরলালের কোন ক্ষতি করিনি’, তবে ‘কেন তিনি গৌহাটিতে বসে এমন কান্ড করালেন!’ মনীশ ঘটক তাঁর কবিতা ‘শিলচরের কমলা ভট্রাচার্যের মায়ের কান্না’ য় যা লিখেছিলেন তাই কি সুপ্রবাসিনীর কথা ছিলনা ?
জীবন দিয়েছিল কিশোরী কমলা। করুক যত হামলা, জবান সে জমা রেখেছিল নিজের প্রাণের কাছে, মাতৃভাষার কাছে।