বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১০ বছর পূরণ করলেন তিনি আর এদিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক শেষে মমতা সব মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে সরাসরি মোদীকে সপাটে আক্রমণ করেলেন। বৃহস্পতিবার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে সকলের হয়ে যেভাবে তিনি ক্ষোভ উগরে দিলেন তাতে আগামী লোকসভা ভোটে বিজেপি এবং মোদী-বিরোধী প্রধান মুখ যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
মমতাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে কি আপনি বিজেপি বিরোধী মঞ্চ হলে তার মুখ হবেন? জবাবে মমতা জানান, তিনি কোভিড নিয়ে লড়তে চান। তাঁর ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’ কোভিড নিয়ে লড়াই। তবে এদিন মমতা এও জানান যে তিনি মনে করেন সারা দেশে বিজেপি বিরোধী একটা দল হওয়া দরকার। যারা বিজেপি-র একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।
এদিন মমতা মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, কোনও মুখ্যমন্ত্রীকেই কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একতরফা বলে গিয়েছেন। মমতার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নিজেই যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো অবমাননা করেছেন এবং সমস্ত মুখ্যমন্ত্রীকে অপমান করেছেন!
প্রসঙ্গত, এদিনের বৈঠকে বাংলা ছাড়াও বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রীরা যেমন ছিলেন তেমনই বাম শাসিত কেরল, কংগ্রেস শাসিত ছত্তীসগড়, রাজস্থান এবং শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপি শাসিত মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হাজির ছিলেন। দশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও জেলাশাসকদের ডাকা হয়েছিল। তবে মমতার সঙ্গে জেলাশাসক নয় ছিলেন মুখ্যসচিব, স্বাস্থ্যসচিব প্রমুখ।
বৈঠক শেষে মমতা সব মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে মোদীকে আক্রমণ করে বলেছেন, ‘হাতে প্রশ্ন নিয়ে পুতুলের মতো বসেছিলাম। মুখ্যমন্ত্রীদের যদি বলতেই দেবেন না, তাহলে ডাকলেন কেন! জেলাশাসকদের নিয়েই তো বৈঠক করতে পারতেন প্রধানমন্ত্রী।’ মমতা এও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজের কথা বলে গেলেন। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন করোনা নাকি কমে গিয়েছে। মমতা বলেন, এই অবহেলার জন্যই করোনা বেড়ে গিয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, কোভিড নিয়ে বৈঠক, প্রধানমন্ত্রী কেন এত ক্যাজুয়াল হবেন, প্রধানমন্ত্রী কেন এত ইনসিকিওর্ড, মুখ্যমন্ত্রীদের কথা কেন শোনেন না?
এরপরই মুখ্যমন্ত্রী একের পর এক প্রশ্নে মোদিকে বিঁধেছেন। কেন্দ্রের কাছে তিন কোটি ভ্যাকসিন চাওয়া হয়েছিল কমিয়ে দিচ্ছে। কেন্দ্র অক্সিজেন দিচ্ছে না, রেমডিসিভির কেন বাজারে নেই? এদিন সেন্ট্রাল ভিস্তা নিয়ে ফের তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী। বললেন, কেন্দ্র কোনও রাজ্যকে পয়সা দিচ্ছে না। ৩০ হাজার কোটি টাকা দিলেই, সবাই নিখরচায় ভ্যাকসিন পেত। ১৮ বছরের ছেলেমেয়েরা যেখানে বিপদের মুখে সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘণ্টা বাজালেই করোনা কমবে!এদিন মমতা ফের ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বিহার ও বাংলায় ভোটের আগে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন।
এদিন মমতা কেন্দ্রের ভ্যাকসিন নীতিরও সমালোচনা করেন। ভ্যাকসিন নেওয়ার সময়সীমা বদল নিয়েও ক্ষোভ ছিল মুখ্যমন্ত্রীর কথায়। বারবার দুই ভ্যাকসিনের মধ্যে সময়সীমা পাল্টানো হচ্ছে। ভ্যাকসিন নেই বলে, বারবার সময়সীমা পাল্টাচ্ছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে এও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফর্মুলা মানলে, দেশে ভ্যাকসিন দিতে ১০ বছর লাগবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত এদিন কেন্দ্রের মোদি সরকারকে তাঁর আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখলেও ছেড়ে দেননি বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারকে। যে গঙ্গার জলকে পবিত্র মেনে পূজা পার্বণ করা হয় সেই গঙ্গার জল আজ দূষিত মৃতদেহ ভাসানোর জেরে-একথা বলে মোদী, বিজেপিকে নিশানা করে তোপ দেগেছেন তিনি। পাশাপাশি করোনা যুদ্ধে সুব্রত মুখোপাধ্যায় ও ফিরহাদ হাকিমদের পাশে না পাওয়ার ক্ষোভও উঠে এসেছে তাঁর কথায়। যদিও আদালত বা আইনের বিষয়ের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তিনি বুঝিয়ে দিতে ছাড়েন না যে এভাবে তার শক্তিকে কোনওভাবে দমানো যাবে না।
মোদীর ডাকা কোভিড বৈঠকে এদিন মমতা নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে না পারায় ব্যাপক ক্ষোভ উগড়ে দেন সাংবাদিক বৈঠকে। স্পষ্টভাষায় মমতা এদিন জানিয়ে দেন যে বিজেপি বিরোধী জোট দরকার। গোটা দেশে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য একটা মঞ্চের আজ প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান যে তিনি আপাতত কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। তবে গণতন্ত্রকে বাঁচাতে যে বিজেপির বিরুদ্ধে একটা জোটে এককাট্টা হওয়া দরকার সেকথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না।
মমতার এদিনের ক্ষোভ দেখে গেরুয়া শিবিরে স্বভাবতই টনক নড়ে। যদিও তারা রাজ্য বিধানসভা ভোটে পর্যুদস্ত হওয়ার আঘাত এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যেখানে তারা বাংলাকে অর্ধেক দখল করে নিয়েছে বলেই ধরে নিয়েছিল সেখানে যে এমনভাবে ধরাশায়ী হতে হবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। পারেনি বলেই সেই আঘাত তাদের পক্ষে কাটিয়ে ওঠাও মুশকিল হয়ে পরছে। ইতিমধ্যে দলের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করেছেন অনেক ছোট-বড়ো নেতা। দলবদলুদের দলে নেওয়ায় দলের মধ্যে চোরাগোপ্তা কোন্দল অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বিধানসভা ভোটে ব্যাপক পরাজয় দলের পক্ষে প্রায় ধ্বসের সমান।
ঘোর করোনা কালে নারদার মতো স্পর্শকাতর কেস সিবিআইকে দিয়ে মুভ করানোর পর রাজ্য বিজেপির অনেকই একটু অবাক হয়েগিয়েছিলেন। এমনিতেই তাদের পায়ের তলার মাটি সরতে শুরু করেছে, তার ওপর আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে মোদি ও বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তাতে রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব আরও দিশাহীন হয়ে পড়েছে। রাজ্য নেতারা বুঝেছেন যে মমতার ক্ষোভের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের নেই। আর তা নেই বলেই তারা কোভিডের মতো মহা সঙ্কটের কথা ভুলে গিয়ে অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেছেন। মমতার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কথা ছুড়ে দিচ্ছেন। এতে যে বাংলার মানুষের কাছ থেকে যে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন, সেকথা বুঝতে পারছেন না। ফের ক্ষমতায় ফিরে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা বা মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা যে কোন উচ্চতায় পৌঁছেছে সেটাও তাঁরা বুঝতে পারছেন না। ফলত তারা যে এই রাজ্য থেকে নিশ্চিহ্ণ হওয়ার পথে সেকথা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোদি ও বিজেপি বিরোধী ক্ষোভ আজ যেভাবে সারা দেশের সামনে পৌঁছেছে তাতে আগামী দিনে তিনিই যে বিজেপি বিরোধী মঞ্চের জাতীয় স্তরের একমাত্র উপযুক্ত নেত্রী তা আবার প্রমান হয়ে গেল।
করোনা কমে গিয়েছে? ও দেশের প্রধানমন্ত্রী না গোয়াল ঘরের চৌকাঠ? ওকে দেশছাড়া না করলে মানুষ শান্তি পাবে না।
করোনা নিয়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি করছেন প্রধানমন্ত্রী। ওঁর প্রতিশ্রুতি মানেই ডাহা মিথ্যা কথা। বাংলায় আর ওঁর কিসের
উৎসাহ; ও তো বুঝেই গেছে ঠাই হবে না, সে কারণে ওঁর লক্ষ্য ছারখার।