দেবদারু গাছের ছায়ার নীচ দিয়ে কার্লোস পাহিরার বিদায়যাত্রার পর অনেক অনেক মাস কেটে গেছে। ইডেন গার্ডেন্সের বিপরীত প্রান্তে খুশির হাওয়া। খারাপ খবর বলতে একটাই, ভারতের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ লালম পুইয়া ক্রমশ মদ্যনেশা আর অত্যাধিক ওজনের ভ্রুকুটিতে নাম লেখাচ্ছেন ‘তারাখসা’ ক্লাবে।তখন সদ্য এক মরোক্কান এসেছেন ক্লাবে। কি দরকার ছিল এক দলছুট পাহাড়ির দিকে আলাদা নজর দেবার,যখন দল ছুটছে অশ্বমেধের মতো। কি দরকার ছিল জানিনা, তবে সেই ঘোরতর অসময়ে লালম পুইয়া সেই মরোক্কান ফর্সা হাত দুটো ছাড়া আর কারোর হাত পায়নি। আর মাংসের বদলে মাছের পরিকল্পনাটা ছিল লালমের জন্য স্পেশাল প্রোটিন ডায়েটের বিকল্প।
ব্যাক টু ২০১৩-১৪। সেই মরোক্কানের দ্বিতীয় ইনিংস। মাথাভারী দল গড়েছে সাধের কর্মকর্তারা। কিন্তু রক্ষণটা ঠিক যেন চোরাবালি। ২০১৪-১৫ তে সুভাষ ভৌমিকের আগমনের আগে অবধি মোহনবাগানের দল গঠনে কোচের খুব একটা পরামর্শ নেওয়া হতোনা।মরোক্কান হাতে পেল কিছু আনকোরাকে। তাতে কি।সেই আনকোরা দলের কিছুজনকে সেই মরোক্কান নিজের হাতে তৈরী করল। আর তারাই আজ ভারতীয় ফুটবলের তারকা— প্রীতম কোটাল।শৌভিক ঘোষ।তীর্থঙ্কর। আর যারা ক্রমশ হারিয়ে গেলেন তাদের মধ্যেও ছিল ভারতসেরা হবার প্রতিভা— রাম মালিক, পঙ্কজ মৌলা, উজ্জ্বল হাওলাদার। ক্লাব লনে সেই কোচের মুখ থেকে তখন একটা কথা প্রায়ই শোনা যেত—‘রাম আমার মিনি কাতসুমি’।

কিছুটা ফিরে যাই ২০০৬-০৭ মরশুমে।আরব সাগরের পাড়ে তিনি পুঁতে আসলেন এক চারাগাছ— গৌরমাঙ্গি সিং, পরবর্তীকালের বটবৃক্ষ। আবার চলুন চলে যাই ২০০৮ থেকে ২০১০ অবধি— হাবিবুর, জেমস, ইসফাক, সুয়োকা, রাকেশ (এনাকে নিয়ে ট্রল হলেও একসময়ের যথেষ্ট প্রতিভাবান), মনীশ মাথানি, স্নেহাশিস। তারপর আবার যদি যান তার দ্বিতীয় ইনিংসে, সেখানে পাবেন— রাম মালিক, পঙ্কজ, উজ্জ্বল, তীর্থঙ্কর, প্রীতম কোটাল, শৌভিক ঘোষ, শৌভিক চক্রবর্তী, আইবরল্যাঙ। তিনি তাঁর কেরিয়ারে যেসকল ফুটবলার তৈরী করেছেন, তাদের দিয়ে মোটামুটি দু-খানা টিম দাঁড় করিয়ে দেওয়া যাবে। সেই মরোক্কান। মুখে সবসময় হাসি।
বাংলার খবরেরকাগজের পিছন পাতায় তাঁর নাম লেখা হতো—’করিম বেঞ্চারিফা’, আর আমি বলি ‘পথিক’। তিনি বারবার যে পথ দিয়ে গেছেন, সেই পথ দিয়ে একবিংশ শতকে সুব্রত ভট্টাচার্য ছাড়া আর কেউই যাননি।—
‘যখন বিদায়-বাঁশির সুরে সুরে শুকনো পাতা যাবে উড়ে
সঙ্গে কে র-বি….
আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি’।
পথভোলা-ই তো, ভুল করে হয়তো এসে পড়েছিলেন কলকাতা ময়দানে যেখানে আর্সেন ওয়েঙ্গারদের বিচার করা হয় ট্রফির হিসাবে।

করিম বেঞ্চারিফা — নামটাতে হয়তো তেমন কোনো জৌলুস নেই, হাই প্রোফাইল নেই, কিন্তু আছে অধ্যাবসায়, আছে ‘যাহা পাই তাহা নিয়ে করিয়া কাজ’ সুলভ মনোভাব। যেবার প্রথম এলেন, সেবার জাতীয় লিগের প্রথম পাঁচ ম্যাচে মাত্র চার পয়েন্ট, তারপর আস্তে আস্তে নতুন দলটাকে একসূত্রে গাঁথলেন। সত্যিই তো জেমস, ইসফাক, সংগ্রাম, শিল্টন, রাকেশ, সুরকুমার, মঞ্জুদের আজ কেই বা মনে রেখেছে। করিম সেইদিন যে মালাটা গেঁথেছিল তা যেন বরমাল্য হয়ে উঠল ভারতীয় ফুটবলে। পাঁচ ম্যাচে তিন পয়েন্ট থেকে টানা ১০ ম্যাচ জয় আর এগারো ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড। তথ্য বলছে, আর একটি ম্যাচ জিতলেই ভেঙে ফেলতেন বার্সেলোনার রেকর্ড, তথ্য এটাও বলছে তাঁর এই রেকর্ডটা ভাঙতে মোহনবাগানের সময় লেগেছে বারোটা বছর। তাঁর ফুটবল দর্শন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী’র মতো জটিল নয়, বরং শরৎচন্দ্রের শরৎ মননের মতোই সহজ সরল কিন্তু অবিশ্বাস্য নিয়মানুবর্তিত। ২০০২ এর পর টানা ৬ বছরে মাত্র একবার জাতীয় লিগে প্রথম তিনে থাকা মোহনবাগানকে আই লিগে রানার আপ করিয়েছেন, ত্রিমুকুট জিতিয়েছেন, কিন্তু সরতে হয়েছে। অবনমনের আওতা থেকে সালগাওকারের হয়ে সোনালী রূপকথা লিখিয়েছেন, সরতে হয়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসে মোহনবাগানকে সাত ম্যাচে শূন্য পয়েন্ট থেকে ২৯ পয়েন্ট তুলিয়ে অবনমন বাঁচিয়েছেন, সরতে হয়েছে। কোচ হিসাবে থুতু তাকে খেতে হয়নি, কিন্তু জুটেছে অনেক অপমান। কারণ? জাতীয় লিগ দিতে পারেননি। ওই যে বললাম, এখানে আর্সেন ওয়েঙ্গারদের বিচার হয় ট্রফি হিসাবে। ট্রফির সাক্ষীতে তোমার মুক্তিলাভ, আর অভাবে জোটে মৃত্যুদন্ড।
অভিশপ্ত ৯ ই ডিসেম্বর, ২০১২, এর পর সব পয়েন্ট কেটে নেওয়া হলো মোহনবাগানের। তাকে প্রশ্ন করা হলো—‘অবনমন কি বাঁচাতে পারবেন? একসময় জুভেন্তাসেরও ৯ পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়, তারাও পরে উঠে আসে, আপনি কি পারবেন’।

উত্তরটা করিম দিয়েছিলেন—‘আমি জুভেন্টাসকে চিনিনা, মোহনবাগানকে চিনি’। শুধু কথা নয়, এরপর তিনি যে কাজটা ক্রিস্টোফার, সাবিথ, ডেনসন, শঙ্কর ওঁরাও, আনফিট ওডাফাদের দিয়ে করিয়েছিলেন, হাজারটা আই লিগ দিয়েও তা পূর্ণ হবেনা।
অবনমন বাঁচল। পরের মরশুমে, কাটসুমির টোটকা দিয়ে ডার্বি জিতিয়ে দীর্ঘ বছরের ডার্বিখরা কাটালেন। তারপর আস্তে আস্তে কিটব্যাগটা নিলেন। করিমকে আর খুঁজে পাওয়া গেলনা। তিনি তখন ধরেছেন সিঙ্গাপুরের টিকিট। বলে গেলেন—‘মোহনবাগান ইজ সেফ নাও’। হয়তো জানতেন বিদায় আসন্ন।
‘Success is not a destination, It’s a journey’—বাগানকে জাতীয় লিগ না দেওয়া করিমের জীবনের দর্পণ আর দর্শন এটাই। মাংসের বদলে মাছ দিয়ে প্রথম দিনে লালম পুইয়ার দুর্দিনে যে মরোক্কান হাতজোড়া কাঁধে ছিল, বাগানের অন্ধকারতম দিনেও সেই হাতজোড়া ছিল ধ্রুবক।

আস্তে আস্তে ক্লাব লন দিয়ে বেড়িয়ে গেলেন। আমি নিশ্চিত, ওপাড় থেকে হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবারের জন্যেও গেয়েছিলেন—
‘দিনের পথিক মনে রেখো
আমি চলেছিলেম রাতে
সন্ধ্যাপ্রদীপ হাতে’।
আর রাতের পথিক করিম কি গাইলেন?—‘এ মণিহার আমার, নাহি সাজে’।