বিরোধী দলনেতা হওয়ার পর থেকে শুভেন্দু অধিকারী কপালে আর রসকলি আঁকেন না। তিনি এখন গেরুয়া তিলক ধারণ করেন। গত সোমবারই শুভেন্দু অধিকারী-সহ জনা পঞ্চাশেক বিজেপি বিধায়কের সঙ্গে বৈঠক করলেন আর তার পরের দিনই দিল্লি উড়ে গেলেন রাজ্যপাল। তবে ধনখড়ের দিল্লি সফরকে হেলাফেলা করা যাচ্ছে না, বরং রাজ্যের এই মুহুর্তের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, মুকুল রায় তৃণমূলে ফেরার পরই দলত্যাগ বিরোধী আইন কার্যকর করা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী তৎপর হয়ে উঠেছেন। সোমবার বিষয়টি শুভেন্দু রাজ্যপালের সামনে উত্থাপনও করেন। রাজ্যপাল এই আইন কার্যকর করার পাশাপাশি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরব হন। উল্লেখ্য; একুশের নির্বাচন পরবর্তী বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি নিয়েও সোচ্চার বহু বিজেপি নেতা। এর পরের দিনই ধনখড়ের দিল্লি সফরকে স্বভাবতই তাৎপর্যময় ভাবতেই হয়।
রাজ্যপাল ধনখড় এ রাজ্যের দায়িত্বভার নেওয়ার পর থেকেই সরকারের সঙ্গে বার বার বিতর্কে জড়িয়েছেন। শাসকদল থেকে শুরু করে বামেরাও তাঁকে প্রকারন্তরে বিজেপির এজেন্ট বলেছে। কার্যত ধনখড় তো এক সময় আরএসএস এবং বিজেপি দুইয়েই সামিল ছিলেন। কেন্দ্রের সঙ্গে তার সখ্যতায় কোনো গোপনীয়তাও নেই। তবে ভোটের পরে ধনখড় রাজ্য সরকারকে সরাসরি আক্রমণের পথে হাঁটছেন। দিল্লি সফরের আগে রাজ্য সরকারকে ভোট পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে কড়া চিঠি দিয়েছেন। যদিও রাজ্য সরকার বিষয়টি গায়ে মাখেনি, মন্ত্রিসভার বৈঠকেও কোনো আলোচনা হয়নি।
ধনখড়ের দিল্লি সফর আরও একটি কারণে রাজনৈতিক মহলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। সাধারণত ধনখড় নিজের প্রতিক্রিয়া টুইট করে জানিয়ে দেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ রাখঢাকও রাখেন না। কিন্তু দিল্লি সফর নিয়ে এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া তিনি জানান নি, যা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ আচরণ।
দিল্লী পৌঁছনোর পর থেকে একের পর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করতে ছোটাছুটি করছেন ধনখড়। কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং প্যাটেল, রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যপাল এত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিকে কী জানাবেন?
বাংলায় ভোট পরবর্তী অশান্তি, রাজনৈতিক হিংসা, সেই হিংসায় বলি হওয়া মানুষদের কথা কি তিনি তুলে ধরতে কেন্দ্রীয়মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির কাছে ছুটছেন? বিজেপির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন কোনও রাজ্যের রাজ্যপাল দিল্লি সফরে এসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করতে তাদের বাড়িতে যাননা, সচরাচর এমন ঘটনা দেখাও যায় না। ধনখড় তাঁর দিল্লি সফরের একাধিক ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে কখনও তিনি কয়লামন্ত্রী আবার কখনও তিনি পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি টুইট করেছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই জগদীপ ধনখড় রাষ্ট্রপতি ভবনে যান। ভোট পরবর্তী বাংলায় হিংসা সংক্রান্ত যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে সেই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে দেন রাজ্যপাল। বিস্তারিত ভাবে সমস্ত ঘটনার বিবরণ রাষ্ট্রপতিকে জানান রাজ্যপাল। সরকারের ভূমিকা নিয়েও রাষ্ট্রপতি রমানাথ কোবিন্দের কাছে কার্যত নালিশ ঠোকেন রাজ্যপাল। জানা গিয়েছে, রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়কে খুব বেশি সময় দেন নি।
তবে গতকাল বুধবার ধনখড় শাহের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও সময় পাননি। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় শাহী দরবারে হাজির হন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়। বাংলার আইন শৃঙ্খলা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী-সহ বিজেপি বিধায়কদের কাছ থেকে যে রিপোর্ট নিয়েছেন সে সংক্রান্ত তথ্য অমিত শাহের হাতে তুলে দেন তিনি। দলত্যাগ বিরোধী আইন নিয়ে হতে পারে কথা। বাংলায় এই মুহূর্তে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ দলত্যাগ। বিরোধী শিবিরে ভাঙন। এই অবস্থায় দলত্যাগ বিরোধী আইন দ্রুত লাঘু করার কথা বলা হচ্ছে। সেই বিষয়ে অমিত শাহের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
দিল্লি সফরে প্রথম দিনই ধনখড় কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন অরুণকুমার মিশ্রের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। অরুণকুমার এর আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন। অবসরের পর কেন্দ্র সরকার তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। ধনখড় পেশাগত ভাবে আইনজীবী। অরুণকুমারের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানিয়েছেন, সৌজন্য বিনিময় করতেই গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে রাজ্যপাল ধনখড়ের বদলে রাজ্যে নতুন রাজ্যপাল করা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। শোনা যাচ্ছে তাঁকে এই রাজ্যের দায়িত্ব থেকে সরানো হতে পারে। কোনও কোনও মহল থেকে এও বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল করা হতে পারে আরিফ মহম্মদ খানকে। একটা সময়ে রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী থেকে জনতা দল হয়ে পরে বিজেপিতে যোগ দেন। এই মুহূর্তে আরিফ মহম্মদ খান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘনিষ্ঠও বটে। কেরলে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরিফ মহম্মদ খানের সঙ্গে কেরল সরকারের বিরোধ সামনে এসে পড়েছিল।
ঘটনাক্রম দেখে বোঝাই যাচ্ছে রাতারাতি দিল্লি উড়ে গিয়ে ধনখড়ের ছোটাছুটিই সার। তার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আরএসএস ও বিজেপির অত্যন্ত বিশ্বস্ত জগদীপ ধনখড়কে বাংলায় আনা হয়েছিল রাজ্য সরকারকে চাপে রাখতে, কিন্তু সে কাজে তিনি যতটা সফল হয়েছেন তার থেকে অনেক বেশি নিজেই বিতর্কে জড়িয়েছেন। দিল্লিতে মমতার বিরুদ্ধে তাঁর নালিশ এখন আর খুব একটা কার্যকরি হবে না।
আরিফ মহম্মদ খান কি ধনখড়ের থেকে কম কিছু হবে বলে মনে হয়?
আরিফ মহম্মদ খান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের খুব ঘনিষ্ঠ। তাঁকে এ রাজ্যের রাজ্যপাল করার
জল্পনা সেই একই জায়গা থেকেই।
আরিফ খান সংখ্যালঘু ৷ তাঁকে বাংলায় এনে এখানকার সংখ্যালঘুদের কাছে বিশেষ বার্তা দেওয়া যাবে ৷ তাছাড়া
তিনি মোদি সরকারের লাগু করা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সমর্থক ৷ বাংলায় এই আইন কার্যকর করতে তিনি
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন ৷
আরিফ মহম্মদ খানকে যদি শেষ পর্যন্ত এ রাজ্যের রাজ্যপাল করা হয়, তাহলে তিনিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে
স্বস্তিতে থাকতে দেবেন না, এই কথাটা মাথায় রাখা দরকার।