ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মশিবিরে যোগ দেওয়ার দিন থেকেই শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি দলের মধ্যে একটা বাড়তি গুরুত্ব আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছিলেন। শুভেন্দুকে দল বাড়তি গুরুত্ব দিলেও কিন্তু দিলীপ শিবির সেই সময় অখুশি ছিল না। বরং একটু খুশি হয়েছিল। কারণ, শুভেন্দু বিজেপিতে আসায় বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে মুকুল রায়ের গুরুত্ব দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছিল। কিন্তু তারপর?
যত দিন গিয়েছে দুই শিবিরের মধ্যে দ্বৈরথ বেড়েছে। সম্প্রতি শুভেন্দুর দিল্লি সফরে সেটা যে এক লাফে অনেকটা বেড়ে গিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দিলীপকে না জানিয়ে শুভেন্দুর দিল্লি পৌঁছানো এবং দু-দিন ধরে জেপি নড্ডা, অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শুভেন্দু যে ভাবে বৈঠক করেছেন, তা থেকে রাজ্য বিজেপি নেতাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, শুভেন্দুর দিল্লি সফর মোটেও আচমকা নয়। শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠকের দিন ক্ষণ আগেই ঠিক হয়েছিল। তার মানে এই বৈঠকের বিষয়ে দিলীপকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। তার আগে দলের বিধায়কদের নিয়ে শুভেন্দুর রাজভবন যাওয়া ও রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করা থেকে আরও স্পষ্ট যে বাংলায় দলের ব্যাপারে শুভেন্দুর ওপর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বেশি ভরসা করছেন।
শুভেন্দু অধিকারীর দিল্লি সফরকালে বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানান, শুভেন্দু কেন দিল্লি গিয়েছেন সেটা দিল্লির নেতারাই বলতে পারবেন। রাজ্য সভাপতিকে অন্ধকারে রেখেই যে শুভেন্দু মোদী-শাহ-নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠক করতে দিল্লি গিয়েছেন, সেটা দিলীপ নিজেই প্রকাশ্যে এনে দেন। এরপরই দিলীপ দলের অন্দরে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দলের বিধায়কদের নিয়ে রাজভবনে পৌঁছানো ও দিল্লি যাওয়া নিয়েও তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। রাজভবনে বিধায়কদের নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে শুভেন্দু জানিয়েছিলেন, তিনি রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) অমিতাভ চক্রবর্তীকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দলের ভিতরেই প্রশ্ন উঠেছে যে, রাজ্য সভাপতিকে এড়িয়ে কেন শুভেন্দু বারবার সংগঠন সম্পাদকের সঙ্গেই কথা বলছেন।
বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর থেকেই বঙ্গ বিজেপির ছন্নছাড়া চেহাড়া প্রকট হয়ে উঠেছে। দলীয় কোন্দলও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার ওপর শুভেন্দুর রাজভবন যাত্রা ও দিল্লি সফরে দলের মধ্যেকার ফাটল যে আরও চওড়া হতে শুরু করল সেটাও পরিস্কার হয়ে ওঠে যখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন একাধিক বঙ্গ বিজেপি নেতা। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে রাজ্যের এই কোন্দলের আঁচ লেগে গিয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যেও। ভোটের ফলপ্রকাশের পর দলের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ নিয়ে কলকাতায় প্রথম বঙ্গ নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লির নেতারা যে আলোচনায় বসেছিলেন, সেখানে হাজির ছিলেন না বিজেপির অন্যতম কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয়।
এমনকি বঙ্গ বিজেপির ছন্নছাড়া অবস্থা সামাল দিতে বিজেপির সর্বভারতীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) শিবপ্রকাশ-সহ অরবিন্দ মেনন এবং অমিত মালব্য যে কলকাতায় এসে বৈঠক করেন সেখানেও রাজ্যের এক নেতা রীতিমতো চিৎকার করে প্রশ্ন করেন, ‘শুভেন্দু যাকে প্রার্থী বলবে তাঁকেই মেনে নিতে হবে নাকি?’ দলের আরেক নেতা বলেন, ‘বিধানসভা ভোটে দিল্লিকে বুঝিয়ে শুভেন্দু অনেক আসনেই তাঁর পছন্দের যত প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই গোহারা হেরেছেন। বিরোধী দলনেতা উপনির্বাচনেও নিজের অনুগামীদের নাম প্রার্থী হিসেবে ভাসাতে শুরু করেছেন’।
অন্যদিকে বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর বিজেপির আন্দোলন কর্মসূচির রূপরেখা ঠিক করার প্রথম বৈঠকে দেখা মেলেনি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর। শিবপ্রকাশ, অরবিন্দ মেনন, অমিত মালব্য, দিলীপ ঘোষ, রাজ্যের পাঁচ সাধারণ সম্পাদক, এক সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) এবং তিন সহ-সভাপতি হাজির থাকলেও শুভেন্দু কেন আরামবাগের খানাকুল এবং ঘাটালের দাসপুরে দলের অন্য কর্মসূচিতে যান। বিজেপির দাবি, এই বৈঠকে শুভেন্দুকে ডাকা হয়নি। কারণ, বৈঠকটা ছিল কেবল বাছাই করা সাংগঠনিক পদাধিকারীদের নিয়ে। শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা হলেও দলীয় সংগঠনে তাঁর কোনও পদ এখনও নেই। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বের এই ব্যাখ্যার পরেও দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠছে, ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে বৈঠকে বিরোধী দলনেতা ডাক পাননিই বা কেন? তবে কি শুভেন্দু বিজেপিতে আসায় আদি শিবিরের নেতারা খুশি নন?
প্রসঙ্গত; বিজেপির আন্দোলন কর্মসূচির রূপরেখা বৈঠকে এক নেতা বিধানসভা ভোটে ‘আদি’ শিবিরের বদলে ‘নব্য’ শিবিরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি স্পষ্ট জানান, প্রার্থী এবং আসন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ‘নব্য’রা বেশি প্রাধান্য পাওয়াতেই ভোটে দল হেরেছে। ওই বৈঠকে অন্য আরেক নেতা বলেন, আসন ধরে ধরে ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন আসনে আলাদা আলাদা কারণে দলের হার হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যাঁদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই জিততে পারেননি।
এমনিতেই বিধানসভা ভোটে মুখ থুবড়ে পড়ার পর বহু বিজেপি নেতা ফের তৃণমূল যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে রয়েছেন। তার ওপর ভোটের খারাপ ফলাফলের জন্য দলের একাংশ এখন রাজ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সরাসরি দোষারোপ করছেন। প্রকাশ্যে ক্ষোভপ্রকাশের ধরণ থেকেই বোঝা যাচ্ছে দলের মধ্যেকার ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছে। তাতে মাত্রা বাড়াচ্ছে দিলীপ-শুভেন্দু দ্বৈরথ।
যে দলে সবাই ক্ষমতার লড়াইতে ব্যস্ত, যে দলে সবাই নিজেকে নেতা বা মন্ত্রী করতে যুদ্ধ করে সে দল ক্ষমতার যুদ্ধেই ক্লান্ত
হয়, ক্ষতবিক্ষত হয় আর খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
যত দিন যাবে দলটার পরিণতি এমনটাই হবে। একদিন মোদি শাহ প্রকাশ্যে মারামারি করবে।
চকচক করলেই সোনা হয় না। সেটা না বোঝার মাশুল দিতেই হবে। পিতলকে সোনা বলে চালানোর চেষ্টা দলের অনেকেই
মানতে চায় না। আপনার লেখা খুব প্রাসঙ্গিক ও প্রাঞ্জল।
রাজনীতি আজ অন্দরে বাহিরে ; বাংলা চলেছে প্রলয় তিমিরে ????
বিধানসভা ভোটে ভরাডুবি হতেই বঙ্গ বিজেপির ছন্নছাড়া চেহাড়াটা প্রকট হয়ে উঠেছে। দলীয় কোন্দল পৌঁছেছে চরম
পর্যায়ে। দলটা এরকমই । ক্ষমতালোভী, ধান্দাবাজদের আঁখরা। ক্ষমতা পেলে এরা সন্ত্রাসবাদীদের লজ্জা দেয়।