রাজ্য রাজ্যপাল সংঘাত এ রাজ্যে নতুন ঘটনা নয়, বিশেষ করে জগদীপ ধনখড়ের জমানায়। এবার নতুন মাত্রা নিয়েছে বিধানসভার অধিবেশন শুরুর আগে রাজ্যপালের লিখিত ভাষণ পাঠ ঘিরে। রীতি অনুযায়ী রাজ্য সরকারের লেখা ভাষণ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর রাজভবনে পাঠানো হয়। তাই পাঠ করেন রাজ্যপাল। কিন্তু এবার নাকি ভাষণের খসড়ার কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি রয়েছে জগদীপ ধনখড়ের। তিনি তা পরিবর্তন করাতে চান। এই কারণে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজভবনে ডেকে পাঠিয়েছেন তিনি।
সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, রাজ্যপালের ভাষণ লেখে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার। এরপর তা অনুমোদন করে রাজ্য মন্ত্রিসভা। তারপর তা পাঠানো হয় রাজ্যপালের কাছে। এক্ষেত্রে নবান্ন যাবতীয় রীতি মেনেই অধিবেশনের দু-দিন আগে ভাষণের খসড়া রাজভবনে পাঠিয়ে দিয়েছে।
স্বাধীনতার পর বাংলায় আসা সমস্ত রাজ্যপালই রীতি মেনে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত লিখিত ভাষণ পাঠ করেছেন, এমনকী, বর্তমান রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ও গতবছর রাজ্য সরকারের পাঠানো ভাষণই হুবহু পাঠ করেছেন। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাও যে লিখিত ভাষণ অনুমোদন করে রাষ্ট্রপতিকে পাঠায় তিনিও তাই হুবহু পাঠ করে থাকেন। এটাই দস্তুর। কিন্তু বাংলার রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় সেই নিয়ম ভাঙতে চাইছেন।
শুক্রবার নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন। রীতি অনুযায়ী অধিবেশন শুরু হয় রাজ্যপালের ভাষণ দিয়ে। সাংবিধানিক বিধি মেনে সরকারের তৈরি করে দেওয়া ভাষণের খসড়াই আগামী ২ জুলাই বিধানসভায় রাজ্যপালের পড়ার কথা। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে সোমবার প্রকাশ্যে অনীহা জানিয়েছেন। কারণ, তাঁর অভিযোগ রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদিত ভাষণের খসড়ায় যা লেখা রয়েছে, তা সত্য নয়। রাজ্যপালের বক্তব্য তিনি উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরেই ২ জুলাই বিধানসভায় ভাষণের খসড়া হাতে পান। খসড়া পড়ে তাঁর মনে হয়, যা লেখা আছে তা বাস্তব নয়। ভাষণের খসড়া নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠিও দেন। রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজভবনে ডেকে পাঠিয়েছেন। ধরে নেওয়াই যায় রাজ্যপাল ভাষণের খসড়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন।
প্রসঙ্গত; দু’দিন আগে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপাল দ্বৈরথে রাজ্য রাজনীতি সরব ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির আলিপুর সাংসদের পৃথক রাজ্যের দাবি ও তারপরেই রাজ্যপালের উত্তরবঙ্গ সফর প্রসঙ্গে তীব্র আক্রমণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যপাল পাহাড়ে অশান্তি তৈরি করার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে রাজ্যপাল দাবি করেছেন, জিটিএ দুর্নীতিতে ভরে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের বক্তৃতার খসড়া নিয়ে আপত্তি এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
রাজ্যপালের তলবে এর আগেও মুখ্যমন্ত্রী একাধিকবার রাজভবনে গিয়েছেন, সেই তলব কখনও চা চক্রে মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ, কখনও জরুরী আলোচনার কারণে। ২০২০-র শুরুতে রাজ্যপালের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার এই বছরে ওই একই আমন্ত্রণে মুখ্যমন্ত্রী গিয়েছিলেন রাজভবনে। আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যসচিবকেও পাঠিয়েছেন রাজভবনে। রাজ্যপাল ডাকলে সংবিধানগতভাবে মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে যেতে বাধ্য। অন্যদিকে রাজ্যপালের দাবি মতো সরকার খসড়া পরিবর্তনে বাধ্য নয়। রাজ্যপাল ডাকলে মুখ্যমন্ত্রী রাজভবনে নিশ্চয়ই যাবেন। চায়ের নিমন্ত্রণ ছাড়াও একাধিক বিষয়ে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীকে দেখা করার কথা বলতেই পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বিষটা একেবারেই আলাদা। মন্ত্রিসভার অনুমোদিত ভাষণ বদলের জন্যই যদি মুখ্যমন্ত্রীকে ডাকা হয় তাহলেও কি তিনি যেতে বাধ্য?
মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করবেন কীনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন। উল্লেখ্য, গত বছর বর্তমান রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় সরকারের পাঠানো ভাষণের খসড়া হুবহু পাঠ করেছিলেন। এক্ষেত্রে এ বছর রাজ্যপালের এ হেন আচরণে রাজ্য-রাজ্যপাল সংঘাতের আঁচ করছেন ওয়াকিবহাল মহল। সাংবিধানিক রীতি অনুসারে, রাজ্যপালের কাছে ভাষণের এই খসড়া আসার আগে রাজ্য সরকার এই খসড়া তৈরি করেছেন। তারপর রাজ্য মন্ত্রিসভায় সেই খসড়া অনুমোদিত হয়েছে। ফলে এই খসড়া পরিবর্তন এখন আর সম্ভব নয়। এটা বোঝা যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী এবার আর রাজ্যপাল ডেকেছেন বলেই রাজভবনে উপস্থিত হচ্ছেন না। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকেও সেরকম আভাষ মিলেছে। তার মানে রাজ্যপালের সঙ্গে রাজ্যের সংঘাত আরও কিছুটা বাড়ল।
এবার আর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নয়। রাজ্যকে চাপে রাখবার চেষ্টায় রাজ্যপাল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নির্দেশানুযায়ী নিরন্তর রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে অভিযোগ তোলেন, এবার তিনি সংঘাতের অন্য পথে হাটতে শুরু করেছেন। সম্প্রতি দিল্লি গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। ফিরে এসেই উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং-এ অস্থায়ী রাজভবনে, সেখান থেকে ফিরে এসেই মন্ত্রিসভার তৈরি করা বক্তৃতার বিষয়বস্তু ‘বিবেচনা’ করার কথা জানিয়েছেন।
আসলে বিধানসভার গত বাজেট অধিবেশনে রাজ্যপালের বক্তৃতা সরাসরি সম্প্রচার না হওয়ার ক্ষোভ এ বার রাজ্যপাল আগেভাগেই সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক অধিবেশনগুলিতে বিধায়কদের বসার জন্য যে বন্দোবস্ত হয় তাতে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা বসানোর জায়গা সঙ্কুলান হয় না। বাজেট অধিবেশনে রাজ্যপালের বক্তৃতার সময় তা করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছ। তা ছাড়া অধিবেশনের কার্যক্রম কী ভাবে, কতটা দেখানো হবে সেটিও সম্পূর্ণ স্পিকারের এক্তিয়ার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেই রেখেছেন কোভিড বিধি পুরোপুরি মেনে স্পিকার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করবেন। এতেও ধনখড়ের গোঁশা হতে পারে।
তাছাড়া ভাষণের প্রথমেই বিপুল জয়ের মধ্যে দিয়ে তৃণমূলের তৃতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার কথা উল্লেখ করা আছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও যে ভেঙে পড়েনি সেই কথা বক্তৃতায় রাখা হয়েছে। এছাড়া রাজ্যপাল সংবাদমাধ্যমে তাঁর বক্তৃতার সরাসরি সম্প্রচার চাইছেন। করোনার কারণে সেই ব্যবস্থা না হওয়ার সম্ভবনাই বেশি। এসব কারণেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত লিখিত ভাষণ পাঠে ধনখড়ের অনীহা।
দুরাশায় মরে
এখনও সময় আছে লুম্বিনী পার্কে পাঠাবার।