কেমন আছে সময়ের মধ্যে দরজা খুঁজে না পাওয়া ছেলেমেয়েরা, কোভিডকালে? বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে এদের যোগাযোগ এমনিতেই ক্ষীণ। এরা বাস করে নিজের জগতে। অন্যতরভাবে সক্ষম এমন ছেলেমেয়েদের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখা বেশ কঠিন। প্রায় দু’বছর ঘরেই বন্দী জীবন কাটাচ্ছে এরা। শুনতে খারাপ লাগলেও একথা সত্যি, এদের অনেকেরই জীবনে বাইরে যাওয়ার মত একমাত্র জায়গা হল স্পেশাল স্কুল। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। অবশ্য আরেকটু সৌভাগ্যবানরা পায়, আঁকা, নাচ, গান কিংবা ক্রাফট শেখার বিশেষ কোন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ। কোভিডের দাপটে সেসবও বন্ধ। আর পাঁচটা ছেলেমেয়েদের মত বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইলে গল্প করা বা গেমিং এ মেতে থাকার ক্ষমতা এদের নেই। চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অনন্ত সময় – অথচ এরা কেউ তাকে জিজ্ঞেস করতে পারছে না, আমাদের দিনের পর দিন এভাবে আটকে থাকার কারণটা কী?
অস্থির হয়ে উঠছে, বেরোতে চাইছে, কান্নাকাটি করছে অনেকেই। আবার কারও বাড়ছে হিংস্রতা ও উত্তেজনা, যা সামলাতে জেরবার হয়ে যাচ্ছেন বাড়ির লোক। তারা ভেবে পাচ্ছেন না কি করবেন, সমস্যা সমাধানের জন্য যাবেন কার কাছে? সামগ্রিকভাবেই দুনিয়াদারি টালমাটাল। সেইসময় একেবারে ‘নেই’ করে দেওয়া, ধর্তব্যের মধ্যে না রাখা, এমন ছেলেমেয়েদের খবর রাখা বা তাদের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় কারও নেই। এমনিতেই এদের নিয়ে কাজ করা লোকজন প্রয়োজনের তুলনায় কম, এসময় তা আরও বেড়েছে।

অথচ অন্যতরভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশের ব্যাপারে কাগজে কলমে সরকারের নির্দিষ্ট নীতি ও প্রচেষ্টা রয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। কিছু বেসরকারি প্রচেষ্টা এই শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা করছে। এই দুঃসময়ে তা মরুভূমির বুকে পড়া দু-এক ফোঁটা জলের মত। পড়তে না পড়তেই শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন সব জায়গাতেই বিশাল সমস্যা। সেখানে এদের কথা শোনার লোক কোথায়? ইদানিং এদের নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠন তৈরি হয়েছে। তারা প্রশংসনীয় কাজও করছেন। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সমস্যার তীব্রতার কাছে তা দাঁড়াতেই পারেনা।
কোভিড থেকে বাঁচতে টিকাকরণের কথাই ধরা যাক। টিকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা এখন সবাই মানছেন। কিন্তু বিশেষ বা স্পেশাল ছেলেমেয়েদের কীভাবে টিকা দেওয়া হবে তেমন কোন সংহত পরিকল্পনার কথা আমরা কেউ জানিনা। কারণ এদের সাধারণভাবে আর পাঁচজনের মত দীর্ঘ সময় লাইন দিয়ে টিকা নেওয়া কঠিন। একথা মোটেই বলছি না, এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। ঘটনা হল, হয়তো নানা গুরুতর ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত সরকার এদের কথা ভাবার সময় পাননি। এটাও ঘটনা, এদের হিসেবের মধ্যে আনার জন্য ওকালতি করা মানুষজনেরও গলার স্বর খুবই ক্ষীণ। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ নিজেদের প্রচেষ্টায় বিশেষ ছেলেমেয়ে ও তাদের পরিবারের লোকজনকে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। প্রশংসনীয় কাজ কিন্তু তারা আর কতটুকু করে উঠতে পারবেন!

এই দুঃসময়ে চিকিৎসকদের ভূমিকা খুবই উজ্জ্বল। প্রায় ঢাল-তলোয়ারহীন অবস্থায় লড়াই করছেন তারা। কিন্তু একথা মানতেই হবে সে তুলনায় মানসিক চিকিৎসকদের ভুমিকা কিঞ্চিৎ নিষ্প্রভ। অন্তত বহু অন্যতরভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা একথাই বলছে। এইসময় বিশেষ ছেলেমেয়েদের মানসিক সমস্যাগুলিকে নিয়ে চিকিৎসকরা খুব একটা কিছু বলছেন না। অনেকের চেম্বারও বন্ধ। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও প্রায় অসম্ভব। এদের জন্য কোন স্পেশাল ক্লিনিক বা কাউন্সেলিং এর উদ্যোগও প্রায় চোখে পড়ে না। আমি বলছি ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞদের নিজস্ব উদ্যোগের কথা। এ সময় এটা খুব জরুরি।
স্পেশাল চাইল্ড বা অন্যতরভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের অভিভাবকরা সত্যি একটা বড় সমস্যায় পড়েছেন। জানি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাবির ভিড়ে তাদের দাবিটির মাথা তোলা বেশ কঠিন। সমাজ যাদের প্রায় ‘বাতিল’ করেছে তাদের কথা বলার লোক এসময় পাওয়া মুশকিল। তবুও শুভবুদ্ধি, মনোযোগ, ভালোবাসা ও মানুষের ইচ্ছাশক্তি ঘটিয়ে দেয় অনেক ম্যাজিক। এসময়েও বিশেষ ছেলেমেয়েদের বেঁচে থাকার পরিসর গড়ে দেওয়ার কথা নিশ্চয়ই অনেকে ভাবছেন। না ভাবাটাই তো একটা মানসিক প্রতিবন্ধকতা!