“ ‘Terrorism’ is a political term. It describes outrageous, randomized violence inflicted in pursuance of a political ideology. However, the definition of ‘terrorism’ excludes, from its common understanding, certain other kinds of violence that may equally terrorize people: structural violence that have been the legacies of post-colonial nation-states, for instance.”—Sharrukh Alam
এ বছর জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সিপিআইএম-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কনিটির ওয়েহসাইটে একটি দীর্ঘ লেখা প্রকাশিত হয়- ‘কুৎসার আড়ালে প্রকৃত সত্য— কসবায় আনন্দমার্গী হত্যা’। লেখক অর্ণব তট্টাচার্য। শুরুতেই লেখক বলেছেন, ‘১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল কসবায় প্রকাশ্য দিবালোকে ১৭ জন আনন্দমার্গীকে হত্যার জন্য সিপিআইএম কে অভিযুক্ত করে কুৎসা প্রচার এখনও চলছে। যদিও এই অভিযোগের কোন সারবত্তা নেই, তবু ঐ নৃশংস ঘটনার এত বছর পরেও যাবতীয় দক্ষিণপন্থী শক্তি এই ইস্যুতে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর ঐদিন আনন্দমার্গীরা কর্মসূচি পালন করে এবং নিয়ম করে সিপিআইএম-এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করে। অথচ কোন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে সিপিআইএম-এর কোন নেতা বা কর্মী এই ঘটনার জন্য দোষী বলে প্রমাণিত নন।
ভুল বলেন নি যে কোন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে কোম সিপিআইএম নেতা বা কর্মী দোষী প্রমাণিত হননি। কিন্তু কোন তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়েছিল কি? বিচারপতি এস.সি. দেবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল ১৯৮২ সালে। অথচ ২০১১ সালের মধ্যে সে কমিশন কাজ শেষ করে রিপোর্ট জমা দিতে পারল না? তাহলে সেই গণ হত্যায় সাজা হবে কি করে? কাজেই প্রমাণিত হয়নি বলে কি কোনও খুনি নৈতিকভাবে নিজেকে নির্দোষ দাবী করতে পারে?
লেখক অর্ণব ভট্টাচার্য আরো বলেছেন, সেদিন সকালে বন্ডেল গেট, বিজন সেতু ও বালিগঞ্জ স্টেশনে ছেলেধরা সন্দেহে বেশ কয়েক জন আনন্দমার্গীকে উত্তেজিত জনতা ঘিরে ধরে প্রচণ্ড প্রহার করে এবং ১৭ জন আনন্দমার্গীকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে। বালিগঞ্জ, কসবা অঞ্চলের বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা যায় যে এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ছেলে ধরা সম্পর্কিত গুজব এলাকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বোঝাই যায় যে একদিকে গুজব রটিয়ে জনগণকে উত্তেজিত করা হয়েছিল, অন্যদিকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সমাজবিরোধীদের যুক্ত করা হয়েছিল। রাজ্য সরকার এই ভয়ঙ্কর ঘটনার সাথে সাথে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়। জনগণকে গুজবে কান না দিতে, আইন হাতে তুলে না নিতে এবং সমাজবিরোধীদের প্ররোচনায় পা না দিতে আহ্বান জানায় সরকার ও রাজ্য বামফ্রন্ট।’
বামফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান, সিপিআইএম-এর প্রথম পলিটব্যুরো ও পশ্চিমবঙ্গের প্রথম রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত তখনও জীবিত। তিনিই বলেছিলেন, ‘কোনরূপ গুঞ্জন ছড়াবেন না, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’। মে দিবস ছুটি থাকায় পার্টির সান্ধ্য গণশক্তি’র প্রথম পৃষ্ঠায় প্রধান খবর প্রমোদবাবুর বিবৃতি, যা পড়ে মনে হয়, তিনি বিজন সেতুর ঘটনায় আদৌ বিচলিত হ’ন নি। কিন্তু বিচলিত হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু যার অধীনে ছিল স্বরাষ্ট্র (পুলিশ) দপ্তর। তিনি যে রীতিমত বিচলিত হয়েছিলেন, সে কথা লিখেছেন সিপিআইএম এর প্রাক্তন সাংসদ ও প্রাক্তন সাংসদ প্রয়াত ড. বিপ্লব দাশগুপ্ত। “আমার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় মাত্র একবারই জ্যোতিবাবুকে বিচলিত হতে দেখেছিলাম। সেদিন বিজন সেতুতে কয়েকজন আনন্দমার্গী খুন হন। সেইদিন সকালে ওর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল এবং কনফার্ম করবার জন্য ফোন করেছিলাম। উনি ঘটনাটা বলে উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘এখন বলতে পারছি না। এক ঘন্টা পরে ফোন করো’ ” [বিপ্লব দাশগুপ্তঃ ‘জ্যোতিবাবুর সঙ্গে, দ্বিতীয় পর্ব (১৯৬৭ থেকে ১৯৭৭)। নন্দন, ১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬।পৃ ৬]। সেদিম ১৭ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীকে (একজন সন্ন্যাসিনী-সহ) পিটিয়ে মেরে পুড়িয়ে মারা হয়। ছেলেধরা গুজব কারা ছড়িয়েছিল? আর তাতে করে জনগণ এতই উত্তেজিত হয়েছিল, যে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটল, আর তাতে ‘সমাজবিরোধীদের যুক্ত করা হয়েছিল’? পূর্বপরিকল্পিত ছক ছাড়া এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে?
মমতা বন্দয়োপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে বিচারপতি আমিতাভ লালা-র নেতৃত্বে বিজন সেতুর হত্যাকান্ড নিয়ে একটি কমিশন গঠন করেন। সেই কমিশন গঠনের আইনী বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি পিটিশন জমা দেন। তাঁর বক্তব্য, ঘটনার সময় সেই কমিশন ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত নতুন কমিশন কোনও রিপোর্ট দিতে পারবে না৷ অদ্ভুত যুক্তি শুনে মনে পড়ে যায় পাড়া গাঁয়ের কোন মাঠে প্রাতঃকৃত্য সারাকালীন এক জরুরী কাজে যাওয়া ব্যক্তির সমুখে এসে পড়া। প্রাতঃকৃত্যকারী রেগে বলল, ‘প্রাতঃকৃত্যও সারব না, যেতেও দেব না। অর্থাৎ জ্যোতিবাবুর আমলে গঠিত তদন্ত কমিশনকে দায়িত্ব পালন করতেও দেবে না, আবার পরিবর্তে অমিতাভ লালা কমিশনকেও কাজ করতে দেবে না।
জানা যায়, লালা কমিশনের সঙ্গে কান্তিবাবুর টক্কর লেগেছিল আনন্দমার্গী হত্যা নিয়ে গঠিত লালা কমিশনের হাতে নতুন বেশ কয়েকটি উঠে আসা তথ্যপ্রমাণ সেই সময় তিলজলায় আনন্দমার্গীদের প্রধান শাখা কার্যালয় খোলার কথা ছিল৷ কলোনি বাজার এলাকায় সে বিষয়ে আলোচনার জন্য ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ আনন্দমার্গীদের নিয়ে আলোচনার জন্য একটি সভা ডাকে সিপিআইএম৷ সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়, প্রাক্তন সিপিআইএম বিধায়ক শচীন সেন, স্থানীয় সিপিআইএম নেতা নির্মল হালদার ও প্রাক্তন সিপিআইএম কাউন্সিলর অমল মজুমদারের মতো কসবা-যাদবপুর এলাকার তাবড় নেতারা৷ কান্তিবাবু সেই সভায় আনন্দমার্গীদের কার্যকলাপের স্বরূপ তুলে ধরে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তার ১১ সপ্তাহ বাদে ৩০ এপ্রিল যখন আনন্দমার্গীরা ট্যাক্সি করে তিলজলা সেন্টারে একটি ‘শিক্ষা সম্মেলনে’ যোগ দিতে যাওয়ার সময় তাদের ছেলেধরা বানিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে বিজন সেতুতে ১৭ জন আনন্দমার্গীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে৷ সে ঘটনার জেরে কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় লালা কমিশন।
মনে পড়ে ১৯৯১-এর ১৮ জুন উদয়নারায়ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের আমতা ১ ব্লকের আনুলিয়া পঞ্চায়েতের কান্দুয়া গ্রামের ঘটনা। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থীদের ‘হাত’ চিহ্নে ভোট দেবার জন্য বেশ কিছু ভোটারের হাত কেটে নেওয়া, একের পর এক বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ও কংগ্রেসের তৎকালীন পঞ্চায়েত সদস্য গোপাল পাত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এ খবর করেছিলেন প্রয়াত রহিত বসু। রহিত তখন ছাত্র ফ্রন্ট এসএফআই থেকে উঠে আসা সিপিআইএম-এর পার্টি সদস্য। সিরামিক্সে পিএইচডি রহিতের কাছেই শোনা, বিবেকের দংশনে ঐ ব্রেকিং নিউজ করা ও পার্টি সদস্যপদ খোয়ানোর কথা। সেবার লোকসভা (উলুবেড়িয়া) ও বিধানসভা (উদয়নারায়ণপুর) জয়ী সিপিআইএম প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে হান্নান মোল্লা ও পান্নালাল মাঝি। আর কংগ্রেসের যথাক্রমে মিনতি হালদার ও সরোজ কাঁড়ার। কাজেই কান্দুয়া গ্রামে যে নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছিল যে সিপিআইএম-পুষ্ট লুম্পেন বাহিনী এ বিষয়ে সংশয়ের কারণ নেই। কিন্তু প্রমাণ হয় নি। কারণ স্বরাষ্ট্র (পুলিশ) মন্ত্রী জ্যোতিবাবু তার যথাযথ তদন্তে উদ্যোগ নেন নি, উৎসাহও দেখান নি, ঠিক যেমন বিজন সেতুতে আনন্দমার্গী হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ২৯ বছর ধরে চলেও শেষ হতে দেওয়া হয় নি।
আর মরিচঝাঁপির নৃশংসতা, যা ঘটেছিল বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হবার দু-বছরের মধ্যে। সিপিআইএম-এর প্রথম একে গোপালন ছাড়া সবাই জীবিত। এ নিয়ে সাম্প্রতিকতম প্রকাশিত যে বইটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা-কর্মী-গবেষকদের মধ্যে তার লেখক দীপ হালদার। বইয়ের নাম Blood Island : An Oral History of Marichjhapi Massacre। তিনি মরিচঝাঁপি বসতি-জনপদ নির্মাণ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী জ্যোতির্ময় মণ্ডলের সাথে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। জ্যোতির্ময়বাবু বলেছিলেন ‘between 14 and 16 May 1979, in one of the worst human rights violations in post-independent India, the West Bengal government forcibly evicted around 10,000 or more from the island. There was rape, murder and poisoning. Bodies were buried in the sea. Countless were killed even as some escaped, too afraid to tell the tale. At least 7,000 men, women and children were killed.’। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থ মন্ত্রী ড. অশোক মিত্র তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘আরেকরকম’ পাক্ষিকে লিখেছিলেন যে সেই সময় পার্টির মন্ত্রীরা সবাই পার্টি কংগ্রেসে, তাই তিনি দায়িত্বে ছিলেন, আর বড় জোর ১০০ জন নিহত হয়েছিলেন— যেন ১০০ জন নিহত হওয়া গৌণ ঘটনা। ইনিই তো বলেছিলেন, ‘আমি ভদ্রলোক নই, আমি কমিউনিস্ট।’ মরিচঝাঁপি প্রসঙ্গে সেখানেই থামেন নি। প্রখ্যাত সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্ত কুমীরমারী থেকে লঞ্চে করে ওপাড়ে মরিচঝাঁপি দ্বীপে গিয়েছিলেন, সেই জলবাহন নাকি পাঠিয়েছিল মার্কিন দূতাবাস। তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম যে মার্কিন দূতাবাসই সেই লঞ্চ পাঠিয়েছিল। তাই বলে কি মরিচঝাঁপির নৃশংসতা যৌক্তিক ছিল? হিপোক্রিট আর কাকে বলে!
স্বাধীন ভারতে কোন রাজ্যে মরিচঝাঁপির মত এত বড় হত্যাকান্ড ঘটেনি। গুজরাটে ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাতে এর এক-তৃতীয়াংশ মানুষও নিহত হননি। সিপিআইএম সে ইয়ুসিদ স্তালিন ও তাঁর সঙ্গী লাভ্রেন্তি বেরিয়ার অমুগামী, মরিচঝাঁপির অতিকায় গণহত্যা তার রক্তাক্ত স্বাক্ষর ।
মনে পড়ে গেল ‘সংবাদ প্রতিদিন-এ ১৬ এপ্রিল ২০০২ সালে সিপিআইএম-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক ও পলিটব্যুরো সদস্য অনিল বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার। নিয়েছিলেন বরিষ্ঠ সাংবাদিক কমল ভট্টাচার্য- পরস্পর ছাত্রজীবন থেকে বন্ধু। দুজনেই প্রয়াত। প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম অনিল বাবুর উক্তি— ‘সিপিএম সন্ত্রাস করে, কেউ বিশ্বাস করবে না।’
মনে পড়ে হিটলারের আমলে প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী পল যোসেফ গোয়েব্লসের কথা; “If you tell a lie big enough and keep repeating it, people will eventually come to believe it.”
সূত্র : https://cpimwb.org.in/the-real-truth-behind-the-slander-anand-margi-arnab-bhattacharya/