কিছুদিন আগে দুটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে অবিজেপি দল বড়রকম সাফল্য লাভ করে। বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তামিলনাড়ুতে এমকে স্ট্যালিন। এই দুটি বিপুল জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল ভোট-কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের। প্রায় একই সময়ে দুটি রাজ্যের ভোটে পিকে-র ভোট সাফল্যের পর তাঁকে ঘিরে জল্পনা বেশ তুঙ্গে ওঠে। ইতিমধ্যে জুন মাসের ১১ ও ২১ তারিখ অল্পদিনের ব্যবধানে এনসিপি প্রধান শরদ পাওয়ারের সঙ্গে দু’বার বৈঠক করেন প্রশান্ত। এনসিপি প্রধানের বাড়িতে ২১ জুন রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলে কয়েক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। তার আগে ১১ জুন মুম্বইয়ে শরদ-প্রশান্ত বৈঠক হয় প্রায় ঘণ্টাতিনেক। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে এনসিপি নেতা শরদ পাওয়ারের সঙ্গে দু’বার পিকের সাক্ষাৎ ঘিরে জল্পনা ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, ২০২৪-এ কেবল দেশের লোকসভা নির্বাচন নয়, পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচন। যে কারণে তখন শরদ-প্রশান্ত বৈঠক জল্পনা দানা বেঁধেছিল, তবে কি মহারাষ্ট্রে শিবসেনা-এনসিপি-কংগ্রেস শিবিরের হয়ে ঘুঁটি সাজাবেন প্রশান্ত?
এদিকে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোর রাহুল গান্ধীর বাসভবনে গিয়ে কংগ্রেসের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সেখানে একা রাহুল গান্ধী নন, হাজির ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কেসি বেণুগোপালও। এই বৈঠক ঘিরেও জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। জানা গিয়েছে সেখানে ছিলেন পঞ্জাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হরিশ রাওয়াত। আর তার থেকেই মনে করা হচ্ছে তাঁদের মধ্যে মূলত পঞ্জাব নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পঞ্জাবে অমরিন্দর সিংয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন প্রশান্ত কিশোর। ২০২২ সালে পঞ্জাবের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কংগ্রেস। এদিকে বর্তমানে পঞ্জাবে কংগ্রেসের অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে। তবে কি সেই নিয়ে আলোচনা করতেই পিকে গান্ধী নিবাসে?
প্রশান্ত কিশোর যখন এনসিপি সুপ্রিমো শরদ পাওয়ারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন থেকেই জল্পনা শুরু হয়, এবার তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মোদী বিরোধী মুখ হিসেবে বিরোধী দলগুলিকে এক সূত্রে গাঁথার কাজ করছেন প্রশান্ত কিশোর। কিন্তু শরদ পাওয়ারের বাসভবনে যে বৈঠক হয় সেখানে কংগ্রেসের কোনও নেতা ছিলেন না। এরপরই জল্পনা তৈরি হয়, ফের তৃতীয় ফ্রন্ট নিয়ে ভাবনা চিন্তা চালু হল কি না। যদিও প্রশান্ত কিশোর বলেছিলেন, কংগ্রেসকে ছাড়া বিজেপি বিরোধী কোনও জোট গঠন করে লাভ নেই। এই আবহে আজ রাহুল গান্ধীর দিল্লির বাড়িতে পিকে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন যা নিয়ে বাড়ল জল্পনা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর শরদ পওয়ার, তারপর একরকম আচমকাই প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতির বাড়িতে হাজির পিকে। জানা গিয়েছে, পিকের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধী নিজের পাঞ্জাব সফর দু’দিনের জন্য পিছিয়ে দিয়েছেন। এবং সেই সাক্ষাৎ ঘিরে একাধিক জল্পনা তৈরি হয়েছে। কেউ মনে করছেন চব্বিশের মহাজোটের সলতে পাকাতেই এই বৈঠক। আবার কেউ বলছেন, চব্বিশের লোকসভার জন্য প্রশান্ত কিশোরকে দলের রণকৌশল তৈরির দায়িত্ব দিতে পারে কংগ্রেস। এদিন বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পাঞ্জাব কংগ্রেসের ডামাডোল- একথাও অনেকে বলছেন। প্রসঙ্গত, এই সময় প্রশান্ত কিশোর কংগ্রেস শাসিত পাঞ্জাবে মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংয়ের হয়ে কাজ করছেন। পঞ্জাবে কংগ্রেস গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত। কংগ্রেস হাই কম্যান্ড সিধু-অমরিন্দর সিং দ্বন্দ্ব সামাল দিতে নাজেহাল হচ্ছে। সেইকারণে পিকে- রাহুল-প্রিয়াঙ্কার এই বৈঠক পাঞ্জাব নিয়ে বলেই মনে হচ্ছে।
তবে এদিনের বৈঠকে ২০২৪-এর রণকৌশল তৈরি নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করছে রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের একাংশ। কারণ স্রেফ সিধু-অমরিন্দর সিং দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়াঢ় জন্য পিকে রাহুল গান্ধীর দিল্লির বাড়িতে হাজির হবেন এটা ভাবা যাচ্ছে না। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী শিবির বিজেপি-বিরোধী মহাজোট তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে। আর প্রশান্ত কিশোর সেই জোটের সেতুবন্ধনকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। স্বাভাবিকভাবেই রাহুলের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের উদ্দেশ্য চব্বিশের রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারাতে আঞ্চলিক দলগুলির একটি সমন্বয় তৈরি করতে চাইছেন অনেক বিরোধী নেতা। সেই জোটে কংগ্রেসকে শামিল করা হবে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। এরই মধ্যে পিকে-রাহুল সাক্ষাৎ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
‘মিশন ২০২৪’ নিয়ে চর্চার আবহে পাওয়ারের সঙ্গে পিকের বৈঠককে ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয় রাজনীতির ময়দানে। গত ১১ জুন মুম্বইয়ে শরদ পাওয়ারের মুম্বইয়ের বাসভবনে তাঁরা বৈঠক করেন। পিকে-পাওয়ারের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয় দিল্লিতে।
মিশন বাংলার পর তা হলে কি এ বার মিশন ২০২৪? ভোট-কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে NCP নেতা শরদ পাওয়ারের বৈঠক উস্কে দেয় এই জল্পনাই। মুম্বইয়ে শরদ পাওয়ারের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন প্রশান্ত। প্রায় তিন ঘণ্টার লাঞ্চ-বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেননি কেউই। পাশাপাশি শরদ পাওয়ারের টিমের জন্য পিকে কোনও দায়িত্ব নিচ্ছেন কিনা, সে নিয়েও জল্পনা চলছে। আর এবার রাহুল-প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে বৈঠক যেন জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৪-এ মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের লোকসভা নির্বাচনও। জল্পনা দানা বাঁধছে, তবে কি মহারাষ্ট্রে শিবসেনা-এনসিপি-কংগ্রেস শিবিরের হয়ে ঘুঁটি সাজাবেন প্রশান্ত? নাকি লোকসভা ভোটে বিরোধী জোট মজবুত করতে কংগ্রেসের হয়ে কাজ করবেন পিকে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয়বার সাফল্যের পর এবার পিকের পরামর্শ নেবেন গান্ধী পরিবারও?
সব ঠিক আছে কিন্তু ডুবন্ত জাহাজ কংগ্রেসে সরাসরি যোগ দিলে প্রশান্তকিশোর নিজেও ডুববে। কেউ আটকাতে পারবে না।
ওটা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যা।