| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সুকুমারী ভট্টাচার্য লিখছেন মনোজিৎকুমার দাস

Reporter
মনোজিৎকুমার দাস / ৮৫০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

অক্লান্ত অধ্যবসায়ে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ, পুরাণ, ইতিহাস এবং বেদ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন অধ্যাপক সুকুমারী ভট্টাচার্য (১৯২১১-২০১৪)। ১২ জুলাই ১৯২১ সালে সুকুমারী দত্ত মেদিনীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। মারা যান ২৪ মে ২০১৪ সালে। মেদিনীপুরে এবং সংস্কৃত সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই তিনি দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন; আর ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিখেছেন।

সুকুমারী ভট্টাচার্য ছিলেন সংস্কৃত সাহিত্যের অসামান্য পণ্ডিত, ভারততত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক। বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে, নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে ভারতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে তিনি চর্চা করেছেন।

ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার বলেন,— ‘তাঁর কাজ প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে আছে।’  অক্লান্ত অধ্যবসায়ে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ, পুরাণ, ইতিহাস এবং বেদ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন অধ্যাপক সুকুমারী ভট্টাচার্য । ছোটবেলার একটি মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন এবং কলকাতায় চলে আসেন। প্রাথমিক ক্রাইস্ট চার্চ স্কুলে, ম্যাট্রিক সেন্ট মার্গারেট থেকে। সংস্কৃতে সাম্মানিক নিয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়তে চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। ভর্তি হন ভিক্টোরিয়া কলেজে।

আজীবন লড়াই চালিয়েছেন মৌলবাদ, গোঁড়ামির বিরুদ্ধে, নারীপ্রগতির পক্ষে। পারিবারিক সূত্রে মাইকেল মধুসূদন দত্তের উত্তরসূরী। খ্রিস্টান পরিবারের মেয়ে, সংস্কৃত পড়তে গিয়ে ন্যায্য প্রাপ্য ঈশান বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন কলেজ জীবনে। পরিবর্তে জুবিলি স্কলারশিপ নিয়ে বি.এ পাস করেন, ১৯৪২-এ, পরে ইংরেজিতে এম.এ। শিক্ষকতার শুরু লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে, ১৯৪৫। এর পরেই প্রাইভেটে সংস্কৃতে এম.এ করেন। বুদ্ধদেব বসুর আমন্ত্রণে ১৯৫৭-য় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে যোগ দেন। এরপর সুশীলকুমার দে’র আহ্বানে সংস্কৃত বিভাগে, ছিলেন অবসর পর্যন্ত। অধ্যাপক অমল ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।

সমান দক্ষতায় বাংলা ও ইংরেজিতে তিরিশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ফেটালিজম ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া, দ্য ইন্ডিয়ান থিওগনি, প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ, বিবাহ প্রসঙ্গ, ইতিহাসের আলোকে বৈদিক সাহিত্য, বাল্মীকির রাম : ফিরে দেখা, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। অনুবাদ করেছিলেন শূদ্রকের মৃচ্ছকটিক। আমৃত্যু সাহিত্যের সনাতনপন্থী অজুহাত-আপত্তির বাইরে গিয়ে খুঁজেছেন নারীর ভাষ্য।

২০১৪ সালে প্রায় ৯৩ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। সুকুমারী ভট্টাচার্য শেষ দিন পর্যন্ত ধারণ করে রাখতে পেরেছিলেন তাঁর তেজস্বী মনস্বিতা, একজন জাগ্রত পাঠক এবং সচেতন লেখক হিসেবেও। শতবর্ষে প্রাচীন মানুষের প্রাচীন কীর্তির পুনর্মূল্যায়ন করা খুবই কঠিন কাজ!

অসাধারণ মেধার পরিচয় রেখে ছাত্রজীবন সম্পন্ন করেন সুকুমারী দত্ত। জন্মসূত্রে তিনি খ্রিস্টান পরিবারের কন্যা, কিন্তু ধর্ম বলতে বামপন্থী মানবতাবোধে বিশ্বাসী। প্রচণ্ড ভাললাগা ও কৌতূহল বশত তিনি স্নাতক স্তরে সংস্কৃত অনার্স নিয়ে পড়েন, আর শুধু সে-বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়াই নয়, গোটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত-সহ সমস্ত কলা বিভাগের মধ্যে প্রথম হওয়ার দরুন ঈশান স্কলারশিপের দাবিদার হন। কিন্তু, এই স্কলারশিপের এন্ডাওমেন্ট পলিসির অন্যতম শর্ত হল, প্রাপককে হিন্দু হতে হবে। এই শর্ত একান্ত ভাবে স্কলারশিপটির প্রদাতাদের আরোপিত, যা উল্লঙ্ঘনের অধিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। শুধু ধর্মের কারণে ন্যায্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়ে সুকুমারীর নিদারুণ ক্ষোভ জন্মায় এবং তিনি সংস্কৃতে স্নাতকোত্তর না পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতে স্নাতকোত্তর পড়তে তাঁকে কোনও বাধা দেয়নি, তবু রটে যায় যে, তিনি খ্রিস্টান ছিলেন বলে সংস্কৃতে এম.এ পড়তে পারেননি। জীবদ্দশায় এ ভাবেই ‘মিথ’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

সংস্কৃতের বদলে সুকুমারী ইংরেজিতে এম.এ পড়লেন এবং ভাল ফল করলেন। ইংরেজির অধ্যাপক অমলকুমার ভট্টাচার্যের সঙ্গে প্রণয়, পরিণয় এবং নিজেও ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। সেখানে দশ বছর অধ্যাপনা করাকালীনই ১৯৫৪ সালে অভিমান ভুলে সুকুমারী আবার আপন করে নিয়েছিলেন তাঁর প্রথম প্রেম সংস্কৃতকে, প্রাইভেটে এম.এ পরীক্ষা দিয়েও সে-বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলেন তিনি। ইংরেজি এবং সংস্কৃত এই দুটি ভাষা ও সাহিত্যেই প্রগাঢ় পণ্ডিত সুকুমারী ভট্টাচার্যকে ১৯৫৭ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য পড়ানোর জন্যে ডেকে নিলেন বুদ্ধদেব বসু। কয়েক বছর পর সুকুমারী চলে এলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই সংস্কৃত বিভাগে।

হিন্দু ধর্মে তথাকথিত উদারতা ও সহিষ্ণুতার আড়ালে, নারী ও শূদ্র, সমাজের এই দুই প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের প্রতি কী মাত্রায় বিদ্বেষমূলক বৈষম্য ও শোষণ করা হয়েছে সে-বিষয়ে প্রথম বার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা ‘প্রাচীন ভারত : সমাজ ও সাহিত্য’ (আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৮৮) নামে আনন্দ-পুরস্কারে ভূষিত গ্রন্থটির জন্য বাঙালি পাঠক তাঁকে মনে রাখবে। এটি বাংলা ভাষায় লেখা প্রতিবাদী সাহিত্যের একটি দিগ্‌দর্শী নিদর্শন। দীর্ঘ কাল ধরে প্রচলিত হিন্দু ধর্মের বহু বৈষম্যমূলক বিধি-বিধানকে ‘শাস্ত্রের’, বিশেষত ‘বেদের বিধান’ বলে বিনা প্রশ্নে মেনে আসা সমাজকে রীতিমতো ধাক্কা দিয়েছিল এই বইটি। বিদ্বৎ-সমাজে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা একটি ‘মিথ’— বৈদিক যুগে সব বিষয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ছিল— তার মূল ধরে নাড়া দিয়েছিল অধ্যাপক ভট্টাচার্যের লেখা এই গ্রন্থ। তাঁর মতে, ভারতের মাটিতে আর্যদের বসবাস সূচনার পর মোটামুটি দু-শতক পর্যন্ত নারী তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অধিকার আংশিক হলেও ভোগ করতে পেরেছিল, কিন্তু তার পর ক্রমশ সে তার সব অধিকার হারায়। নারীর অধিকারের এই ক্রমাবনতির কারণ হিসেবে পণ্ডিতেরা যুক্তি দেন, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে বহিঃশত্রুর ক্রমাগত আক্রমণে উত্তর ভারত বিপর্যস্ত হয় এবং সেই বিপদ থেকে রক্ষার জন্যই তৎকালীন স্মৃতি ও ধর্মশাস্ত্র নারীর স্বাতন্ত্র্য নিষিদ্ধ করে। এই ভ্রান্ত জ্ঞানের বিরুদ্ধে বাংলা সাহিত্যে প্রথম বলিষ্ঠ ও যুক্তিপূর্ণ কণ্ঠস্বর সুকুমারী ভট্টাচার্যের। তিনি প্রাচীনতর যুগের শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সমাজে নারী-পুরুষের কখনওই সমানাধিকার ছিল না, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের প্রাচীন নারীদের মতো আর্য নারীরাও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন সভ্যতার শুরু থেকেই, তার প্রধান কারণ শারীরিক শক্তিতে তাঁরা পুরুষের থেকে দুর্বল। এই অমানবিক মানসিকতাকে আড়াল করে প্রাচীন শাস্ত্রসমূহ যে ভাবে নারীর অধিকার খর্ব করেছে, তার স্বরূপ উন্মোচনই ছিল সুকুমারী ভট্টাচার্যের লক্ষ্য। তাই তিনি বৈদিক সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন ধর্মের নামে দ্বিচারিতার আদি উৎসগুলোকে।

মার্ক্সবাদী সুকুমারীর এই সব গবেষণালব্ধ তথ্য সনাতনপন্থীদের কাছে প্রখর বিদ্বেষ ও বিদ্রুপের বিষয় হয়ে ওঠে। তীব্র প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে তাঁর সত্যোদ্ঘাটনের জেদ আরও বেড়ে যায় এবং ক্রমশ তাঁর শাণিত কলমে প্রকাশিত হয় আরও কিছু মূল্যবান প্রবন্ধের গ্রন্থ, যেগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘বেদের যুগে ক্ষুধা ও খাদ্য’ (১৯৯৮), ‘বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য’ (২০০০) এ ছাড়াও ইংরেজিতে ‘উইমেন অ্যান্ড সোসাইটি ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (১৯৯৪), ‘ফেটালিজ়ম ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (১৯৯৫)।

প্রকৃত গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত সংস্কারমুক্ত, নিরপেক্ষ এবং নৈর্ব্যক্তিক, এটি সুকুমারী ভট্টাচার্য বার বার তাঁর ছাত্রছাত্রীদের শেখালেও তাঁর নিজের লেখায় এই নিরপেক্ষতা এবং নৈর্ব্যক্তিকতা সব সময় রক্ষিত হয়নি বলে মত পোষণ করেন বহু সুধীজন, যাঁরা নিজেরাও সংস্কারমুক্ত, নিরপেক্ষ গবেষণার সমর্থক। তাই অভিযোগ ওঠে, যে-সব বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে অধ্যাপক ভট্টাচার্য প্রাচীন ভারতকে নারীবিদ্বেষী বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকগুলোই প্রসঙ্গরহিত ভাবে বিশেষ উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন তাঁর প্রথমোক্ত গ্রন্থটিতে “বৈদিক সমাজে নারীর স্থান” প্রবন্ধে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের একটি মন্ত্রাংশের (৬.৩.৭.১৩) তিনি অর্থ করেছেন ‘কন্যা অভিশাপ’ (পৃ : ৩৮), এখানে সম্পূর্ণ মন্ত্রটিতে জায়াকে সখা মানে বন্ধু বলা হয়েছে, পুত্রকে বলা হয়েছে পরমাকাশের জ্যোতি আর কন্যার প্রতি প্রযুক্ত হয়েছে ‘কৃপণ’ এই বিশেষণটি, যার অর্থ সুকুমারী ভট্টাচার্য করেছেন ‘অভিশাপ’, প্রাচীন ব্যাখ্যাকার নিরুক্ত-গ্রন্থের প্রণেতা যাস্ক এই শব্দটির অর্থ করেছেন ‘কষ্টের কারণ’, বিবাহের পরে কন্যা মা-বাবাকে ছেড়ে চলে যায়, তাই সে তাঁদের কষ্টের কারণ এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে। যে-মন্ত্রে জায়াকে বন্ধু বলা হয়েছে, সেখানেই এক নিঃশ্বাসে কন্যাকে কী করে অভিশাপ বলা হল, তার যুক্তিগ্রাহ্যতা প্রশ্নাতীত নয়, তা-সত্ত্বেও সুকুমারী ভট্টাচার্যের ‘কৃপণ’ শব্দটির সটান ‘অভিশাপ’ অনুবাদ নিরপেক্ষ গবেষকদের মনেও অনুবাদকের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় জাগায়। একই ভাবে উল্লেখ করা যায়, তাঁর ওই গ্রন্থেরই ‘নারীর স্থান— রামায়ণে ও মহাভারতে’ প্রবন্ধটির, যেখানে ব্রাহ্মণ গালবের গুরুদক্ষিণা মেটানোর জন্যে যযাতিকন্যা মাধবীর চারটি পুরুষের কাছে আত্মবিক্রয়ের মর্মান্তিক কাহিনি উল্লেখ করে প্রবন্ধকার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, ‘এসবের পশ্চাতে সমাজমানসে যে বোধটি সক্রিয় ছিল তা হল: নারী ব্যক্তি নয়, বস্তু এবং ভোগ্যবস্তু।’ (পৃ. ১১৮) অথচ, কী প্রসঙ্গে মহাভারতকার এই কাহিনির অবতারণা করেছেন তা তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন! মহাভারত (৫.১১৮-২২) অংশে কোনও বিষয়ে অহেতুক জেদাজেদি করলে কী অনর্থ ঘটতে পারে তার উদাহরণ হিসেবেই গালব ও মাধবীর কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। শিক্ষান্তে গালব তাঁর গুরু বিশ্বামিত্রকে গুরুদক্ষিণা দিতে চান। গুরু কোনও রকম দক্ষিণাই নিতে চাইলেন না, কিন্তু গালবের জেদ চেপে গেল গুরুকে দক্ষিণা দিতেই হবে। তাঁর ক্রমাগত পীড়াপীড়িতে বিরক্ত হয়ে বিশ্বামিত্র এমন মহার্ঘ দক্ষিণা চেয়ে বসলেন যে, তা দেওয়ার সামর্থ্য গালবের ছিল না। তিনি বিপত্তি এড়াতে রাজা যযাতির দ্বারস্থ হন, কারণ তখন প্রথা ছিল যে ব্রহ্মচারীর গুরুদক্ষিণা দেবার সাধ্য না থাকলে দেশের রাজার কর্তব্য তাঁকে আর্থিক সাহায্য করা। তখন যযাতিও অর্থসঙ্কটে ছিলেন, তিনি অর্থের পরিবর্তে তাঁর মেয়ে মাধবীকে ভাড়া খাটিয়ে সেই দক্ষিণা জোগাড়ের জন্য গালবকে অনুমতি দিলেন। এখানে স্পষ্ট যে, নারী পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা সত্ত্বেও এটি যে অনর্থ ও অনভিপ্রেত, তা কিন্তু কাহিনির শুরুতেই মহাভারতকার বলে দিয়েছেন। এই তথ্যটিকে উপেক্ষা করা নিরপেক্ষ গবেষকের কর্তব্য নয়। গবেষক সুকুমারী ভট্টাচার্য বিশ্বের দরবারে পরিচিত তাঁর ‘দ্য ইন্ডিয়ান থিয়োগনি’ বইটির জন্যে। ভারতের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এই ত্রিদেব তত্ত্বের বৈদিক উৎস ও পৌরাণিক বিবর্তন নিয়ে তিনি ১৯৬৪ সালে পিএইচডি-র জন্য গবেষণা করেন। তার বছর দুয়েকের মধ্যে কেমব্রিজের ক্লেয়ার হল থেকে ১৯৬৬-৬৭, এই এক বছরের জন্যে একটি ফেলোশিপ পান। এই সময়ে সারা পৃথিবীর পৌরাণিক তত্ত্বের সঙ্গে ভারতীয় পৌরাণিক তত্ত্বের তুলনামূলক গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। মেধা, মনন ও শ্রমের অত্যুৎকৃষ্ট ফসল তাঁর ‘দ্য ইন্ডিয়ান থিয়োগনি’ ১৯৭০ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং এইটিই সুকুমারী ভট্টাচার্যের ম্যাগনাম ওপাস। এ ছাড়াও তাঁর বিশেষ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ দুটি খণ্ডে প্রকাশিত ‘লিটরেচার ইন বেদিক এজ’। বেদ-গবেষণায় যে মাত্রা সুকুমারী এনে দিয়েছেন, তা ভারতীয় গবেষণার পরিসরে নিঃসংশয়ে অনন্য এবং অভিনব। তাঁর পদ্ধতি ভারতীয় বেদ-পড়া মানুষদের উদ্বুদ্ধ করেছিল সুপ্রাচীন এই গ্রন্থকে আধুনিক এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে পড়তে।

মেয়েদের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সমতার প্রত্যাশী সুকুমারী ভট্টাচার্য শুধু প্রবন্ধ ও বৌদ্ধিক আলোচনাতেই নয়, নিজেকে প্রসারিত করে দিয়েছিলেন বাস্তব জগতেও। ১৯৮২ সালে সুকুমারী ভট্টাচার্যকে সভানেত্রী করে প্রয়াত যশোধরা বাগচী ‘সচেতনা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যেখানে অনেক নিপীড়িত মেয়েকে আত্মনির্ভর ও আত্মসচেতন হতে সাহায্য করা হত।

সুকুমারী ভট্টাচার্য আজীবন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত থেকেও ২০০৯ সালের নন্দীগ্রামের ঘটনায় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। এর জেরে পার্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি পার্টির তরফ থেকে আসা সাহায্য ফিরিয়ে দেন। ভাবলে অবাক হতে হয়, কতখানি মানসিক দৃঢ়তা থাকলে সম্পূর্ণ একা, প্রায় শয্যাশায়ী নবতিপর এক বৃদ্ধা এমন আপসহীনতার সাহস দেখাতে পারেন!

সুকুমারী ভট্টাচার্য যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, সেই একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-এর। মুসলমান বলে শহীদুল্লাহ্‌কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত পড়াতে রাজি হননি পন্ডিত সত্যব্রত সামশ্রমী। আর সুকুমারী ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারের মেয়ে, সে কেন সংস্কৃত পড়বে? ভাবখানা এই, সংস্কৃত যেন নানা স্রোতে-উপস্রোতে গড়ে ওঠা ভারতীয় জীবনের অঙ্গ নয়, তা কেবল ‘আদি হিন্দুদের ভাষা’। অর্বাচীন মুসলমান আর খ্রিস্টানদের সে ভাষা পড়ার কোনও ‘অধিকার’ নেই। অনধিকারী সংস্কারহীনদের হাতে পড়লে ‘সংস্কৃত’-এর বিশুদ্ধি বিনষ্ট হবে। তাই পড়তে দিয়ো না, ঢুকতে দিয়ো না ‘দেবভাষার দেবালয়ে’, বাদ দাও, বহিরাগত হিসেবে দাগিয়ে রাখ।

এই যে বাদ দেওয়ার প্রকল্প, তার নানা কৌশল। প্রাচীন ভারতকে সব পেয়েছির দেশ বলে, নির্ভেজাল পুণ্যভূমি বলে তুলে ধরতে চাইতেন যে সংকীর্ণ হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা, তাঁরা আসলে পুরনো ভারতের নানা জটিল খাঁজখোঁজকে বাদ দিতেন। পুরনো ভারতের ছবিটি তাতে বেশ গৌরবময় হয়ে উঠত। সুকুমারী সেই ছবিটি ভেঙেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাখ্যান হয়তো শাপে বর হয়েছিল। সংস্কৃত পড়তে না পেয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে এম.এ পাশ করেন সুকুমারী। কিন্তু সংস্কৃতের পিছু ছাড়েননি। প্রাইভেটে সংস্কৃতে এম.এ পাশ করলেন। ঢুকলেন শাস্ত্র, কাব্য, পুরাণের অন্দরে। পুরনো ভারতের নামে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা যে গৌরবময় একমেটে ছবিটি তুলে ধরতেন, তার বিরুদ্ধে কলম ধরলেন।

‘মা’ কেমন ছিলেন? সুকুমারীর যুক্তি, তথ্য দিয়ে সাজানো নিবন্ধগুলি প্রমাণ করছে ভাল ছিলেন না ‘বহু অনুসন্ধানেও নারী-কে সেকালের সমাজে সম্মানের আসনে দেখতে পাইনি। অশিক্ষার অন্ধকারে নির্বাসিত, স্বাধীন অর্থকরী বৃত্তি থেকে বঞ্চিত নারী,’ লিখেছিলেন সুকুমারী। তাঁর পাঠ এক দিক থেকে বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া, কিন্তু লক্ষ করা যায়, অ্যান্টিথিসিস তৈরির ঝোঁকে মনের জানলাকে বন্ধ করছেন না। ‘এগুলিতে কোনো বিষয় সম্পর্কেই শেষ কথা বলার ধৃষ্টতা নেই; চিন্তার একটি স্তরই বিধৃত আছে এগুলিতে; চিন্তা চলছে এখনো।’ দামি কথা। এই কথাটার দাম না বুঝলে কী হয়, পশ্চিমবঙ্গবাসী দেখেছেন। এক সময় দেওয়াল লিখনে মার্ক্সবাদকে অপরিবর্তনশীল বিজ্ঞান হিসেবে দাগানো হত, ‘চিন্তা চলছে এখনো’ মানুষদের প্রতিক্রিয়াশীল বলে বাদ দিয়ে দিতেন আগমার্কা বাম শিবির। তার ফল যে কী ভয়ংকর আত্মঘাতী হতে পারে, সেটা এখন তাঁরাই হয়তো সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন। পুরনো ভারতকে একমাত্রিক ভাবে আধ্যাত্মিক ভাববাদের গর্ভধারিণী বলার মধ্যে যে গোঁড়ামি আছে, বস্তুবাদ ও যুক্তির নামে সাধারণ ভারতবাসীর ধর্ম-সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার মধ্যেও সেই একই গোঁড়ামি আছে।

সুকুমারী কিন্তু তাঁর লেখায় যতটা পারতেন স-তথ্য পুরো ছবিটি দেওয়ার চেষ্টা করতেন। যেমন, রামায়ণ। এই মহাকাব্য এক দিনে গড়ে ওঠেনি। এর মধ্যে সময়ের নানা স্তর মিশে আছে। সীতা চরিত্রের সূত্রে তিনি বিষয়টি ব্যক্ত করেছিলেন। সীতা ‘ভারতীয় সতীত্ব’-এর আদর্শ, হিন্দুত্ববাদীর কাছে পাতিব্রত্যের আলোকোজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। সুকুমারী রামায়ণের নির্দিষ্ট শ্লোক তুলে দেখিয়েছিলেন, ‘পতিই একমাত্র গতি’ এই পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য মোটেই সীতা রামের সঙ্গে বনে যাননি, রামের বিরহ তাঁর অসহ হবে বলে ভালবেসে বনে গিয়েছিলেন। সীতার বনযাত্রার কারণ পাতিব্রত্যের সামাজিকতা নয়, ভালবাসার ব্যক্তিগত উপলব্ধি। এই সীতাই তাই পরে রাবণ-সংসর্গের জন্য প্রশ্নের সম্মুখীন হলে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমার নিজের আয়ত্তে আমার যে মন তা তো তোমাতেই আছে, আমার যে শরীরটা পরাধীন সেটার সম্বন্ধে অক্ষম আমি কী করব।’ প্রশ্নটা আমাদের ভাবায়। পতিব্রতা হলে যে চুপ করে থাকতে হয়, বর পেটালেও মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়, হিন্দু পাতিব্রত্যের এই বিচিত্র আদর্শকে মান্য করার আদেশ দেয় বর্ণহিন্দু সমাজে প্রচলিত পুরুষতন্ত্র। এমনকী কোনও কোনও সংঘের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট একই কথা বলতে চায়। সরব সীতা এর বিরোধী, প্রতিবাদী। এ প্রসঙ্গে মনে পড়বে, শারীরিক সতীত্ব রক্ষার নামে ভারতে মেয়েদের আত্মাহুতি দিতে বলা হত। এখনও মেয়েরা ধর্ষিতা হলে সমাজ ও পরিবার শারীরিক শুচিতা অশুচিতার প্রশ্নে মেয়েদের নাকাল করে। সুকুমারীর উদ্ধার করা শ্লোকটি কিন্তু এই সব কৌশলের মূলে আঘাত করছে। পুরুষরা এসে শরীর দখল করবে বলে কেন মরতে হবে মেয়েদের? সতীত্ব প্রমাণের জন্য কেন অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে? ২০০৩ সালে পাকিস্তানের ইসলামিকরণের বিরুদ্ধে সাবিহা সুমার নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র ‘খামোশ পানি’। দেশভাগ হয়েছে। পঞ্জাবের গ্রাম। একাংশ পাকিস্তানের। পুরুষেরা গ্রাম ছাড়ছে। সতীত্ব বাঁচাতে মেয়েদের আত্মহত্যা করতে হচ্ছে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে। একটি মেয়ে করেনি। ‘আমার যে শরীরটা পরাধীন সেটা সম্বন্ধে অক্ষম আমি কি করব’ এ প্রশ্ন তার মনেও উঠেছিল। তাই সে আত্মহত্যা না করে পালায়, ‘জীবনের অধিকার’ বজায় রাখে। মেয়েদের শরীর-সম্বন্ধীয় এই প্রশ্নটি অমোঘ এবং নির্দিষ্ট কালের সীমা ছাড়িয়ে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে উদ্যত।

সুকুমারীর মতে, প্রাচীন ভারতে গণিকারা শিক্ষা পেতেন, স্বাধীনতাও ছিল তাঁদের। শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’ নাটকের অনুবাদ করেছিলেন সুকুমারী। সুখপাঠ্য সেই অনুবাদে বসন্তসেনার মতো সু-মনা গণিকার সঙ্গে পরিচিত হন বাঙালি পাঠক। অর্থের প্রতি আকর্ষণ ছিল না স্বাধিকারসচেতন এই রমণীর। প্রেমিক চারুদত্তকে অর্থনৈতিক সংকটের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। আবার লক্ষ করতে হবে, নরনারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমাজের বাস্তব প্রেক্ষিতে ‘বিবাহ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি যে গুরুত্বপূর্ণ, সুকুমারী সে কথা অস্বীকার করেননি। তাঁর নারীবাদ দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিল না।

প্রাচীন ভারতের নামী-দামি মুনি-ঋষিদের শ্রেণিস্বার্থের প্রশ্ন ও প্রসঙ্গগুলি উত্থাপন করতেও সুকুমারী দ্বিধা করেননি। জন্মান্তরবাদের প্রবক্তা যাজ্ঞবল্ক্য যে ধ্বনিক, ঋত্বিক ও দার্শনিক এই তিনের স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন, তা জানিয়েছিলেন। এই ধরনের লেখালিখিতে এমন সব প্রসঙ্গ তিনি উত্থাপন করতেন, যেগুলি প্রাত্যহিক ও জরুরি। প্রাচীন ভারতের নিয়তিবাদ নিয়ে দর্শনগ্রন্থ লিখেছিলেন, ক্ষুধার প্রসঙ্গও এড়িয়ে যাননি। দর্শন জীবন থেকে আলাদা নয়, দেশকালের সমাজ ও অর্থনীতির কথা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। যুক্তি, তর্ক, আলোচনা, সমালোচনার জবাব দিয়ে তিনি তাঁর মতামতকে যুক্তিগ্রাহ্য  করে তুলে ইংরেজি, বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠত করেছেন।

মনোজিৎকুমার দাস, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev