যেখানে শোনা যেত সুফি সন্তদের শান্তির বাণী, কাওয়ালির সুর ভেসে আসতো বাতাসে, সেই খোরাসানেই আজ বন্দুক কামানের গর্জন। ইসলামিক স্টেট অফ খোরাসান প্রভিন্স, মিডিয়াতে যা আইএসকেপি নামে পরিচিত তার উৎপত্তি সেখান থেকেই। ইতিহাসের এ এক পরম কৌতুক। যাকগে এবার কাজের কথায় আসি। কাবুল বিমানবন্দরে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর আইএসকেপি জানিয়েছে কাজটা তাদের। মতলব পরিস্কার, এর মধ্যে দিয়ে তারা জানালো তালিবানরা নয়, এই ভূখণ্ডে তারাই আসল মার্কিন বিরোধী শক্তি। অনেকে বলছেন এই ঘটনা আইএসকেপি প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর আল বাগদাদির হত্যার বদলা। এর পাশাপাশি আরেকটা তত্ত্ব বাতাসে ভাসছে তা হল, একাজ আমেরিকার। এই ঘটনার বদলা নেওয়ার সূত্রেই আমেরিকা আবার আফগান মুলুকে ঢুকে পড়বে। হামলাবাজদের খোঁজার নামে হস্তক্ষেপ করবে সে দেশের রাজনীতিতে।

কেউ কেউ এমনটাও বলছেন, এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে তালিবান এবং আমেরিকা আরও কাছে আসবে। আমেরিকার সঙ্গে তালিবানদের দোস্তি দেখে অন্য দেশগুলিও আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দেবে। কথাটা অদ্ভুত শোনালেও এই মুলুকের ভূ-রাজনীতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো আমেরিকার কাছে তালিবানদের থেকে বড় শত্রু হল আইএসকেপি। এই সংগঠনের কাজকারবার সম্পর্কে যারা কিঞ্চিৎ খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন, আইএসকেপি তালিবানদের থেকেও ভয়ঙ্কর শক্তি। তাদেরকে তালিবানরাও ভয় পায়। আবু বকর আল বাগদাদিকে তালিবানরা আফগানিস্তানে জিহাদি নিয়োগ বন্ধ করতে বলেছিল, কিন্তু তিনি তা শোনেননি। তৎকালীন তালিবান প্রধান মোল্লা আখতার মনসুর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন আফগানিস্তানে একটা নিশান, একটা নেতৃত্ব থাকবে। আইএসকেপি তা পত্রপাঠ খারিজ করে দেয়। কাবুল বিমানবন্দরে নিরস্ত্র মানুষদের নারকীয় হত্যার মাধ্যমে আইএসকেপি যেন জানিয়ে দিল, তাদের শক্তিকে ছোট করে দেখলে চলবে না।
ইতিহাস কখনও কখনও একই গলায় কথা বলে। একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখবো ৯/১১ হামলার পর বুশ বলেছিলেন, যারা একাজ করেছে তাদের আমরা খুঁজে বার করে শাস্তি দেবো। এখন তো ঠিক একই কথা বলছেন, বাইডেন। ৯/১১ থেকে ৮/২৬, আমেরিকা আছে আমেরিকাতেই। বরং বাইডেন আরও কড়া। ট্রাম্প শেষদিকে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে আলোচনা চেয়েছিলেন। বাইডেন এখন সেই কারণে তাকে দুষছেন। কাবুল বিমানবন্দরে হামলার পর আমেরিকা এবং তালিবানদের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়ে গেছে। কারণ চুক্তির পর এই প্রথম আফগানিস্তানে ১৩ জন মার্কিন নাগরিক হত্যার ঘটনা ঘটলো। তালিবানদের দাবি, তারা এই ঘটনা ঘটায়নি। সত্য যাইহোক, এ ঘটনার দায় তাদের নিতেই হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএসকেপি এভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারলো। এক, তারা নিজেদের শক্তির জানান দিল। দুই, আমেরিকার সঙ্গে তালিবানদের সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিল। এরফলে তালিবানদের সমস্যা বাড়বে।

আফগানিস্তানে আইএসকেপি এখন আরও সংহত। দক্ষিণ-পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ায় তাদের নেটওয়ার্ক বেশ শক্তিশালী। তাদের নীতিই হল, মূল জেহাদি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করা। লস্কর-এ-তইবা, জামাত-উদ-দাওয়া, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এবং ইসলামিক মুভমেন্ট অফ উজবেকিস্তান এর সদস্যদের সদস্যদের অনেকেই এখন আইএসকেপিতে যোগ দিয়েছে। তালিবানরা মূলত একটা জাতীয়তাবাদী ইসলামিক শক্তি, যাদের পিছনে আছে পাকিস্তান। অন্যদিকে আইএসকেপি কোন সীমান্ত মানেনা। তারা বিশ্ব জুড়ে ইসলামিক খিলাফৎ প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এককথায় তাদের অ্যাজেন্ডা আরও গ্লোবাল। বোঝাই যাচ্ছে আফগানিস্তান আবার বেশ কিছুদিন একটা রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাবে। কাওয়ালির বদলে সেখানে শোনা যাবে কামানের গর্জন।
এক ধরনের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। সে যে নামেই হোক না কেন।