একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিপিএম নেতা মানিক সরকার ত্রিপুরার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাংলার মানুষের কাছে বিজেপির ফাঁদে পা না দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মানিকবাবুর নামোল্লেখ করেই তাঁর ওই কথা নিজের প্রচারে ব্যবহার করেছিলেন।
বাংলা জয়ের পর ত্রিপুরাকে পাখির চোখ করেছে তৃণমূল। ত্রিপুরায় সংগঠন বাড়াতে তৃণমূল মরিয়া হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের নেতা কর্মীরা ঘনঘন ত্রিপুরায় পা রাখছেন। কিন্তু প্রতিবারই তারা বিজেপির বাধার মুখে পড়ছেন। একেবারে গোড়ায় ভোট-কুশলী প্রশান্ত কিশোরের সংস্থার সদস্যদের ত্রিপুরার পুলিশ হেনস্তা করে। তাদেরকে আটক করার ঘটনায় প্রতিবাদ করেছিলেন মানিকবাবু। ত্রিপুরায় প্রতিটি পদক্ষেপেই তৃণমূলের পাশে দাঁড়াতে দেখা গিয়েছে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিপিএম নেতা মানিক সরকারকে। তৃণমূলের উপর যতবার বিজেপি হামলা করেছে মানিকবাবু তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়ে বিজেপির নিন্দা করেছেন। এমনকি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভার অনুমতি না দেওয়ার জন্যও।
মানিকবাবু দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করেও বলেন, বিজেপি বামেদের উপর হামলা দিয়ে শুরু করেছিল, এখন কংগ্রেস ও তৃণমূলের উপরও হামলা শুরু করেছে। তৃণমূল ত্রিপুরার মাটিতে পা দেওয়ার পর যতবার অত্যাচারিত হয়েছে, ততবারই সিপিএম নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির সমালোচনা করেছে। কেবল তাই নয়, সীতারাম ইয়েচুরিকে পাশে বসিয়েও মানিক সরকার তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেছেন। যার ফলে ত্রিপুরায় জল্পনা শুরু হয়েছিল, সিপিএম ও তৃণমূল একজোট হয়ে বিজেপির মোকাবিলায় নামতে পারে। রাজনৈতিক মহলও অনুমান করেছিল মানিক সরকারের এই সমর্থন একজোট হয়ে বিজেপিকে রোখার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে।
তবে ত্রিপুরার বর্তমান বিরোধী দলনেতা সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক গৌতম দাশ আগেই জানিয়েছিলেন, ‘জোটের প্রশ্ন এখন আসছে কেন? তৃণমূল তো ত্রিপুরায় বলার মতো কিছু করেনি এখনও। এদিকে সিপিএম দলের সম্মেলন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার দিকেই এখন নজর দিচ্ছি।’ পাশাপাশি সিপিএমের একাংশের বক্তব্য ছিল, শাসক বিজেপির বিক্ষুব্ধ একটা অংশ তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তৃণমূল-যোগে যাঁদের কথা শোনা যাচ্ছে, তাঁরা সকলেই ত্রিপুরার রাজনীতিতে বহু পরীক্ষিত। তবে বিজেপি-বিরোধী ভোটে তৃণমূল উল্লেখযোগ্য ভাবে ভাগ বসানোর জায়গায় গেলে তা সিপিএমের চিন্তার কারণ হতে পারে। সরকারে থাকার সময়ে বাম-বিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার সুবিধা পেত সিপিএম। এখন শাসক বিজেপির আমলে সেই অঙ্কই উল্টো দিকে কাজ করতে উত্তর-পূর্বের ওই রাজ্যে গিয়ে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করে এসেছেন, সেখানে ‘মা-মাটি-মানুষের খেলা শুরু’ হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আগামী বিধানসভা ভোটের আগে সে রাজ্যে বিজেপির মোকাবিলায় তৃণমূলের সঙ্গে বামেদের জোটের ভাবনা সরাসরি খারিজ করে দেন নি ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং সিপিএমের পলিটবুরো সদস্য মানিক সরকার। তাঁর বক্তব্যের জেরেই জিইয়ে ছিল নতুন সমীকরণের জল্পনা।
মঙ্গলবার সীতারাম ইয়েচুরিকে পাশে বসিয়ে মানিক সরকার তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেন। তিনি বলেন, তৃণমূল এই রাজ্যে এসে নিজেদের সংগঠন বাড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের উপর হামলা হচ্ছে। ত্রিপুরা সিপিএম তার প্রতিবাদ করছে। মানিকবাবু বলেন, এটাই ত্রিপুরার সংস্কৃতি। এটা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের সহবৎ। অন্যান্য দলের সঙ্গে সিপিএম বা বামেদের এটাই পার্থক্য। একজন অত্যাচারিত হচ্ছে দেখে প্রতিবাদ করব না, তা হয় নাকি। মানিক সরকার আরও বলেন, বিজেপির সরকার তৃণমূল নেতাদের উপর হামলা করায় আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, একাট রাজনৈতিক দলের সংগঠন বিস্তারের অধিকার আছে। কিন্তু তা বলে হামলা হবে তাদের উপর, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। সেই জায়গা থেকেই আমরা প্রতিবাদ করেছি। এর পরেই বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলের দিকে সমর্থনের হাত বাড়াতে পারে সিপিএম, এমন জল্পনা শুরু হয়েছিল ত্রিপুরায়। তারপরও সেই সম্ভাবনা আরও দৃঢ় হয়।
মানিক সরকার এর পরে বলেন, ত্রিপুরার মানুষ ভুল বুঝতে পেরেছেন। তারা এখন পরিবর্তন চাইছেন। তাঁরা কাকে বেছে নেবেন তা তাদের ব্যাপার। আমরা রাজনৈতিক দল হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করছি। তৃণমূল আমাদের কাছে ফ্যাক্টর নয়। তৃণমূল তৃণমূলের মতো কাজ করছে। মানুষ যাঁকে বেছে নেবেন, সেই রাজনৈতিক দলই সরকার গড়বেন। তবে তৃণমূলের সঙ্গে জোট এই প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার মানে এই নয় যে আমরা তৃণমূলকে সমর্থন করছি। মানিক সরকার এই কথা বলার পর তৃণমূল-সিপিএম জোট সম্ভাবনা যে ধাক্কা খেল সে কথা বলাই বাহুল্য। কারণ সামান্য দেরিতে হলেও তৃণমূলকে নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করল ত্রিপুরা সিপিএম। ত্রিপুরারা সংস্কৃতির কথা তুলে ধরে ত্রিপুরা সিপিএমের অন্যতম মুখ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার জানিয়ে দিলেন, তৃণমূলের সঙ্গে জোট গড়ার কোনও প্রশ্নই নেই। আমরা এতদিন অত্যাচারিত হয়ে এসেছি, বাইরে থেকে একটা দল এসে অত্যাচারিত হচ্ছে, তাই আমরা অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তার মানে এই নয়, আমরা তৃণমূলের সঙ্গে জোট করতে চলেছি।