সম্প্রতি কেরালার রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খানের পণপ্রথা বিষয়ে বিতর্কিত প্রস্তাব নিয়ে চর্চার অবকাশ তৈরি হয়েছে। এমনিতে পণপ্রথার বহুরূপী চেহারা গণমাধ্যমের দৌলতে একুশ শতকেও প্রবহমানই নয়, প্রকাশমুখরও। স্বাভাবিক ভাবেই যা আধুনিক শিক্ষার প্রগতিশীল চেতনাতেও সমাজমানসের অভিশাপ হয়ে রয়েছে,তা দূর করার জন্য শেষে আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তাব অপ্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার সোপানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেবিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা যেতেই পারে। যেখানে অপরাধবোধ তীব্র হয়ে ওঠে,সেখানে তার প্রতিবিধানে আইন জরুরি মনে হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৬১-এর আইন অনুযায়ী পণপ্রথা সামাজিক অপরাধ। অথচ তা আজও বহালতবিয়তে চলছে। সেক্ষেত্রে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পণ দেওয়া এবং নেওয়া থেকে বিরত থাকার মুচলেকা নিয়ে রাজ্যপালের প্রস্তাবে অসঙ্গতি থাকলেও তাঁর উদ্দেশ্য যে মহৎ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিকে আইন করে সুফল মেলে, তার দৃষ্টান্তও কম নেই। ধূমপান আইন করে অনেকটাই কমেছে। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ragging-এর বিরুদ্ধে আইনও সফল হয়েছে। কিন্তু পণপ্রথা শুধু আইনেই নেই, আছে সংস্কার আর পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ববোধে। আইন করে বন্ধ করলেই তা নির্মূল হবেই, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। আর পণ তো শুধু টাকাপয়সা, ধনদৌলত নয়, অন্ধ আনুগত্যও। এজন্য পণ না পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেনাপাওনা’র নিরুপমার করুণ পরিণতি, পণ পেয়েও তাঁর ‘হৈমন্তী’র হৈমন্তীর দুর্বিষহ জীবন।
সে প্রথায় ছেলে বা ছেলের বাবাই নয়,তার মাও কম যায় না। শুধু তাই নয়, বাড়িতে একাধিক নারী থাকা সত্ত্বেও একজন নবাগত নারীরকেই শিকার হতে হয়। সেখানে অবস্থানভেদে শোষিতই শোষণ করে,শাসিতই শাসন চালায়। আসলে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর প্রতি হেয় মানসিকতাই তাকে অবমূল্যায়নের শিকার করে তোলে। সেই মূল্য উসুলে শুধু পণ নয়, দাসত্বের জীবনপণের প্রত্যাশাও জেগে থাকে। একারণে সতীদাহ প্রথা উঠে গেলেও অমানবিক নির্যাতনে তার রেশ বহমান একালেও। শুধু তাই নয়, বিধবা বিবাহেও আমাদের মন ওঠে না। অথচ বিপত্নীকের বিবাহে আমাদের অধীর আগ্রহ। যোগ্য বরের সুযোগ্যা কন্যার দাম্পত্যেও অসুখী জীবন লক্ষ করা যায়। সেখানে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ববোধ সংস্কারকেই সচল করে রেখেছে।
অন্যদিকে নারী-পুরুষের বৈষম্যবোধ যেমন পণপ্রথাকে উজ্জীবিত করে রেখেছে, তেমনই তার প্রতিক্রিয়ায় সময়বিশেষে বিকারও উঠে এসেছে। সেখানে নারীদের কাছে পুরুষও শিকার হয়ে ওঠে। সাম্যতা প্রতিষ্ঠায় প্রতিশোধের বিকার নেমে আসে, মর্যাদার অধিকারে আনুগত্যের দ্বন্দ্বও উপস্থিত হয়। সেদিক থেকে পণপ্রথা শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, পুরুষের জীবনেও অভিশাপ মনে হয়। সেখানে পণপ্রথা পণ নিয়ে শুরু হলেও জীবনপণ হয়ে ওঠে। যৌবনে সেই নতুন জীবনে চলার পথের নিজের ভূমিকাটি সম্পর্কে আত্মসচেতনতাও জরুরি। যা সাধারণ ভাষায় সহজবোধ্য হয় না, তাই আইনের ভাষায় বোধগম্য মনে হয়। সেদিক থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সেই বৈষম্যমূলক মূল্যবোধের সংস্কারমুখী শিক্ষার শুভ সূচনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। তাতে সমস্যা নির্মূল না হলেও কাণ্ডজ্ঞান জেগে উঠবে। প্রাত্যহিক জীবনে জ্ঞানের চেয়ে কাণ্ডজ্ঞানই বেশি জরুরি। সংস্কারের মূলেও সেই কাণ্ডজ্ঞানের অভাব। সেই অভাববোধ যত দূর হবে, আমজনতার মধ্যে পণ না নেওয়ার পণ ততই ছড়িয়ে পড়বে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
পণপ্রথায় নারী পুরুষ দুই পক্ষই সমান দায়ী।বিবাহের সময় সুন্দরী মেয়েদের চাহিদা বেশি।গায়ের রঙ চাপার কারণে বহু মেয়ের বিবাহে বাধা হয়।তখন অর্থের বিনিময়ে সেই কালোমেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেয় পিতামাতা।নারী পুরুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য এক্ষেত্রে দায়ী।নারী যদি আর্থিক দিক দিয়ে সাবলম্বী হয় তাহলে পণপ্রথা দূর হতে পারে। প্রকৃত শিক্ষা ও নারীর আর্থিক সাবলম্বনেই পারে এই পথাকে দূর কযতে।