আমরা কেউই বাজে জিনিস চাই না, বাজে ছেলে বললে আমাদের মন খারাপ হয়, বাজে জিনিস জানলে সেটা কিনি না। সাধ করে বাজে মাল ঘরে তুললে তাকে বোকা বলে সবাই। কিন্তু মহামহিম কেন্দ্রীয় শাসকরা অন্যরকম ভাবেন। তাঁরা তাই তৈরি করে ফেললেন বাজে বা ইংরেজিতে ব্যাড ব্যাঙ্ক, যার পোশাকি নাম ন্যাশনাল অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড বা এনএআরসিএল। পাশাপাশি বানানো হবে আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি, যার নাম ইন্ডিয়া ডেট রেজলিউশন কোম্পানি বা আইডিআরসি। ব্যাপারটি কী এবং কেন, একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
জল্পনা চলছিল অনেকদিন ধরেই। বাজেটেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। এবার খুব একটা হইচই না করেই সহসা ঘোষণা করে দেওয়া হলে। সর্বভারতীয় খবরের কাগজগুলিও ব্যাপারটি নিয়ে তেমন শোরগোল তুলল না। টাইমস অফ ইন্ডিয়া কাগজে ২১ নম্বর পাতায় সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট, দ্য ইকনমিক টাইমস প্রথম পাতায় নিলেও ছোট্ট একটা প্রতিবেদন। তুলনায় বাংলা কাগজে একটু বেশি জায়গা পেয়েছে খবরটি, আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রথম পাতায় শুরু হয়ে ভিতরের পাতায় শেষ হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে একটু রাখঢাক করেই খবরটা কেন যে পরিবেশিত হলো, সেটা একটা রহস্য, বিশেষ করে যখন এমন একটা ঘটনা এ দেশে আগে কখনো হয়নি।
ন্যাশনাল অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড বা এনএআরসিএল
এটা একটা এমন কোম্পানি, যার ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকবে রাষ্টায়াত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে। বা বলা যেতে পারে এনএআরসিএল একটি আধা-সরকারি সংস্থা। কী কাজ করবে এই এনএআরসিএল বা ব্যাড ব্যাঙ্ক? তার আগে ভারতে ব্যাঙ্কগুলির বর্তমান অবস্থা একটু আলোচনায় আনা দরকার। ভারতে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি চলছে আজ তিন দশক হয়ে গেল। এই অর্থনীতির মূল কথা কী? সেটা হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বদলে বেসরকারি সংস্থায় জোর, যতটা পারা যায় সরকারি সংস্থাগুলি বেচে দেওয়া, সম্ভব হলে জলের দরে। আগে কোনো কোম্পানি বা সংস্থা শুরু করতে গেলে যেসব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, সেগুলিকে যতটা সম্ভব লঘু করে দেওয়া, যাতে তথাকথিত ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ চালু করা যায়। তৃতীয়ত, ভারতের বাজারকে বিদেশি পুঁজির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া, তাদের জন্য লাল কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া। নরসিংহ রাও, মনমোহন সিংহদের হাত ধরে এই কাজ শুরু হয়েছিল ’৯০-এর দশকের একেবারে গোড়ার দিকে। সেই সময় থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো উদার ভাবে ঋণ দিতে শুরু করে নানা কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে। এই গোটা প্রক্রিয়াটা দূরন্ত গতি পায় নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হবার পরে। মোদি ঘনিষ্ঠ গুটিকয় কর্পোরেট সংস্থা বিপুল পরিমাণে ঋণ পায়, যার অনেকটাই শোধ করে না। এই ধরনের ঋণকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় নন্ পারফর্মিং অ্যাসেট বা এনপিএ বলে। এনপিএ হয়ে যাবার পরেও কিছুদিন তা আদায় করার চেষ্টা চালায় ব্যাঙ্কগুলি, অন্তত, তেমনটাই করার কথা। এর পরেও ঋণের টাকা আদায় না হলে সেটা ব্যাঙ্কের চালু খাতা থেকে সরিয়ে দেয় ব্যাঙ্ক, সেটাকে বলে রাইট অফ (Write Off) করে দেওয়া। মোদির আমলে গত ছ’বছরে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা এমন ভাবেই রাইট অফ করে দেওয়া হয়েছে।
এবার আসা যাক এনএআরসিএল প্রসঙ্গে। এই নয়া সংস্থা ব্যাঙ্কগুলোর কাছ থেকে খারাপ হয়ে যাওয়া ঋণ বা ব্যাড ডেট (Bad Debt) কিনে নেবে। কী ভাবে? ওই ঋণগুলির যা মূল্য, তার মাত্র ১৫ শতাংশ টাকা ব্যাঙ্কগুলিকে দেবে এনএআরসিএল, বাকি ৮৫ শতাংশের জন্য দেবে সিকিউরিটি রিসিপ্টস (এসআর)। এবার ওই ঋণগুলি নেওয়ার সময়ে যে যে সম্পত্তি গ্যারান্টি হিসেবে রাখা হয়েছিল, সেগুলি বিক্রি করে টাকা তোলার চেষ্টা করা হবে। তবে এই বিক্রি-বাটার কাজটি এনএআরসিএল নিজে করবে না। এটা করবে ইন্ডিয়া ডেট রেজলিউশন কোম্পানি বা আইডিআরসি। এই দ্বিতীয় কোম্পানিটি কিন্তু সরকারি নয়, বেসরকারি কোম্পানি। আইডিআরসি ঋণগ্রস্ত সম্পত্তি বেচার চেষ্টা করবে, তারপরে সে বাবদ সংগৃহীত টাকা এনএআরসিএল মারফত ব্যাঙ্কগুলিকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই কাজের জন্য সম্পত্তি হাতে নেওয়ার পর থেকে ইন্ডিয়া ডেট রেজলিউশন কোম্পানি বা আইডিআরসি পাঁচ বছর সময়ে পাবে। জানা যাচ্ছে, সবথেকে খারাপ ৯০ হাজার কোটি টাকার খারাপ ব্যাঙ্ক ঋণ প্রথম দফায় নেবে এনএআরসিএল। এসব কাজ করার জন্য ভারত সরকার ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা গ্যারান্টি হিসেবে রাখবে। এর অর্থ, ঋণখেলাপি কর্পোরেটগুলির বন্ধক রাখা সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণের টাকা তোলা না গেলে সেই টাকা মেটানো হবে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল থেকে। আপাতত ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এ বাবদ কেন্দ্র দিলেও পরে তা বাড়ানো যাবে না, এমন কোনো কথা নেই। বরং, আরও বিশাল অঙ্কের টাকা কেন্দ্র এ বাবদ ঢালবে বলেই মনে হয়। পুরো ব্যাপারটার একটাই অর্থ করা যায়, ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে সে টাকা মেরে দেবে পছন্দের কর্পোরেট, আর ক্ষতির ধাক্কা সামলাবে কেন্দ্র। কেন্দ্র কোন টাকায় সে কাজ করবে, বা একটু অন্য ভাবে বললে, কেন্দ্রের হাতে টাকা আসে কী ভাবে? কেন্দ্রই হোক বা রাজ্য, তাদের টাকা তো আমার আপনার দেওয়া করের টাকাই। অর্থাৎ, আমাদের টাকা গিয়ে ঢুকবে কর্পোরেটের পকেটে, আর করোনা অসুখে অক্সিজেন না পেয়ে উত্তর প্রদেশ, বিহারে মরবেন হাজার হাজার মানুষ। এটাই কি আমাদের ভবিতব্য? না, ভবিতব্য আরও খারাপ, যে বিষয়ে আমাদের লেখালিখি চলবে।