যাওয়ার আগে বৃষ্টি এবার যেন সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অতিমারির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিবর্ষণ। পুজোর মুখে টানা বৃষ্টিতে বিধ্বস্ত বাংলা। ১৮ থেকে ২০ তারিখ বাংলা ও ওড়িশায় ভারি বৃষ্টির আভাস আগে থেকেই ছিল। এখন সেই সময়সীমা পেরিয়ে বর্ষণ অব্যাহত। গত ১৩ তারিখ থেকে প্রায় ১০০ ঘণ্টার বেশি বৃষ্টি হয়েছে। দেশে এবার বৃষ্টির ঘাটতি ছিল। গত তিন দিনের বৃষ্টিতে সেই ঘাটতি প্রায় অর্ধেক মিটেছে। দেশে প্রায় ৪৮ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। আমাদের দেশে বৃষ্টি হল অর্থমন্ত্রী। কৃষিপ্রধান দেশে তার কমবেশির ওপর নির্ভর করে ফসলের ভবিষ্যৎ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অতিবর্ষণ মানেই আতঙ্ক। খামখেয়ালী বৃষ্টিতে কোন লাভ হয়না।

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, অতিবৃষ্টি জলবায়ু পরিবর্তনের একটা সঙ্কেত। উষ্ণায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ঐতিহ্যবাহী বন্যা নিয়ন্ত্রণগুলির বিলুপ্তি, সব মিলিয়ে যাকে বলে জীবন জেরবার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবসময় স্বাভাবিক ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেয়। চলতি অবস্থা বা ব্যবস্থা দিয়ে তাকে মাপা যায়না। এখন ঠিক তাই ঘটছে। অতিবৃষ্টির প্রভাব এখন বৃষ্টি ও বন্যার চেনা ছবিটাকেই বদলে দিয়েছে।
আগে টানা বৃষ্টি বলতে আমরা বুঝতাম গ্রামগঞ্জ ও নদী সংলগ্ন নিচু এলাকাগুলিতে জল জমা। সেই জলে ভাসতো গ্রামগঞ্জ, পাড়া, বাড়িঘর। খবরের কাগজে আর সাদা-কালো টিভিতে দেখতাম, বুকজল ভেঙে হাঁটা মানুষজনের ছবি। উষ্ণায়ন গোটা পৃথিবীকে একাসনে বসিয়ে দিয়েছে। দেশ বিদেশের ঝাঁ চকচকে শহর দিয়ে বইছে জল। আর সেই জলে ডিগবাজি খেতে খেতে ভেসে যাচ্ছে দামি গাড়ি, ভেঙে পড়ছে দামি বাড়িও। সে ছবিও আমরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি, যাকে বলে মুড়িমিছরির একদর!

এই বিপর্যয়ের সামনে মানুষকে খুব অসহায় দেখায়। যারা এতদিন যারা বানভাসি মানুষের ছবি দেখেছেন তাদেরকেই এখন ভাসতে হচ্ছে শহরের নোংরা বানের জলে। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম অর্থাৎ নিচু জায়গা দিয়ে জল বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আমরা জলাজমিতে বাড়িঘর করে বন্ধ করে দিয়েছি। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম বলতে কিছু নেই। আবার পুরনো জলনিকাশি ব্যবস্থার সংস্কারও হয়নি। কাজেই রাস্তা নদী হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

অতিবৃষ্টি মানে তো শুধু কতটা বৃষ্টি হল তার হিসেব নয়। কতগুলি বাড়ি ভাঙলো, সেতু ভাঙলো কটা, নষ্ট হল কত মানুষের কাজের দিন – সেসব হিসেবও তো রাখতে হবে। কত জমির ফসল এরফলে ওঠার আগেই নষ্ট হয়ে গেল বলুন তো? সবকিছুকেই আনতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির হিসেবে। মাথায় রাখতে হবে রাস্তা, বাঁধ, জলাধার ধ্বংস হওয়া বাবদ মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও। ২০১৮তে সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনের একটা হিসেবে দেখছিলাম, কেরালা, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ সব জায়গাতেই অতিবৃষ্টি ও বন্যাতে বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। জলে ডুবে যাওয়া বা ভেসে যাওয়া দ্বীপগুলির মানুষজনকে শুরু করতে হচ্ছে সবকিছু নতুন করে।

অতিবর্ষণে জেগে থাকে শুধুই অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক। ঝিরঝির বরষাতে কোন গান ভেসে আসেনা। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা আমাদের গান-গল্প-তেলেভাজা-খিচুড়িতে মোড়া বর্ষার চেনা ছবিটাই বদলে দিয়েছে।
আমেরিকা ভাসছে। সমগ্ৰ পৃথিবী একদিন মহাসমুদ্রে পরিণত হবে। খুবই ভালো লেখা তুমি পরিবেশন করেছো।
ধন্যবাদ পূর্ণেন্দু ।