প্রাতিষ্ঠানিক উপাধি কীভাবে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারে, তার পরিচয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অতুলনীয়। অবশ্য তিনি ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর জায়গায় ‘শর্ম্মা’ বা ‘শর্ম্মণঃ’ লিখতেন। তাঁর ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি শুধু তাঁর পরিচয়কেই মহিমান্বিত করেনি, তাঁকেই আত্মসাৎ করেছে। এজন্য তাঁর কৌলিক উপাধিই শুধু নয়, নামটিকে পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। সেখানে তাঁর ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল মুখশ্রীও তাঁকে স্বনামে ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, সময়ান্তরে তা আরও সবুজ সজীবতা লাভ করেছে। উনিশ শতকের শিক্ষাবিস্তারের অপ্রশস্ত পরিসরে তাঁর মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মনীষার পক্ষে শিক্ষাশোভন পরিসরে উপাধিকে পদবিতে উন্নীত করা অস্বাভাবিক মনে হয় না। সেকালে এরকম উপাধির পদবি পরিচয় ছিলই। সেখানে ঈশ্বরচন্দ্রের বহুমুখী প্রতিভা ও কর্মৎপরতাও সেই বিদ্যাসাগরীয় পরিচয়কে অতিক্রম করতে পারেনি। এমনকি তাঁর মধ্যে একাধিক সাগরের অস্তিত্ব ক্রমে নিবিড় হয়ে এলেও বিদ্যার সাগরেই তাঁকে গৌরবান্বিত করার প্রবণতা ক্রমে উৎকর্ষমুখর বনেদিয়ানা লাভ করেছে।
‘বিদ্যাসাগর’ উপাধির উদ্ধৃতি চিহ্ন অন্তর্হিত হয়ে পড়ে, উপাধিপ্রাপকের নামও আড়ালে চলে যায়। অথচ তাঁর ব্যক্তিত্বে সাগর থেকে মহাসাগরের অভাব ছিল না। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর গুণমুগ্ধবন্ধুকে নিয়ে চিঠিপত্রে কত কথাই না বলেছেন যা শুধু মুগ্ধতাই বয়ে আনে না, বহুরূপী ঈশ্বরচন্দ্রকে খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানেই ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি ‘করুণাসাগর’-এর হদিশ মেলে (‘Not only Vidyasagara but Karunasagara also’)। অবশ্য ব্যাপ্তিতে সেই সাগর ‘এছাড়াও’ (‘also’)-এর অতিরিক্ততাবোধে স্বতন্ত্রতায় সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। সেখানে বিদ্যাসাগরের বিশেষণেই তার শিরোপা জুটেছে, ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’। সেরকমই আমবাঙালির ‘দয়ার সাগর’ বিশেষণে সুবাসিত হলেও বিদ্যাসাগরের মতো বিশেষ্য হতে পারেনি। অথচ মাইকেল মধুসূদন দত্তের মূল্যায়নেই ঈশ্বরচন্দ্রের বহুমুখী পরিচয়ের নিদান বর্তমান। ‘সমকালের সেরা ব্যক্তি’, ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘প্রাচীন মুনিঋষির মতো প্রজ্ঞা ও জ্ঞান’, ‘ইংরেজের মননশক্তি ও বাঙালি নারীর হৃদয়ের সমন্বয়’ প্রভৃতির মধ্য ঈশ্বরচন্দ্রের বহুধা ব্যাপ্ত ব্যক্তিত্বের পরিচয় উঠে এলেও সবগুলিই সমুদ্রগামী নদীর মতো বিদ্যাসাগরে মিলিত হয়েছে। তার পরিচয়ও মধুসূদনেই বর্তমান।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র(১৮৬৬) দুটি সনেট ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে লেখা। প্রথমটিতে (‘বঙ্গদেশে এক মান্য বন্ধুর উপলক্ষে’) যাও-বা উহ্য ছিল, পরেরটিতে (‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’) তা শুধু শিরোনামে প্রকট হয়ে ওঠেনি, সূচনাতেই ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগরীয় পরিচয় প্রসারিত হয়েছে : ‘বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে/ করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঈশ্বরচন্দ্র বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের জন্য সর্ব ভারতীয় পরিচিতি লাভ করেন। সেখানে তাঁর সমাজসংস্কারকের ভূমিকা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৮৭৮-এ বীরশালিঙ্গম পান্তলু ‘সোসাইটি ফর সোশ্যাল রিফর্ম’ গড়ে তুলে তেলুগুভাষী অঞ্চলে বিধবাবিবাহের জন্য আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এজন্য তাঁকে ‘দক্ষিণ ভারতের বিদ্যাসাগর’ বলে অভিহিত করা হয়। সেদিক থেকেও ঈশ্বরচন্দ্রকে পিছনে ফেলে বিদ্যাসাগরের পথ প্রশস্ত হয়ে ওঠে। তাঁর বিদ্যাসাগরীয় পরিচয় সম্পর্কে ঈশ্বরচন্দ্র শুধু আত্মসচেতনই ছিলেন না, তাকে মান্যতা দিয়েই জীবনের উপান্তে এসে আত্মজীবনী শুরু করেছিলেন ‘বিদ্যাসাগর চরিত’(১৮৯১)।
সেখানে উপাধিটি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো প্রয়াস লক্ষ করা যায় না। তার সূচনাবাক্যেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরে একাত্ম হয়ে পড়েছেন, ‘শকাব্দঃ ১৭৪২, ১২ই আশ্বিন, মঙ্গলবার, দিবা দ্বিপ্রহরের সময়, বীরসিংহগ্রামে আমার জন্ম হয়।’ অবশ্য তখনও বিদ্যাসাগরের জন্ম হয়নি। তার জন্য ১৯ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৮৩৯-এ সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় সাফল্যের মাধ্যমে তাঁর বিদ্যাসাগরে নবজন্ম লাভ হয়। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঈশ্বরচন্দ্রের মৃত্যুর পরে ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ নামেই যেদুটি প্রবন্ধ লিখেছেন, তাতেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরে বিলীন হয়ে পড়েন। অবশ্য সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরচন্দ্রের মহিমাকে ইতিপূর্বের প্রচলিত ধারণাকে অস্বীকার করে তাঁর চরিত্রের মধ্যে দয়া ও বিদ্যার পরিবর্তে ‘অজেয় পৌরুষ’ ও ‘অক্ষয় মনুষ্যত্ব’কে প্রধান গৌরব বলে অভিহিত করেছেন। তাতে বিদ্যাসাগরীয় পরিচিতি কোনো রকম হেরফের না ঘটাই স্বাভাবিক। অথচ আপাতভাবে ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগরীয় পরিচিতিসর্বস্বতা যেমন প্রত্যাশিত ছিল না, তেমনই তা অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়।
ঈশ্বরচন্দ্র মূলত সংস্কৃত সাহিত্য ও দর্শনের অসামান্য দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিদ্যাসাগরের প্রশংসা পত্র পেয়েছিলেন। সেখানে তিনি এরিস্টটলের মতো প্রায় সর্ববিদ্যায় সুপারম্যান ছিলেন না। সংস্কৃত কলেজ থেকে পাশ করার অব্যবহিত পরিসরে মাত্র একুশ বছর বয়সে বছরে যখন তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনার জীবন শুরু করেন, তখনও তাঁর ভালো করে ইংরেজি শেখাই হয়নি। স্বনামধন্য ইংরেজির অধ্যাপক রিচার্ডসনের ছাত্র তথা বন্ধুবর আনন্দকৃষ্ণ বসুর কাছে তিনি ইংরেজি শিখিছিলেন। অবশ্য স্বকীয় প্রতিভায় সেই শিক্ষা যে উত্তম রূপে সম্পন্ন হয়েছিল, তা তাঁর নানাবিধ অনুবাদকর্ম থেকে শিক্ষাসংক্রান্ত নথিপত্রেই প্রতীয়মান। সেদিক থেকে সংস্কৃতে তাঁর অসামান্য অধিকার যেমন তাঁকে শাস্ত্রীয় পরিসরে বিধবাবিবাহ থেকে বাল্যবিবাহ বা বহুবিবাহের আয়ুধ সংগ্রহে সাহায্য করেছিল, তেমনই ভালোভাবে ইংরেজি জানার দৌলতে শিক্ষাবিস্তারের পথ সুগম হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্র অঙ্কও শিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তিনি অগ্রসর হতে না পেরে পরিত্যাগ করেছিলেন। সেক্ষেত্রে বিদ্যাশিক্ষার সীমিত পরিসরেই তাঁর অগাধ জ্ঞানের পরিচয় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সেদিক থেকে ঈশ্বরচন্দ্রের স্বল্পবয়সে ফোর্ট উইলিয়াম ও সংস্কৃত কলেজের মতো উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমশ পদমর্যাদায় উত্তরণ ও বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজনে পাঠ্যবই রচনা ও শিক্ষাবিস্তারে অগ্রদূতের অবিসংবাদী ভূমিকায় তাঁর বিদ্যাসাগরীয় প্রকৃতি স্বাভাবিক ভাবেই সবুজ হওয়ার অবকাশ পেয়েছিল। এজন্য বিধবাবিবাহ প্রবর্তনে(১৮৫৬) তাঁর সমাজসংস্কারকের আলোড়নসৃষ্টিকারী সাফল্য তাঁকে যে বিপুল জনপ্রিয়তা প্রদান করে, তাতেও সেই বিদ্যাসাগরীয় পরিচয় আরও তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে তিনি তখন শিক্ষাশোভন পরিসর ছেড়ে আমজনতার দুয়ারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সেখানে তিনি উনিশ শতকের প্রথম সেলিব্রেটি যাঁকে নিয়ে গান বাঁধা হয়েছে, শান্তিপুরের তাঁতিদের কাপড়ে বিদ্যাসাগর নাম উঠে এসেছে, একপলক দেখার জন্য উদ্গ্রীব জনতা রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে থেকেছে। অথচ তাঁকে দেখে নিরাশ হয়েছে আমজনতা। দৃষ্টিনন্দনযোগ্য চেহারা তাঁর ছিল না। সুকুমার রায়ের পাগলা দাশুগোছের চেহারা অনেকটা : ‘ক্ষীণ দেহ খর্বকায় মুণ্ডু তাহে ভারী/ যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারী।’ শুধু তাই নয়, মূর্তিকে প্রতিমা গড়ে তোলাতেও ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন বিমুখ। এজন্য রেলি ব্রাদার্সের একখানি কাপড়কে ফেঁড়ে একখণ্ড পরতেন আর একখণ্ড গায়ে দিতেন। পায়ে পরতেন দেশি মুচির শুঁড়তোলা চটিজুতো। শুধু তাই নয়, তাঁর সামনের চুল অবাঙালিসুলভ ছাঁটা। মহাদেবের মতো দীনদরিদ্রের বেশই ছিল তাঁর রাজবেশ। সেদিক থেকে ঈশ্বরচন্দ্রের দেহশ্রী বা বেশভূষায় ব্রাহ্মণ্য আভিজাত্য বা পণ্ডিতের আবেশ কোনোটাই ছিল না। ধর্মীয় পরিচয়েও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সেখানে তাঁর দীন-হীন প্রকৃতিতে পাণ্ডিত্যের বিদ্যাসাগরীয় পরিচয়ও আবেদনমুখর হয়ে ওঠে না। অথচ তাঁর এই বিরল ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বেই বিদ্যাসাগরের আত্মপরিচয় স্বনামীয় পরিসরকে আত্মসাৎ করে ফেলে।
আপাতভাবে ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাধর প্রকৃতিতে বিদ্যাসাগরের অভাববোধ অস্বাভাবিক নয়। জ্ঞানী হিসাবেও তাঁর পরিসর সুবিস্তৃত হয়নি। অন্যদিকে তাঁর চেয়ে কম বয়সে মাত্র সতেরো বছরে অসাধারণ প্রতিভাধর ডিরোজিও কলকাতার হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হয়েছিলেন। অবশ্য তাঁর চেয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বহুমুখী প্রতিভার অধিকারীই ছিলেন না, তাঁর বহুধাবিস্তৃত কর্মবহুল জীবন শুধু তীব্র আবেদনক্ষমই ছিল না, তা অতুলনীয়ও। সেখানে তাঁর জ্ঞানের চেয়ে কাণ্ডজ্ঞানে বিদ্যাসাগরীয় পরিচয় আন্তরিক হয়ে উঠেছে। তাঁর পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, শিক্ষাবিস্তার থেকে সমাজসংস্কার সবেতেই সেই কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় বর্তমান। সর্বত্র তাঁর মানবিক মুখ মুখপত্র হয়ে উঠেছে। রামমোহন রায় ১৮২৯-এ সতীদাহ প্রথা রোধ করে যে সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র তার পরিসমাপ্তির দায়ভার নিজের স্কন্ধেই নিয়েছিলেন। সতীদাহ রোদের ফলে সমাজে অসংখ্য বিধবার করুণ পরিণতি তাদের জীবনকেই শুধু নয়, সমাজজীবনকেও দুর্বিষহ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। সেখানে সতীদাহ রোধে জীবন বাঁচলেও মনে আর মানে বাঁচা দায় হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে সমাজজীবন ব্যাভিচারের পরিসর বিস্তৃতি লাভ করে। সেক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিধবাবিবাহ প্রবর্তনে সেই বিধবাদের চোখের জল মোচনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তাঁদের মুখে হাসি ফোঁটানর জন্য বহুবিবাহ রোধ থেকে বাল্যবিবাহের প্রতিরোধেও তিনি সামিল হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, সেখানে অবলা মেয়েদের শিক্ষার মাধ্যমে সবলা, স্বনির্ভর করে তোলার জন্যই তাঁর নারীশিক্ষার বিস্তার। সেদিক থেকে বিধবাদের বিবাহ প্রবর্তনে তাঁর রক্ষণশীল সমাজের সঙ্গে শাস্ত্রযুদ্ধে সামিল হয়ে জয় লাভ করার বিষয়টি যেমন সাধারণ্যে প্রচার-প্রসার লাভ করে, সেই সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগরও আমজনতার অন্দরমহলে প্রবেশ করে। তর্কযুদ্ধে বিদ্যার প্রভাব আপনাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে শাস্ত্রীয় যুদ্ধে বিজয়ী ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগর উপাধি থেকে পদবিতে পৌঁছানো ছিল সময়ের অপেক্ষা। আর তাঁর সম্প্রসারণে গৌরবে বহুবচনে বিদ্যাসাগরের বিস্তৃতিও স্বাভাবিক হয়ে আসে। অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্রের বহুমুখী কর্মের নেপথ্যে ছিল তাঁর শিক্ষা ও সমাজের কল্যাণসাধন। সেক্ষেত্রে তাঁর কল্যাণব্রতী ভাবমূর্তির সঙ্গে পাণ্ডিত্যের অপরাজেয় প্রকৃতি সাধারণ্যে অসাধারণ প্রভাব বিস্তারের মধ্যে শ্রদ্ধার পরশ সেই সাগরকেই স্পর্শ করেছে। ত্যাগ ও সেবার মাধ্যমে মানবসেবার আদর্শের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র যেভাবে অনির্বাণ আত্মবিশ্বাস থেকে ঋষিকল্প ত্যাগ-তিতিক্ষা, দানে সর্বদা সিদ্ধহস্ততা, অসীম সহনশীলতা, অপরিসীম বিনয়, আত্মপ্রত্যয়ী সংযম ও কর্তব্যে অবিচল থাকা প্রভৃতি গুণের মাধ্যমে লোকহৈতেষী ব্রতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, সেগুলি বিদ্যাশিক্ষার মধ্যেই বর্তমান। সেক্ষেত্রে ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’র আন্তরিক প্রকাশ ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগরের মধ্যেই প্রতীয়মান। এজন্য তাঁর কল্যাণকামী চেতনায় কোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণের প্রাধান্য ছিল না, না-ছিল কোনো মতবাদের বা চিন্তনের দাসত্ব।
ঈশ্বরচন্দ্রের লক্ষ্যেই ছিল দেশের মানুষের সার্বিক প্রগতি। অবশ্য ‘বিদ্যাসাগর চরিত’-এ তিনি নারীদের প্রতি তাঁর পক্ষপাতের কথা বলেছেন। তাঁরা যে সমাজে অমানুষিক জীবনযন্ত্রণার মধ্যেও অনেকবেশি মানবিক, তা তিনি ‘বিদ্যাসাগর চরিত’-এ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এজন্য মেয়েদের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়তি গুরুত্ব প্রদানের মধ্যে তাঁর অসাধারণ মূল্যবোধই নিবিড় হয়ে ওঠে। সেখানে তাঁর দয়া বা করুণার অসীম বিস্তৃতি ও গভীরতা সবই বিদ্যাসাগরেরই বহুবিস্তারী রূপের পরিচায়ক। সেই সাগরের অমূল্য রত্নরাজির নানা পরিচয়ের পরাকাষ্ঠায় ঈশ্বরচন্দ্রের শ্রেষ্ঠত্ববোধে তাঁর অতুলনীয় চারিত্রিক মাহাত্ম্যই তাঁকে বিদ্যাসাগরে একাত্ম করে তুলেছে। তাঁর সব পরিচয়কেই তার আধারে একীভূত মনে হয়। শুধু তাই নয়, সেই সাগরের জলেই তো তাঁর চোখ আজীবন সজল ছিল। এজন্য স্বেচ্ছায় মা-বাবার কিংবদন্তী সম্পর্ক থেকে দূরে সরে এসে, পারিবারিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশ আত্মীয়পরিজনহীন নিঃসঙ্গতার মধ্যেও আজীবন জনবিচ্ছিন্ন হননি। প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তিক্ততাবোধে তাঁর জীবনের সেরা কাজ বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের জন্য একবার সখেদে বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র, কিন্তু তা থেকে সরে থাকেননি।
স্বনামধন্য সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতা দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্রের সুহৃদ ছিলেন। সেই পরম সুহৃদকে বারবার প্রতারিত হয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।’ বলা বাহুল্য, ঈশ্বরচন্দ্র সেই নিঃসঙ্গ জীবনের অন্তিম পর্যায়ে কলকাতা ছেড়ে সুদূর কার্মাটাড়ে গিয়েও তাঁর স্বধর্মে সক্রিয় থেকেছেন। তিনি সমস্ত জেনে-বুঝে মানুষের কল্যাণে ব্রতী হয়েছিলেন। তাতে তাঁর প্রত্যাশাহীন দানধ্যান নিয়ে উপকার করলে অপকার পাওয়ার কিংবদন্তী ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য সেই ‘অসার ও অপদার্থ’ লোকজনের প্রতি তারপরেও তাঁর সাহায্যের হাত অবিচলভাবে সক্রিয় থেকেছে। অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্র জানতেন সাগরের জলের মতোই বিরূপ সমালোচনাও স্বাভাবিক, কিন্ত সেটাই সব নয়। তা পানের অযোগ্য হলেও তাই আবার বাষ্পায়িত হয়ে পানীয় জলের উৎস হয়ে ওঠে, দাহিত হয়ে লবণ নিষ্কাশন করে। ঈশ্বরচন্দ্র সেই বিদ্যাসাগরে একাত্ম হয়েছিলেন তাঁর সজল প্রাণের পরশে আর তার লাবণ্যের সৌরভে। তিনি যে যথার্থই বিদ্যাসাগর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল’ করার জন্য বিদ্যাসাগরীয় চরিত্রকে অনুভব করার কথা বলেছেন। সেদিক থেকে বিদ্যাশিক্ষায় ঈশ্বরচন্দ্র যে সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষিতের অবিকল্প প্রতিভূ, তা তাঁর বিদ্যাসাগরেই প্রতীয়মান।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪। যোগাযোগ : জীবনসুরভি, ক্রিং টাওয়ার, হুচুকপাড়া, পুরুলিয়া-৭২৩১০১
আপনার আলোচনা পড়ে খুব ভালো লাগল স্যার। সমৃদ্ধ হলাম। অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এরকম একটা উপকারী লেখা পোস্ট করার জন্য।