প্রয়োজন যখন আয়োজন হয়ে ওঠে, তখন তার নিষ্ঠায় পবিত্রতা বিরাজ করে। সেই আয়োজন যখন প্রয়োজনকে ছাপিয়ে বিস্তার লাভ করে, তখন তার আবেদন যেমন বেড়ে যায়, তেমনই তার নিষ্ঠায় ফাঁক ও পবিত্রতায় ফাঁকি চলে আসে। অবশ্য সময়ের দাবিও তাতে ঘটার কপালে ফোঁটা দিয়ে থাকে। এভাবে পূজা উৎসবে মিলিয়ে যায়, বারোমাসে তেরো পার্বণের বিস্তার স্বাভাবিক মনে হয়। পূজার বৈচিত্রে উৎসবের বিস্তার। শুধু তাই নয়, আমুদে বাঙালি পূজাকে উৎসবে মিলিয়ে দিতেও অপার আন্তরিক। তার সরস প্রাণে রসিকের নিত্য আনাগোনা। স্বর্গের দেবদেবীদের নিয়েও তার ঠাট্টা তামাশার অভাব নাই। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে তার সুলভ পরিচয়। সেখানে তার বাঙালিকরণের ঝোঁক সর্বত্র। পার্বত্য এলাকার দেবদেবীও বাঙালির আপনজন হয়ে উঠেছে। সেখানে কৈলাসের শিব বা হিমালয়ের পার্বতী সবাই বাংলার ধূলিকণার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেখানেই শেষ নয়, হরগৌরীর বিচিত্র রূপের পরিচয়ের মধ্যেও বাঙালি নিজেকে নানা ভাবে খুঁজে ফিরেছে।
মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যেই তার বিচিত্র পরিচয়। সেখানে অসুরনাশিনী মহামায়ার সঙ্গে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার মহিমাই শুধু নয়, দেবীর পুত্রকন্যাকে নিয়ে পতিগৃহ থেকে পিত্রালয়ে আসার অপূর্ব মেলবন্ধনের মধ্যে বাঙালি তার পারিবারিক সম্পর্ককেও খুঁজে নিয়েছে। আগমনি থেকে বিজয়া তারই পরিচয়ে পূজা উৎসবে মিলে যায়। অথচ সেখানে গরিবের উৎসব, বড়লোকের বিলাসিতা জেগে ওঠে।
আসলে যাদের দুর্গতির শেষ নেই, দেবী দুর্গা তাদের আরাধ্যই শুধু নয়, ত্রাতারূপী ভগবানের সহধর্মিণী ভগবতী। এই ভগবতী অতি সাধারণ দীনহীন মানুষের একান্ত আপন মাতৃরূপা দেবী। গ্রামগঞ্জে এখনও দেবী দুর্গা ভগবতী। দেবীর মাহাত্ম্য শুধু বাৎসরিক পূজার আয়োজনে বা প্রতিনিয়ত ত্রাতারূপী দশভুজার আরাধনাতে সীমিত নয়, বাঙালির যাপিত জীবনের সঙ্গেও বিজড়িত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অমরসৃষ্টি অহিফেনসেবী কমলাকান্তের মাধ্যমে বঙ্গদেশের মাতৃদেবী হিসেবে দেবী দুর্গাকে আরাধনা করেছেন। আবার ভারতমাতার মধ্যেও দুর্গার ছায়া কায়া হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বাঙালিমানসে ‘বড় পূজা’ থেকে ‘পূজা’ বলতেই দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। সেই পূজাই বাঙালির যাপিত জীবনের ক্যালেন্ডারে পরিণত হয়েছে। সারা বছরের অপার আনন্দ সেই পূজাকে কেন্দ্র করেই শুধু আবর্তিত হয় না,কল্পনা থেকে পরিকল্পনাও বিস্তার লাভ করে। এজন্য তার আগমনি অনেক আগেই বিজ্ঞাপিত হয়, বিসর্জনেও আগমনি জেগে থাকে।

‘ঠাকুর আসবে কবে’ প্রশ্নচিহ্নের সামনে আসতেই উত্তর মেলে ‘বছর পরে’। যেন খুব তাড়াতাড়ি তার আগমন, শুধু সময়ের অপেক্ষা। শুধু তাই নয়, পরের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার নির্ঘণ্টের মতো দুর্গা পূজার তারিখ সামনে চলে আসে। চলে নানা হিসেবনিকেশ। দুর্গা পূজার বনেদি বিস্তারেই রয়েছে তার উৎসবের আভিজাত্য। অথচ সেখানে গরিবের আনন্দ যাপনের মধ্যেই ধনীর প্রাচুর্যের বিলাস শুধু ভাবায় না, ধনীদরিদ্রের পার্থক্যকে আরও প্রকট করে তোলে। নদীর জলের বিস্তার যত হয়, গভীরতা তার ততই কমে। উৎসবের প্রাচুর্যে তার বিস্তার যত ঘটেছে, তত পবিত্রতা কমেছে, ততই ভক্তি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেখানে আনন্দযাপনের লক্ষ্যেই এসেছে দেখনদারির প্রতিযোগিতা, আড়ম্বরের বিলাস। দরিদ্র মানুষের পক্ষে তা এঁটে ওঠা সম্ভব নয়, প্রত্যাশিতও নয়।
পণ্যায়িত বিশ্বে সবই পণ্য। সেখানে বিপণনই আপন, বাকি সব পর। দুর্গোৎসবের বিস্তারে সেই বিপণনীর আয়োজনকে স্বাভাবিক ভাবেই ছাপিয়ে যায়। প্রয়োজন যখন বিলাসী হয়ে ওঠে, তখন তার আকর্ষণের বিস্তার ঘটে, আভিজাত্য লাভে শুরু হয় দেখনদারির প্রতিযোগিতা। সেখানে বারোয়ারি পূজা থিমে পরিণত হয়, পূজার চেয়ে প্রতিমা প্রদর্শন বড় হয়ে ওঠে, ভক্তের জায়গায় দর্শনার্থী ভিড় করে। পূজার পবিত্রতা অস্থির আড়ম্বরমুখর প্রতিযোগিতায় নিঃস্ব হয়ে ওঠে। চার-পাঁচ দিনের চোখ ধাঁধানো আলোর আয়োজনের মধ্যেই দীনহীন মানুষের অন্ত্যজ অন্ধকার আরও প্রকট মনে হয়। ব্যয়বহুল পূজার উৎসবে সামিল হওয়াই তাদের পক্ষে বিলাসিতার নামান্তর। অথচ তার পরেও নিরন্ন অসহায়তার মধ্যেও দীনদরিদ্রের সেজে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা, ভক্তি ভরে মাতৃদর্শনে ধুলোমাখা পায়েই পথচলা। বানভাসি হয়েও জলচোখেও দেবী দুর্গার মহোৎসবে মেতে উঠতে চায় তারা। অন্যদিকে প্রাচুর্যের আভিজাত্যে ধনীদের অস্থির বিলাসী আয়োজন। পুজোর মরশুম মানেই ভোগে-উপভোগে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকে জীবনকে নতুন করে আস্বাদন। একদিকে জীবন সংগ্রামের মাঝে উৎসবের উষ্ণতার পরশে নিজেকে মেলানোর সদিচ্ছা, অন্যদিকে জীবনকে উপভোগের আয়োজনে পুজোকেই মিলিয়ে নেওয়ার বিলাসিতা। সেখানে গরিবের উৎসবই বড়লোকের উপভোগ্য হয়ে ওঠে। একদিকে সিদূর খেলার আড়ম্বর, অন্যদিকে বিসর্জিত প্রতিমার কাঠামো তুলে আনার প্রস্তুতি।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো বীরসা-বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪