টানা ৪৮ ঘন্টার প্রবল বর্ষনে বিপর্যস্ত পাহাড় সমতল সহ উত্তরবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলা। সবচেয়ে বেশী বিপর্যস্ত দার্জিলিং, কার্শিয়াং, জলপাইগুড়ি জেলা। প্রবল বর্ষনে জলস্তর বেড়ে লাল সতর্কতা জারি হয়েছে তিস্তায়। তিস্তার জলে প্লাবিত একাধিক গ্রাম। পাহাড়ে বহু জায়গায় নেমেছে ধ্বস। বিপর্যস্ত ৫৫ ও ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে ফাটল। সমস্যায় পড়েছে পাহাড়ে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা। চলছে যুদ্ধকালীন ততপরতায় ধ্বস সরানোর কাজ। সবমিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি পাহার সমতলে।

গত ৪৮ ঘন্টার লাগাতার বর্ষনে বিপর্যস্ত পাহাড় সমতল। ইতিমধ্যেই ধ্বসের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে দার্জিলিংগামী ৫৫ নম্বর জাতীয় সড়ক ও সিকিম যাওয়ার ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক। জানা গেছে, প্রবল বর্ষনের কারণে ৫৫ নম্বর জাতীয় সড়কের কার্শিয়াং এর কাছে মহানদী, পোখরিবং, লোধামা, চংটং, রিম্বিক, জোড়বাংলো, কালিম্পং ও ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের ২৯ মেইল, কালিঝোড়া, ইত্যাদি একাধিক জায়গায় ধ্বসের খবর মিলেছে। যান চলাচল বন্ধ রয়েছে সিকিম গামী ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক, দার্জিলিং এর পোখরিবং- সুখিয়াপোখরি রোড, ঘুম-বিজনবাড়ী, লাভা-আলগারা রোড, লোধামা বাজার, চংটং-দার্জিলিং রোড, লোধামা-মানেভঞ্জন রোড, জোরবাংলো-বিজনবাড়ী রোড ও রিম্বিক-শ্রীখোলা রোডে। এই সমস্ত পাহাড়ি পথে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বস সরানোর কাজ শুরু হয়েছে জেলা প্রশাসনের তরফে। ধ্বস সরানোর কাজে মোতায়েন করা হয়েছে গ্রেফ-কেও। ১০ নম্বর জাতীয় সড়কে ধ্বস সরানোর কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে বিকেলের পর থেকে যান চলাচল শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দার্জিলিং যাওয়ার বিকল্প রাস্তা রোহিনী ও পাঙ্খাবাড়ি সড়ক খোলা রয়েছে।

এদিকে প্রবল জলস্রোতে শিলিগুড়ির কাছে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর গুরুত্বপূর্ণ বালাসন নদীর সেতুতে ফাটল দেখা দিয়েছে। সেই সেতু দিয়ে সম্পুর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সবরকমের যান চলাচল। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দুধিয়ার লোহার ব্রীজের। ফলে দুধিয়া-সুহিয়াপোখরি রাস্তা দিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কালিম্পং এর রংপো সেতু।
মঙ্গলবার বিকেল থেকেই প্রবল বর্ষনের কারণে জল বাড়তে শুরু করে তিস্তা মহানন্দা বালাসন সহ ডুয়ার্সের প্রতিটি নদীতেই। বিপদ সীমার ওপর দিয়ে বইছে তিস্তা, রংপো নদীর জল। কালিম্পং জেলার গরুবাথান এলাকায় মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির খবর মিলেছে। ত্রিবেনীতে তিস্তার জল বেড়ে ছাপিয়ে গেল পাহাড়ি রাস্তা। এদিকে পাহাড় সমতলে ভারি বর্ষনে তিস্তায় জারি করা হয়েছে লাল সতর্কতা। তিস্তার জল ঢুকে প্লাবিত হয়েছে জলপাইগুড়ি শহর সংলগ্ন সারদাপল্লী সুকান্তপল্লী এলাকা। সেখানকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিরাপদ স্থানে। জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ, ময়নাগুড়ি, ক্রান্তি ব্লকের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে তিস্তা। আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে নদী লাগোয়া গ্রাম গুলিতে। মৌয়ামারী, চাপাডাঙ্গা, নন্দনপুর, পাতকাটা সহ আরও বেশ কিছু এলাকার ১০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই কাজে দুর্গতদের রাখার কাজে ব্যবহার করা হবে স্কুল কলেজগুলিকে। উদ্ধারকার্যে মোতায়েন করা হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দল ও সিভিল ডিফেন্সকে। জানিয়েছেন জলপাইগুড়ির জেলাশাসক মৌমিতা বসু গোদারা। তিস্তার পাশাপাশি ভূটানে প্রবল বৃষ্টির কারণে জলস্তর বেড়েছে ডুয়ার্সের জলঢাকা নদীতে। সেখানেও জারি করা হয়েছে হলুদ সংকেত।

টানা ভারি বর্ষনে বিপর্যস্ত পাহাড় সমতল। এই সময় প্রচুর পর্যটক রয়েছেন পাহাড় ও ডুয়ার্সে। সবচেয়ে বেশী সমস্যায় পড়েছে পাহাড়ে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা। তারা একপ্রকার গৃহবন্দী অবস্থাতেই রয়েছেন। পাহাড়ে বহু জায়গায় ধ্বসের কারণে ফিরে আসতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে ব্যপক সমস্যায় পড়েছেন তারা। মঙ্গলবার অনেক পর্যটককেই দেখা গিয়েছে রাস্তাতেই গাড়ির মধ্যে। ধ্বসের কারণে আটকে পড়েছেন তারা। তাদের অনেককেই উদ্ধার করে শিলিগুড়ি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসার রোহিনী পাঙ্খাবাড়ি রোড খোলা থাকায় অনেক ট্যুর বাতিল করে নেমে আসছে পাহাড় থেকে। এই পরিস্থিতিতে পর্যটকদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে যাতে কোন গাড়ির চালক ভাড়া বেশী নিতে না পারে তার জন্য নজর রাখছে প্রশাসন।

এদিকে সিকিমে ঘুরতে গিয়ে মৃত্যু হল মালদার এক পর্যটকের। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাকায় মৃত ব্যক্তির দেহ আনতে সমস্যায় রয়েছেন পরিবার। মৃত ব্যক্তি পেশায় স্কুল শিক্ষক। নাম দেবরাজ রায়, বয়স উনপঞ্চাশ বছর। মৃতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিবেকানন্দ পল্লীর বাসিন্দা ওই শিক্ষক বন্ধু ও তার পরিবার নিয়ে গত ১৭ অক্টোবর সিকিমে ঘুরতে যান। সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সেখানে তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় সিকিম মণিপাল হাসপাতালে। বুধবার সকালে মৃত্যু হয় তার। তবে সিকিমে আবহাওয়া বিরূপ থাকায় ও ধ্বসের কারণে তার দেহ আনতে সমস্যায় পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে বিবেকনন্দপল্লী এলাকায়।