‘দেশাত্মবোধক গান’ এবং ‘ঐতিহাসিক নাটক’ এই দুই-এর সহাবস্থানে বাংলা সাহিত্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-এর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। কিন্তু সেই বিষয় নিয়ে চর্চা খুব কম না হলেও তা প্রচলিত গণ্ডিকে টপকে অসীমতা অর্জন করতে পেরেছে খুব কম ক্ষেত্রেই। দ্বিজেন্দ্র-চর্চার আবহে থাকা সুধীজন, যাঁরা সাহিত্যপাঠকে প্রয়োজনের পাশাপাশি প্রিয়জন করে তুলেছেন, যাঁরা গবেষকদৃষ্টির সাথে গভীর রসাস্বাদনের দৃষ্টিকে মিলিয়ে সাহিত্যপাঠ করেন, তাঁদের কাছে অবশ্যপাঠ্য ‘আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল’ শীর্ষক প্রবন্ধ গ্রন্থটি। লেখক সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রফেসর তথা একালের বরেণ্য প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার মণ্ডল।
করুণা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল’ প্রবন্ধগ্রন্থটি। কেন দ্বিজেন্দ্রলালের অসীম স্বকীয়-প্রতিভার শৈল্পিক প্রভাব সংগত রূপ পেয়েও ক্রমে নিঃশেষ হয়ে পড়েছিল? কীভাবে দ্বিজেন্দ্র ব্যক্তিত্বের প্রকটতা ব্যাহত করে তোলে তাঁর শিল্পপ্রতিভাকে? দ্বিজেন্দ্রলালের নিজস্ব ব্যক্তিত্বের স্বভাব ও অভিব্যক্তিতেই যে তাঁর অনন্য-সাধারণ শিল্পীসত্তার করুণ পরিণতির ট্রাজিক বীজ লুকানো ছিল, আর তা যুক্তিনিষ্ঠতার সাথে প্রমাণ করে দেন একালের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার মণ্ডল। শুধুমাত্র রবীন্দ্রবিরোধিতাই যে দ্বিজেন্দ্রপ্রতিভার করুণ পরিণতির কারণ নয় তা প্রমাণিত হয় এই গ্রন্থে। গ্রন্থটির মোট চারটি অধ্যায়ে দ্বিজেন্দ্রলালের চতুর্ভূজ জীবনবলয়কে এঁকেছেন তিনি। প্রথম অধ্যায় ‘‘উপেক্ষিত’ দ্বিজেন্দ্রলাল’, দ্বিতীয় অধ্যায় ‘আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল’, তৃতীয় অধ্যায় ‘দ্বিজেন্দ্রলাল ও রবীন্দ্রনাথঃ বিভেদের মাঝে ‘মিলন মহান’’, চতু্র্থ অধ্যায় ‘নাট্যকার ডি.এল. রায় : ব্যক্তিসত্তা বনাম শিল্পীসত্তা’। এই চার অধ্যায়ের চৌহদ্দিতে দ্বিজেন্দ্র পিপাসুদের পিপাসা যে মিটবে একথা অনস্বীকার্য। প্রথম অধ্যায়ে ‘উপেক্ষিত দ্বিজেন্দ্রলাল’ প্রবন্ধে শ্রদ্ধেয় শ্রী মণ্ডল মূলত দ্বিজেন্দ্র উপেক্ষার স্থান ও পরিধিকে ব্যক্তি-সমাজ-পরিস্থিতি নির্বিশেষে সপ্রমাণ ব্যাখ্যাদান করার পাশাপাশি অন্বেষার পথ ধরে পৌঁছে গেছেন দ্বিজেন্দ্র মানসলোকে। তুলে ধরেছেন দ্বিজেন্দ্র-উপেক্ষার প্রকৃত কারণকে। প্রাবন্ধিকের নান্দনিক বীক্ষণ, বিবেকের এই বিচরন দ্বিজেন্দ্রলালের বিবেকী-নির্মাণকে অমরতা দান করেছে একথা বলা যায়।
২.
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল’। সেখানে ব্যক্তি দ্বিজেন্দ্রলাল এবং তাঁর সাথে পত্নী সুরবালার সম্পর্ক, সমাজকর্তৃক ‘একঘরে’ হওয়া, কবি-প্রতিভার ক্ষেত্রান্তর, আধ্যাত্মিক সুরে ব্যঙ্গরসের কুপ্রভাব প্রভৃতি ফুটে উঠেছে। বোধিবৃক্ষের জ্ঞানতাপস প্রাবন্ধিক যেন এই প্রবন্ধে সাহিত্যের সব্যসাচী হয়ে উঠেছেন। একহাতে খণ্ড আমিত্ব, স্ববিরোধী ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্র বিরোধীতা যে দ্বিজেন্দ্রলালের আত্মঘাতী প্রকৃতির প্রধান ফাঁসিসেল তা প্রমাণ করেন। অপর হাতে অর্জুনের নির্ভেদী লক্ষ্যের বাণরূপী কলমে লেখেন ‘দ্বিজেন্দ্রলাল আত্মঘাতী হয়েও অপরাজেয়, নিন্দিত হয়েও নন্দিত।’ এভাবেই সাহিত্য পাঠক যেন মেধার লালনভূমিতে নবচিন্তনের বীজ খুঁজে পায় প্রাবন্ধিক স্বপনকুমার মণ্ডলের সৃজিত বীজাধার প্রবন্ধে। যা কর্ষনের পাশাপাশি, সাহিত্যাকাশে উড্ডীয়মান পক্ষীর পাখনা বিশেষ।
৩.
তৃতীয় অধ্যায় ‘দ্বিজেন্দ্রলাল ও রবীন্দ্রনাথ : বিভেদের মাঝে মিলন মহান’ প্রবন্ধটিতে প্রাবন্ধিক স্তব্ধতার মরীচিকা সৃষ্টি করেন। যা কৌতুহলী পাঠককে মরুলোকের আত্মঘাতী গরলের মধ্যে অমৃতের সন্ধান দেয়। এই অংশের মূল আলোচ্য রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র সম্পর্ক ও পারস্পরিক প্রতিভার চৌম্বাকর্ষন। শ্রদ্ধেয় শ্রী মণ্ডল এখানে দেখিয়েছেন রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র সমপ্রতিযোগিতার সুস্থ সংযোগ কীভাবে ‘দ্বিজু রায় বনাম রবি ঠাকুর’ নামক অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংযোগহীন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে। পাশাপাশি ‘ম্যাঁও এ্যঁও ও্যঁও’ কোলাহল যেন যুদ্ধকালীন দর্শকের নামান্তর। আবার যুদ্ধ পরবর্তী দুই বাল্যবন্ধুর ভগ্নহৃদয়ের সন্ধিপত্রকে প্রাবন্ধিক তাঁর শিল্পগুণে প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রবন্ধগ্রন্থে।
গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায় নতুন করে ভাবতে শেখায়। প্রতি অধ্যায়ের পাঠশেষে নতুন শিখনে মুগ্ধ হতে হয়। গ্রন্থে দেখা যায় শিল্পী দ্বিজেন্দ্রলালের সৃষ্টিকে বিশ্লেষণ করে সেই সৃষ্টিবিশ্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তি-আমি’কে টেনে পাঠকের সামনে হাজির করার অমূল্য দিক। যে দিক সাহিত্যের আঙিনায় দ্বিজেন্দ্রলালের অবস্থানকে যেমন স্পষ্ট করে, তেমনই দ্বিজেন্দ্রর নিজ জীবনকে ভিন পথে দেখার গতিবিধি, এককথায় দার্শনিকতার ত্রুটি-বিচ্যুতিকেও স্পষ্ট করে দেয়। মুগ্ধতা জাগে দ্বিজেন্দ্রলালের ‘মন্দ্র’ কাব্যকে ঘিরে প্রাবন্ধিকের ঋদ্ধ অভিমত অনয়নে। তিনি প্রমাণ করেন ‘মন্দ্র’ কাব্যকে কেন্দ্র করে দ্বিজেন্দ্র প্রতিভার সমান্তরাল সমনিক্ষেপকে। ‘মন্দ্র’কে ঘিরে রাবীন্দ্রিক কণ্ঠে মধুমাখা সুরের দোলা শেষ অবধি বেসুরো গম্ভীর ধ্বনির অভিধা বহন করে। রবি হয়ে ওঠেন রোদ, আর দ্বিজেন মেঘ। মেঘ রোদের এই খেলা ইন্দ্রজিতের মতো খেলে চলেন প্রাবন্ধিক। নেপথ্যের প্রাবন্ধিক ও তাঁর বিশ্লেষণী কড়চা যে সাহিত্যজগতের চিরকালীন ‘অভিজ্ঞান’ হয়ে উঠবে একথা ষোলআনা মান্য।
৪.
সর্বশেষ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ‘নাট্যকার ডি.এল.রায় : ব্যক্তিসত্তা বনাম শিল্পীসত্তা’। এই অধ্যায় গ্রন্থটির আলম্বন-কেন্দ্র বা কেন্দ্রবিন্দু, চলতি ভাষায় বলা যায় আকর্ষীবিশেষ। কেন্দ্রবিন্দু যেমনভাবে নেতৃত্বদানে দল-পরিচালক হয়ে ওঠে তেমনভাবে এই প্রবন্ধটি গ্রন্থটির মুখ্য পরিচালক ও পরিবাহক হয়ে উঠবে বর্তমান থেকে ভবিষ্যত পাঠকের দরবারে। আর ‘ আকর্ষী’ রূপ এই প্রবন্ধ বহু স্বপ্নসন্ধানী গবেষণাললব্ধ ব্যক্তি, দ্বিজেন্দ্র অনুসন্ধিৎসু ব্রাত্যজনের দ্বিজেন্দ্র-মানসফল প্রাপ্তির সহায়ক হয়ে উঠবে। এই অংশে প্রাবন্ধিক ৬৫টি উপঅধ্যায় সহযোগে ডি.এল.রায় এর ‘ঘর’ এর দরজা এবং ‘বাহির’ এর বারান্দার সামনে দাঁড় করান আামদের। অর্থাৎ ব্যক্তিসত্তা ও শিল্পীসত্তার এই যুগলবন্দী লিখন পাঠককে নবপথযাত্রী করে তোলে। প্রসঙ্গত স্মরণযোগ্য প্রাবন্ধিকের মত — ‘ব্যক্তিত্বের কায়া যখন শিল্পে ছায়া বিস্তার করে, তখন তার নিরপেক্ষ আবেদন আপনাতেই ব্যাহত হয়। শুধু তাই নয়, সেই ছায়া কাটিয়ে ওঠার মধ্যে যেমন শিল্পীর মহত্ত্বের পরিচয় বর্তমান, তেমনই তার ব্যর্থতায় অমিত প্রতিভাধর শিল্পী ও মেঘে ঢাকা তারা হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রখর ব্যক্তিত্ব নিয়ে লেখনীকে হাতিয়ার করে তুলেছেন। তাঁর সেই আত্মঘাতী প্রকৃতির পরিচয় তাঁর রচনাবলীতেই বর্তমান।’ হয়তো এরপর আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রাবন্ধিক বিপ্রতীপতার পথ বেয়ে তাঁর প্রকাশ-বলে কখনো পাঠক সমাবেশে রাজবেশ পরিহিত দ্বিজেন্দ্রকে দাঁড় করান আবার কখনো তাঁরই কলমে দ্বিজেন্দ্র গেয়ে ওঠে গৌরীপ্রসন্নের সেই বিখ্যাত গানের চরণ— ‘মেজাজটাই তো আসল রাজা।’
৫.
সবশেষে বলা যায় সাহিত্যানুসন্ধিৎসু পাঠকেরা কোনো গ্রন্থ পাঠকালে মূলত দুটি রুটের মধ্যে নিজেদের যাওয়া-আসা সচল রাখে। প্রথম রুট— পাঠকের সাথে গ্রন্থটির সম্পর্ক; দ্বিতীয় রুট— নিজের সাথে লেখক মননের যোগসূত্র। এক্ষেত্রে পাঠক ‘তরী’; এবং ‘আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল’ গ্রন্থটি ‘তীর’। তীর আবার দ্ব্যর্থক। একটি ‘তীর’ যা পাঠককে আশ্রয় দেবে। দ্বিজেন্দ্রলালের ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি, মনন-মানসিকতার ছায়া কীভাবে তাঁর নিজ সাহিত্যের কায়ায় এসে হাজিরা দিয়েছে সেই সম্পর্কে এক নির্লিপ্ত, সিকিওর আশ্রয় পাঠক পাবেন। আর দ্বিতীয় ‘তির’ — ধনুকের তির; যা আপনার চেতনাকে লক্ষভেদী করে তুলবে। দ্বিজেন্দ্র-মুদ্রাদোষ, রবীন্দ্র-বিরোধ কীভাবে তাঁকে ‘আত্মঘাতী’ করে তুলেছে তারই এক বাস্তব দলিল এই গ্রন্থটি। প্রাবন্ধিককে কুর্নিশ এমন কিংবদন্তী গ্রন্থ সাহিত্যজগতকে উপহার দেওয়ার জন্য।
আত্মঘাতী দ্বিজেন্দ্রলাল, স্বপনকুমার মণ্ডল, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি, ২০১৯, করুণা প্রকাশনী, ১৮০.০০ টাকা।