বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন – ‘মানুষের বসতির পাশে অরণ্য আছে’। সত্যি বন-জঙ্গল-নদী-নালা-টিলা-পাহাড়ের মাঝে মানুষের বেড়ে ওঠা। সভ্যতার শুরু থেকে পশুপাখির সঙ্গে মানুষের বসবাস। তারা তাদের ভয় পেয়েছে আবার ভালোবেসেছে। বিভিন্ন সময়ে আমাদের গান-গল্প-প্রবাদ-ছড়া-রূপকথা-ছবিতে ধরা পড়েছে এই মিলেমিশে থাকার ছবি, ভয়-ভক্তির গল্প। বাংলার এই ঐতিহ্য ডিজনির Zootopia র থেকে বহু বছরের প্রাচীন।
এই কলকাতা ছিল একসময় জলে জঙ্গলে ভরা। বাঘ, কুমীর, শিয়াল, ভাম, ভোঁদড়, বেজি, সাপ, বনবেড়াল, গোসাপ, তক্ষক অবাধে সেখানে ঘুরে বেড়াতো। আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রথম সুপার প্রাণী বিশেষজ্ঞ রামব্রহ্ম সান্যাল ১৮৯২ সালে তার লেখা Animals in captivity in lower Bengal বইতে বলছেন, প্রথমদিকে আলিপুর চিড়িয়াখানার অধিকাংশ বন্যপ্রাণীকে সংগ্রহ করা হয়েছিল কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চল থেকে। বাঙালির Zootopia তাই মোটেই Etopia নয়। তা তৈরি হয়েছে আমাদের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের লৌকিক বা লোক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তার অজস্র নমুনা ছড়িয়ে আছে।

ছড়া
(১)
খোকা যাবে মাছ ধরতে
ক্ষীর নদীর কূলে,
ছিপ নিয়ে গেল কোলাব্যাঙ,
মাছ নিয়ে গেল চিলে।
(২)
চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে
কদমতলায় কে,
হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে
সোনামণির বে।
(৩)
খোকন খোকন করে মা’য়
খোকন গেছে কাদের নায়
সাতটা কাকে দাঁড় বায়
খোকন রে তুই ঘরে আয়।
প্রবাদ-প্রবচন
(১)
আয়রে আয় ভালুকে তেঁতুল খায়
শেওড়া গাছে ছয় বুড়ি গাছ আঁচড়ায়।
(২)
বাঁশ বনের কাছে
ভুঁড়ো শিয়ালি নাচে
তার গোঁফ জোড়াটি পাকা
মাথায় কনক চাঁপা।
(৩)
*কাগ রা’য় গেল বউ শেয়াল রা’য় এল
জেতের বউ তাই সব সামলে নিল
*কাগ রা মানে কাক ডাকা ভোর, শেয়াল রা মানে শেয়াল ডাকা সন্ধে।
(৪)
হাতি যখন কাদায় পড়ে
চামচিকা তাতে লাথি মারে
(৫)
ভাগ্যিমানের ইস্তিরি মরে
আভাইগ্যার *ঘুরা মরে
*ঘুরা মানে ঘোড়া।
এছাড়াও আমরা পাচ্ছি – গভীর জলের মাছ, মাছের তেলে মাছ ভাজা, ধরি মাছ না ছুই পানি’র মত উপমা।
লোকগান
ভাওয়াইয়া (প্রতিমা বড়ুয়া)
ও তোমরা গেইলে কি আসিবেন
মোর মাহুত বন্ধু রে
বিখ্যাত এ গানে প্রতিমা বড়ুয়া হাতি ও মাহুতদের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন।
বঙ্গজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পশুপাখিদের প্রতি বাঙালির মনোযোগ, পর্যবেক্ষণ, ভালোবাসার এমন বহু নমুনা ছড়িয়ে আছে আমাদের ছড়া ও গানে। এগুলির দিকে একটু নিবিষ্টভাবে তাকালে দেখা যাবে বাংলার প্রাণীবৈচিত্রের একটা সম্পূর্ণ ছবি। সবই আছে কিন্তু এসবের দিকে তাকানোর লোকই এখন বড় কম। আর কিছুদিন পর এসব ছড়া, গান খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর হবে। হারিয়ে যাবে বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।