হাওড়ার পুর নির্বাচনে এবারে কি ফাঁকা মাঠে গোল দেবে তৃণমূল কংগ্রেস? পরিস্থিতি সম্ভবত সেদিকেই যাচ্ছে। কারণ, শিল্পনগরীতে গেরুয়া শিবিরের গোষ্ঠীকোন্দল এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে পুরসভার ভোটে গভীর অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা করছে দলেরই শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ। এবং এর সুফল নিশ্চিতভাবেই ভোগ করবে তৃণমূল কংগ্রেস।
আসলে জেলার বিজেপি সংগঠনে এতদিন ধরে যাঁরা লাঠি ঘুরিয়েছেন, যাঁদের ইচ্ছাই ছিল সংগঠনে শেষ কথা, সাম্প্রতিক সমীকরণে তাঁরাই এখন কোনঠাসা। তার বদলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন তাঁরাই, যাঁদের গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন। এঁদের অধিকাংশই কিন্তু দলের অত্যন্ত পুরনো নেতা-কর্মী। একই সঙ্গে পুর নির্বাচনে দলের পরিচালনার ভার তুলে দেওয়া হয়েছে মূলত তৃণমূল কংগ্রেস থেকে আসা নব্য বিজেপিদের হাতে। স্বাভাবিকভাবেই দলের মধ্যে জটিলতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
ঘর গুছনো তো দূরের কথা, ঘরের ভাঙন আটকাতেই এখন কালঘাম ছুটে যাচ্ছে গেরুয়া শিবিরের। নির্বাচনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অন্তর্দলীয় কোন্দলে আরও ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলেছে শিল্পনগরী হাওড়ার বিজেপি। শুধুমাত্র দু’টি বা তিনটি গোষ্ঠী নয়, অজস্র গোষ্ঠী, একরাশ ইগো। অনেকের মধ্যেই মুখ দেখাদেখিও কার্যত বন্ধ। কোনও সমন্বয় নেই। দলীয় সংগঠন বলতে যা বোঝায় তা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ এক আদি বিজেপি নেতার মন্তব্যে হতাশা স্পষ্ট, ‘ অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে পুরবোর্ড দখল তো দূরের কথা, মোট ৫০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫/৭টা জুটবে কি না সন্দেহ।’ অন্তর্ঘাতের আশঙ্কাও করছেন দলের কিছু নেতা।
২০১৩-র পুরনির্বাচনে বিজেপি হাওড়ায় পেয়েছিল মাত্র দু-টি আসন। ২০১৯এর লোকসভা নির্বাচনে হাওড়ায় বিজেপি তৃণমূলের কাছে হেরেছিল লক্ষাধিক ভোটে। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে শহরের সবকটি আসন- দক্ষিণ হাওড়া, মধ্য হাওড়া,উত্তর হাওড়া, এবং শিবপুরে তৃণমূল প্রার্থীদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা। এবং এর অন্যতম নেপথ্য কারণ ছিল গেরুয়া শিবিরে অন্তর্দ্বন্দ্ব।
বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে হাওড়ায় মৌরসীপাট্টা চালিয়ে এসেছেন দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সিং। বিজেপির জেলা (সদর) কমিটির মাথায় তিনি বসিয়েছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং একান্ত অনুগত সুরজিৎ সাহাকে। নেপথ্যে যাবতীয় কলকাঠি নাড়তেন তিনিই। সংগঠনের আসল রাশ ছিল সঞ্জয়ের হাতেই। বার দুয়েক কাউন্সিলর হয়েছেন তিনি। কিন্তু পরপর দু’বার বিধানসভা নির্বাচনে মধ্য হাওড়া থেকে গোহারা হেরেছেন সঞ্জয়। তাঁকে নিয়েই দলের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে জ্বলছিল ক্ষোভের আগুন। মধ্য হাওড়ার অত্যন্ত পুরনো নেতা এবং দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি অম্বুজ শর্মাকে একেবারে কোনঠাসা করে রেখেছিল সঞ্জয়গোষ্ঠি। উত্তর হাওড়ার বিজেপি নেতা উমেশ রাইও মাথা তুলতে পারেননি সঞ্জয়দের দাপটে। দলের রাজ্য নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে এই নিয়ে বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেট ভাঙল তৃণমূল থেকে আসা নব্য বিজেপি নেতাদের দাপটে। সৌজন্যে অবশ্যই শুভেন্দু অধিকারী। সঞ্জয়-সুরজিৎকে এড়িয়ে পুর নির্বাচন কমিটির মাথায় বসানো হয়েছে তৃণমূল থেকে আসা হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র ডা. রথীন চক্রবর্তীকে। আর সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে দলের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করে জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন সুরজিৎ সাহা। নির্বাচন কমিটিতে জায়গা হয়নি সঞ্জয় সিং এবং তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠ অনুগামীরও। তাঁরাও একে একে ধরছেন সুরজিতের পথ। তবে এটা স্পষ্ট, হাওড়ায় দলের হয়ে নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারে, তৃণমূল থেকে আসা নব্য বিজেপি নেতাদের উপরেই আস্থা রাখছে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতৃত্ব। তাই রথীনের কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক জটু লাহিড়ি,সুপ্রীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতো একসময়ের দক্ষ সংগঠকরা। যদিও তাঁদের বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতা এক বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।বিজেপির সাংগঠনিক পরিকাঠামো এবং কর্মপদ্ধতির সঙ্গেও এখনও ঠিক মানিয়ে উঠতে পারেননি তাঁরা।
এদিকে দীর্ঘদিন বঞ্চনার পরে সম্মানজনক জায়গা পেয়েছেন সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ মানস নাগ, অম্বুজ শর্মা। তাঁরা দলের দীর্ঘদিনের সুখ-দুঃখের সাথী। কিন্তু এই কমিটি আদৌ কতটা কাজ করতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে বিজেপির অন্দরে। কারণ, হাতে সময় খুবই অল্প। দলের নড়বড়ে সংগঠন সামলে ওঠার মতো লোকবলও নেই। এর ওপরে পুরনির্বাচনে অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না গেরুয়া শিবির। একে ঠেকানোর মতো ব্যক্তিত্বপূর্ণ জনপ্রিয় নেতাও নেই জেলায়। স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গিয়েছে গেরুয়া শিবিরের নির্বাচনী ভবিষ্যৎ।