শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে দেশ একটু এগোলেও এখনও অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার পঞ্চম দফার ফল অন্তত সেকথাই বলছে। সমীক্ষাটি একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে রাষ্ট্রসংঘ নির্দেশিত ২০২২ এবং ২০৩০ এর লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে গেলে এখনও হাঁটতে হবে অনেকটা পথ। এই সমীক্ষা চলেছে দুটি পর্বে। সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে শিশুদের টিকাকরণের ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতি লক্ষ্যনীয়। ১২ থেকে ২৩ মাস বয়সীদের মধ্যে ৭৬.৪ শতাংশ শিশুকে বিসিজি, হাম, বসন্ত, পোলিও এবং ডিপিটি’র তিনটি ডোজ দেওয়া হয়ে গেছে। তবে একথা মানতেই হবে প্রান্তবাসী শিশুদের অনেকেই এখনও টিকাকরণের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

শিশুদের পুষ্টির জন্য জন্মের পর থেকে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো বেড়েছে। কমেছে শিশু মৃত্যুর হার। তবে এক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার থেকে এখনও আমরা অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি। বিশেষ করে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে গতবারের জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার থেকে এবারের অগ্রগতি খুবই কম। তবে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে একটা বিরাটসংখ্যক শিশুদের রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া। শিশুদের রক্তাল্পতা এবার চোখে পড়ার মত বেড়েছে। জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার চতুর্থ দফায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সের ৫৮.৬ শতাংশ শিশু ছিল রক্তাল্পতার শিকার। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭.১ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধি বিপজ্জনক।

রক্তাল্পতার সঙ্গে সম্পর্ক আছে পুষ্টির। চতুর্থ জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষায় জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ছিল ৪১.৮ শতাংশ। আগের সমীক্ষা থেকে আমরা মাত্র ২ শতাংশ এগিয়েছি। এদিকে নীতি আয়োগ জাতীয় পুষ্টি নীতিতে ৬.৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অ্যানিমিয়ার লক্ষ্যমাত্রা ২০২২ এর মধ্যে ১৯.৭ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন চিন্তা এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে কিনা তা নিয়ে। অসুস্থ মা মানেই অসুস্থ শিশু। এবারের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ১৫ – ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের রক্তাল্পতা বেড়েছে ৯.২৪ শতাংশ। বোঝাই যাচ্ছে সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে মেয়েদের রক্তাল্পতা কমানোর কাজটি বেশ কঠিন।

সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাফল্য নির্ভর করছে জাতীয় পোষণ অভিযানের সাফল্যের ওপর। এটা মনে রাখতে হবে দেশের শিশুদের একটা বড় অংশ এখনও নানা ধরণের অপুষ্টি ও ক্ষুধায় ভোগে। কোভিড এসে পরিস্থিতি আরও জটিল করে দিয়েছে। লিঙ্গবৈষম্যও শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা। এদেশের বহু কন্যা সন্তানই জন্মের পর থেকে এই বৈষম্যের শিকার হয়ে অপুষ্টিতে ভোগে। শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এই বৈষম্যের অবসান না ঘটালে কোন পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হবে না। একেবারে প্রান্তবাসী শিশুদের কাছে জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে না দেওয়া গেলে রাষ্ট্রসংঘ নির্দেশিত সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে।