বহুকাল আগে থেকেই বাংলায় একটা প্রবাদ চালু আছে, খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে/ মরল সে এঁড়ে বাছুর কিনে। এই প্রবাদ কেন চালু হয়েছিল জানিনা, তবে এটা অনুমান করা যায় যে তাঁতি তাঁত বুনে তার জীবন নির্বাহ করতে না পারায় অধিক লাভের আশায় এঁড়ে বাছুর কিনেছিল চাষ করবে বলে। তাতে তার তাঁতটাও গেল, চাষবাসও করা হয়ে উঠল না। কারণ বংশপরম্পরায় তাঁত চালিয়ে জীবিকা অর্জন করা তাঁতি সেটা ভালোভাবে করতে পারল না।

কিন্তু প্রশ্ন, তাঁতি কেন তাঁত ছেড়ে এঁড়ে বাছুর কিনতে গেল? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একসময় ঢাকার কিছু কিছু সোনার কারবারি সোনার কাজ ছেড়ে তাঁতের কাজ ধরেছিল, কারণ সে সময় তাঁত এতটাই লাভজনক ছিল। তারপর ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের ধাক্কায় যন্ত্রচালিত তাঁতের পেষণে বাংলার তাঁত অন্তর্জলী যাত্রার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। তাঁতিরা তাঁত ছেড়ে অন্যান্য পেশা গ্রহণ করতে থাকল। এই পেশা পরিবর্তন করতে গিয়ে কতজন যে অনাহারে অর্ধাহারে মারা গেল, তার খোঁজ খবর কেউ রাখে নি। তার মধ্যেও কিছু কিছু তাঁতি বিদেশি মিলের সুতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়ে কোনো রকমে টিকে গেল শিবরাত্রির সলতে মতো।
এরপর দেশ স্বাধীন হল। দেশবিভাগের কবলে পড়ে আবার তাঁতিরা উদ্বাস্তু হয়ে পাড়ি জমালো নতুন দেশে, নতুন মাটিতে নতুন করে শেকড় স্থাপন করে বাঁচার লড়াই এ টিকেও গেল।

কিন্তু ইতিহাস তাদের পিছু ছাড়ে না। আবারো সেই যন্ত্রতাঁতের পুনরাবৃত্তি। আবারো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। সংবাদে প্রকাশ, এ যন্ত্রতাঁত তৈরি করবে স্কুলড্রেস, রেডিমেড পোশাকের কাপড়, গৃহসজ্জায় ব্যবহৃত দ্রব্যাদি। কিন্তু ১৯৮৫ সালের হস্ততাঁত সংরক্ষণ আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, সরকারের নাকের ডগায় যেভাবে হাতের তাঁতের শাড়ি তৈরি করে, তার বাজার নষ্ট করে তাকে কোণঠাসা করে দিয়ে পাওয়ারলুম রমরমা করছে, তার সেই মারণ রথ ঠেকাবে কে! এতদিন লুকিয়ে চুরিয়ে চলছিল কাজকারবার। এবার সরকারের বদান্যতায়, অনুপ্রেরণায় হাতে যেন স্বর্গ পেল পাওয়ারলুম। ব্রিটিশ সরকারের ঔপনিবেশিক স্বার্থ ছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকার কিসের স্বার্থ!

এখন তাঁতি এঁড়ে বাছুর কিনবে না আলু-পটল বিক্রি করবে, নাকি রাজমিস্ত্রির লেবার হয়ে পরিযায়ী হবে- সেটা তারাই চিন্তা করুক! কারণ তারা মরলে কারো কিছু যায় আসে না! পাওয়ারলুম শাড়ি তৈরি করবে, কাপড়ের ব্যবসায়ীরা সেই কাপড় ৫০০ টাকায় বিক্রি করবে, আমরা খরিদ্দাররা ৫০০ টাকার অলওভার জামদানি পেয়ে খুশি হবো— এটাই তো ভবিতব্য! তাঁতি- মহাজন সামাজিক বোঝাপড়ার সম্পর্কের পরিবর্তে মিল মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক তৈরি হবে। আর আমরা, সৌখিন গবেষকরা, হস্ততাঁতশিল্পের কঙ্কালের ওপর দাঁড়িয়ে গবেষণা করে পাতা ভরাব, নিজেদের ডিগ্রী বাড়াবো আর ‘মোদের একখান দ্যাশ ছিল’-এর মতো বলবো, ‘আমাগো একখান তাঁত আছিল!’
দুঃখ