পাশের গ্রাম বড়ডাঙায় সন্ধে হলেই আসর বসে যায়। ‘হাটুয়া’দের আসর। নাটুয়া নাচ হয়, ‘চড়িয়া-চড়িয়ানী’র গান। ‘ফরিখেল’-এর মাঠে লম্বা লম্বা লাঠি হাতে মহড়ায় নেমে যায় ভটা ডোম। প্রহ্লাদ সিং। মহড়া নাচ হয়। তি-রি তি-রি হাওয়ায় কাঁপতে থাকে তলোয়ারের মতো ধারালো আখের পাতাগুলি ‘আখুবনে’, নদীধারে।
হয়তো কাঁকড়ার খোঁজে খালে-বিলে ভ্রাম্যমাণ দু-চাট্টা শিয়াল ডেকে ওঠে একত্রে, একসঙ্গে। হাওয়ায় ভেসে আসে ঢোল-বাজনার তালে তালে চড়িয়া- চড়িয়ানীর গান— ‘আ লো যুবাকালে মো পাশে নাহি মোর ঘৈতা লো…!’
আর এসবেরই নাটের গুরু নুয়াসাহীর অনন্ত দত্ত। জাতে রাজু। আমি তাকে যার পর নেই সমীহ করি। তাঁর হাত ধরে কত কত ছোকরাই যে তরে গেল! আমাদের গ্রামের টুম্পা, ভালো নাম সত্যরঞ্জন, অনন্ত দত্তের হাতের ছোঁয়ায় বনে গেল এ তল্লাটের নামকরা নাচুয়া।
লাইবুকু, ভালো নাম নবীন। নবীন হয়ে গেল এ তল্লাটের সেরার সেরা গায়িকা। দু’হাত মেলে ধরে, দু’হাত নেড়েচেড়ে মেয়ে সেজে সে যখন গাইতে শুরু করে— ‘কে নিবি ফুল? কে নিবি ফু-উ-ল? বেলা-মালতী-চাঁপা ও বকুল…’ তখন? তখন হাততালির ছররা ফুটে উঠবে না ভরা আসরে? তামাম দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠবে না, ‘এ-ন্-কোর! এ-ন্-কোর!!’ অর্থাৎ দৃশ্যটা আবার হোক, আবার হোক!
তো, সেই লাইবুকু ওরফে নবীন হয়ে গেল আমার ‘রোল মডেল’। তখন স্বপ্নে জাগরণে শুধু ‘নবীন’ ‘নবীন’। তার ওপর নাটের গুরু অনন্ত দত্তেরও কী জানি কীভাবে পছন্দ হয়ে গেল আমাকে। আমাদের গুরুবারের হাটে মুলো-সজনে ডাঁটা-পোকামোকা বেগুন-শুকামাছ সওদা করতে এসে রাজুর পো তো হপ্তায় হপ্তায় দরবার করে গেলেন মায়ের কাছে, ‘বউদি গো, টকাটারে মোর নাটুয়া দলে সঁপি দও, মু গড়িপিটি মানুষ করি নিমু।’
‘হ্যাঁ’ করে দিন না মা, রাজুর পো অত করে বলছেন যখন! মা বললেন, ‘ন্না ঠাকুরপো, ছেলেটা এখন লেখাপড়া করছে আরও কিছুদূর করুক তো!’ ধুতির খুঁটে বাঁধা পোকামোকা বেগুন কাঁধে ফেলে বিমর্ষ মুখে অনন্ত দত্ত হাঁটা দিলেন। আমারও আর যাত্রাদলে চড়িয়া-চড়িয়ানী সাজা হল না এ জন্মের মতো।
মাঝে মাঝে মা যে কী করেন না!
দুই
আমার মেজকাকা তখন তল্লাটের নামজাদা কোবরেজ। দূর দূর গ্রাম থেকে সাঁঝ-সকাল রাত-বিরাত ‘কল’ আসছে। কারওর বুকে ‘পদ্মল ঘা’ কারওর বা সন্নিপাতি, মধুমেহ। তার মধ্যে দিনে একটা-দুটো ‘সাপ-কাটি’ তো আছেই। কাকার ক্লান্তি নেই, রোগীর অবস্থা বুঝে রোগের নাম শুনে ওই যা একটু ভুরু কোঁচকানো! তারপর ওষুধের বটুয়া হাতে ধন্বন্তরির মতো বেরিয়ে পড়া।
ওষুধ গাছের কতরকম নাম। গদগাছ, কিরকিচ্, পিটনা-সিজ, ঘি-কুমারী, লাল-ভেঁড়রা, হাড়জোড়া, দধিগড়া, দুধিয়া, শ্বেতবিড়ালা, বাঘনখী, ছাগলহাঁচি। ছাগলহাঁচি কি বাঘনখীর গুণে যখন পদ্মল ঘা ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছে, গদগাছের রসে কি গোলমরিচের গুঁড়োয় সাপ-কাটির রোগী যখন আস্তে আস্তে চোখ খুলছে, তখন আমাদের দশাসই মেজকাকা ঘরে ফিরে মাটির দাওয়ায় বসে এমন সর্বহারার ভাব করতেন যে আমাদের মা-কাকিরা তার কোনও কুল-কিনারা খুঁজে পেতেন না।
আসলে মেজকাকা মনে মনে অঝোরঝর ভাবতেন, সবই তো হল কিন্তু তারপরে কে? মেজকাকার অবর্তমানে তার কোবরেজগিরি কার ওপর বর্তাবে? ‘কারে দিয়া যাব গো?’ এহেন আকুল চিন্তায় অত সাফল্যের পরেও আমাদের মেজকাকা কেমন মুষড়ে পড়তেন।
অগত্যা মা-কাকিরা যোগ্য উত্তরসূরি ভেবে আমাকেই ঠেলে-গুঁজে পাঠিয়ে দিতেন, ‘যা না ললিন দু-চাট্টা সাপকাটির মন্তর অন্তত, অমন সুযোগ হেলায় হারাস না।’
সেই হাঁটু মুড়ে বসা, হাঁটুতে কাপড় ঢেকে বসা। মেজকাকা ফিসফিস করে আওড়ে চলেছেন, ‘মেঘ কন্ কন্ আঁধার রাতি সাপে মারল ঘা। হেনকালে বিপদ হৈল স্মরণ করব কা।।’ আমিও বিড় বিড় করে মুখস্থ করছি, ‘মেঘ কন্ কন্ আঁধার রাতি সাপে মারল ঘা…’
আর যাই কোথায়। মুখস্থ করছি বটে, কিন্তু মুহুর্মুহু মনে হচ্ছে, এই বুঝি একটা ‘হলহলিয়া’ ওই বুঝি একটা ‘দুধিয়া’। যেন ঢুকে এল পায়ের তলায়, দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে গেল। গলে গেল কোথায়? ওই তো ফিরে এল হল্ হল্ করে, আংকুড়া-বাংকুড়া হয়ে।
চোখ বুজে ফেলি ভয়ে, ‘হেনকালে বিপদ হৈল স্মরণ করব কা?’ ‘না মেজকা, আমার দ্বারা ওসব হবে না।’
কোবরেজ হবার অতবড় ‘চান্স’টাই মাটি হয়ে গেল আমার!
তিন
কোবরেজি গেল, নাটুয়া দলে ‘নাচুয়া’ও হওয়া গেল না—আমার দ্বারা আর কী হবে? আর কী হওয়া যায়, অতপর তক্কে তক্কে থাকি। একদিন দেখি, যেখানে পায়ে চলার পথটা মাকড়া পাথরের ‘হুড়ি’ ভেঙে উঠে গেছে উপরে আরও উপরে, সেখানে গাধার পিঠে বোঁচকা-বুঁচকি বেঁধে, শিকলি বাঁধা মেনি বাঁদরকে টানতে টানতে ঘাগরা পরা একদল নারীপুরুষ হেঁটে চলেছে আমাদের ইস্কুল টাঁড়ের হেলে পড়া বটতলার দিকে।
ক’দিন বটতলা জমজমাট। ইট ভাঙা, পাথরের টুকরো, কাদামাটি দিয়ে উনুন থেকে ধোঁয়া উড়ছে অনর্গল। রান্না হচ্ছে চামচিকে-বাদুড়ের ঝোল। আমাদের গ্রামের ঝাড়েশ্বর রোজ দু’বেলা ঝরনার দিকে বিলে-বাতানে যেতে আসতে বটতলায় বুকের উপর দু’হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। একবার তাকাচ্ছে ফুটন্ত কড়াইয়ে নিহত চামচিকে-বাদুড়ের দিকে, আর একবার তাকাচ্ছে ত্রৈলোক্যদের শিমুলগাছে অবশিষ্ট জীবন্ত ও ঝুলন্ত চামচিকে-বাদুড়ের দিকে, আর জোরে জোরেই বলছে, ‘ইঃ বাবাঃ! এসব হাগ্রে-বাজকাররা আর ক’দিন থাকলে এ তল্লাটের চামচিকে-বাদুড় যে ঝাড়ে-বংশে শেষ হয়ে যাবে!’
শুধু কি চামচিকে-বাদুড়, ব্যাঙ-ইঁদুর-শামুক-সামখোল-গেঁড়ি-গুগলি কী না খেত এবারের হা-ঘরে যাযাবরের দলটা! তবে হ্যাঁ, খাপখোলা তলোয়ারের মতো ধার ছিল পায়ে ‘খাড়ুয়া’ হাতে ‘বাজু’ পরা এবারের যুবতী ঘাগরাউলিদের। শম্ভু বাগাল তো তাদের আশপাশে, কি ঝরনায় জল আনতে গেলে কি গ্রামের ভিতর জড়িবটি বেচতে এলে, অষ্টপ্রহর ছুঁক ছুঁক করত। তবে তেমন কিছু করে ওঠার সাহস পেত না, কারণ সে শুনেছিল—এ ‘জাত’টার ঘাগরার ভিতর গোঁজা থাকে ‘গুপ্তি’। তার মানে এক ধরনের কুকরি, বিষমাখা।
আমার সে-ভয় নেই। যার জন্য, যাদের জন্য বটতলায় সকাল-বিকাল যেতাম-আসতাম সে বা তারা ঘাগরাও পরে না, বড় জোর ল্যাজ নাড়ে কান ঝাড়ে, অন্যের মাথার উকুন বেছে দেয়, আরও বেশি বিরক্ত করলে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে হেসে ওঠে।
সেই আমারও কী যে হয়ে গেল, শুধু রাতটুকু পোহানোর অপেক্ষা! সকাল হলেই দৌড়ুতাম বটতলায়, আর সে তখন এনামেলের থালায় ভাত নিয়ে ঘুরে ঘুরে খেত। দু’হাত ভরতি কাচের চুড়ি বাজত—রিন্ ঠিন্! রিন্ ঠিন্! পায়ে কি ‘মল’ ছিল? ছিল, ছিল। সে যখন পায়ের মল হাতের চুড়ি বাজিয়ে ঘাগরা দুলিয়ে ঘুরে ঘুরে খেত, তখন দলের বুড়ো সর্দারটা পায়ের বুড়ো আঙুলে ‘গুলতি’র আঙটা আটকে ‘ছিলা’য় টান দিত। কারওর দিকেও না, এমনি, মিছামিছি। তবু সে ভয়ে হোক নির্ভয়ে হোক, এঁটো হাতেই ঘাগরা গুটিয়ে একদৌড়ে ‘সাজঘরে’ ঢুকে পড়ত। আমি তার পুনঃপ্রবেশের অপেক্ষায় আকুল হৃদয়ে পলকহীন চোখে সাজঘরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
আমাদের গ্রামের দশরথ চুপিসারে কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে টের-ই পাইনি। আমার চোখের সামনে হাতের চেটো নেড়েচেড়ে সে বলছে, ‘কী দেখছিস অমন ফ্যাল ফ্যাল করে? চাস যদি তো তোর বিয়ে দিয়ে দেব ওই হা-ঘরে ছুঁড়িটার সঙ্গে!’
পরিষ্কার বাংলা কথা, তবু যেন সে বুঝে ফেলে ‘সাজঘর’ থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল, এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল লাজে-রাঙা-বধূটির মতো! আমিও লজ্জায় নত হই, চেষ্টা করছি কোনও মতে দশরথদার বগলের তলা দিয়ে গলে পালিয়ে যেতে। দশরথদা জাপটে ধরে বলল, ‘পালাচ্ছিস যে বড়? বিয়ে করবি তো দাঁড়া।’
আর দাঁড়া, দৌড়-দৌড়, কিন্তু পরের দিন সকাল হলে ফের যে-কে-সেই। সেই বটতলা, সেই এনামেলের থালা, সেই ঘুরে ঘুরে ভাত খাওয়া। বধূ-বধূ ভাব, কী যেন বললও আমাকে। কী বলল? বলল কি ‘ও বেলা এসো, কথা আছে’? এ বেলা নয় ও বেলা, ও বেলা নয় সে বেলা, আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু—দিনের পর দিন, হপ্তার পর হপ্তা। আচ্ছাই মেয়ে তো, বলব-বলব করেও বলছে না!
অবশেষে মনে হল, কাল। হ্যাঁ কাল। তখনও অন্ধকার কমেনি, ইস্কুল-টাঁড়ের বটতলা ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় মশগুল। আমাদের গ্রাম থেকে ইস্কুল-টাঁড়ে যেতে-আসতে একটা নড়বড়ে কাঠের পুল আছে, ধরে ধরে সাবধানে পেরতে হয়। আজ যেন মনে হল, পুলটা বেশ শক্তপোক্তই, লাফিয়ে লাফিয়েই পেরিয়ে এলাম।
কুয়াশার ধোঁয়া চোখে-মুখে ঝাপটা দিচ্ছে। দু-হাত দূরের জিনিসকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবু কুয়াশা ঠেলেই দৌড়ুলাম। দৌড়-দৌড়—
পৌঁছে দেখি—বটতলা ফাঁকা, জনমনিষ্যি নেই। পড়ে আছে— ভাঙা উনুন, পোড়ামাটি, ধোঁয়ামাখা পাথর, চামচিকে-বাদুড়ের ঠ্যাঙ। নেই শুধু সলজ্জ বধূ-বধূ ভাব নিয়ে বিগলিত যাযাবরী মেয়েটা।
বটতলা ফাঁকা করে চলে গেছে হা-ঘরে বাজিকররাও। কিন্তু থেকে গেছে সেই ‘গন্ধ’টা। হায়, হা-ঘরে বাজিকরদের দলে ভিড়ে হা-ঘরে বাজিকরও হতে পারলাম না!
প্রথম প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭
ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল গল্পটা পড়ে।এমনই কতো কতো স্বপ্ন দেখতাম আমিও ছোটবেলায়।