ভম্বল দাস ডাক্তারের কাছে গেলো। ডাক্তারকে বললো, স্যার, আমার পালিত মুরগিগুলো ডিম পাড়ে। কিন্তু ডিম খুব ছোট দেয়। কি করলে মুরগির ডিম বড় হবে?
ডাক্তার একটু গোঁফে হাসলেন, তারপর বললেন, আপনার এলাকায় কি ঝোঁপঝাড় কিংবা জঙ্গল বেশি?
ভম্বল দাস বললো, হ্যাঁ, তা তো আছে। বাড়ির সামনে একটি হলুদের ক্ষেত ও কিছু ঝোঁপঝাড় আছে।
ডাক্তার বুঝতে পারলেন বিষয়টি, তখন বললেন, শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব আছে, তাই না?
ভম্বল দাস হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো। ডাক্তার বললেন, শিয়াল, খাটাশ, বেজির ভয়ে আপনার মুরগির পর্যুদস্তু অবস্থা। তাই ডিম ছোট হচ্ছে। শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব যদি কমে তবে আপনার মুরগির ভয় দূর হবে, ডিম দেবে বড়। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। গর্ভবতী মা যদি মানসিক সমস্যায় ভোগেন, মাথায় দুশ্চিন্তা থাকে, শব্দ দূষণ আশপাশে থাকে কিংবা স্বামী-সংসার দ্বারা নির্যাতিত হন তবে সে মায়ের বাচ্চা আন্ডারওয়েট হতে পারে।
ভম্বল দাস সব বুঝতে পারলো। বাড়ি এসে মুরগির ঘর খুলে তাদের সাথে কথা বললো, তোদের এত ভয় তা আমাকে আগে বলিসনি কেন? শিয়াল, খাটাশ, বেজির ভয়ে ছোট ছোট ডিম দিচ্ছিস?
এক মুরগি বললো, শিয়াল, বেজির ভয়ে খুশি মতো বেড়াতে পারি না।
আর এক মুরগি বললো, ঘর থেকে পা ফেললে ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা।
এক মুরগি মা বললো, বাচ্চাগুলোকে বাগান ঘেঁটে কিছু পতঙ্গ খাওয়াতে পারি না। আমার বাচ্চাগুলো এ জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
এক মুরগি ছানা বললো, ডানা না থাকলে সেদিন বেজির খাদ্য হতাম আমি। আমার সেদিন থেকে খাওয়া দাওয়া নেই।
এক অসুস্থ মুরগি বললো, আমার শরীরে এক বেজির দাঁতের আঁচড়ের দাগ, ওহ কি ব্যথা!
আর এক মুরগি মা বললো, আমার চার চারটা বাচ্চা খেয়েছে বেজি।
এক মোরগ বললো, রাতে ঐ বাগানে খাটাশ ডাকে। ভয়ে আমি আর সকালে বাক দেই না।
এক চঞ্চল মুরগি বললো, তাই ঐ বাগানে মোরগের সাথে আমি ঘুরতে যাচ্ছি না।
একটি হাঁস বললো, রাতে খাটাশ এসে দরজায় বসে। কবে দরজা খুলে আমাদের টুটি যে টেপে!
এক ডিম পাড়া মুরগি বললো, ভয়ে মুখে জল থাকে না। আমি বুঝতে পারছি না কেনো ডিম ছোট হচ্ছে, আমার মা বললো, আমি বড় বড় ডিম দিতাম, তোদের যে কি হলো!
ভম্বল দাস সবাইকে থামালো। বললো, চুপ, সব চুপ। তোদের মনে এতো প্রশ্ন, এতো ক্ষোভ আমি কি জানতাম? তোরা যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারিস, উড়তে পারিস, তার ব্যবস্থা করছি। তোরা নিশ্চিন্তে থাক।
পরদিন কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেললো ভম্বল দাস। জঙ্গল অভাবে শিয়াল, খাটাশ, বেজি পালালো। বেশ ক দিন অবস্থা ভাল থাকলো।
একদিন বৃষ্টি ভেজা দুপুরে শিয়াল ছাগলের দড়ি ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে। ছাগল ওর সাথে যাবে না। শিয়াল তা বুঝতে চাচ্ছে না। ভম্বল দাস এলে শিয়াল পালালো। ছাগল বললে, প্রায়ই শিয়াল এসে আমার সাথে ভাব নেয়। ওর সাথে যেতে বলে। আমার এক সখি ওর সাথে গিয়েছিলো। আর ফিরে আসেনি। তাই আমি ওর কথায় রাজি হয়নি। আজ নিয়ে যাওয়ার জন্য টানা হেঁচকা করছিলো।
ভম্বল দাস মহাচিন্তায় পড়লো। ছাগলটাকে পতিত মাঠে বেঁধে দিয়েও কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই বাড়ি নিয়ে এলো।
ভম্বল দাস কুকুর সর্দারের কাছে গেলো। কুকুর সর্দার ভম্বল দাসকে বসতে দিলেন। ভম্বল দাস বললো, আপনার সহয়তা আমার খুব দরকার।
কুকুর সর্দার হো হো করে হেসে নিয়ে বললেন, আমার সহয়তা তো সবাই-ই নেয়। তা বল, কিভাবে সহয়তা করতে পারি?
ভম্বল দাস বললো, আমার কিছু হাঁস, মুরগি, ছাগল আছে। এলাকায় শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় মহাসমস্যায় পড়েছি। আপনার তো বিশাল কুকুরবহর আছে। আমার হাঁস, মুরগি আর ছাগলগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য কিছু কুকুর দিতে হবে।
কুকুর সর্দার ভম্বল দাসকে আশ্বস্ত করলেন। ভম্বল দাস নির্বিঘ্নে বাড়ি এলো। হাঁস মুরগি আর ছাগল এতো দিনে নিশ্চিন্ত হলো। ছাগল জাগর কাটতে লাগলো। তার ছোট ছোট বাচ্চাগুলো দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। মুরগি আর মোরগগুলো গোল হয়ে বিশ্রাম নেচ্ছে। উঠতি বয়সী মোরগটি আর মুরগি আলাদা স্থানে বসেছে। তারা গল্প করছে। মোরগটি বললো, ছোট খাটো তুমি, সুন্দর পালক আমাকে মুগ্ধ করেছে।
মুরগিটি বললো, তোমার গলার নিচে কি সুন্দর লতা, মাথায় কি আকর্ষণীয় লতা, লেজটি কি সুন্দর! আমি পাগল হয়ে যাই। তাই তুমি খেতে খেতে কুটকুট করে ডাকলে আমি ছুটে চলে আসি।
মোরগটি বললো, আমার খুব হাসি পায়, জানো, মুরগিদের চেয়ে মোরগগুলো সুন্দর, গাভির চেয়ে এঁড়ে গরু সুন্দর, মেয়ে ছাগলের চেয়ে খাসি সুন্দর, সিংহীর চেয়ে সিংহ সুন্দর। অর্থাৎ সবক্ষেত্রে পুরুষরাই সুন্দর। কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা সুন্দর।
মুরগিটি বললো, ঠিকই, ভম্বল দাসের চেয়ে তার বৌটি কি দারুন!
পাঁচ সাতটি কুকুরের পদচারণা এলাকাতে বেড়ে গেলো। ভয়ে শিয়াল, খাটাশ, বেজি গভীর বনে চলে গেলো। শিয়াল একটু জল খেয়ে বললো, খাওয়া দাওয়া কমে গেলো। মাংসাশী প্রাণী আমরা, মাংস না খেলে ভালো লাগে?
বেজি বললো, চুপটি মেরে বসে থাকতাম। মুরগি ছানা পেলে নিয়েই দৌঁড় দিতাম। বৌ আর আমি মিলে মিশে খেতাম। আহ, সব দুঃস্বপ্ন!
খাটাশ বললো, তোমরা তো দিনে খেতে পেতে। দিনে তো আমি গর্তে থাকতাম। সেই গর্তও ভম্বল দাস বন্ধ করে দিয়েছে। রাতে একটু বের হতাম। কুকুর পাহারা দিচ্ছে। আমাকে দেখলেই ডাক জুড়ে দেয়। মানুষগুলো তখন বের হয়ে আসে। পালাই আমি। পিছন পিছন দৌঁড়ায় কুকুরগুলো। কবে যে ধরায় পড়ি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, আমরা কি খেটে খাওয়া প্রাণী? অন্যের পোষা প্রাণী খেলে কুকুরের এতো দোষ কেন? কত দিন না খেয়ে থাকা যায়?
বেজি বললো, আমার বাচ্চাগুলোর নাজেহাল অবস্থা। আমাকে দেখলেই কেউমেউ করে। ক্ষুধার জ্বালায় ওরা শেষ। এখন কি আর সেই দিন আছে? আহা, কত খেয়েছি মুরগি ছানা! ভূড়ি হয়ে গিয়েছিলো। তেল তেল করতো শরীর। আমার স্বামী বলতো, দিন গেলেই তোমার শরীরের বাড় বাড়ছে, আর এখন থুত্থুরে বুড়ি।
শিয়াল বললো, আমার বুদ্ধিতে কাজ হচ্ছে না। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেও ছাগলটাকে আনতে পারলাম না। এখন ভম্বল দাসের নজরদারি। আবার কুকুরের বাড়াবাড়ি। আমাদের যেন দুর্ভিক্ষ এলো। বাঁচবো না আর। কি দিন যে এলো।
কুকুরগুলো মুরগিগুলোর সাথে ভাব নেয়। মোরগ এলে কুকুরগুলো কথা পরিবর্তন করে ফেলে। আজ মোরগ ছিলো না। তাই একটি কুকুর বললো, আমরা তোদের পাহারা দিচ্ছি বলে আর শিয়াল, খাটাশ, বেজি তোদের খাচ্ছে না। আমাদের কোন দিন ধন্যবাদও দিলি না।
একটি মুরগি বললো, সরি, দেরিতে হলেও ধন্যবাদ গ্রহণ করেন।
কুকুরগুলো খুশি হলো, বললো, আমরা জেনেছি তোরা ডিম পাড়িস, লাল ডিম, সাদা ডিম। শুনেছি, খেতে নাকি খুব সুস্বাদু।
একটি মুরগি বললো, হ্যাঁ, সুস্বাদু। ভম্বল দাস বিক্রি করে টাকা রোজগার করে।
এক কুকুর বললো, আমরা তোদের পাহারা দিই, দুটো একটা ডিম দিলে তো পারিস, খেতাম, দেখতাম কেমন স্বাদ।
অন্য মুরগি বললো, ভম্বল দাস যদি রাগ করে?
কুকুর বললো, মাঝে মধ্যে দুটো একটা ডিম না পেলে ভম্বল দাস কিছু মনে করবে না।
অন্য এক মুরগি বললো, আপনারা আমাদের জীবনের রক্ষাকারী, আমরা মাঝে মধ্যে ডিম আপনাদের দেবো।
ছায়াযুক্ত স্থানে দুটো কুকুর বসে জিরাচ্ছিলো। আর সুখ-দুঃখের গল্প করছিলো। এক কুকুর বললো, সর্দারের নজরদারি বেড়ে যাচ্ছে। পাহারাই দিচ্ছি। উপরি পাওনাটা আর হচ্ছে না। আহা, আগে পাহারা দিলে ভাতের মাড় খেতে দিতো ভূ-স্বামী। কত যে হাড়-গোড় খেয়েছি নয়ামিয়ার দরজায় বসে।
অন্য কুকুরটি বললো, কষ্টই করি আমরা। ফল পাই না। যা পাই তাতে কি পেট চলে? এভাবে বেঁচে থাকার নামই কি জীবন? আমাদের শখ আহ্লাদ পূরণ হবে না?
হঠাৎ ওরা শিয়ালকে দেখতে পেলো। ওমনি ওরা শিয়ালকে তাড়ালো। শিয়াল আজ দৌঁড়ে বাগানের মধ্যে ঢুকে গেলো না। সাহস করে দাঁড়িয়ে থাকলো। কুকুর দুটো এলো। এক কুকুর বললো, এই দৌঁড়া, পালা, দাঁড়ালি কেন? পালা বলছি, নতুবা সর্দারের হাতে তুলে দেবো কিন্তু।
শিয়াল বললো, পনের দিন না খাওয়া ভাই। দৌঁড়াতে পারছি না।
অন্য কুকুর বললো, অন্যের গড়া জিনিসে মুখ দিস কেন? লজ্জা করে না?
শিয়াল বললো, কাজ কর্মে মন বসে না। সারা জীবন চুরি করে খাওয়া অভ্যাস বদলাতে পারছি না। এভাবে সূক্ষ্ম ভাবে পাহারা দিলে বাঁচবো না তো। ভাতের মাড় আর হাড় গোড়ই তো খেয়েছেন। মাংস খেয়েছেন? খেলে বুঝতেন স্বাদ কি? শক্তি বাড়বে। দৌঁড়ায়ে প্রথম হতে পারবেন। কোন দিন দৌঁড়ায়ে শিয়াল ধরতে পেরেছেন?
এক কুকুর কান খাড়া করে বললো, কি বলতে চাস?
শিয়াল বললো, দেখেও না দেখার ভান করবেন। আমি ছাগল শিকার করবো। হাড় দেবো, মাংস দেবো। সব উপরি পাওনা আর কি! ঘুমাবেন, শরীর ভাল থাকবে।
অন্য কুকুর বললো, খাওয়া দাওয়ার অভাবে আমরা শীর্ণ হয়ে যাচ্ছি। আর তোদের কি সুন্দর স্বাস্থ্য।
দ্বিতীয় কুকুরটি বললো, সর্দার যেন জানতে না পারে। আমরা দেখেও না দেখার ভান করবো। তোরা আবার অন্যের পোষা প্রাণী ধর, মার, খা।
শিয়াল লেজ নাচাতে নাচাতে বেজি আর খাটাশের কাছে এলো, বেজি শিয়ালের লেজ নাচানো দেখে বললো, লেজ মনে হয় তোমার একারই আছে!
কথাটি বলে বেজিও একটু লেজ নাচালো। খাটাশ বললো, শিয়ালকে যে খুব খুশি লাগছে!
শিয়াল বললো, কুকুরদের সাথে আঁতাত করে এলাম। এবার ভম্বল দাসের হাঁস, মুরগি, ছাগল খেলে কুকুররা আর আমাদের তাড়াবে না। বিনিময়ে ওদেরও কিছু দিতে হবে।
বেজি বললো, সত্যি বলছো? পারো মামা, শিয়াল মামা তুমি সব পারো।
সেদিনের পর থেকে আবারও শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব বেড়ে গেলো। ভম্বল দাস এলে কুকুরগুলো শিয়াল, খাটাশ, বেজিকে একটু দূরে তাড়িয়ে দেয়। ভম্বল দাস চলে গেলে কুকুরের সাথে শিয়াল, খাটাশ, বেজি এসে গল্প করে। এক কুকুর তো একদিন শিয়ালের গুহাতে গিয়ে থেকে এলো। বেজিও তার সুখ-দুঃখের গল্প করলো অন্য একটি কুকুরের সাথে।
ভম্বল দাস ভ্রূ কুঁচকায়, মাথা চুলকায়। শিয়াল, খাটাশ, বেজি আর কিছু কুকুরের পেট ভরে। ভম্বল দাসের যা কিছু অবশিষ্ট মুরগি থাকলো তারা আবার ডিম ছোট দিতে শুরু করলো। ভম্বল দাস আজো বুঝতে পারছে না পাহারাদার থাকতে তার মুরগিগুলো ছোট ছোট ডিম কেনো দিচ্ছে!