আদিম কোনো সমাজে সম্পত্তির যৌথ মালিকানা যেদিন হাত বদল করে ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তরিত হলো, সেদিন থেকেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নির্ণয় করার সমস্যা সামনে এসে গেল। সমাজ এই সমস্যার সমাধান করেছিল নবজাতকের পিতৃপরিচয় নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে। আদিম সাম্যবাদী সমাজে সেটা ছিল এক ঘোরতর বিপ্লব, যা মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে পিতৃতন্ত্রের প্রবর্তন করে। মানব সভ্যতার এই প্রথম সামাজিক বিল্পবই সমাজে পুরুষপ্রভুত্বের প্রচলন করল, যার প্রবক্তা হিসাবেই আমাদের দেশে মনু-পরাশরের আবির্ভাব।
মনু পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বাগণ্য তাত্ত্বিক। তাঁর সমসময়ে মনু ছিলেন ঠিক ততটাই প্রাসঙ্গিক, যতখানি অবান্তর হয়ে পড়েছিল মাতৃতন্ত্র। হজরত মহম্মদ যখন ঘোষণা করলেন, একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান চারজনের বেশি স্ত্রী রাখতে পারবে না, তখন আরবের মরু-প্রান্তরে গরু-ভেড়ার সঙ্গে মেয়েদেরও কেনাবেচা চলত। নবী সেই স্বৈরাচারকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে দিয়ে আরব সমাজে এক বৈপ্লবিক শৃঙ্খলার পত্তন করেন। পরস্পরের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত যুদ্ধবাজ আরব উপজাতিগুলিতে সমর্থ, বিবাহযোগ্য পুরুষের সংখ্যা দ্রুত কমছিল, আর সেই অনুপাতে বাড়ছিল তরুণী বিধবার সংখ্যা। সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যও তাই প্রয়োজন ছিল এই বিধানের। তবে কোনও সামাজিক অনুশাসনই শাশ্বত হতে পারে না। মনুসংহিতা ও কোরান-হাদীশের পুঁথিও আজ কেবল সমাজবিজ্ঞানের যাদুঘরেই সংরক্ষিত থাকার কথা। অথচ এই অবান্তর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া শাস্ত্রের প্রতিটি অক্ষর আমরা পরম যত্নে মনের মধ্যে লালন করছি, প্রাত্যহিক জীবনে নিষ্ঠার সঙ্গে অনুশীলন করছি। মহিলাদের তুলনায় আত্মিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষের যে কাল্পনিক ধারণা শাস্ত্র পুর্বপুরুষদের মনে গড়ে দিয়েছিল এবং যে ধারণায় পুরুষরা এখনও বুঁদ হয়ে আছে, তার বিরুদ্ধে জেহাদের নামই নারীমুক্তি আন্দোলন।

আধুনিক নারীমুক্তি আন্দোলনের সূচনা অবশ্যই পশ্চিমে এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে ব্যাপকতর সংগ্রামের অংশ হিসেবেই তার আত্মপ্রকাশ। ধনতন্ত্রে মহিলাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত, ফ্যাসিবাদের দার্শনিক পূর্বসুরী নীটশে উনিশ শতকেই তার ফর্মুলা দিয়ে গিয়েছিলেন — পুরুষের সৃষ্টি হয়েছে সৈনিক হওয়ার জন্য এবং নারীর সৃষ্টি হয়েছে সেই সৈনিকের মনোরঞ্জনের জন্য। তাঁর সতর্কবাণী : কোনো মহিলার কাছে যদি যাও, কখনও চাবুকটা সঙ্গে নিতে ভুলো না। রাজনীতিতে নীটশের মতাদর্শের উত্তরাধিকারী যে নাৎসি জীবনদর্শন, তার প্রবক্তা হিটলার এ সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতেন? তাঁর মতে — পুরুষের হেঁশেলই নারীর একমাত্র উপযুক্ত জায়গা। প্রায় একই সময়ে ইউরোপের ডেকাডেন্ট সাহিত্যে বোদলেয়রের কণ্ঠস্বর শোনা যায় : ওম্যান ইজ ন্যাচারাল দ্যাট ইজ অ্যাবমিনেবল। (এই ডেকাডেন্সের কোনও অনুবাদ হয় না) উন্নত পাশ্চাত্যের ধনতান্ত্রিক মূল্যবোধ অতএব নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রয়োজনীয় পেক্ষাপটটুকু তৈরি করেই রেখেছিল।
পাশাপাশি অনগ্রসর সামন্ততান্ত্রিক প্রাচ্যে পরিপক্ক হয়েছে ভিন্নতর এক পরিপ্রেক্ষিত। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের শরিক হিসেবে মহিলারাও সেখানে প্রকাশ্য মঞ্চে উঠে এসেছেন। এমনিতে যাঁরা পিতা-স্বামী বা পুত্রের অভিভাবকত্ব ছাড়া চৌকাঠ ডিঙোতে পারতেন না, স্বাধীনতা সংগ্রামের ডামাডোল তাঁদের বাইরে আসার সুযোগ করে দেয়। চিকের পর্দা ও বোরখার আড়াল সরিয়ে তাঁরা পথে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু পাদপ্রদীপের আলো স্থানান্তরের প্রক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই মহিলারা সামন্ততান্ত্রিক শোষেণের বিরুদ্ধে, গৃহপালিত পশুর মতো পুরুষদের দ্বারা ব্যবহৃত হওয়ার বিরুদ্ধে জেহাদ শুরু করে দিলেন। তৃতীয় বিশ্বে নারীপ্রগতির আন্দোলন মূলত দুটি প্রশ্নে আবর্তিত হয়েছে — আইনের চোখে পুরুষের চোখে সমানাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের দাবি। প্রথম দাবিটি বেশিরভাগ রাষ্ট্রই মেনে নিয়েছে বা মেনে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। দ্বিতীয় দাবিটি, বলা বাহুল্য সার্বিক অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। পশ্চাৎপদ অর্থনীতি ও অপর্যাপ্ত শিল্পবিকাশের তৃতীয় দুনিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ এত কম যে, আপাতত কোটি কোটি বেকার পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নেমে মহিলাদেরও কোনও উপায় নেই। এতো গেল বেকারত্বের কথা। আর কাজছাঁটাই? সেই দিকে দেখলেও দেখা যাবে বিগত দুই বছরে করোনা মহামারির কারনে যত সংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়েছেন তার মধ্যে পুরুষের তুলনায় মহিলার সংখ্যা অনেক বেশি।
বলা হয়ে থাকে, শারীরিক শক্তিতে নারী যে পুরুষের সমকক্ষ নয়, এটা নাকি জীববিজ্ঞানের সত্য। যদি তাই হয়, তাহলে এ নিয়ে মেয়েদের গ্লানি বোধ করার কোনও কারণ নেই, কেননা সেক্ষেত্রে গোটা প্রাণীজগৎ সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। একই কারণে এই সম্পূর্ণ জেনিটিক ও অনর্জিত উৎকর্ষের জন্য পুরুষদেরও স্বতন্ত্র কোনও গর্ববোধের হেতু নেই। অথচ নারীকে অবলা হিসেবে দেখার ঐতিহাসিক কারণ এটাই। পিতৃতন্ত্র তথা দাস সমাজের শুরুতে এবং পরে সামন্ততন্ত্রে সামাজিক উৎপাদনের সংজ্ঞা যখন সন্তান প্রজননের গার্হস্থ্য চৌহদ্দি অতিক্রম করে কৃষিকাজের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও ধারাবাহিক কায়িক শ্রমের মধ্যে ব্যাপ্ত হলো, তখন থেকেই নারীর দৈহিক শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সমাজ এমন এক অলীক অতিকথা তৈরি করে যে, পুরুষের প্রতি নির্ভরশীলতা, আনুগত্য ও আজ্ঞাবহতা অবলা নারীর ভবিতব্য হিসেবে নির্ধারিত হয়ে যায়। হাজার হাজার বছর ধরে এই মায়াবী রূপকথার পরম্পরা নারীর চেতনাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, সে বুঝতেই পারেনি, তাকে অবলা করে রাখার মধ্যেই পুরুষের স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে সিদ্ধ হয়।

বিজ্ঞানের অগ্রগতি, মানুষের উদ্ভাবনী প্রতিভা, ভারি কাজের বোঝা বইবার জন্য এখন শারীরিক বলের বিকল্প যন্ত্রকে আবিষ্কার করেছে। আর সেই থেকে শুরু হয়েছে উৎপাদনের কায়িক শ্রমের দৈহিক শক্তিমত্তার মর্যাদা ও গুরুত্ব লুপ্ত হওয়ার দিন। ‘বলহীনতার’ জন্য পুরুষের ওপর নারীর নির্ভরশীলতার দিনও ফুরিয়ে এলো। যে দেশে যন্ত্র যত দ্রুত কায়িকশ্রমের এযাবৎ অধিকৃত ক্ষেত্রগুলির দখল নিতে লাগল, সে দেশে নারী তত দ্রুত পুরুষের সঙ্গে সমাজের একই পঙক্তিতে জায়গা করে নিতে লাগল। কেননা, কায়িক শ্রমে ‘পরাজিত’ হলেও মানসিক শ্রমে নারী পুরুষের চেয়ে কোনও অংশে কম নয় — নারীর মস্তিষ্কে যতগুলি কোষ আছে, পুরুষের মস্তিষ্কে তার চেয়ে একটাও বেশি নেই। অব্যবহারে ইস্পাতেও মরচে পড়ে। তাই, হতে পারে, যুগ যুগ ধরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা জং-ধরা কোষগুলো শানিত-সক্রিয় হয়ে উঠতে খানিকটা সময়ের দরকার। কিন্তু পশ্চিমের সর্বব্যাপী প্রযুক্তি বিপ্লব যে কায়িক শ্রমকে, পুরুষের দৈহিক বলের উৎকর্ষকে সামাজিক উৎপাদনের ক্ষেত্র অবান্তর করে দিয়েছে, তাতে কোনও ভুল নেই। স্বভাবতই পশ্চিমে মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ভাবার বস্তুগত ভিতটা এখন কার্যত চূর্ণ।
তৃতীয় বিশ্বে প্রধানত সামন্ত্রতন্ত্রই এখনও বহাল। ভারতের মতো কিছু দেশে এর পাশাপাশি আরোপিত ধনতন্ত্রের সমান্তরাল বিকাশ ঘটলেও, সামাজিক মূল্যবোধে সামন্ততন্ত্রের আধিপত্য কিছুমাত্র খর্ব হয়নি। মহেঞ্জোদরোর বলদ চালিত শকট যে দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এখনও মালবহনের প্রধান ভরসা, সেদেশে কায়িক শ্রমের মূল্য এবং সেইহেতু পুরুষের দৈহিক শক্তির উৎকর্ষ সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারীর অচলাত্বের তত্ত্বকে আরও কিছুকাল জিইয়ে রাখবে হয়ত। তবু পশ্চিমের মতো প্রাচ্যেও এমন দিন আসছে বলে আমরা আশাবাদী, যখন প্রযুক্তি মানবদেহের পেশীকে অবান্তর করে তুলবে, যন্ত্রচালক বা যন্ত্রগণক-চালকের মস্তিষ্কই হয়ে উঠবে দেহের একমাত্র প্রাসঙ্গিক অঙ্গ। এটা এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা।