সম্প্রতি নেতাজিকে নিয়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্য অথবা সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত ঘিরে অনেকেই বলছেন, এ আর নতুন কি। নেতাজিকে নিয়ে আকচা আকচি তো সেই স্বাধীনতার আগে থেকেই চলে আসছে। স্বাধীনতা উত্তরকালে নেতাজির অবদান, অন্তর্ধান নিয়ে যেমন বিতর্ক তুমুল হৈচৈতে পরিণত হয়েছে তেমনি দেশের নানা প্রান্তে কেউ কেউ নেতাজির মূর্তি ভাঙতেও দ্বিধা করেন নি।
এ বছর ২৩ জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্বোধন করেছিলেন নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তি। সেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন দেশের প্রতি নেতাজির অবদানের কথা মাথায় রেখেই এখানে দেশনায়কের একটি গ্রানাইটের মূর্তি বসানো হবে। কেন্দ্রের তরফে এও বলা হয়, যতদিন পর্যন্ত না নেতাজির গ্রানাইট মূর্তি তৈরি হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ইন্ডিয়া গেটে নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তি বসানো থাকবে। কিন্তু মাত্র কয়েক দিন পরেই নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তি নিয়ে ঘটলো বিপত্তি। দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তি অন্ধকারে।
ইন্ডিয়া গেটে যে নেতাজি মূর্তি সূক্ষ্ম পাতলা পর্দার ওপর আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে দেখা যেত তা উদ্বোধনের কয়েকদিন পরেই অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে তৃণমূল সাংসদদের একটি প্রতিনিধি দল ইন্ডিয়া গেটে নেতাজি মূর্তির সামনে হাজির হন। তৃণমূল সাংসদদের দাবি নেতাজিকে অপমান করা হয়েছে। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় লোকসভার অধিবেশনেও অন্ধকার নেতাজি মূর্তির প্রসঙ্গ তোলেন। তারপরও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন না হওয়ায় মূর্তির পাদদেশেই ধর্নায় বসেন তৃণমূল সাংসদেরা।
কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক জানায়, ঝোড়ো হাওয়ার দরুণ নিয়ম মেনেই কিছুক্ষণের জন্য নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তির আলো নেভানো হয়েছিল। কেন্দ্রের আরেকটি সূত্র মারফত জানা যায়, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই হলোগ্রাম মূর্তির জন্য ব্যবহৃত প্রোজেক্টরটি বন্ধ করে হয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও দু-একদিন কেটে যাওয়ার পরও নিষ্প্রদীপ অবস্থাতেই পড়ে থাকে নেতাজির মূর্তি।
প্রসঙ্গত এ বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াযে বাংলার পাঠানো নেতাজি বিষয়ক ট্যাবলোর প্রস্তাব কেন্দ্র নাকচ করে দেয়। গতবছর রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, জল ধরো জল ভরো প্রকল্প নিয়ে ট্যাবলো পাঠানোর প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কেন্দ্র। উল্লেখ্য, পরাক্রম দিবস নাকি দেশনায়ক দিবস! নেতাজির জন্মদিন ঠিক কোন নামে পালন হবে, এ নিয়েও রাজনৈতিক তরজা চরমে উঠেছিল।

নেতাজির ট্যাবলো বাতিল থেকে শুরু করে ইন্ডিয়া গেটে নেতাজির মূর্তি স্থাপন নিয়ে কেবল বিজেপি বিরোধীরা নয়, সরব হয়েছিল হিন্দু মহাসভা। নেতাজির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে বারাকপুরে নীলগঞ্জের আইএনএ বীর সৈনিকদের স্মরণে যজ্ঞানুষ্ঠান শেষে নেতাজির ট্যাবলো বাতিল করা-সহ একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা।
প্রজাতন্ত্র দিবসে নেতাজি ট্যাবলো বাতিল করার পর সমালোচনার ধাক্কায় মোদি বুঝতে পারেন নেতাজি নিয়ে নেতিবাচক পদক্ষেপ হয়ে গিয়েছে। দ্রুত নেতাজি মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে প্রচার নিজের দিকে ঘোরানোই ছিল তার একমাত্র উদ্দেশ্য। নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তির উদ্বোধনে মোদী কংগ্রেস ও নেহরু-গান্ধী পরিবারের সমালোচনা করে দাবি করেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ মানুষের অবদান ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাস চেপে দেওয়া হয়েছে। তার সরকার গর্বের সঙ্গে অতীতের ভুল সংশোধন করছে। তার সরকারই নেতাজি-ফাইল প্রকাশ করেছে।
প্রজাতন্ত্র দিবসে নেতাজি ট্যাবলো নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের চারবার বৈঠক হয়েছে। কেন্দ্র কখনই বাংলার ট্যাবলো বাতিলের কথা বলেনি। কিন্তু নেতাজির ট্যাবলো বাদ দেওয়ারপরেই যে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়, তার জন্য মোদী তথা বিজেপি মোটেই প্রস্তুত ছিল না। এরপরই নেতাজি মূর্তি বানাবার জন্য ব্যস্ত তা শুরু হয়। তার আগে নেতাজির মূর্তি বসানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না।যদি তেমন ইচ্ছে থাকতো তাহলে এত তাড়াতাড়ি হলোগ্রাম মূর্তি করতে হত না, ধীরে সুস্থে গ্রানাইটের মূর্তি স্থাপন করা যেত। ড্যামেজ কন্ট্রোল করতেই আচমকা সিদ্ধান্ত।
বিশেষঙ্গরা অবশ্য বলছেন, মূর্তি বসানোর আরও একটা কারণ হল নেতাজিকে সামনে রেখে কংগ্রেস-বিরোধী মনোভাব নেওয়া। নেতাজির মুর্তি বসানোর এই ধরণের প্রচেষ্টায় মোদী এই বার্তা দিতে চাইছেন যে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁদের অর্থাৎ আরএসএস বা বিজেপিরও ভূমিকা ছিল। আসলে ঐতিহাসিক ভাবে বিজেপি-র ভিতরে বাইরে একটা ঐতিহাসিক সংকট তো আছেই যে তারা ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনে ছিল না, তাছাড়া গান্ধীজিকে হত্যার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের নামও জড়িয়ে আছে, তাই তারা এই ধরনের কাজ করে বার্তা দিতে চাইছে।
মোদি কিম্বা বিজেপি অথবা আরএসএস যদি ভেবে থাকে নেতাজি নিয়ে নতুন রাজনীতির খেলা খেলবে অথাবা নেতাজির মূর্তি বসিয়ে প্রমান হবে
যে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁদেরও ভূমিকা ছিল তাহলে তাঁরা মুর্খের সবর্গে বাস করছেন। এমনিতেই সময় ফুরিয়ে আসছে তার ওপর এই সব
ভরংবাজি চালাবার চেষ্টা হলে দেশবাসী আবর্জনায় ছুড়ে ফেলে দেবে।