রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা বলেছিলেন পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচন থেকে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভবনা প্রবল। একদিকে অকালি দল ভেবেছিল যে পাঞ্জাবে বহুজন সমাজ পার্টির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতা লাভ করা যাবে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পাঞ্জাব নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে মনে করছিল ফের ক্ষমতায় ফিরে আসা যাবে। পাশাপাশি এটাও বোঝা যাচ্ছিল, গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যে দলটি জায়গা করেছিল সেই আম আদমি পার্টি এবার ক্ষমতায় আসার জন্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখছে না।
যদিও পাঞ্জাব বরাবরই ছিল কংগ্রেস এবং শিরোমণি অকালি দলের মজবুত ঘাঁটি। কিন্তু এবারের ভোটের লড়াই ছিল অনেক বেশি তাৎপর্যময়। বিজেপি-পিএলসি থেকে অকালি-বিএসপি জোট কেউই বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী ছাড়তে রাজি ছিল না। কিন্তু কংগ্রেস, অকালি দল, বিজেপির মতো বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করে ৭০ বছর পর পঞ্চ নদীর তীরে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন অরবিন্দ কেজরিয়াল। একেই বলে ইতিহাস সৃষ্টি। বুথ ফেরত সমীক্ষাতেও আপ সবাইকে পিছনে রেখেছিল।
প্রশ্ন কীভাবে এই ইতিহাস তৈরি হল। দিল্লি মডেলেই কি আম আদমি পার্টি কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করলো। যদিও পাঞ্জাবে আপ লড়াই শুরু করেছিল সেই ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে। দিল্লি ছাড়িয়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে আপ-কে মেলে ধরতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই পঞ্চনদের তীর বেছে নিয়েছিলেন। এর পর ২০১৭ সালের বিধানসভা ভোটে ১১৭টি আসনের মধ্যে ২০টি পায় আপ। একের পর এক কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী চরণজিৎ সিং চান্নি থেকে শুরু করে নভজ্যোত সিং সাধু নিজের নিজের কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন। অন্যদিকে আপের প্রার্থীরা একের পর এক কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের নির্বাচনে এই ছবিটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। আপকে থামতে হয়েছিল মাত্র ২০টি আসনে। আর পাঁচ বছর পর পরিবর্তনের ঝড় তুলে দিল সেই আপ।
এই পরিবর্তনের নেপথ্যের কারিগর অবশ্যই অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তার নেতৃত্বের কারণেই এই বিপুল সাফল্য। কারন তিনিই পাঞ্জাবের আম জনতার মনে ৭০ বছর পর পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়েছেন। তা না হলে এতগুলি বছর ধরে হয় শিরোমণি অকালি দল না হলে কংগ্রেস দফায় দফায় সরকার গড়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় দুই রাজনৈতিক দলের লাগাতার দলাদলি আর বিদ্বেষে পাঞ্জাবের মানুষ যে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা যে নতুন কিছু চাইছিলেন সেটা বুঝতে পেরে অরবিন্দ কেজরিওয়াল ২০১৪-র লোকসভা, ২০১৭-র বিধানসভা ভোটে আপ পাঞ্জাবের ভোটে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সেদিন পাঞ্জাবের মানুষ আপের উপর তেমন ভরসা করতে পারেনি। তাঁরা অনেকটা রক্ষণশীল হয়েই বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসকে ফের ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু সেই কংগ্রেসও শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাববাসীর বিশ্বাস রক্ষা করতে পারেনি। তাই শেষ পর্যন্ত বিকল্প হিসাবে আপকেই বেছে নিলেন তাঁরা।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা পাঞ্জাবে এই পরিবর্তন, আপের এই বিপুল জয়ের নেপথ্যে কৃষক আন্দোলনকে একটা বিরাট কারণ বলে মনে করেন। নরেন্দ্র মোদী সরকার শেষ পর্যন্ত কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছিলেন কিন্তু সেটা করতে অনেক সময় নিয়েছিলেন। তার আগেই চাপা ক্ষোভ আগুনে পরিণত হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্রের তিন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে এক বছর ধরে চলা কৃষক আন্দোলনের সময় আপ নেতারা বারবার পাঞ্জাবে ছুটে গিয়েছেন। কেজরিওয়াল রাজধানীর বুকে কৃষক আন্দোলনকে খোলাখুলি সমর্থন জানান। তার পর ভোটমুখী পঞ্জাবে শুধুমাত্র কৃষকদের জন্য বেশ কিছু প্রকল্পের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন আপ প্রধান।
পাঞ্জাবে বেশ কিছুকাল ধরে কর্মসংস্থানের এক বিপুল সংকট তৈরি হয়েছে। কেজরিওয়াল সেটা বেশ ভাল করে বুঝতে পেরেই ভোটের সময়ে মোক্ষম অস্ত্র হিসাবে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষে পঞ্জাবে বেকারত্ব বেড়েছে ৭.৮৫ শতাংশ। কেজরিওয়াল পঞ্জাবের ভোটে প্রচারের মূল বিষয় করেন বেকারত্ব এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকার। একই সঙ্গে প্রতিটি ভোট প্রচারে কেজরিওয়াল ‘দিল্লি মডেল’-এর কথাই তুলে ধরেন। পাঞ্জাব ভোটে তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ঠিক যেমনটা দিল্লিতে করেছিলেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল নামমাত্র খরচে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং পানীয় জল পরিষেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতি মাসে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ১ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আপের ভোট বাড়াতে এই প্রতিশ্রুতিগুলি ম্যাজিকের মত কাজ করেছে।
I like to read your every article!