মঞ্জুশ্রী (Mañjuśrī)
মঞ্জুশ্রীর খ্যাতি অনুবাদক হিসেবে বিশ্বজোড়া। তিনি প্রখ্যাত বিক্রমশীলা বিহারে গ্রন্থগুলি রচনা এবং অনুবাদ করেন। যতদূরসম্ভব তারা দেবীর উপাসক ছিলেন। তারা দেবীর নামে তিনি দুটি বই অনুবাদ করেছেন। এরমধ্যে একটা ছিল তারা-দেবী-স্ত্রোত্র আকাবিমংশ-সাধননামা। অন্যটি হল আর্য-তারা-ভট্টারিকা-সাধনা সকল্পিকা-বিংশক-কর্ম-সংক্ষেপ-নাম। এই দুটি মূল বই কাশ্মীরের আচার্য সূর্য গুপ্তের রচনা। আচার্য সূর্য গুপ্তের মূল বইটির সন্ধান পাওয়া না গেলেও সেগুলির তিব্বতি অনুবাদ অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। তিনি পণ্ডিত অবধুত শ্রীমজ জগদ্রপণএর আরেকটি বই বজ্রাচার্য-ক্রিয়া-সমুচ্চয়ে অনুবাদ করেন। তাঁর উপাধি ছিল পণ্ডিত।
ধর্মকীর্তি (Dharmakīrti)
তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারিত হলে, তিব্বত থেকে বেশ কয়েকজন তিব্বতি পণ্ডিত ভারতে আসেন বৌদ্ধ পুস্তকাদি বিষয়ে জ্ঞান সঞ্চয় করতে। তাঁরা বিক্রমশীলা, নালন্দা এবং জগদ্দল মহাবিহারে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং সংস্কৃত ভাষায় রচিত বৌদ্ধ সাহিত্য বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। এই তিব্বতী পণ্ডিত দলের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ধর্ম কীর্তি।
ধর্মকীর্তি বৌদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে খুবই প্রচলিত নাম। একজ ধর্মকীর্তি ছিলেন নালন্দার প্রখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক। ধর্মকীর্তি সপ্তম শতাব্দীতে চোল রাজ্যের তিরুমলৈ গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কোরূনন্দ। বিভিন্ন তিব্বতী গ্রন্থ থেকে জানা যায় শৈশব থেকে তিনি বেদ ও অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্র সম্বন্ধে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু নাগার্জুন, বসুবন্ধু, দিঙনাগ প্রভৃতি বৌদ্ধ পন্ডিতদের দর্শন পাঠ করে তিনি অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ায় ব্রাহ্মণেরা তাকে ছেড়ে যায়। দমে না গিয়ে তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা করে বিহারের প্রধান ধর্মপালের নিকট শিষ্যত্ব লাভ করেন। এই সময় দিঙনাগের শিষ্য পরম্পরার ঈশ্বরসেন নামক নৈয়ায়িকের কাছে তিনি ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। শিক্ষালাভের শেষে তিনি আত্মজীবনী ও বিভিন্ন গ্রন্থ লিখেছেন। ই-চিং ধর্মপালের উল্লেখ করেছেন বলেই এই ধর্মকীর্তিকে ৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দের আগের মানুষ বলে মনে করা হয়। কিন্তু হিউয়েন সাঙ ধর্মকীর্তির কোথাও নাম উল্লেখ করেন নি। সেই তথ্য থেকে অনুমান করা যায়, যে হিউয়েন সাঙ যখন নালন্দায় ছিলেন, ততদিনে ধর্মকীর্তির মৃত্যু হয়। যাই হোক না কেন, ধর্মপাল খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মানুষ ছিলেন বলে বিশ্লেষণ করা যায়।
আমরা জানিনা, সেই ধর্মকীর্তিই কী বিক্রমশীলার আমাদের আলোচ্য ধর্মকীর্তি কী না। হয়ত নয় কারণ যতদূর সম্ভব তিনি নালন্দার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্দেশক আচার্য শীলভদ্রর সাক্ষাতশিষ্য ধর্মপালের শিষ্য ছিলেন। তাকে কোনওভাবেই বিক্রমশীলা বিহারের ধর্ম কীর্তির সঙ্গে একাসনে বসানো সম্ভব নয়। তার গুরু দিগঙ্গ সপ্তম শতাব্দীর শিক্ষাচার্য এবং বিক্রমশীলা তার এক শতাব্দ পরে অষ্টম শতাব্দে রাজা ধর্মপাল স্থাপন করেন।
ফলে আমাদের আলোচ্য প্রথমে উল্লিখিত ধর্ম কীর্তি। আমরা আন্দাজ করতে পারি তিনি বিক্রমশীলা মহাবিহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কারণ আমরা দেখি তিনি সেই বিহারের আচার্য পদ্মসম্ভবের ‘সাময় পঞ্চ’ নামক কীর্তিটি অনুবাদ করেন।
যদিও এই সন্ন্যাসীর নাম ভারতীয় রীতি অনুসারে দেওয়া হয়েছে কিন্তু যতদূরসম্ভব তিনি তিব্বতী ছিলেন; কারণ আমরা তাঁর জন্মস্থানের নাম পাচ্ছি ক্ষমস বা ক্ষমস্প। শরৎচন্দ্র দাসের মতে এই স্থানটি পূর্ব তিব্বতের অংশ। তাঁকে লোতসবা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; লোতসবা অর্থে যে সব তিব্বতি পণ্ডিত সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শী। ফলে আমরা পরোক্ষে প্রমান করতে পারি তিনি তিব্বতিই ছিলেন। তিনিই বিক্রশীলায় আসেন সংস্কৃত পাঠ নিতে। বিক্রমশীলায় তিনি বেশ কয়েকটি সংস্কৃত বই তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন –

কাল-চক্রভতারা নাম; আর্য-মঞ্জু-শ্রী-নাম-সঙ্গীতি-বৃত্তি আমৃত-বিন্দু-প্রত্যয়-লোক নাম; সময়-পঞ্চ; শ্রী-বুদ্ধ-কপাল-মহা-তন্ত্র-রাজা-টিকা অভয়-পদ্ধতি নাম; অষ্টাদশ-পাটল-ব্যাখান; দশ-তত্ত্ব; বাদী-রাজা-সাধনা; মহা-রাজা-দিদ-মঞ্জুশ্রী-সাধনা; বিধাধর-পিটক-সংক্ষিপ্ত-মনুশ্রী-সাধন; মঞ্জুশ্রী-প্রজ্ঞাপ্রকরম; বজ্রানঙ্গ-মঞ্জু-ঘোষ-সাধনা; আর্য-মনু-বজ্র-সিদ্ধিকা-বীর-সাধনা; মঞ্জু-শ্রী-প্রজ্ঞাচক্র-সাধনা; কৃষ্ণ-যমারি-সাধনা।
অভয়ঙ্কর গুপ্তের সমসাময়িক ছিলেন ধর্ম কীর্তি। ধর্ম কীর্তি তাঁকে কাল-চক্রভতারা-নাম অনুবাদ করতে সহায়তা করেন; এই তথ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার তিনি একাদশ শতের শেষে এবং দ্বাদশ শতাব্দের শুরুতে সক্রিয় ছিলেন।
শাক্য শ্রী ভদ্র (Śākya śrī bhadra)
মহাপণ্ডিত শাক্য শ্রী ভদ্র ছিলেন বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষতম সন্ন্যাসী যিনি তিব্বত ভ্রমণ করেন। তুরুস্কু আক্রমনের ভয়ে তিনি মগধ থেকে তিব্বতে প্রব্রজনের যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাশ্মীরের ভূমিপুত্র। তাঁর সময়ে, তাঁর থেকে আর বড় দার্শনিক আর কেউ ছিল না। নেপালের বুদ্ধ-শ্রী, আচার্য রত্নরক্ষিত, জ্ঞানাঙ্কর গুপ্ত, বুদ্ধ-শ্রী-মিত্র এবং অন্যান্য পণ্ডিত তার সমসাময়িকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিব্বতি নথি সূত্রে স্পষ্ট তিনি রাজা রতিকসেনের সময়ে জীবিত ছিলেন। কিন্তু রতিকসেনের সময় বা তার কাজকর্ম বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট ঐক্যমত্য নেই। তিনি হয়ত সেন পরিবারের কোনও রাজা। কিন্তু আমরা তাঁর রাজত্বকাল সম্বন্ধে খুব বেশি অবহিত নই, হয়ত তিনি বৌদ্ধ সময়ের শেষতম সময়ের রাজা। তার উত্তরপুরুষের নাম লবসেন। তিনি কী লক্ষ্মণ সেন?
লামা তারানাথ জানাচ্ছেন, তাঁর রাজত্বের সময়ে জনৈক তুরুস্কু রাজ চন্দ্র (?) গঙ্গা-যমুনার মাঝে রাজত্ব করত। তিনি বাংলার রাজার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মগধ রাজ্য দখল করেন এবং ওদন্তপুরী আর বিক্রমশীলার বহু সন্ন্যাসী (ভিক্ষু) হত্যা করেন। বিক্রমশীলা মহাবিহারের ধ্বংসের পরে পণ্ডিত শাক্য শ্রী ভদ্র জগদ্দল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান, সেখান থেকে তিনি তিব্বতে যান। বলা হয় বহু ভিক্ষু তার অনুগামী হয়ে তিব্বতে পালিয়ে যায় এবং তাদের জীবনের শেষ সময় সেখানে বুদ্ধদেবের বচন প্রচার করার পুণ্য কর্ম সাধন করে বাকি জীবন অতিবাহিত করে।
তিনি তিব্বতি ভাষায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং তারা-সাধনোপদেশ-কর্ম এবং ভগবতী-তারা-দেব্যকবিংশতি-স্তোত্রপ-য়িকা।
তিনি নিম্নলিখিত বইগুলি অনুবাদ করেন—
শ্রী-কাল-চক্র-জ্ঞাননোপদেশ-নাম; পঞ্চ-গ্রহ-প্রতি-জ্ঞানোনপদেশ-নাম; আর্য-তারা-সাধনা; বিশুদ্ধ-দরররশন-কায়াপোদেশ-নাম; নাম-সঙ্গীতি-বচনোপদেশ-নাম; মনুশ্রী-কাল-চক্র; সংক্ষিপ্তমোঘপাশ-সাধনা।
শাক্য শ্রীর নামাঙ্কিত আরও দুটি বই উল্লিখিত হয়েছে সিংহ-নাদ-রক্ষা-চক্র-নাম; কাল-পুজা-মহা-চতুষ্ক-কারিকা। (চলবে)