বিধায়ক তথা কলকাতা পুরসভার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ ৩১ মার্চ ২০২২ বৃহস্পতি বার ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ প্রস্তুতি এবং পর্যালোচনা সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন।
গরম কাল এসে পড়ল। এর পরেই শহর কলকাতায় আসতে চলছে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার সময় পর্ব। মশা বাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রতিবছরই বর্ণাঢ্য পদ যাত্রার আয়োজন করে কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ। ২০২০ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতা পুরসভার মূল ভবনের সামনে থেকে আরম্ভ হয়ে কলেজ স্কোয়ার পর্যন্ত বিশাল এমন এক পদযাত্রায় পা মিলিয়েছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, সাংসদ তথা কলকাতা পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়, সাংসদ শান্তুনু সেন, ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ, মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার, স্বপন সমাদ্দার-সহ কাউন্সিলরগণ ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত মানুষরা। মেয়র সেদিন জানিয়েছিলেন, ‘বিগত ১০ বছর ধরে মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে লাগাতার এক লড়াই স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মেয়র পারিষদ অতীন ঘোষের নেতৃত্বে কলকাতা পুরসংস্থা করে এসেছে। কিন্তু কলকাতা পুরসভা শুধু এই লড়াইটা করলেই কি আমরা ডেঙ্গু থেকে মুক্তি পাব? না। কলকাতা পুরসভা বা রাজ্য সরকার যতই চেষ্টা করুক না কেন এর থেকে আমরা সম্পূর্ণ মুক্তি পাব না, যতক্ষন পর্যন্ত কলকাতাবাসী এটাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করবে। তাই এই প্রচার। মানুষকে আমরা সচেতন করতে চাই। কোথাও জল জমতে দেবেন না। নিজেও জমাবেন না, অন্য কাউকেও জমাতে দেবেন না।’ ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ জানায়েছিলেন, ‘আমরা নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চাই। ডেঙ্গু আজ সারা পৃথিবীর সমস্যা। সমগ্র বিশ্বের ১২৮ টি দেশ এর ভয়াবহতা এবং গুরুত্ব স্বীকার করেছে। বিশ্ব উষ্ণায়ণের কারণে প্রকৃতির যে খামখেয়ালিপনা শুরু হয়েছে তার কারণে মশাবাহিত রোগের পাদুর্ভাব বাড়ছে। ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা ও বেশি আদ্রতা ডেঙ্গু মশা জন্মাবার আদর্শ পরিবেশ। আমরা একটা সহজ বিষয় জানি, জলে মশা জন্মায়। জলে মশার জন্মানোর বিষয়টা প্রতিরোধ করতে পারে মানুষই। তাই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এই রোগের কোনো ভ্যাক্সিন এখনও বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। এই রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা একটাই করা বলেন, মশাকে উৎস স্থলেই ধ্বংস করতে হবে। এর জন্য আমরা সারা বছর ধরে প্রচার চালাচ্ছি। আমরা প্রতিটি মানুষ যদি সচেতন হই, যদি আমরা জল জমার মতো পরিবেশ তৈরি না করি তাহলে এই রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিই আমাদের কাছে মূল লক্ষ্য। সর্ব স্তরে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে।’ বিশেষজ্ঞরা জানান, ডেঙ্গুর মশা খুব বেশি দূর উড়তে পারে না, ১০০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে তার গতিবিধি। তাই নাগরিকরা যদি নিজের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে পারে, কোথাও জল জমার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় তাহলেই অনেকাংশে এর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
শতাব্দী-প্রাচীন দুই মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে বিগত ১২ বছব ধরে বেশ কিছু নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ, যার একটি হলো মশা গবেষণাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা। ২০১১ সালে তৈরি এই গবেষণাগারটিকে পূর্ব ভারতের প্রথম মশা গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিরেক্টরেট অফ ন্যাশনাল ভেক্টর বর্ন ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম। ভেক্টর কন্ট্রোলের কাছে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের মশা শনাক্তকরণ এবং মশা দমনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে সাহায্য করছে এই মশা গবেষণাকেন্দ্র।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে আবহাওয়া জনিত পরিবর্তন শহরের পরিবেশকে মশার অনুকূল করে তুলেছে। তাই বছরের গোড়া থেকেই শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মশাকে আঁতুড়ে বিনাশ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে ৩২টি র্যাপিড অ্যাকশন টিম, যা সারা দেশে অভিনব। এই র্যাপিড অ্যাকশন টিমগুলি দ্রুত কর্মস্থলে পৌঁছে যাতে তাদের নির্ধারিত কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তা সুনিশ্চিত করতে টিমপিছু একটি করে গাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছে। নির্মীয়মান বাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ অফিস ব্লিডিং, বাজার এলাকা, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিদিন মশার আঁতুরঘর খুঁজে বের করে তা ধ্বংস করছে এই ৩২টি র্যাপিড অ্যাকশন টিম।
প্রতিটি মশা দমনের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ওয়ার্ড স্তরে একজন এবং বরো স্তরে একজন দক্ষ কর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের কাজের তদারকির ভার দেওয়া হয়েছে একজন সিনিয়র এনটেমোলটিস্ট এবং ৩ জন ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসারের ওপর। এই ত্রিস্তরীয় নজরদারি ব্যবস্থা অভূতপূর্ব। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের আগে মাত্র একটি ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসারের স্থায়ী পদ ছিল। বর্তমান অতিরিক্ত ৩টি স্থায়ী ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসারের পোষ্ট তৈরি করে তাতে অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।
মশাকে উৎসে বিনাশের জন্য তৈরি করা হয়েছে মশার সম্ভাব্য ব্রিডিং সাইট-এর ঠিকানা সম্বলিত ওয়ার্ড ভিক্তিক ডাটা ব্যাঙ্ক, যা শুধুমাত্র ভারতের নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বিরল। বছরের প্রায় ৮ মাস এই ডাটা ব্যাঙ্ক অনুযায়ী শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশা দমনের কাজ করে পৌর স্বাস্থ্য বিভাগ।
শহরের নিকাশী খালগুলি কিউলেক্স মশার মূল আঁতুড়ঘর। নভেম্বর মাস থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এই মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হতো শহরবাসী। অতীতে কিউলেক্স মশার লার্ভা মারার কোনও উদ্যোগ ছিল না। ২০১১ সাল থেকে ২০টি দাঁড়টানা নৌকার সাহায্যে নিকাশী খালগুলিতে নিয়মিত নিরাপদ কীটনাশক স্প্রে করে নেওয়া হয়েছে কিউলেক্স মশা দমনের উদ্যোগে, যা দেশে প্রথম।
আগে ম্যালেরিয়া ক্লিনিকগুলিতে শুধুমাত্র ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণের জন্যই রক্ত পরীক্ষা করা হতো। এখন প্রতিটি ক্লিনিকে মূল কাজের পাশাপাশি হিমোগ্লোবিনের পরিমাপ, সুগারের পরিমাণ, প্লেটলেট গণনা-সহ আরও অনেক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিনামূল্যে এলাইজা পদ্ধতিতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণের জন্য চালু করা হয়েছে ১৫টি ডেঙ্গু নির্ণয় কেন্দ্র। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনা এইসব ডেঙ্গু নির্ণয় কেন্দ্রে এনে অত্যাধুনিক BioRad যন্ত্রের সাহায্যে এলাইজা পদ্ধতিতে করা হয় ডেঙ্গু পরীক্ষা। ডেঙ্গু পরীক্ষার রিপোর্ট এসএমএস অ্যালার্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রোগী সহ পৌরসংস্থার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে, যার ভূয়সী প্রশংসা করেছে বিশেষজ্ঞমহল। (চলবে)